📄 ইমাম সাহেবের অগ্নি পরীক্ষা
সত্যপরায়ণ ও সত্যজীবী বিদ্বানগণের ন্যায় ইমাম মালিককেও দুনিয়াপরস্ত শাসনকর্তাগণের কোপানলে পতিত হইয়া ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা প্রদান করিতে হইয়াছিল এবং সত্যজীবী ও সত্যপরায়ণগণের ন্যায় রাসূলুল্লাহর (সা) এই সুযোগ্য ওয়ারিস সেই অগ্নি পরীক্ষায় সগৌরবে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। কি কারণে তিনি তদানীন্তন আব্বাসী শাসক গোষ্ঠীর কোপানলে পতিত হইয়াছিলেন সে সম্বন্ধে বিদ্বানগণ মতভেদ করিয়াছেন। ইবনুল ইমাদ ও ইবনুল জওযী প্রভৃতি ১৪৭ হিজরীর ঘটনা প্রসংগে বলিয়াছেন যে, যবরদস্তীর তালাক অসিদ্ধ অথবা যবরদস্তীর শপথ পন্ড বলিয়া যে সকল হাদীস রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ বর্ণিত হইয়াছে, সেই হাদীসগুলি তদানীন্তন শাসক গোষ্ঠীর পশুবৃত্তির অন্তরায় হওয়ায় তাঁহারা ইমাম মালিককে এই সকল হাদীস রেওয়ায়ত করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব তাঁহাদের নিষেধাজ্ঞার প্রতি দৃকপাত না করিয়া প্রকাশ্যভাবে সেই সকল হাদীস রেওয়ায়ত করিতেন।
ফলে খলীফা আবু জা'ফর মনসুরের আদেশে ইমাম মালিক ধৃত হইয়া বাগদাদে নীত হন। কেহ কেহ বলেন, মুতা বা ঠিকা বিবাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইলে ইমাম সাহেব বলেন, উহা হারাম। আব্বাসী শাসকরা জিজ্ঞাসা করেন, তাহা হইলে আবদুল্লাহ বিনে আব্বাসের উক্তি সম্পর্কে আপনি কি বলিতে চান? ইমাম সাহেব জবাব দেন যে, এই মসআলায় অন্য বিদ্বানগণের উক্তি ইবনে আব্বাসের তুলনায় কুরআনের সহিত অধিকতর সুসমঞ্জস। ইমাম সাহেব মুতার হারাম হওয়ার ফওয়া সনির্বন্ধ ভাবে বারবার জোরের সহিত উচ্চারণ করিতে থাকেন। তাঁহাকে একটি উত্তেজিত ষাঁড়ের পৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া বাগদাদ শহর প্রদক্ষিণ করান হয়। ষাঁড়ের মল ও ময়লা ইমাম সাহেব তাঁর পবিত্র বদন মণ্ডল হইতে মুছিতেন আর উচ্চৈঃস্বরে বলিতেন, "হে বাগদাদের অধিবাসী বৃন্দ, তোমাদের মধ্যে যাহারা আমাকে চিন, তাহারা তো চিনিয়াছই, কিন্তু যাহারা আমাকে চিন না তাহারা আমার পরিচয় গ্রহণ কর, আমি আনসের পুত্র মালিক! আমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করা হইতেছে তোমরা দেখিতেছ, আমি যাহাতে ঠিকা বিবাহ জায়েয হইবার ফতওয়া দেই তজ্জন্য আমার সংগে এই ব্যবহার করা হইতেছে, কিন্তু আমি কিছুতেই এই কার্যকে জায়েয বলিব না।" [শযরাতুয যাহব (১), ২৯০; মানাকীবে আহমদ (ইবনে জওযী), ৩৪৩ পৃঃ]।।
অন্যান্য ঐতিহাসিকরা বলিয়াছেন যে, হযরত ইমাম মালিক আব্বাসী খলীফাদের আনুগত্য স্বীকার করার শপথকে বাতিল মনে করিতেন এবং এই কথা তিনি প্রকাশ্য ভাবে ব্যক্ত করিতেন। মদীনার তদানীন্তন শাসনকর্তা জা'ফর বিনে সুলায়মান ইহাতে অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া ইমাম সাহেবকে ধৃত করেন। তাঁহাকে বিবস্ত্র করিয়া তাঁর প্রসারিত হস্তে সত্তরটি কোড়ার আঘাত করা হয়। ইহার ফলে তাঁর একটি হস্তের কব্জি সম্পূর্ণরূপে খসিয়া যায়। ইবরাহীম বিনে হাসাদ বলেন যে, আমি ইমাম সাহেবের দিকে তাকাইয়া দেখিতেছিলাম, তিনি যখন জা'ফরের দরবার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন তখন তিনি তাঁর একটি হস্ত অপর হস্ত দ্বারা ধরিয়া রাখিয়াছিলেন। [আল ইনতিকা, ৪৩ পৃষ্ঠা]।।
📄 রাসূলুল্লাহর [সা] হাদীসের প্রতি ... শ্রদ্ধা
দারুল হিজরত মদীনা-তাইয়েবার ইমাম হযরত মালিক বিনে আনস (রহ) রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র হাদীসসমূহের প্রতি কিরূপ অসামান্য শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন, সে সম্পর্কে ইমাম সাহেবের অন্যতম ছাত্র স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ও মুজাহিদ হযরত আব্দুল্লাহ বিনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) এক রোমাঞ্চকর ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, একদা আমি ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম, তখন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে একটি বৃশ্চিক দশ বারের অধিক ইমাম সাহেবকে দংশন করে, তাঁর বদন মন্ডল বিবর্ণ হইয়া যায়, কিন্তু তিনি অঙ্গ সঞ্চালন পর্যন্ত না করিয়া সমানভাবে হাদীসের রেওয়ায়ত করিতে থাকেন। রেওয়ায়ত শেষ হইলে বৃশ্চিকটি দূরে নিক্ষিপ্ত হয়। ইবনুল মুবারক এ বিষয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন, স্বীয় ধৈর্য্য শক্তি প্রদর্শন করার জন্য এরূপ করি নাই, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতি সম্মানের বশবর্তী হইয়াই আমাকে এই কার্য করিতে হইয়াছে। [যুরকানীর শরহে মুআত্তা, উপক্রম ভাগ (১), ৩ পৃষ্ঠা]।।
📄 কূপমণ্ডুকতা বিরোধী নীতি
বর্তমান জগতে ইলমুল হাদীসের প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠতম সম্পদ হইতেছে "মু'আত্তা ইমাম মালিক"। ইমাম সাহেব সুদীর্ঘ চল্লিশ বৎসরের কঠোর পরিশ্রমে এই অমূল্য গ্রন্থ সংকলিত ও সুসম্পাদিত করিয়াছিলেন। খলিফা মনসুর আব্বাসী এই অপূর্ব গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হইয়া হজ্জ করিতে আসিয়া ইমাম সাহেবের নিকট প্রস্তাব করেন, ‘আমি আপনার প্রণীত গ্রন্থগুলি নকল করাইয়া মুসলিম অধ্যূষিত নগরসমূহে প্রেরণ করিতে এবং সর্বত্র এই আদেশ প্রচার করিতে চাই যে, সকলকে শুধু আপনার গ্রন্থগুলিরই অনুসরণ করিতে হইবে এবং কেহ ওগুলিকে অতিক্রম করিয়া চলিতে পারিবে না।’
ইমাম সাহেব খলিফার প্রস্তাবের উত্তরে বলিলেন, "আমীরুল মু'মেনীন! আপনি কদাচ এরূপ কার্য করিবেন না। কারণ "মুআত্তা" সংকলিত হইবার পূর্বেই বিভিন্ন উক্তি জনগণের হস্তগত হইয়াছে এবং তাঁহারা হাদীসসমূহ শ্রবণ করিয়াছেন এবং বিভিন্ন রেওয়ায়ত বিদ্বানগণ বর্ণনা করিয়াছেন, যেরূপ উক্তি যে দলের হস্তগত হইয়াছে, তাঁহারা তাহাই অবলম্বন করিয়াছেন, এই ভাবে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে বিদ্বানগণের মতভেদ জনগণের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। অতএব প্রত্যেক নগরের অধিবাসীবৃন্দ তাহাদের জন্য যে যাহা অবলম্বন করিয়াছেন, আপনি তাঁহাদিগকে সেই অবস্থাতেই থাকিতে দিন।"
শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস স্বীয় গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, আর একটি বর্ণনা সূত্রে খলিফা হারুনর রশীদও ইমাম মালিকের নিকট তাঁর গ্রন্থ 'মুআত্তাকে' পবিত্র কা'বার প্রাচীর গাত্রে ঝুলাইয়া দিবার এবং জনমণ্ডলীকে তাঁর অনুসরণে বাধ্য করার প্রস্তাব উত্থাপিত করিয়াছিলেন। ইমাম সাহেব তদুত্তরে হারুনর রশীদকে বলেন, "আপনি এরূপ করিবেন না, কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণের মধ্যে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে মতভেদ ঘটিয়াছিল আর এইভাবেই তাঁহারা বিভিন্ন দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিলেন! তাঁহাদের সমুদয় মতভেদ অতিক্রান্ত সুন্নাতরূপে পরিগৃহীত!" খলিফা হারুন বলিলেন, ‘হে আবু আবদুল্লাহ, আপনার মহানুভবতাকে আল্লাহ বর্ধিত করুন।’ [হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা ১৫০ পৃষ্ঠা]।।
নির্দিষ্ট কোন মযহবে জনমণ্ডলীকে সমবেত হইবার জন্য বাধ্য করা জ্ঞানের সম্প্রসারণ ও গবেষণার পক্ষে হানিকর, হারুনর রশীদও যে তাহা বুঝিতেন, তাঁর শেষ কথায় ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এই ঘটনা দ্বারা একদিকে যেমন ইমাম মালিকের জ্ঞানের প্রখরতা ও তদীয় গ্রন্থ 'মুআত্তার' গৌরব গরিমা প্রতিপন্ন হইতেছে, তেমনি ইহাও প্রমাণিত হইতেছে যে, ইমাম মালিক তাঁর মযহবে জনসাধারণকে সমবেত করার কার্য্যে সম্মতি দেন নাই।
📄 রাসূলুল্লাহর [সা] প্রতি অনাবিল শ্রদ্ধা
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতি ইমাম মালিকের অনাবিল শ্রদ্ধার বিবরণ পাঠকগণ ইতিপূর্বে শ্রবণ করিয়াছেন, এক্ষণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি ইমাম সাহেবের সীমাহীন ও গভীরতম ভক্তির পরিচয় তাঁর দৈনন্দিন জীবনের একটি আচরণ হইতে গ্রহণ করুন। দুর্বলতা ও বার্ধক্য সত্ত্বেও ইমাম সাহেব তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত মদীনার বুকে কোন দিন কোন যানবাহনে আরোহণ করেন নাই। কেহ বিশেষভাবে অনুরোধ করিলে তিনি বলিতেন, "লা আরকাবু ফী মদীনাতি ফিহা জুসসাতু রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা মাদফূনাহ— যে মদীনার মাটির নীচে রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র দেহ সমাহিত রহিয়াছে, সেই মদীনার বুকের উপর আমি কোন যানবাহনে উঠিতে পারি না।" [ইবনে খল্লকান (১) ৪৪৯ পৃঃ; শযরাতুয যাহব (১), ২৮৯ পৃঃ]।।
মুহাম্মদ আরবী (সা) উভয় জগতের আবরূ,
যে তাঁর দুয়ারের মাটি নয়, তার কপালে মাটি!