📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 আহলে রায় ও আহলে হাদীস দলের প্রতিপাদন রীতির পার্থক্য

📄 আহলে রায় ও আহলে হাদীস দলের প্রতিপাদন রীতির পার্থক্য


ঐতিহাসিক ইবনে খলদুন (মৃঃ ৮০৮) তাঁর ইতিহাস গ্রন্থের সুপ্রসিদ্ধ উপক্রমণিকাংশে (মুক্কাদ্দেমা) বলিতেছেন:
‘বিদ্বানগণের ফিক্হ শাস্ত্র দুই ধারায় প্রবাহিত হয়। একটি হইল ‘আহলে রায়’ বা আহলে কিয়াসগণের পন্থা। ইরাকের অধিবাসীগণ এই পথের পথিক। ফিক্হ শাস্ত্রের দ্বিতীয় ধারাটি হইল আহলে হাদীসগণের পন্থা। হেজাযের অধিবাসীবৃন্দ এই পথের অনুসরণকারী। ইরাকীদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অল্পই ছিল, সুতরাং তাহাদের মধ্যে কিয়াসের (প্রতিপাদন প্রণালী) আধিক্য ঘটিয়াছিল। আর এই জন্যই তাহাদিগকে আহলে রায় বলা হইয়া থাকে। এই দলের অগ্রনায়ক, যিনি উল্লিখিত পদ্ধতিতে স্বীয় সহচরবৃন্দের মধ্যে তাঁর মযহব প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, তিনি হইতেছেন ইমাম আবু হানীফা (রহ)।’ [মুক্কাদ্দেমা, ৫২৪ পৃষ্ঠা]।।

ভারত গুরু শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস বলিতেছেন:
‘আহলে রায়দের কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস এবং সাহাবাগণের উক্তি প্রচুর পরিমাণে মওজুদ ছিল না বলিয়া আহলে হাদীসগণের অবলম্বিত নিয়মানুসারে ফিকহের মসআলাসমূহ প্রতিপাদিত করা তাহাদের পক্ষে সম্ভাবিত হয় নাই। অধিকন্তু বিভিন্ন নগর নগরীর বিদ্বানগণের উক্তিসমূহ ও তৎসমূদয়ের পর্যালোচনায় প্রবৃত্ত হওয়ার কার্যেও আহলে রায়গণ বিশেষ উৎসাহ বোধ করেন নাই। তারা তাঁদের নেতৃবর্গ সম্পর্কে ধারণা করিয়া বসিয়াছিলেন যে, জ্ঞান ও গবেষণায় তাঁদের আসন বহু উচ্চে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের অন্তর স্বীয় শিক্ষকদের অপরূপ শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ ছিল। এতদ্ব্যতীত জ্ঞানের তীক্ষ্ণতা এবং একটি বিষয় হইতে অন্য একটি বিষয় অনুমান করার প্রত্যুৎপন্ন মতিত্ব তাহাদের মধ্যে অত্যধিক ছিল। এই সকল কারণে তারা স্বীয় গুরুগণের সিদ্ধান্ত ও উক্তিসমূহকেই ভিত্তি করিয়া বিভিন্ন সমস্যার সমাধান আবিষ্কার করিতে পারিতেন। যে কার্যের জন্য যাহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে, তাঁর পক্ষে সেই কার্যই সহজসাধ্য হয় এবং প্রত্যেক দলের নিকট যাহা রহিয়াছে তাহা লইয়াই তাহারা পরিতুষ্ট থাকে।’ [হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা, ১৫৭ পৃষ্ঠা]।।

আহলে রায় ও আহলে হাদীস দলের প্রতিপাদন রীতির মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্বানগণ বর্ণনা করিয়াছেন, আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় হযরত ইমাম আবু হানীফার বেলায় তাহা প্রতিপন্ন করা সহজ নয়। আমি বিশ্বাস করি যে, ইমামে আ'যমকে সর্বতোভাবে আহলে রায়গণের পর্যায়ভুক্ত করা সঙ্গত নয়। উস্তায আবু মনসূর আবদুল কাহের বাগদাদী (মৃত্যু ৪২০ হিজরী) তদীয় ‘উসূলে দীন’ নামক গ্রন্থে বলিয়াছেন যে, মতবাদের দিক দিয়া ইমাম আবু হানীফার নীতি দুইটি মসআলা ছাড়া সকল বিষয়েই আহলে হাদীসগণের অনুরূপ। [(১) ৩১২ পৃষ্ঠা]।।

অর্থাৎ আল্লাহর তওহীদে উলুহিয়ত, তওহীদে রবুবীয়ত, গুণাবলী ও কার্যসমূহ, উপরের দিকে তাঁর অবস্থান, মহিমান্বিত আরশে তাঁর বিরাজিত হওয়া, সৃষ্টজীব-জগত হইতে তাঁর পার্থক্য ও বিভিন্নতা, সর্ববিষয়ে তাঁর অবগতি ও শক্তির বিদ্যমানতা এবং যদৃচ্ছ ও অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হওয়া এবং নবুওত ও রিসালত, আলমে গাইব ও পুনরুত্থান প্রভৃতি বিষয়ে অন্যান্য নবাবিষ্কৃত দলসমূহের বিপরীত ইমাম সাহেব আহলে হাদীসগণের সহিত একমত হইতে পারেন নাই বলিয়া উস্তায আবু মনসূর ইঙ্গিত করিয়াছেন। প্রকৃত প্রস্তাবে সেই দুইটি বিষয়ের পার্থক্য শাব্দিক পার্থক্য মাত্র।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 প্রথম পার্থক্যের স্বরূপ

📄 প্রথম পার্থক্যের স্বরূপ


শায়খুল মশায়েখ সৈয়দ আবদুল কাদের জীলানী (রহ) স্বীয় গ্রন্থে ইমাম আ'যমের শিষ্যবৃন্দকে মুর্জিয়ারূপে আখ্যাত করিয়াছেন। শায়খ জীলানীর (রহ) এই অভিমত অনেক লোকের পক্ষে বিভ্রান্তির কারণ হইয়াছে। রিজাল শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ খুলাসায় হযরত আলীর পৌত্র ইমাম হাসান বিন মুহাম্মদ হানাফীয়াকে (মৃত ৯৫ হিঃ) মুর্জিয়া মতবাদের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। শহরস্তানীও তাঁর মিলাল ওয়ান নহল গ্রন্থে এই কথাই বলিয়াছেন। কিন্তু ইবনে কুতায়বা বলেন যে, বসরায় সর্ব প্রথম হাসান বিনে বিলাল মু'যানী এই মতবাদ ব্যক্ত করিয়াছিলেন। কেহ কেহ আবুস্ সত্ সাম্মানকে মুর্জিয়া মতবাতের মন্ত্রগুরু রূপে অভিহিত করিয়াছেন। তিনি ১৫২ হিজরীতে পরলোক গমন করেন।

ফলকথা, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদ হানাফীয়া অথবা হাসান বিনে বিলাল মু'যানী কিম্বা আবুস্ সত্ সাম্মান— ইহাদের মধ্যে যে কেহই মুর্জিয়া মতবাদের স্রষ্টা হউন না কেন, ইহাদের পরিগৃহীত ও প্রচারিত ইর্জা সম্বন্ধে সাধারণভাবে একটি বিরাট বিভ্রান্তি সংঘটিত হইয়াছে। আভিধানিকভাবে ইর্জার দুই প্রকার অর্থ প্রতিপন্ন হয়। প্রথম, বিলম্বিত করা; দ্বিতীয়, আশ্বস্ত করা। দুই অর্থকে ভিত্তি করিয়া নিম্ন লিখিত চারটি মতবাদের জন্য ইর্জা শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে:
(১) আমলকে ঈমান অপেক্ষা বিলম্বিত করা।
(২) হযরত আলীর খেলাফতকে প্রথম স্থান হইতে চতুর্থ স্থানে বিলম্বিত করা।
(৩) কবীরা গুনাহর অপরাধীদিগের চূড়ান্ত মীমাংসা কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করা অর্থাৎ তাহারা বেহেশতী হইবে না দোষখী— পার্থিব জীবনে তাহা নির্দিষ্টরূপে উচ্চারণ না করা।
(৪) ঈমানের সঙ্গে গুনাহকে ক্ষতির কারণ বিবেচনা না করা এবং শুধু ঈমানের বিনিময়ে পূর্ণ মুক্তি অর্জিত হইবে বলিয়া আশ্বস্ত করা।

যে সকল মুর্জিয়া চতুর্থ মতবাদ পোষণ করিয়া থাকেন, বিদ্বানগণ শুধু তাহাদিগকেই বিদআতী এবং সাহাবীগণের পরিগৃহীত পথের বিরোধী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। কিন্তু ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদ হানাফীয়া ও ইমাম আবু হানীফা নু'মান বিনে সাবেত এই উল্লিখিত চতুর্থ শ্রেণীর ইর্জার সমর্থনে একটি কথাও উচ্চারণ করিয়াছেন কি?

হাফেয ইবনে হজর আসকালানী ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদ সম্পর্কে লিখিয়াছেন যে, ‘আমি ইমাম সাহেবের বিরচিত গ্রন্থ স্বয়ং পাঠ করিয়াছি। এই গ্রন্থে তিনি কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ কল্পে ওসীয়ত করার পর লিখিয়াছেন যে, আমরা হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও হযরত উমর ফারুককে অন্তরের সহিত ভালবাসি এবং তাঁদের সমর্থনে আমাদের সমুদয় শক্তি প্রয়োগ করিয়া থাকি। কারণ এই উম্মত উল্লিখিত দুই জন সম্পর্কে কখনও পরস্পর সংগ্রাম করেন নাই এবং এই উম্মতে তাঁদের সম্বন্ধে কোন দ্বিধা বা ইতস্ততের ভাবও সৃষ্টি হয় নাই। এই দুই জনের পর যাহারা ফিৎনায় (আত্মকলহে) প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাঁদের বিষয় আমরা বিলম্বিত করিতেছি।’ হাফেয ইবনে হজর বলেন যে, ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদের উক্তির তাৎপর্য এই যে, মুসলমানদের যে দুইটি দল আত্ম কলহ ও সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিলেন, তাঁদের মধ্যে কোন্ দলটি ভ্রান্ত আর কোন্ পক্ষ সত্য পথের পথিক ছিলেন— ইহা নির্দিষ্টরূপে উচ্চারণ করা তিনি সঙ্গত মনে করেন নাই। তিনি ঐ দুইটি দলের পরিণাম কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করিয়াছেন। কিন্তু আমল-বিহীন ঈমান যে মুক্তির পথে যথেষ্ট— এরূপ ইর্জা তিনি সমর্থন করেন নাই। অতএব হাসান বিনে মুহাম্মদ হানাফীয়ার মুর্জিয়া হওয়া কোন মারাত্মক ব্যাপার নয়। [তহযীবুত তহযীব (২) ৩২১ পৃঃ]।।

শাহ সাহেব আরও বলিয়াছেন, ‘এই বিতর্কটি শাব্দিক মাত্র। কারণ সমুদয় আহলে সুন্নত একমত হইয়াছেন যে, কোন গোনাহগার স্বীয় পাপাচরণের জন্য ঈমান হইতে বাহির হইয়া যায় না, অথচ সে স্বীয় পাপাচরণের জন্য দন্ডনীয় হইবে, এরূপ ক্ষেত্রে অতি অল্প চেষ্টাতেই ইহা প্রতিপন্ন করা সম্ভব যে, সকল প্রকার সদাচরণ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।’

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 দ্বিতীয় পার্থক্যের স্বরূপ

📄 দ্বিতীয় পার্থক্যের স্বরূপ


ইমাম বুখারী স্বীয় সহীহ গ্রন্থে কিতাবুল ঈমানের সূচনায় বলিতেছেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এর নির্দেশের অধ্যায় যে, ইসলাম পাঁচটি বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং উহা উক্তি ও আচরণের সমষ্টি এবং উহা বর্ধিত ও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়।’ হাফেয ইবনে হজর বুখারীর ভাষ্য গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণ অর্থাৎ সকলের অভিমত এই যে, আন্তরিক বিশ্বাস, রসনার সাক্ষ্য এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আচরণকে ঈমান বলে। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থ উমদাতুল কারীতে লিখিয়াছেন, ‘রসনার দ্বারা স্বীকৃতি এবং অন্তরের পরিচয়ের নাম ঈমান। ইহাই ইমাম আবু হানীফা এবং ফকীহগণের ও কতিপয় মুতকল্লিমের উক্তি।’ [(১) ১২১ পৃঃ]।।

ইমামে আ'যম আমলকে ঈমানের পর্যায়ভুক্ত করেন নাই অথচ আহলে হাদীসগণ আমলকেও ঈমানের পর্যায়ভুক্ত করিয়াছেন। সাধারণ দৃষ্টিতে এর পার্থক্য পর্বত পরিমাণ দৃশ্যমান হইলেও ইমাম সাহেব এ সম্পর্কে যাহা বলিয়াছেন মনোযোগ সহকারে তাহা অনুধাবন করিলে শাব্দিক পার্থক্যে পর্যবসিত হইবে। হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ) এ সম্পর্কে বলিতেছেন:
‘আমরা একথা বলি না যে, মু'মিনের জন্য পাপাচরণ ক্ষতিকারক হয় না এবং আমরা একথাও বলি না যে, মু'মিন আদৌ দোযখে প্রবেশ করিবে না এবং আমরা একথাও বলি না যে, গোনাহগার মু'মিনের দোযখ চিরন্তনী হইবে, যদি সে ফাসেকও হয় কিন্তু মু'মিন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটিয়া থাকে। এবং আমরা মুর্জিয়াদের মত একথাও বলি না যে, আমাদের যাবতীয় পুণ্যকার্য গ্রাহ্য এবং আমাদের পাপরাজি মার্জনীয় হইবে। আমরা এই কথাই বলি যে, যে ব্যক্তি কোন সৎকার্য করিবে এবং উক্ত কার্য যথা নিয়মে এবং সর্বপ্রকার দোষমুক্ত ভাবে সম্পাদন করিবে এবং কুফর, অহঙ্কার ও কপটাচরণ দ্বারা উহা কলুষিত করিবে না এবং সেই অবস্থায় পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া যাইবে, আল্লাহ তাঁর পুণ্যকার্য বিনষ্ট করিবেন না। বরং গ্রহণ করিবেন এবং তজ্জন্য তাহাকে পুরস্কার দিবেন। শির্ক এবং কুফর ছাড়া অন্যান্য পাপাচরণে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা না করিয়া মু'মিন অবস্থায় মরিয়া যায় তাঁর পরিণাম আল্লাহর অভিপ্রায়ের উপর নির্ভর করে। ইচ্ছা করিলে তিনি তাহাকে শাস্তি দিতে পারেন, আবার ইচ্ছা করিলে তাহাকে ক্ষমাও করিতে পারেন। কিন্তু তাহাকে অনন্তকাল ধরিয়া কিছুতেই দোযখের শাস্তি প্রদান করিবেন না।’ [ফিকহে আকবর, মুল্লা আলী কারীর টীকাসহ, ৯৪ পৃঃ]।।

ইমামে আ'যমের উপরিউক্ত অভিমত যাঁহারা সুস্থ মনে অনুধাবন করিতে সক্ষম, তাঁদের পক্ষে ইহা বুঝিতে পারা আদৌ কষ্টকর নয় যে, তিনি তাঁর অভিমত দ্বারা শুধু মু'তাযেলা এবং খারেজীদের মতবাদের প্রতিবাদ করিয়া ক্ষান্ত হন নাই বরং মুর্জিয়াদের নাম লইয়া তিনি তাঁদের আকীদার প্রতিও স্বীয় অসন্তুষ্টি জ্ঞাপন করিয়াছেন। ইমাম সাহেব স্বয়ং মুর্জিয়াদের নাম লইয়া তাঁদের প্রতিবাদ করেন অথচ একদল লোক তাঁহাকে মুর্জিয়া রূপে উল্লেখ করিয়াছেন কেন, ইহা বাস্তবিকই আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য।

উল্লিখিত ‘ফিকহে আকবর’ গ্রন্থেই কথিত হইয়াছে যে, যে সকল বিষয়ে ঈমান স্থাপন করা আবশ্যক সেই সকল বিষয়ের দিক দিয়া ঈমান বৃদ্ধি বা হ্রাস প্রাপ্ত হয় না। কিন্তু বিশ্বাসের দৃঢ়তার দিক দিয়া ঈমান বৃদ্ধি বা হ্রাস প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কারণ দীনের পরিপক্কতার দিক দিয়া ঈমানদারগণ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। সমুদয় মু'মিন ঈমান ও তাওহীদের দিক দিয়া সমতুল্য কিন্তু আমলের দিক দিয়া সমতুল্য নয়। আর আল্লাহর আদেশ সমূহের সম্মুখে নতশির হওয়া এবং সেগুলি প্রতিপালন করাকে ইসলাম বলে। অতএব অভিধানের দিক দিয়া ঈমান ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে কিন্তু কোন ঈমানই ইসলাম ছাড়া এবং কোন ইসলামই ঈমান ছাড়া হয় না। এই দুইটির পারস্পরিক সম্পর্ক পিঠ ও পেটের সম্পর্কের ন্যায়। আর দীন শব্দটি ঈমান, ইসলাম ও শরীয়তের উপর সমষ্টিগত ভাবে প্রযোজ্য হইয়া থাকে। [১০৩-১০৪ পৃঃ]।।

ফলকথা আহলে হাদীসগণ বলেন যে আমল এবং ঈমান অভিন্ন। আর ইমাম সাহেবের অভিমত এই যে, আচরণ ছাড়া ঈমান আর ঈমান ব্যতীত আচরণ স্বতন্ত্র ভাবে বিরাজিত হইতে পারে না। ইমাম তাহাবী এ সম্পর্কে ইমামে আ'যমের একটি ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন: ইমাম হাম্মাদ বিনে যায়দ একদা ইমামে আ'যমকে রাসূলুল্লাহর (সা) বিখ্যাত হাদীস ‘কোন ইসলাম সর্বাপেক্ষা উত্তম?’ শুনাইতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিতেছিলেন যে, উৎকৃষ্টতম ইসলাম হইতেছে আল্লাহর প্রতি ঈমান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরত এবং জেহাদকেও ঈমানের পর্যায়ভুক্ত করিলেন। এই হাদীস শ্রবণ করিয়া হযরত ইমাম মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তাঁর জনৈক শিষ্য তাঁহাকে বলিলেন, ‘জনাব আপনি ইহার উত্তর দিতেছেন না কেন?’ ইমাম সাহেব বলিলেন, ‘আমি তাঁর কথার কি উত্তর দিব? সে তো আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস বর্ণনা করিতেছে!’ [শরহে তাহাবীয়া, ২৮১ পৃঃ]।।

এই ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, ইমামে আ'যম রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীসকে কিরূপ শ্রদ্ধা করিতেন এবং হাদীসের মুকাবেলায় কোনরূপ তর্ক বিতর্কের অবতারণাকে কিরূপ অসঙ্গত বিবেচনা করিতেন।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম আ’যমের উক্তি

📄 ইমাম আ’যমের উক্তি


হাফিয ইবনে আবদুর রব সনদ সহকারে বর্ণনা দিয়াছেন যে, ইমাম সাহেব বলিয়াছেন:
‘মা জা-আনা আন রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ক্বাবিলনাহু আলার রা’ছি ওয়াল আইনাইন— রাসূলুল্লাহ (সা) নিকট হইতে যাহা আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি তাহা আমরা মস্তক ও চক্ষুদ্বয়ের উপর ধারণ করিয়া কবুল করিয়াছি আর আল্লাহর রাসূলের (সা) সাহাবীগণের যেসব কথা আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে তাঁর মধ্য হইতে আমরা বাছাই করিয়া যে উক্তি উত্তম বিবেচিত হইয়াছে, তাহা গ্রহণ করিয়াছি কিন্তু কোন অবস্থাতেই তাঁদের সকলের সিদ্ধান্তের বাহিরে যাই নাই। অর্থাৎ কোন না কোন সাহাবীর উক্তি গ্রহণ করিয়াছি। কিন্তু ব্যাপার যখন তাবেয়ীগণের পর্যায় পর্যন্ত গড়ায় তখন আমাদের অভিমত এই যে, তারা যেরূপ গবেষণা করিয়াছেন আমরাও সেইরূপ করিতে সক্ষম।’ [আল-ইনতাকা: ১৪৪ পৃঃ]।।

হাফিয ইবনে হজর আসকালানী ইয়াহ্ইয়া বিনে যরীসের প্রমুখাৎ বর্ণনা দিয়াছেন যে, ‘আমি ইমাম আবু হানীফাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, যে কোন সমস্যা হউক না কেন তাঁর সমাধানকল্পে আমি সর্বপ্রথম আল্লাহর গ্রন্থ কুরআনের আশ্রয় লইয়া থাকি, কুরআনে তাঁর সমাধান প্রাপ্ত না হইলে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নত অনুসন্ধান করি, সুন্নতেও তাঁর সমাধান না পাইলে সাহাবাগণের মধ্য হইতে যে কোন জনের উক্তি আমার মনঃপূত বিবেচিত হয়, আমি তাহা বাছিয়া লই কিন্তু কোন অবস্থাতেই তাঁদের সকলের উক্তি পরিহার করিয়া অন্যদিকে গমন করি না।’ [তাহযীবুত তাহযীব (১০) ৪৫১ পৃঃ]।।

শায়খ আবদুল ওয়াহ্হাব মা'রানী ইমাম আ'যমের এই উক্তি উধৃত করিয়াছেন:
‘তোমরা যদি আমার কোন উক্তি প্রকাশ্য কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিকূল দেখিতে পাও তাহা হইলে তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ পালন করিও এবং আমার উক্তি প্রাচীরের উপর ফেলিয়া মারিও।’ [মীযানে কুবরা (১) ৫৭ পৃঃ]।।

‘ফাতাওয়ায় শামীয়া’ নামক ফিক্হ গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইমাম সাহেব বলিয়াছেন: ‘ইযা সাহহাল হাদীসু ফাহুয়া মাযহাবী— কোন সমস্যা সম্বন্ধে সহীহ হাদীসে যে সমাধান পাওয়া যাইবে, তাহাকেই তোমরা আমার মযহব বলিয়া জানিবে।’ গ্রন্থকার ইবনে আবেদীন বলিতেছেন যে, এই রেওয়ায়ত সঠিক ভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। [রদ্দুল মুহতার (১) ৪৬২ পৃঃ]।।

আল্লামা শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস স্বীয় ‘ইকদুর জীদ’ নামক পুস্তিকায় লিখিয়াছেন যে, ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা হইল, ‘আপনার কোন সিদ্ধান্ত রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের বিপরীত হইলে আমরা কি করিব?’ ইমাম সাহেব বলিলেন, ‘আল্লাহর রাসূলের (সা) হাদীসের মুকাবেলায় আমার উক্তি ফেলিয়া দিও।’ [ইকদুল জীদ, ৫৪ পৃঃ]।।

ইমাম সাহেবের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিপক্ষগণের বড় অভিযোগ এই যে, তিনি হাদীস গ্রাহ্য করিতেন না। আল্লামা ইবনে আবেদীন তাঁর ফতাওয়ায় ইমাম সাহেবের উক্তি উধৃত করিয়াছেন: ‘আল হাদীসুয যায়ীফু আহাব্বু ইলাইয়্যা মিন আরা-ইর রিজাল— বিদ্বানগণের ব্যক্তিগত অভিমতের তুলনায় আমার কাছে দুর্বল হাদীসও অধিকতর প্রিয়।’

কাযী আবু ইউসুফ (রহ) স্বীয় উসতায ইমাম আবু হানীফার (রহ) উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন যে, ‘লা ইয়াহিল্লু লি-আহাদিন আইঁ ইয়াফতিয়া বি-ক্বওলিনা মা লাম ই’লাম মিন আইনা ক্বুলনা— আমাদের সিদ্ধান্তের সূত্র অর্থাৎ আমরা কোন্ দলীল সূত্রে সিদ্ধান্ত করিয়াছি ইহা অবগত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ফতওয়া প্রদান করা কাহারও পক্ষে বৈধ হইবে না।’ [বুস্তানে আবুল লয়েস সমরকন্দী: ৮ পৃঃ]।।

ইমাম সাহেব আরও বলিয়াছেন: ‘লা ইয়াম্বাগী লি-মান লাম ই’য়ারিফ দলীলী আইঁ ইয়াফতিয়া বি-কালামী— যে ব্যক্তি আমার দলীল অবগত নহে তাঁর পক্ষে আমার উক্তি সূত্রে ফতওয়া দেওয়া সঙ্গত নয়।’ [হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা ১৬২ পৃঃ]।।

শায়খুল ইসলাম আহমদ বিনে হাম্বল বলিয়াছেন, ‘ইমাম আবু হানীফা বিদ্যাবত্তা, পরহেযগারী এবং পারলৌকিক কল্যাণের আগ্রহে যে আসন অধিকার করিয়াছেন, সে আসন অন্য কেহ অধিকার করিতে পারেন নাই।’ ইরাকের গভর্ণর ইবনে হুরায়রা ইমাম সাহেবকে কুফার প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন, রাজি না হওয়ায় তাঁকে কারারুদ্ধ করিয়া প্রহার করা হইয়াছিল। ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ইমাম সাহেবের এই ত্যাগ আলোচনা করিতেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করিতেন। ইমাম সাহেব ১৫০ হিজরীর শবেবরাতের নিশীথে বাগদাদের কারাগারে মহাপ্রস্থান করিয়াছিলেন। রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ওয়া রাযিয়া আনহু।

ফন্ট সাইজ
15px
17px