📄 চতুর্থ খলীফার যুগে
ইকরিমা বলেন, ইবনে সাবা ইহুদীর প্ররোচনায় শিয়াদের প্রথম যে দলটি ইসলাম ধর্ম বর্জন করিয়া হযরত আলীকে আল্লাহর অবতার বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল হযরত আলী তাহাদিগকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। ইহা জানিতে পারিয়া আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস বলেন, আমি যদি আলীর স্থানে হইতাম, তাহা হইলে ইসলাম ভ্রষ্টদিগকে অগ্নদগ্ধ না করিয়া তরবারী দ্বারা নিহত করিতাম। কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) বলিয়াছেন মান বাদ্দালা দীনাহূ ফাক্বতুলূহু "ইসলাম গ্রহণ করার পর যদি কেহ ফিরিয়া যায় তাহাকে তরবারীর আঘাতে নিহত কর।" ইবনে আব্বাস পুনশ্চ বলিলেন যে, আমি অপরাধিদিগকে কদাচ অগ্নিদগ্ধ করিয়া মারিতাম না। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন যে, তোমরা আল্লাহর দণ্ড দ্বারা কাহাকেও দণ্ডিত করিও না। হযরত আলী ইবনে আব্বাসের উক্তি শ্রবণ করিয়া বলিলেন, ইবনে আব্বাস সত্য কথাই বলিয়াছেন। [তিরমিযী (২), ৩৩৭ পৃঃ]
আবদুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিম বলেন যে, একদা আমি জনৈক সিরিয়াবাসীকে তামাকু হজ্জ (উমরা এবং হজ্জ্বের মিলিত সঙ্কল্প) সম্পর্কে আমার পিতা আবদুল্লাহ বিনে উমরকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে শুনিয়াছিলাম, ইবনে উমর উত্তর করিয়াছিলেন যে, উহা হালাল! তাঁর ফতওয়া শ্রবণ করিয়া সিরিয়ার লোকটি বিস্মিত হইলেন এবং বলিলেন, আপনি হালাল বলিতেছেন বটে কিন্তু আপনার পিতা তামাকু হজ্জ নিষেধ করিতেন। ইবনে উমর বলিলেন, দেখ! যে কার্য আমার পিতা নিষেধ করিয়াছেন যদি তাহা রাসূলুল্লাহ (সা) করিয়া থাকেন তাহা হইলে তুমি বল সেরূপ ক্ষেত্রে আমার পিতার সিদ্ধান্ত মান্য করিতে হইবে, না রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ শিরোধার্য করিয়া লইতে হইবে? লোকটি বলিলেন, এরূপ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশই অবশ্য প্রতিপালিত হইবে। [তিরমিযী, হজ্জ]
হযরত আব্দুল্লাহ বিনে উমর একদা বিখ্যাত তা'বেয়ী আবুশ শা'আসা জাবির বিনে যয়েদকে বলিলেন, ইন্নাকা মিন ফুকা্বহা-ই বারিয়াতি ফালা তুফতি ইল্লা বিকুরআনিম না-তিক্বিন আও সুন্নাতিম মা-যিয়াহ্। "তুমি বসরার ফকীহগণের অন্যতম, সাবধান! স্পষ্ট কুরআন এবং অতিক্রান্ত সুন্নত ছাড়া অন্য কোন বিষয় অবলম্বন করিয়া ফওয়া প্রদান করিওনা।" [দারমী, ৩৩ পৃ]
হযরত মু'আয বিনে জবল বলেন, মুসলিমগণ! "তোমরা বিপদ অবতীর্ণ হইবার পূর্বেই তাঁর জন্য ব্যতিব্যস্ত হইও না, কারণ সাহাবীগণের চিরাচরিত প্রথা ছিল যে, কোন সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইলে, তাঁহারা রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করিয়া শুনাইয়া দিতেন। [দারমী, ২৩ পৃঃ]
হযরত আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস যদি কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হইতেন তাহা হইলে জিজ্ঞাসিত বিষয়টি কুরআনে উল্লিখিত থাকিলে তিনি কুরআনের নির্দেশ জানাইয়া দিতেন। কুরআনে না থাকিলে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস শুনাইয়া দিতেন। জিজ্ঞাসিত বিষয়টির মীমাংসা যদি কুরআন ও হাদীসে না থাকিত, তাহা হইলে তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের ফতওয়া শুনাইয়া দিতেন এবং ইহাও যদি সম্ভবপর না হইত তাহা হইলে তখন তিনি তাঁর নিজের অভিমত ব্যক্ত করিতেন। [দারমী, ৩৩ পৃষ্ঠা]
আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস কর্তৃক আবু বকর ও উমরের ফয়া উল্লেখ করার তাৎপর্য এই নয় যে, তিনি তাঁহাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অন্ধ অনুসরণ বা তকলীদ করিতেন। আবুবকর ও উমরের সমুদয় সিদ্ধান্ত ইসলামী পার্লামেন্টে গৃহীত সিদ্ধান্তের নামান্তর মাত্র, সুতরাং ইবনে আব্বাসের আচরণ দ্বারা ইহাই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন ও সুন্নতে যে বিষয়ের মীমাংসা খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না, সে সম্পর্কে মুসলমানদিগকে সাহাবীগণের ইজমার অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ বিনে মসউদ বলেন যে, কাহারও উপর বিচার-পতিত্বের ভার ন্যস্ত করা হইলে তাহাকে আল্লাহর গ্রন্থ অনুসারে বিচার করিতে হইবে। আর যাহা কুরআনে নাই তাঁর মীমাংসা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসারে করিতে হইবে এবং যে বিষয়ের মীমাংসা কুরআন এবং হাদীসে নাই তাঁর ফয়সালা সাহাবীগণের মিলিত সিদ্ধান্ত অনুসারে করিতে হইবে- [দারমী ৩ পৃঃ]
আমীর মু'আবিয়া হজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় আসিয়া মদীনাতেও আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) মিম্বরে আরোহন করিয়া বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, আমার বিবেচনায় সিরিয়া দেশের দুই মুদ্ (অর্ধ সা) গম এক সা' খেজুরের সমতুল্য। সর্বসাধারণ শাসনকর্তার এই কথা মানিয়া লইলেন কিন্তু বিখ্যাত সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, আমি মু'আবিয়ার এই নির্দেশ মান্য করিব না, রাসূলুল্লাহর (সা) সময়ে যেভাবে ফিত্রা আদা করিতাম ঠিক সেই ভাবেই যাবজ্জীবন দিতে থাকিব এবং এক সা'র কম কোন খাদ্য বস্তুরই ফিত্রা কদাচ বাহির করিব না। [বুখারী ফতহসহ, (৬) ৬৪ পৃঃ]
এই ঘটনা দ্বারা প্রতিপন্ন হয় যে শাসনকর্তাদের শরয়ী মসআলা সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত জনমণ্ডলীর জন্য প্রতিপালনীয় নয় এবং কাহারও ইজতেহাদ আইনের পর্যায়ভুক্ত হইতে পারে না।
📄 তাবেয়ীগণের যুগে
আমর বিনে দীনার তাবেয়ীকুল গৌরব সালেম বিনে আবদুল্লাহ বিনে উমরের বাচনিক রেওয়ায়ত করিয়াছেন যে, হযরত উমর হজ্জের সময় জমরার পর বায়তুল্লাহর যিয়ারতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ তাওয়াফে-ইফাযার পূর্বে সুগন্ধির ব্যবহার নিষেধ করিতেন। জননী আয়েশা বলিলেন, আমি স্বহস্তে রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র দেহে ইহরামের প্রাক্কালে ও হালাল হইবার সময় তাওয়াফে ইফাযার পূর্বে সুগন্ধি মাখাইয়াছি। সালিম বলিতেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসরণের অধিকতর যোগ্য। ইমাম শাফেয়ী বলিতেছেন, সালিম হযরত আয়িশার প্রমুখাৎ বর্ণিত রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের দরুণ স্বীয় পিতামহ ও ইসলাম জগতের সর্বাধিনায়ক উমর ফারুকের ফতওয়া বর্জন করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে আবদুল বর ও ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ মন্তব্য করিয়াছেন যে, ইহাই প্রত্যেক মুসলিমের উপযোগী আচরণ। তকলীদপন্থীরা যেভাবে স্বীয় মান্যস্পদগণের খাতিরে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্জন করিয়া থাকেন, তাহা একজন মুসলিমের উপযোগী আচরণ নয়। [ইকায, ১১ পৃঃ]
তায়েবীকুল-ভূষণ আবু সালমা বসরায় পদার্পণ করিলে আবুন্নসর ইয়াহয়া বিনে আবি কাসির ও ইমাম হাসান বসরী তাঁর সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট গমন করেন। আবু সালমা হাসান বসরীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন যে, তুমিই হাসান বসরী? এই নগরীতে তোমার অপেক্ষা অধিক অন্য কাহারও সাক্ষাৎকার আমার বাঞ্ছনীয় ছিল না। আমি শুনিয়াছি, তুমি নাকি নিজের বুদ্ধি খাটাইয়া ফতওয়া দিয়া থাক, সাবধান! রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত এবং অবতীর্ণ কুরআন ব্যতিরেকে কখনই ফতওয়া দিওনা। [দারমী-৩৩ পৃঃ]
ইমাম আওযায়ী বলিতেছেন যে, পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ স্বনামধন্য তাবেয়ী ফকীহ উমর বিনে আবদুল আযীয ঘোষণা পত্র প্রচার করিলেন যে, আল্লাহর গ্রন্থের মুকাবেলায় কাহারও অভিমতের কোন মূল্য নাই কিন্তু যে বিষয়ে কুরআনে কিছু অবতীর্ণ হয় নাই এবং যে বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসেও কোন নির্দেশ বিদ্যমান নাই কেবলমাত্র সেই সব বিষয়ে ইমামগণের অভিমত মূল্যবান। যে সুন্নাত স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) বলবৎ করিয়া গিয়াছেন তাঁর মুকাবিলায় যে কেহই হোক না কেন কাহারও অভিমত কার্যকরী নয়। [হুজ্জতুল্লাহেল বালেগা-১৫৫ পৃষ্ঠা]
খলীফা উমর বিনে আবদুল আযীযের বাণী ও চার্টারের সাহায্যে কয়েকটি বিষয় দ্ব্যর্থহীন ভাবে প্রমাণিত হইতেছে:- ১। ইসলাম শুধু ইবাদত সংক্রান্ত কতিপয় বিধানের সমষ্টি মাত্র নয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসন শৃংখলার যাবতীয় বিধানের সন্ধান মুখ্য বা পরোক্ষভাবে কুরআন ও সুন্নতে বিদ্যমান রহিয়াছে। ২। কোন বিদ্বান বা আইনজ্ঞের, এমন কি কোন রাষ্ট্রেরও ইসলামী সমাজ জীবনে বা শাসনব্যবস্থায় কুরআন ও সুন্নতের প্রতিকূল কোন ফতওয়া বা আইন রচনার কোন অধিকার নাই। ৩। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক কুরআন ও সুন্নতের বলবৎকারী শক্তি মাত্র। তাঁহারা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শরীয়ত (সমাজ বা রাষ্ট্র বিধান) প্রণয়ন ও প্রবর্তনের অধিকারী নন। ৪। যে সকল বিষয়ে কুরআন ও সুন্নতে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট নির্দেশ বিদ্যমান নাই শুধু সেই সকল বিষয়েই বিদ্বান ও আইনজ্ঞগণের কুরআন ও সুন্নতকে ভিত্তি করিয়া গবেষণা ও প্রতিপাদন কার্যে প্রবৃত্ত হওয়া বৈধ হইবে। ৫। যে বিষয়গুলি কুরআন ও সুন্নতের স্পষ্ট বিধানের প্রতিকূল, সেই সকল বিষয়ে বিদ্বান বা শাসন-কর্তাগণের কোন আদেশ কখনও অনুসরণীয় ও আইনের পর্যায়ভুক্ত হইবে না।
তাবেয়ী-কুলশ্রেষ্ঠ ইব্রাহীম নখয়ী এই অভিমত পোষণ করিতেন যে, দুই ব্যক্তি নামাযের জামাআতে দাঁড়াইলে মুক্তাদিকে ইমামের বাম পার্শ্বে দাঁড়াইতে হইবে। আ'মশ বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) ইবনে আব্বাসকে তাঁর দক্ষিণ পার্শ্বে দাঁড় করাইয়াছিলেন। ইব্রাহীম নখয়ী এই হাদীস শ্রবণ করা মাত্র স্বীয় অভিমত পরিবর্তন করিয়া ফেলিলেন। [দারমী, ৬২ পৃঃ]
স্বনামধন্য তাবেয়ী আমের বিনে আবদুল্লাহ শা'বী বলিতেছেন, বিদ্বানগণ যাহা রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ বর্ণনা করিয়া শুনাইবেন, তোমরা তাহা গ্রহণ কর। কিন্তু তাঁহারা নিজেদের খেয়াল মত যে ব্যবস্থা প্রদান করিবেন তাহা আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ কর।
আমরা এযাবৎ যে সকল উধৃতি পাঠকবর্গের সম্মুখে উপস্থিত করিয়াছি, কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ সম্পর্কে বিদ্বানগণের অভিমত ও আচরণের তাঁর সামান্য মাত্র নিদর্শন। এই সকল উক্তির সাহায্যে দ্ব্যর্থহীন ভাবে ইহা প্রতিপন্ন হয় যে, সুবর্ণ যুগে মুসলমানদের সম্মুখে যে কোন পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যার উদ্ভব হইত কুরআন ও হাদীসের সাহায্যেই সেই সকল সমস্যার সমাধান করিয়া লওয়া মুসলমানগণের চিরন্তন রীতি ছিল। বিদ্বানগণের গবেষণা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বহুমূল্য হইলেও তাঁর প্রত্যেকটি কথা চিরন্তন ও সার্বকালিন নয়। যে দিবস হইতে মুসলমানরা তাহাদের ব্যক্তিগত মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহর গ্রন্থ ও রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের তুল্য আসন প্রদান করিতে শুরু করিয়াছেন সেই দিন হইতেই মুসলমানগণের জাতীয় জীবনের বিধ্বস্তি এবং সামাজিক দৃষ্টি ভঙ্গীর অসামঞ্জস্য আরম্ভ হইয়াছে। সেই দিন হইতেই মুসলমানরা এত দলে ও পথে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে যে, আজ তাহাদিগকে কোন নির্দিষ্ট কেন্দ্রে সমবেত করার প্রচেষ্টা সফল ও সার্থক হইতে পারিতেছেনা। ব্যক্তিগত ও দলীয় খোদাওন্দির প্রভাব হইতে উদ্ধার করিয়া মুসলিম সমাজকে কুরআন ও হাদীসের সনাতন ও শাশ্বত কেন্দ্রে ফিরাইয়া আনাই আহলে হাদীস আন্দোলনের লক্ষ্য।