📄 প্রথম খলীফার যুগে
মইমুন বিনে মিহরান বলিতেছেন যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট কোন বিচার উপস্থিত হইলে সর্বপ্রথম তিনি আল্লাহর গ্রন্থের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেন, যদি উক্ত প্রশ্নের সমাধান কুরআনে প্রাপ্ত হইতেন তাহা হইলে তিনি তদনুসারে মীমাংসা করিয়া দিতেন। যদি কুরআনে না পাইতেন অথচ উক্ত বিষয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ তাঁহার জানা থাকিত, তাহা হইলে তিনি তদনুসারে আদেশ প্রদান করিতেন। যদি উদ্ভূত প্রশ্ন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশও তাঁহার অপরিজ্ঞাত থাকিত, তাহ হইলে তিনি বাহির হইয়া বেড়াইতেন ও বলিতেন, আমার সম্মুখে এই জটিল প্রশ্ন সমুপস্থিত হইয়াছে, আপনারা কি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) কোন হাদীস অবগত আছেন? মইমুন বলিতেছেন, কখন কখন এমনও ঘটিত যে, সকলেই উক্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অবগত থাকিতেন। তখন আবু বকর বলিতেন, আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন লোকও বিদ্যমান রহিয়াছেন যাঁহারা আমাদের রাসূলের (সা) হাদীস স্মরণ করিয়া রাখিয়াছেন। মইমুন বলিতেছেন, জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সমাধান রাসূলুল্লাহর হাদীসেও যদি না পাওয়া যাইত, তাহা হইলে আবুবকর নেতৃস্থানীয় এবং সজ্জন ব্যক্তিদিগকে সমবেত করিয়া তাঁহাদের তিনি সমুপস্থিত সমস্যার সমাধান করিয়া দিতেন। [দারমী ৩২ পৃঃ]
জননী আয়েশা বলিতেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন অনন্তধামে যাত্রা করিলেন তখন আবু বকর মদীনার নিকটবর্তী সুনুহ নামক স্থানে স্বীয় বাসভবনে অবস্থান করিতেছিলেন। হযরতের (সা) মৃত্যু শোকে দিশাহারা হইয়া হযরত উমর বলিতে লাগিলেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহর (সা) কিছুতেই মৃত্যু ঘটে নাই, তিনি মরিতে পারেন না। ইতিমধ্যে আবুবকর আসিয়া পড়িলেন ও হযরতের (সা) গাত্র বস্ত্র উন্মোচন করিয়া তাঁর পবিত্র দেহে চুম্বন দান করিলেন এবং বলিলেন, "আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসৃষ্ট হউন! জীবনে ও মরণে আপনি পবিত্রই থাকিয়া গেলেন!" তারপর ঘর হইতে বহির্গত হইয়া উপস্থিত জনসাধারণকে সম্বোধন করিলেন। আবু বকরের কন্ঠস্বর শ্রবণ করিয়া উমর বসিয়া পড়িলেন। আবু বকর বলিলেন, আপনারা অবগত হউন, "যাহারা মুহাম্মদকে (সা) পূজা করিত তাহারা শ্রবণ করুক যে, হযরত মুহাম্মদ (সা) সত্যই মরিয়া গিয়াছেন আর যাহারা আল্লাহর পূজারী তাহারা শ্রবণ করুক যে, তিনি চিরঞ্জীব, তিনি কখনও মরিবেন না।" অতঃপর আবু বকর কুরআনের নিম্নলিখিত আয়তটি পাঠ করিলেন :
ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন - এবং বলিলেন: ওয়া মা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূলুন ক্বাদ খালাত মিন ক্বাবলিহির রুসুলু আফা-ইম্মাতা আও ক্বুতিলাং কালাবতুম আলা আ’ক্বাবিকুম ওয়ামাই ইয়ানকালিব আলা আক্বিবাইহি ফালাই ইয়াযুররাল্লাহা শাইয়াওঁ ওয়াসাইয়াজযিল্লাহুশ শাকিরীন।
"তুমিও মরণশীল এবং তাহারাও মরণশীল" তারপর বলিলেন, "মুহাম্মদ (সা) রাসূল ছাড়া অন্য কিছুই নহেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণ সকলেই অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছেন। মুহাম্মদ (সা) মরিয়া গেলে বা নিহত হইলে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে? অথচ যাহারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে বস্তুতঃ তাহারা আল্লাহর কিছুই ক্ষতিসাধন করিতে পারিবে না এবং আল্লাহ কৃতজ্ঞদিগকে উপযুক্ত ভাবে পুরস্কৃত করিবেন।" [বুখারী, ফতহ সহ (৮) ১১১ পৃঃ]
উল্লিখিত ঘটনার ভিতরে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করিবার রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রেম ও আসক্তি ঈমানের অপরিহার্য অঙ্গ এবং নবী-প্রেমের আতিশয্যের ফলেই হযরত উমর ফারুক রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুকে চাক্ষুষ করা সত্বেও বিশ্বাস করিতে পারেন নাই কিন্তু তাঁর সম্বিৎ ফিরাইয়া আনিল কুরআন! মুসলমানদের প্রণয় ও প্রীতি, ভক্তি ও শ্রদ্ধা, শত্রুতা ও বৈরিভাব সমস্তকেই আল্লাহর গ্রন্থ এবং তদীয় নবীর সুন্নতের অধীনে রাখিতে হইবে। যদি এরূপ না হয় তাহা হইলে কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত পথে চলিয়া কোন ব্যক্তি ওলী, দরবেশ, রাজনীতিবিদ ও অত্যাধুনিক বলিয়া অভিহিত হইতে পারে বটে- কিন্তু মুসলিমরূপে তাঁহাকে কিছুতেই মর্যাদা দান করা চলিবে না। উমর ফারুক কিভাবে স্বীয় অন্তর্নিহিত অনুরাগ ও শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি কুরআনের নির্দেশের পাদমূলে বিসর্জন দিয়াছিলেন এই ঘটনায় তাহা সুস্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হইতেছে। এই বিষয়ে আল্লাহর রাসূলও (সা) জাতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সাবধান করিয়া গিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, লা ইউ’মিনু আহাদুকুম হাত্তা ইয়াকূনা হাওয়া-হু তাবি’আল্লিমা জি’তু বিহি। "শুন! তোমরা কেহই ঈমানের অধিকারী হইতে পারিবেনা যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রবৃত্তিকে, আমি যাহা লইয়া আসিয়াছি (অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ) তাঁর অধীন করিতে সক্ষম হইবে।” [মুসলিম]
মা আয়েশা আরও বলিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) পরলোক গমনের পর আনসারগণ সায়েদাদের চাতালে স'অদ বিনে উবাদার নিকট সমবেত হইয়া বলাবলি করিতে লাগিলেন যে, আনসারদের মধ্য হইতে একজন আর মুহাজেরগণের মধ্য হইতে একজন সর্বাধিনায়ক বা শাসনকর্তা (আমীর) নির্বাচন করা হউক, তখন আবু বকর সিদ্দীক রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস তাঁহাদিগকে পাঠ করিয়া শুনাইলেন যে, আল আইম্মাতু মিন ক্বুরাইশ "নেতা কুরায়েশ বংশোদ্ভূত হইবেন।" ইবনুত্তীন বলিতেছেন, আনসারগণ রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস শ্রবণ করা মাত্র তাহা মান্য করিয়া লইয়াছিলেন এবং নিজেদের দাবী প্রত্যাহার করিয়া ছিলেন- [বুখারী ফতহ সহ (৭) ২৫ পৃঃ]
কুরায়শদের ইমাম সম্পর্কিত হাদীসটি সংবাদ, না আদেশের পর্যায়ভুক্ত এবং উক্ত আদেশ সার্বজনীন ও সর্বকালীন কি না এ বিষয়ে পরবর্তী বিদ্বানগণ যতই মাথা ঘামাইয়া থাকুন না কেন, ইহা সর্ববাদীসম্মত যে, এই হাদীসটি তখনকার মত একটি জাতীয় জীবনের বিধ্বস্তকারী মহা সংগ্রামের প্রতিরোধকল্পে অশেষ প্রকারে সহায়ক হইয়া ছিল। আজ যাহারা রাষ্ট্র ক্ষেত্র হইতে রাসূলুল্লাহর (সা) সার্বভৌমত্ব চির সমাধিস্থ করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন তাঁহারা স্বীয় ইসলামের ভনিতায় লজ্জা অনুভব করিতে পারেন কি?
যুয়বের পুত্র কুবায়সা বলিয়াছেন যে, কোন ব্যক্তির পিতামহী হযরত আবু বকর সিদ্দীকের নিকট আসিয়া মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তাঁর কি অংশ নির্ধারিত আছে তাহা জানিতে চায়। আবু বকর বলিলেন আল্লাহর গ্রন্থে তোমার অংশের কথা উল্লিখিত নাই আর এ সম্বন্ধে হাদীসের নির্দেশ কি তাহাও আমি অবগত নই। তুমি এখন ফিরিয়া যাও আমি লোকদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিব। অতঃপর আবু বকর সাহাবাগণকে সমবেত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) উল্লিখিত প্রশ্নের কি মীমাংসা করিয়াছেন? মুগীরা বিনে শো'বা বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত ছিলাম, তিনি পিতামহীকে পৌত্রের পরিত্যক্ত সম্পত্তির ষষ্ঠাংশ দান করিয়াছিলেন। আবু বকর বলিলেন, একথা আপনার মত আরও কেহ শুনিয়াছেন কি? তখন মুহাম্মদ বিনে মুসলিমা দাঁড়াইলেন এবং মুগীরার অনুরূপ কথা বলিলেন। তখন আবু বকর সেই ব্যবস্থা পিতামহীর জন্য বলবৎ করিয়া দিলেন। [মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, ৩২৭ পৃঃ]
এই ঘটনার ভিতর লক্ষ্য করা উচিত যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাসূলুল্লাহর (সা) পরম মিত্র এবং স্বনামধন্য সহচর হওয়া সত্ত্বেও পিতামহী সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অবগত হইতে পারেন নাই। অথচ এ কথা তাঁর অপেক্ষা জুনিয়ার সাহাবীগণ অবগত ছিলেন। পরবর্তীকালে বিদ্বানগণের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ ইহাও বটে, অর্থাৎ একজন ইমামের নিকট যে হাদীসটি পৌঁছায় নাই অথবা তাঁর বিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয় নাই সেই হাদীসটি অপর ইমামের পক্ষে শ্রবণ করার সুযোগ ঘটিয়াছিল এবং তিনি যে মাধ্যমে উহা শ্রবণ করিয়াছিলেন তাহাতে অবিশ্বস্ত কোন রাবী ছিল না। ফলে পরবর্তী ইমাম উল্লিখিত হাদীসটিকে গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু পূর্ববর্তী ইমামের পক্ষে উহা গ্রহণ করা সম্ভবপর হয় নাই। এক্ষণে মুসলমানদের ইতিকর্তব্য কি হইবে?
যে বিদ্বান উপরিউক্ত কারণে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অবগত হইতে না পারিয়া স্বীয় সাধারণ জ্ঞানের আশ্রয় লইয়া ফতওয়া প্রদান করিয়াছেন মুসলমানদিগকে তাহারই অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে, না যে বিদ্বান রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসারে স্বীয় অভিমত সুসংবদ্ধ করিয়াছেন মুসলমানদিগকে তাহারই উক্তি মান্য করিতে হইবে?
আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস বলিতেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র দেহ কোথায় সমাধিস্থ করা হইবে সে সম্বন্ধে সাহাবাগণের মধ্যে মতভেদ ঘটে। কেহ কেহ তাঁর পবিত্র দেহ তাঁর মসজিদেই দাফন করিতে চাহেন, আর অন্য একটি দল হুযুরকে (সা) তাঁর সহচরবৃন্দের সহিত সাধারণ কবরস্তানে দাফন করিতে ইচ্ছা করেন। হযরত আবু বকর বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট শ্রবণ করিয়াছি, তিনি বলিয়াছিলেন, মা ফুবিযা নাবিয়্যুন ইল্লা দুফিনা হাইসু ইউক্ববাযু। “প্রত্যেক নবী যে স্থানে মৃত্যুমুখে পতিত হন, সেই স্থানেই তাঁহাকে দাফন করা হইয়া থাকে।” ইবনে আব্বাস বলেন যে, এই হাদীস শ্রবণ করার পর সাহাবাগণ দ্বিরুক্তি না করিয়া হযরত (সা) যে শয্যায় মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছিলেন তাহা উত্তোলন করিয়া তাঁর নিম্নস্থ ভূমিতে হযরতের (সা) পবিত্র রওযা খনন করিয়া ছিলেন। [ইবনে মাজা, ১১৮ পৃষ্ঠা]
জননী আয়েশা বলেন যে হযরত ফাতেমা ও হযরত আব্বাস [রাসূলুল্লাহর (সা) কন্যা ও চাচা] আবু বকর সিদ্দীকের নিকট আগমন করিয়া রাসূলুল্লাহর (সা) পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ দাবী করিলেন, তাঁহারা ফিদিকের বাগান আর খয়বরের জমির ভাগ চাহিতেছিলেন। আবু বকর বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলিতে শুনিয়াছি, নাহনু মা’আশিরাল আম্বিয়া-ই লা নূরাসু মা তারাকনাহু সাদাক্বাহ। "আমরা নবীর দল, আমাদের কেহ উত্তরাধিকারী হয় না, আমরা যাহা পরিত্যাগ করিয়া যাই সমস্তই সর্বসাধারণের জন্য।" [বুখারী, ফারায়েয]
আবু বকর সিদ্দীক বিবি ফাতেমাকে তাঁর পিতার সম্পত্তির ভাগ প্রদান করেন নাই বলিয়া শিয়ারা আবু বকর, উমর এবং অন্যান্য সাহাবাগণের উপর খুব চটা কিন্তু আবু বকর সিদ্দীককে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের বশবর্তী হইয়াই বিবি ফাতেমার দাবী প্রত্যাখ্যান করিতে হইয়াছিল। বিবি ফাতেমা ও হযরত আলীর রাসূলুল্লাহর (সা) এই নির্দেশটি অপরিজ্ঞাত ছিল এবং তাঁহারা কুরআনে বর্ণিত সাধারণ দায়ভাগের নিয়ম অনুযায়ী নিজেদিগকে রাসূলুল্লাহর (সা) পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বিবেচনা করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহাদের এই ইজতেহাদকে আবুবকর সিদ্দীক রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস দ্বারা খন্ডন করিয়াছিলেন। ফাতেমা ও আলীর ইজতেহাদ খন্ডন করার যোগ্যতা যদি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের ভিতর থাকে তাহা হইলে অন্যান্য উলামা, ফকীহ, মুহাদ্দিস, আওলিয়া ও রাষ্ট্র নীতিবিদগণের ব্যক্তিগত বা দলগত সিদ্ধান্ত উল্টাইয়া দিবার ক্ষমতা রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসকে প্রদান করা হইবে না কেন?
এই ঘটনার ভিতর আর একটি বিষয় লক্ষ্য করিবার রহিয়াছে। ইহা অনস্বীকার্য যে কুরআনের ব্যবস্থা সূত্রে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অংশ বিদ্যমান রহিয়াছে। যাঁহারা কেতাবুল্লাহর অতিরিক্ত কোন হাদীস স্বীকার করিতে ইতস্ততঃ করেন, তাঁহাদিগকে আবু বকরের আচরণ হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত অথবা ১০/১২ জন সাহাবী ব্যতীত সমস্ত সাহাবীর ইজমা বাতিল এবং তাঁহাদের আচরণকে শিয়াদের মত গুমরাহী বলিয়া মান্য করিয়া লওয়া কর্তব্য।
মা আয়েশা বলিতেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) পরলোকগমনের পর হযরতের সহধর্মীনীগণ হযরত উসমানকে আবুবকর সিদ্দীকের নিকট প্রেরণ করিয়া রাসূলুল্লাহর (সা) পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ দাবী করার সংকল্প করেন। মা আয়েশা তাঁহাদিগকে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কি একথা বলিয়া যান নাই যে, আমাদের অর্থাৎ নবীগণের পরিত্যক্ত সম্পত্তির কেহ উত্তরাধিকারী হয় না, সমস্তই জাতীয় সম্পদে পরিণত হইয়া থাকে? [বুখারী, ফারয়েয]
📄 দ্বিতীয় খলীফার যুগে
মসরুক তাবেয়ী বলেন যে, দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর একদা মিম্বরে আরোহন করিয়া জনমন্ডলীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, স্ত্রীলোকদের মোহরের পরিমাণ বর্দ্ধিত করা যদি শুভকার্য হইত তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তদীয় সাহাবীগণ বর্ধিত পরিমাণে মোহর নির্ধারিত করিতেন কিন্তু তাঁহাদের মধ্যে কেহই চারি শত দিরহামের অতিরিক্ত মোহর স্বীয় স্ত্রী ও কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করেন নাই। অতএব অতঃপর যদি কেহ চারিশত দিরহামের অতিরিক্ত মোহর স্বীয় স্ত্রী বা কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করে তাহা হইলে অতিরিক্ত অর্থ আমি বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইব। মসরুক বলেন যে জনৈকা কুরায়শী মহিলা হযরত উমরের নির্দেশ শ্রবণ করিয়া বাধা প্রদান করিলেন এবং হযরত উমরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আমিরুল মুমেনীন, আপনি কি লোকদিগকে স্ত্রী লোকদের মোহর চারিশত দিরহামের অতিরিক্ত নির্ধারিত করিতে নিষেধ করিতেছেন? আপনি কি কুরআনের আয়াত শ্রবণ করেন নাই যে, আল্লাহ বলিয়াছেন, ওয়া আতাইতুম ইহদাহুন্না ক্বিনতারা। "তোমরা যদি স্বীয় নারীদিগকে অর্থের স্তূপ মোহর-স্বরূপ দান কর"। মহিলাটির কথা শ্রবণ করিয়া হযরত উমর তৎক্ষণাৎ মসজিদে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং পুনরায় মিম্বরে আরোহন করিয়া বলিলেন, "একজন পুরুষ ভুল বুঝিয়াছিল কিন্তু একজন নারী ঠিক বুঝিয়াছে। হে জনমণ্ডলী, আমি আপনাদিগকে চারিশত দিরহামের অতিরিক্ত মোহর নির্ধারণ করিতে নিষেধ করিয়াছিলাম, আমি এক্ষণে আমার নির্দেশ প্রত্যাহার করিয়া লইতেছি এবং বলিতেছি যে, যাহার যেরূপ ইচ্ছা ও সামার্থ সে তদনুরূপ মোহর নির্ধারণ করিতে পারে।” [আবু ইয়োলা]
এই ঘটনার সাহায্যে তিনটি বিষয় অবিসম্বাদিত ভাবে প্রমাণিত হইতেছে: প্রথম, আইনের তাৎপর্য অনুধাবন করার যোগ্যতায় নর-নারী সম্পূর্ণ অভিন্ন। দ্বিতীয়, কোন রাষ্ট্রাধিনায়কের বা পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত কুরআনের বিপরীত হইলে ইসলামী রাষ্ট্রে উক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে না। তৃতীয়, সমুদয় বিদ্বান ও চিন্তাশীল মনীষীগণের অভিমত কুরআনের প্রতিকূল হইলে তাঁহাদের অভিমত পরিত্যজ্য হইবে।
দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর কুফার চীফ জাষ্টিস কাযী সুরায়হকে যাহা লিখিয়াছিলেন সমস্যা ও তাঁর সমাধান পদ্ধতির পক্ষে উহাকে ইসলামের বুনিয়াদী বিধানরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। তিনি লিখিয়াছেন, "আপনার নিকট কোন সমস্যা সমুপস্থিত হইলে আপনি আল্লাহর গ্রন্থ অনুসারে তাঁর নিস্পত্তি করিয়া দিবেন। সাবধান! মানুষের উক্তির দিকে আপনি আগ্রহান্বিত হইবেন না আর বিষয়টি যদি এরূপ হয় যাহার মীমাংসা আল্লাহর গ্রন্থে নাই তাহা হইলে আপনি রাসূলুল্লাহর হাদীসে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন এবং তদনুসারে সমাগত সমস্যার সমাধান করিয়া দিন আর যদি বিষয়টির মীমাংসা আল্লাহর গ্রন্থের মত রাসূলের সুন্নতে খুঁজিয়া না পান তাহা হইলে (ইসলামী পার্লামেন্টে) মানুষেরা যে বিষয়েতে একমত হইয়াছেন আপনি তাহা গ্রহণ করুন আর যদি উপস্থাপিত প্রশ্নের মীমাংসা আল্লাহর কিতাবে এবং তাঁর নবীর সুন্নতে বিদ্যমান না থাকে এবং পূর্ববর্তীগণও কেহ সে বিষয়ে আলোচনা না করিয়া থাকেন তাহা হইলে আপনি দুইটির মধ্য হইতে একটি পথ নির্বাচন করিয়া লউন অর্থাৎ হয় আপনি আপনার ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধির সাহায্য লইয়া অগ্রসর হউন, আর না হয় তাঁর মীমাংসায় ক্ষান্ত থাকুন। আমি কিন্তু আপনার পক্ষে ক্ষান্ত থাকাই মঙ্গলজনক বলিয়া বিবেচনা করি। [দারমী]
আবদুল্লাহ বিনে উমর বলেন, দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক মৃত্যু-শয্যায় নিজের মনে বলাবলি করিতে লাগিলেন যে, আমি যদি কাহাকেও আমার স্থলাভিষিক্ত করিয়া না যাই তাহা হইলে রাসূলুল্লাহও (সা) তো কাহাকেও স্থলাভিষিক্ত করিয়া জান নাই। আর যদি আমি কোন ব্যক্তিকে আমার স্থলাভিষিক্ত করিয়া যাই তাহা হইলে আবু বকর স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করিয়া গিয়াছিলেন। হযরত উমরের পুত্র বিখ্যাত তাপস ও বিদ্বান হযরত আবদুল্লাহ বলিতেছেন, আল্লাহর কসম! যখন পিতা রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বকরের তুলনা করিলেন তখনই আমি বুঝিয়া ফেলিলাম যে, তিনি আবু বকর অথবা অন্য কাহারও খাতিরে রাসূলুল্লাহ (সা) রীতি পরিহার করিবেন না এবং কাহাকেও তিনি স্বীয় স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করিয়া যাইবেন না। [মুসলিম (২) ১২০ পৃঃ]
যাহারা মনে করিয়া থাকেন যে, হযরত উমর সকল বিষয়ে তাঁর পূর্ববর্তী শাসনকর্তা খলীফা আবু বকরের অন্ধ অনুসরণ করিয়া চলিতেন এই ঘটনায় তাঁহাদের চৈতন্য উদ্রিক্ত হওয়া উচিত। হযরত উমর তাঁর খিলাফতের যুগে হযরত আবু বকরের বহু ব্যক্তিগত নির্দেশ অমান্য করিয়াছেন এবং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের (সা) সমকক্ষতায় কাহারও কোন নির্দেশ মুসলমানের কাছে যে গ্রহণ যোগ্য হইতে পারে না ইহা সামান্য চিন্তা করিলে সকলেই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে জাতির সর্বাধিনায়ক নির্বাচন করার অধিকার ইসলাম জাতির হস্তেই প্রদান করিয়াছে এবং এই জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা) আবশ্যক বিবেচনা করা সত্ত্বেও তাঁর মহাপ্রয়াণের প্রাক্কালে স্পষ্ট ভাষায় কাহাকেও স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করিয়া যান নাই।
সঈদ বিনুল মুসাইয়েব বলেন, হযরত উমরের ব্যক্তিগত অভিমত অনুসারে স্ত্রীর পক্ষে তাঁর স্বামীর দিয়ত অর্থাৎ আহত বা নিহত হওয়ার দরুন আর্থিক ক্ষতিপূরণের কোন অংশ প্রাপ্ত হইবার উপায় ছিল না কিন্তু যাহ্হাক বিনে সুফয়ান হযরত উমরকে লিখিয়া পাঠাইলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আশ্হয়স বিনুয যবাবির স্ত্রীকে তাঁর স্বামীর দিয়তের দরুণ অর্থের অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা অবগত হওয়া মাত্র হযরত উমর ফারুক তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। [ইবনে মাজাহ, ১৯৪ পৃঃ]
উমর ফারুক অগ্নিপূজকদের নিকট হইতে সামরিক ট্যাক্স গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না, তাহাদিগকে তিনি "আবাদাতুল আওসান" বা প্রতিমাপূজকদের পর্যায়ভুক্ত মনে করিতেন। অবশেষে আবদুর রহমান বিনে আওফ সাক্ষ্যদান করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরের অগ্নিপূজকদের নিকট সামরিক ট্যাক্স গ্রহণ করিয়াছিলেন। অতঃপর হযরত উমর তাঁর পূর্ব মত পরিহার করিয়া লইলেন।
আবু সঈদ খুদরী বলেন যে, একদা আমি আনসারদের এক বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম এমন সময় আবু মূসা আশআরী অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত ভাবে প্রবেশ করিলেন এবং বলিলেন, আমি উমরের নিকট গিয়া বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করার জন্য তিনবার অনুমতি চাই এবং জওয়াব না পাওয়ায় ফিরিয়া আসি, ইতিমধ্যে হযরত উমরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার ঘটে এবং তিনি প্রত্যাবর্তনের কারণ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি বলি যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ করিয়াছেন: ইযাছতা’যানা আহাদুকুম সালাসা ফাল্লাম ইউ’যান লাহূ ফালইয়ারজি’ "তোমাদের মধ্যে কেহ যদি কাহারও গৃহে প্রবেশ করিবার জন্য তিনবার অনুমতি চাহিয়াও উত্তর না পায় তাহা হইলে সে ফিরিয়া আসিবে।" উমর বলিলেন, আল্লাহর কসম! আপনাকে এ কথার প্রমাণ দিতে হইবেই। আবু মূসা আনসারদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, তোমরা কেহ হযরতের (সা) বাচনিক এই হাদীস শ্রবণ করিয়াছ কি? আবু সঈদ খুদরী বলেন যে, আমি দলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা কনিষ্ট ছিলাম, আমি আবু মুসা আশআরীর সহিত গমন করিয়া হযরত উমরের নিকট সাক্ষ্যদান করিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বাস্তবিকই উক্ত কথা বলিয়াছিলেন। [বুখারী, ইসতিযান]
এই ঘটনার সাহায্যেও প্রমাণিত হইতেছে যে, অপরের গৃহে প্রবেশ সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসটি কনিষ্ট সাহাবীগণের জানা থাকলেও উমরের ন্যায় প্রাচীন ও অগ্রগণ্য সাহাবীর উহা অপরিজ্ঞাত ছিল। যদি আবু বকর ও উমরের ন্যায় মহামনীষীদের কোন কোন হাদীস অজ্ঞাত থাকিতে পারে, তাহা হইলে পরবর্তী ইমাম ও ফকীহদের পক্ষে রাসূলুল্লাহর (সা) কোন কোন নির্দেশ অপরিজ্ঞাত থাকা কিছু মাত্র বিস্ময়কর নয়। যাহারা মনে করেন যে, নির্দিষ্ট ইমাম বা ফকীহ রাসূলুল্লাহর (সা) সমুদয় আদেশ ও নিষেধ অবগত ছিলেন এবং শরীয়তের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অন্য বিদ্বান বা ফকীহর বিদ্যার সহায়তা গ্রহণ করা আদৌ আবশ্যক নয় তাঁহাদের এই ধারণা একান্ত একদেশদর্শিতা ও গোড়ামীর পরিচায়ক মাত্র।
📄 তৃতীয় খলীফার যুগে
স্বামী মরিয়া গেলে স্ত্রী যে কোন স্থানে থাকিয়া ইদ্দত পালন করিতে পারে বলিয়া হযরত উসমানের ধারণা ছিল। কিন্তু বিষয়টি মীমাংসার জন্য হযরত উসমান আবু সাঈদ খুদরীর ভগ্নি ফোরায়'আকে ডাকাইয়া পাঠান এবং উপরিউক্ত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ফোরায়া হযরত উসমানকে জ্ঞাপন করেন যে, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আমার আত্মীয় স্বজনের মধ্যে থাকিয়া ইদ্দত প্রতি পালন করিবার অনুমতি চাহিয়াছিলাম কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাহা অস্বীকার করেন অথচ আমার স্বামী তাঁর পলাতক দাসের অনুসন্ধানে বহির্গত হইয়া নিহত হইয়াছিলেন এবং তিনি তাঁর নিজস্ব ঘরবাড়ী বা সহায় সম্পদ কিছুই রাখিয়া যান নাই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত অবগত হওয়া সত্বেও আমাকে বলিলেন, আল্লাহর গ্রন্থের নির্দিষ্ট মী'আদ পর্যন্ত স্বামীর গৃহে অবস্থান কর। অতঃপর হযরত উসমান স্বীয় অভিমত পরিবর্তন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বলবৎ করিয়া দিলেন। [মুওয়াত্তা, ২১৭ পৃঃ]
আবু সামান বলেন, একদা আমি খলীফা উসমান গনীর নিকট উপস্থিত ছিলাম ইতিমধ্যে তাঁর সম্মুখে ওলীদ বিন উকবাকে ধরিয়া আনা হইল (ওলীদ এবং হযরত উসমান একই মাতার সন্তান ছিলেন এবং ওলীদ কুরায়শ গোষ্ঠির বিশিষ্ট ব্যক্তি, মহাবীর, কবি ও সুসাহিত্যিক ছিলেন)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা), উমর ফারুক ও উসমান গনীর শাসনকালে বিভিন্ন স্থানের গভর্ণর পদে মনোনীত হইয়াছিলেন। ওলীদ ফজরের নামাযের দুই রাআতে ইমামত করিয়া মুক্তাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তোমাদের জন্য কি আরও কিছু নামায পড়াইয়া দিব? দুই জন লোক হযরত উসমানের নিকটে সাক্ষ্যদান করিলেন যে, তাহারা ওলীদকে সুরা পান করিতে দেখিয়াছেন। আর এক ব্যক্তি বলিলেন, তিনি তাহাকে বমন করিতে দেখিয়াছেন।
হযরত উসমান বলিলেন, মদ না খাইলে ওলীদের বমনে সুরা ধরা পড়িত কেমন করিয়া? অতঃপর হযরত উসমান ওলীদকে সুরাপানের দণ্ড স্বরূপ বেত্রাঘাত করার জন্য হযরত আলীকে আদেশ দিলেন। হযরত আলীর নির্দেশ ক্রমে তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র আবদুল্লাহ বিনে জা'ফর ওলীদকে বেত্রাঘাত করিতে ও হযরত আলী তাহা গণনা করিতে লাগিলেন। চল্লিশ বেত লাগান হইলে হযরত আলী বলিলেন, ক্ষান্ত হও! রাসূলুল্লাহ (সা) মদ্য পানের দণ্ডস্বরূপ চল্লিশ বেত লাগাইয়া ছিলেন, আবু বকরও চল্লিশ বেত লাগাইয়াছিলেন কিন্তু উমর ফারুক আশি বেত লাগাইয়াছিলেন। সমস্তই সুন্নত বটে কিন্তু আমার কাছে চল্লিশ বেতের শাস্তিই উত্তম। [সহীহ মুসলিম, (২) ১৭ পৃঃ]
এই ব্যাপারে কয়েকটি গুরুতর বিষয় লক্ষ করা উচিত। ইসলামের সমাজ ব্যবস্থায় দেশের শাসনকর্তা ও সর্বসাধরণের মধ্যে আইনের প্রয়োগ ব্যবস্থায় কোনরূপ ব্যতিক্রম রাখা হয় নাই। ওলীদ একাধারে যেরূপ কুফার গবর্ণর ছিলেন, সেইরূপ ইসলাম জগতের সর্বাধিনায়ক হযরত উসমান গনীর সহোদর ছিলেন, কিন্তু ইসলামী দণ্ডবিধির আওতা হইতে তিনি নিজেকে মুক্ত রাখিতে পারেন নাই এবং হযরত উসমানের পক্ষেও স্বজন প্রীতির কোন লক্ষণ প্রদর্শিত হয় নাই। ইসলামী রাষ্ট্রের এই বৈশিষ্টকে তথাকথিত গণতন্ত্রবাদীর দলবিশেষ আশঙ্কার দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকেন, কারণ সাম্য ও গণতন্ত্রের ঢাক পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলি যত জোরেই বাজান না কেন ইসলামের সাম্য এবং ন্যায় বিচারের সঙ্গে তাহারা কোন দিন মুকাবিলা করিতে পারেন নাই এবং ভবিষতেও ইহার কোন সম্ভাবনা নাই।
দ্বিতীয় বিষয়টি যাহা আমাদের বিশেষভাবে লক্ষ্য করা উচিত তাহা হইল এই যে, হযরত আলী আবু বকর এবং উমরের দণ্ডবিধানকে ভ্রান্তিমূলক মনে না করিলেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দণ্ডবিধানকে অগ্রগণ্য করিয়াছিলেন।
📄 চতুর্থ খলীফার যুগে
ইকরিমা বলেন, ইবনে সাবা ইহুদীর প্ররোচনায় শিয়াদের প্রথম যে দলটি ইসলাম ধর্ম বর্জন করিয়া হযরত আলীকে আল্লাহর অবতার বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল হযরত আলী তাহাদিগকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। ইহা জানিতে পারিয়া আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস বলেন, আমি যদি আলীর স্থানে হইতাম, তাহা হইলে ইসলাম ভ্রষ্টদিগকে অগ্নদগ্ধ না করিয়া তরবারী দ্বারা নিহত করিতাম। কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) বলিয়াছেন মান বাদ্দালা দীনাহূ ফাক্বতুলূহু "ইসলাম গ্রহণ করার পর যদি কেহ ফিরিয়া যায় তাহাকে তরবারীর আঘাতে নিহত কর।" ইবনে আব্বাস পুনশ্চ বলিলেন যে, আমি অপরাধিদিগকে কদাচ অগ্নিদগ্ধ করিয়া মারিতাম না। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন যে, তোমরা আল্লাহর দণ্ড দ্বারা কাহাকেও দণ্ডিত করিও না। হযরত আলী ইবনে আব্বাসের উক্তি শ্রবণ করিয়া বলিলেন, ইবনে আব্বাস সত্য কথাই বলিয়াছেন। [তিরমিযী (২), ৩৩৭ পৃঃ]
আবদুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিম বলেন যে, একদা আমি জনৈক সিরিয়াবাসীকে তামাকু হজ্জ (উমরা এবং হজ্জ্বের মিলিত সঙ্কল্প) সম্পর্কে আমার পিতা আবদুল্লাহ বিনে উমরকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে শুনিয়াছিলাম, ইবনে উমর উত্তর করিয়াছিলেন যে, উহা হালাল! তাঁর ফতওয়া শ্রবণ করিয়া সিরিয়ার লোকটি বিস্মিত হইলেন এবং বলিলেন, আপনি হালাল বলিতেছেন বটে কিন্তু আপনার পিতা তামাকু হজ্জ নিষেধ করিতেন। ইবনে উমর বলিলেন, দেখ! যে কার্য আমার পিতা নিষেধ করিয়াছেন যদি তাহা রাসূলুল্লাহ (সা) করিয়া থাকেন তাহা হইলে তুমি বল সেরূপ ক্ষেত্রে আমার পিতার সিদ্ধান্ত মান্য করিতে হইবে, না রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ শিরোধার্য করিয়া লইতে হইবে? লোকটি বলিলেন, এরূপ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশই অবশ্য প্রতিপালিত হইবে। [তিরমিযী, হজ্জ]
হযরত আব্দুল্লাহ বিনে উমর একদা বিখ্যাত তা'বেয়ী আবুশ শা'আসা জাবির বিনে যয়েদকে বলিলেন, ইন্নাকা মিন ফুকা্বহা-ই বারিয়াতি ফালা তুফতি ইল্লা বিকুরআনিম না-তিক্বিন আও সুন্নাতিম মা-যিয়াহ্। "তুমি বসরার ফকীহগণের অন্যতম, সাবধান! স্পষ্ট কুরআন এবং অতিক্রান্ত সুন্নত ছাড়া অন্য কোন বিষয় অবলম্বন করিয়া ফওয়া প্রদান করিওনা।" [দারমী, ৩৩ পৃ]
হযরত মু'আয বিনে জবল বলেন, মুসলিমগণ! "তোমরা বিপদ অবতীর্ণ হইবার পূর্বেই তাঁর জন্য ব্যতিব্যস্ত হইও না, কারণ সাহাবীগণের চিরাচরিত প্রথা ছিল যে, কোন সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইলে, তাঁহারা রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করিয়া শুনাইয়া দিতেন। [দারমী, ২৩ পৃঃ]
হযরত আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস যদি কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হইতেন তাহা হইলে জিজ্ঞাসিত বিষয়টি কুরআনে উল্লিখিত থাকিলে তিনি কুরআনের নির্দেশ জানাইয়া দিতেন। কুরআনে না থাকিলে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস শুনাইয়া দিতেন। জিজ্ঞাসিত বিষয়টির মীমাংসা যদি কুরআন ও হাদীসে না থাকিত, তাহা হইলে তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের ফতওয়া শুনাইয়া দিতেন এবং ইহাও যদি সম্ভবপর না হইত তাহা হইলে তখন তিনি তাঁর নিজের অভিমত ব্যক্ত করিতেন। [দারমী, ৩৩ পৃষ্ঠা]
আবদুল্লাহ বিনে আব্বাস কর্তৃক আবু বকর ও উমরের ফয়া উল্লেখ করার তাৎপর্য এই নয় যে, তিনি তাঁহাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অন্ধ অনুসরণ বা তকলীদ করিতেন। আবুবকর ও উমরের সমুদয় সিদ্ধান্ত ইসলামী পার্লামেন্টে গৃহীত সিদ্ধান্তের নামান্তর মাত্র, সুতরাং ইবনে আব্বাসের আচরণ দ্বারা ইহাই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন ও সুন্নতে যে বিষয়ের মীমাংসা খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না, সে সম্পর্কে মুসলমানদিগকে সাহাবীগণের ইজমার অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ বিনে মসউদ বলেন যে, কাহারও উপর বিচার-পতিত্বের ভার ন্যস্ত করা হইলে তাহাকে আল্লাহর গ্রন্থ অনুসারে বিচার করিতে হইবে। আর যাহা কুরআনে নাই তাঁর মীমাংসা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসারে করিতে হইবে এবং যে বিষয়ের মীমাংসা কুরআন এবং হাদীসে নাই তাঁর ফয়সালা সাহাবীগণের মিলিত সিদ্ধান্ত অনুসারে করিতে হইবে- [দারমী ৩ পৃঃ]
আমীর মু'আবিয়া হজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় আসিয়া মদীনাতেও আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) মিম্বরে আরোহন করিয়া বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, আমার বিবেচনায় সিরিয়া দেশের দুই মুদ্ (অর্ধ সা) গম এক সা' খেজুরের সমতুল্য। সর্বসাধারণ শাসনকর্তার এই কথা মানিয়া লইলেন কিন্তু বিখ্যাত সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, আমি মু'আবিয়ার এই নির্দেশ মান্য করিব না, রাসূলুল্লাহর (সা) সময়ে যেভাবে ফিত্রা আদা করিতাম ঠিক সেই ভাবেই যাবজ্জীবন দিতে থাকিব এবং এক সা'র কম কোন খাদ্য বস্তুরই ফিত্রা কদাচ বাহির করিব না। [বুখারী ফতহসহ, (৬) ৬৪ পৃঃ]
এই ঘটনা দ্বারা প্রতিপন্ন হয় যে শাসনকর্তাদের শরয়ী মসআলা সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত জনমণ্ডলীর জন্য প্রতিপালনীয় নয় এবং কাহারও ইজতেহাদ আইনের পর্যায়ভুক্ত হইতে পারে না।