📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 বাগদাদের পতন কাহিনী

📄 বাগদাদের পতন কাহিনী


তাতারী নর-রাক্ষসদের সেনাপতি তিমুজেন ৬০১ হিজরীতে চেঙ্গীস খান উপাধি ধারণ করেন। ৬১৪ হিজরীতে তিনি খোওয়ার্যম অধিকার করিয়া লন এবং ৬২২ হিজরীতে মৃত্যুমুখে পতিত হন। চীনের মঙ্গোলিয়া হইতে উত্থিত হইয়া এই নর-রাক্ষসরা পঙ্গপালের মত ছড়াইয়া পড়ে এবং প্রায় সমগ্র এশিয়াকে বিধ্বস্ত করিয়া ফেলে। চেঙ্গীস্ মধ্য-এশিয়ার উপরিভাগে খোওয়ার্যম বা খীবা পর্যন্ত হানা দিবার পর মুসলিম সাম্রাজ্যের অভ্যন্তর ভাগে অগ্রসর হইতে সাহসী হন নাই। চেঙ্গীসের সামাজ্য যখন তদীয় পৌত্রগণের মধ্যে বিভক্ত হয় তখন মধ্য এশিয়া ও তৎসংলগ্ন দেশগুলি হালাকু খাঁর ভাগে পড়ে কিন্তু হালাকু খানও তাঁর নির্দিষ্ট সীমানার বাহিরে পা বাড়াইতে সাহসী হন নাই। দীর্ঘ ছয়শত বৎসরের নিরবচ্ছিন্ন ও সুপ্রতিষ্ঠিত "খিলাফতে ইসলামীর" গৌরব ও প্রতাপের প্রভাব তখনও কাহারও হৃদয় হইতে অন্তনিহিত হয় নাই কিন্তু আকস্মিকভাবে এমন এক কাণ্ড মুসলিম সাম্রাজ্যের ভিতর সংঘটিত হইল যে, মুসলিম সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ভূমির রুদ্ধ দ্বার হালাকুর সম্মুখে আপনা আপনি খুলিয়া গেল। খোরাসানে বাগদাদের মত হানাফী ও শাফেয়ীদের ভিতর তুমুল সংঘর্ষ চলিতেছিল। তুস শহরের হানাফীরা শাফেয়ীদের জিদে পড়িয়া হালাকু খাঁকে আমন্ত্রণ করিল এবং নিজেরাই নগরের সিংহদ্বার তাতারী বাহিনীর জন্য মুক্ত করিয়া দিল কিন্তু তাতারীদের তরবারি যখন নিষ্কাষিত হইল তখন তাহারা শাফেয়ীদের সঙ্গে হানাফীদিগকেও রেহাই দিল না, হানাফী ও শাফেয়ী সকলকেই তাহারা তুল্য ভাবে নিঃশেষিত করিয়া ফেলিল। [তর্জুমানুল কুরআন - শরহে নহজুল বালাগত, ইবনে আবির হাদীদ [২] ৪৯৩ পৃষ্ঠা]।।

খোরাসানের পতন বাগদাদ অভিযানের পথ মুক্ত করিয়া দিল। হালাকুর মন্ত্রী ছিলেন খাওয়াজা নসীরুদ্দিন তুসী (মৃঃ ৬৭২ হিজরী) আর বাগদাদের খলীফা মুসতাসিম বিল্লাহর [৫৮৮-৬৫৬] মন্ত্রী ছিলেন ইবনুল আলকামী (মৃত্যু ৬৫৬ হিজরী)। উভয় মন্ত্রী অত্যন্ত গোঁড়া শিয়া এবং সুন্নীগণের প্রতি ভীষণ ভাবে বিদ্বিষ্ট ছিলেন। নসীরুদ্দীন তুসী ইতিপূর্বে আলমুৎ দুর্গে ইসমায়ীলী রাফেযীদের মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কুখ্যাত ইসলাম বিদ্বেষ হালাকুর নৈকট্য লাভের পক্ষে সহায়ক হইয়াছিল। তাদের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় একদিকে যেমন হালাকু খাঁ বাগদাদ আক্রমণ করার জন্য বিরাট আকারে প্রস্তুত হইতেছিলেন, অন্যদিকে ইবনুল আলকামীর বিশ্বাস-ঘাতকতার ফলে বাগদাদে সৈন্য বাহিনীর সংখ্যা কমাইয়া মাত্র দশ সহস্র অশ্বারোহী সৈন্যে পরিণত করা হইয়াছিল [ইবনে কসীর [১৩] ২০১ পৃষ্ঠা]। প্রফেসর ব্রাউন তবকাতে নাসেরীর বরাতে খলীফার মোট সৈন্য সংখ্যা ২ লক্ষ লিখিয়াছেন [Literary History of Persia [২] ৪৬১ পৃষ্ঠা]। ইবনে খল্লদুন লিখিয়াছেন, ইবনুল আলকামী তদীয় বন্ধু আরবলের সুলতান ইবনুস্ সালায়াকে লিখেন যাহাতে তিনি হালাকু খাঁকে বাগদাদ আক্রমণ করার জন্য প্ররোচিত করেন। হালাকু আলমুৎ দুর্গ আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার অব্যবহিত কাল পূর্বে ইবনুল আলকামীর এই পত্র তাঁর হস্তগত হয় [ইবনে খল্লদুন [৫] ৫৪ পৃষ্ঠা]।। ব্রাউন লিখিয়াছেন, বাগদাদ অভিযানে যে সকল ব্যক্তি হালাকুর সাহচর্য করিয়াছিলেন তন্মধ্যে সিরাজের আবু বকর বিনে সঅদ জঙ্গী (শেখ সাদী যাহার নামে তদীয় গুলিস্তা নামক গ্রন্থ উৎসর্গ করিয়াছেন), মসুলের বদরুদ্দীন লুলু তদীয় মন্ত্রী আতা মালিক জোওয়ায়নী এবং নসীরুদ্দীন তুসী প্রভৃতি [ব্রাউন [১] ৪৬০ পৃঃ]। মসুলের শাসনকর্তা লুলু হালাকুর জন্য অভিযানের পথ সুগম করিয়া দিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে গোপনে খলীফাকেও হালাকুর দুরভিসন্ধির কথা জানাইয়াছিলেন। কিন্তু ইবনুল আলকামী সে কথা খলীফাকে আদৌ জ্ঞাপন করেন নাই। তিনি হালাকুর নিকট স্বীয় ভ্রাতা ও জনৈক ক্রীতদাসকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। হালাকুর সহিত তাঁর শর্ত হইয়াছিল যে, হালাকুর প্রতিনিধি স্বরূপ বাগদাদের সিংহাসনে তিনি স্বয়ং উপবেশন করিবেন। এই শর্ত মানিয়া লইলে বাগদাদ অধিকার করার জন্য হালাকুকে কোনরূপ বেগ পাইতে হইবে না বলিয়া ইবনুল আলকামী তাঁহাকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। সমস্ত আয়োজন ঠিক ঠাক হওয়ার পর ইবনুল খোয়ার্যমীর পুত্র হালাকুর নিকট অর্থ, খাদ্য ও জানোয়ার সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়া লোক প্রেরণ করেন। মসুলের সুলতানের সঙ্গে তদীয় পুত্র সালেহ ইসমায়ীলও হালাকুর সহযাত্রী হইয়াছিলেন [ইবনুল ইমাম [৫] ২৭০ পৃষ্ঠা]।। ইবনে কসীর, ইবনুল ইমাদ ও সৈয়ূতী প্রভৃতি তাতারী সৈন্যদলের সংখ্যা দুই লক্ষ বলিয়াছেন কিন্তু শিয়া ঐতিহাসিক ইবনে তাবাতবা যিনি ইবনুত তিকতিকী নামে প্রসিদ্ধ (মৃঃ ৭০২ হিজরী)। তাঁর ইতিহাসে লিখিয়াছেন যে, তাতারী সৈন্য দলের সংখ্যা মাত্র ত্রিশ হাজার ছিল [ইবনে কসীর [১৩] ২০০ পৃষ্ঠা, ফখরী ৩০০ পৃষ্ঠা]। ব্রাউন এক লক্ষ দশ হাজার সৈনিকের কথা লিখিয়াছেন [Literary History of Persia [২] ৪৬১ পৃষ্ঠা]।। হালাকুর সৈন্যদল কাঁচির আকারে দুই দিক দিয়া বাগদাদের উপর চড়াও করে। হালাকু স্বয়ং এক বিরাট বাহিনী লইয়া পূর্ব দিক দিয়া সোজাসুজি অগ্রসর হইতে থাকেন। আর এক দল বায়ুনয়ানের সেনাপতিত্বে পশ্চিম দিক হইতে বাগদাদের উপর চড়াও করার উদ্দেশ্যে- তন্ত্রীতের পথ ধরিয়া আগুয়ান হইতে থাকে। খলীফার পক্ষ হইতে হালাকুর প্রতিরোধকল্পে খলীফার সেক্রেটারী মুজাহেদুদ্দীন আইবেক, যিনি দওয়েদার সগীর নামে প্রসিদ্ধ তিনি এবং মালিক ইযযুদ্দীন বিনে ফতহুদ্দীন অগ্রসর হন এবং মুষ্টিমেয় সৈন্যের সাহায্যে হালাকুর অগণিত ধ্বংস বাহিনীর প্রতিরোধ করিতে সক্ষম হন। কিন্তু রাত্রিযোগে তাতারীরা চৈনিক ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্যে দজলার বাঁধ ভাঙ্গিয়া দেয়। ইহার ফলে বাগদাদ নগরী প্লাবিত এবং খলীফার সৈন্য বাহিনী পরাভূত হয়।

দওয়েদার ও ইযযুদ্দীন প্রাসাদে প্রত্যাগত হইয়া খলীফাকে নৌকাপথে বসরায় পলায়ন করার পরামর্শ দিয়াছিলেন কিন্তু বিশ্বাস-ঘাতক ইবনুল আলকামী তাহাতেও বাধা প্রদান করিলেন [ব্রাউন [২] ৪৬১ ও ৪৬২ পৃষ্ঠা]।। যহবী ও ইবনুল ইমাদ লিখিয়াছেন যে, হালাকুর সহিত সন্ধির কথা আলোচনা করিবেন এইরূপ ভান করিয়া ইবনুল আলকামী একক ভাবে হালাকুর সহিত সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু ইবনে কসীর তাঁর ইতিহাসে বলিয়াছেন যে, ইবনুল আলকামী স্বীয় পরিবার বর্গ ও দাস দাসী সমভিব্যবহারে হালাকুর নিকট গমন করিয়া ছিলেন এবং যাহাতে কোন ক্রমেই সন্ধি স্থাপিত হইতে না পারে খাওয়াজা নসীরুদ্দীন তুসীসহ তিনি হালাকুকে সেইরূপ পরামর্শ দিয়াছিলেন [দুওয়ালুল ইসলাম [২] ১২২ পৃষ্ঠা; শঘ্রাত [৫] ২৭১ পৃষ্ঠা; ইবনে কাসীর [১৩] ২০১ পৃষ্ঠা]।।

যহবী ও ইবনুল ইমাদ লিখিয়াছেন যে, ইবনুল আলকামী হালাকুর নিকট হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া খলীফা মুসতা'সিমকে বলিলেন যে, হালাকু খাঁ সন্ধির জন্য সম্মতি দিয়াছেন এবং খলীফার পুত্র আমীর আবু বকর আহমদের সহিত তাঁর কন্যার বিবাহে প্রস্তাব দিয়াছেন। সন্ধির শর্ত এই যে, খলীফার পূর্বপুরুষগণ যেরূপ 'সলজুকী'দের অধীনতাপাশে আবদ্ধ ছিলেন, খলীফাকেও তদ্রূপ হালাকুর অধীনতা স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। ইবনে কসীর বলিয়াছেন যে, সন্ধি শর্তের মধ্যে ইরাক প্রদেশের অর্ধেক রাজত্ব হালাকুকে প্রদান করিবার কথাও ইবনুল আলকামী খলীফাকে শুনাইয়াছিলেন। ইবনুল আলকামীর প্রস্তাব অনুসারে বিবাহোৎসব সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে খলীফা তাঁর নিকট আত্মীয় এবং কাযী, মুফতী, সুফী ও নেতৃস্থানীয় উমারা এবং রাজপ্রতিনিধিগণের মোট সাত শত অশ্বারোহী সহ-হালাকুর সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্লিখিত সাতশত বিশিষ্ট ও নির্বাচিত ব্যক্তিগণের প্রত্যেককে হত্যা করা হইল। স্বয়ং খলীফার সহিত হালাকু খাঁ অতিশয় অপমান সূচক ব্যবহার করিলেন। খলীফা লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও সন্ত্রস্ত অবস্থায় রাজধানীতে প্রত্যাবর্তিত হইলেন। খাওয়াজা নসীরুদ্দীন তুসী ও ইবনুল আল-কামী খলীফার সঙ্গে সঙ্গে বাগদাদে আসিলেন এবং তাঁদের পরামর্শ অনুসারে খলীফা রাজকোষের সমুদয় স্বর্ণ, হীরক এবং মূল্যবান সামগ্রীসহ পুনরায় হালাকুর নিকট উপস্থিত হইলেন [ইবনে কসীর [১৩] ২১ পৃষ্ঠা]।।

ঐতিহাসিক ইবনে কসীর লিখিয়াছেন যে, শিয়া মন্ত্রীদ্বয়ের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার ফলে খলীফা মুসতাসিমের শত অনুনয় বিনয় ও অনুরোধ সত্ত্বেও হালাকু তাঁর সহিত সন্ধি স্থাপন করিতে স্বীকৃত হইলেন না। মন্ত্রীরা হালাকুকে বুঝাইয়াছিলেন যে, সন্ধি কদাচ স্থায়ী হইবে না এবং দুই এক বৎসর যাইতে না যাইতেই খলীফা বিদ্রোহ করিবেন। উক্ত দুই ইসলাম বিদ্বেষী শিয়া মন্ত্রীর উস্কানীর ফলেই শেষ পর্যন্ত হালাকু খলীফা মুসতা'সিমের প্রাণ ভিক্ষা দিতেও রাযী হইলেন না, ইসলাম জগতের খলীফাকে অতিশয় নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হইল। যহবী, ইবনে কাসীর, ইবনুল ইমাদ, সৈয়ূতী প্রভৃতি লিখিয়াছেন যে, হিংস্র তাতারীগণ লাথি মারিতে মারিতে খলীফা মুসতা'সিমকে হত্যা করিয়াছিল। ইবনে খল্লদুন বলিয়াছেন, খলীফাকে চটের বস্তায় পুরিয়া কুঠার দ্বারা খণ্ড খণ্ড করা হইয়াছিল [ইবনে খল্লদুন [৫] ৫৪৩ পৃষ্ঠা]।।

৬৫৬ হিজরীর ১২ই মুহাররম হালাকুর সৈন্য দল বাগদাদে প্রবেশ করে এবং ১৪ই সফর বুধবার- খলীফাতুল মুসলেমীন শহীদ হন। ইবনুত তিকতিকীর মতে শাহাদতের তারিখ ছিল ৪ঠা সফর। খলীফার দুই পুত্র আমীর আবু বকর আহমদ ও আবুল ফাযায়েল আবদুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়া তাতারী নর-পিশাচের দল খলীফার কন্যা ও পুর-মহিলাগণকে দাসীতে পরিণত করে [ফখর: ১ পৃষ্ঠা]।।

প্রফেসর ব্রাউন লিখিয়াছেন যে, বাগদাদে তাতারীদের হত্যা উৎসব আট দিন পর্যন্ত চলিতে থাকে ও আট লক্ষ নাগরিক নিহত হয়। হালাকুর বাগদাদে প্রবেশের দিন হইতে খলীফার শাহাদত পর্যন্ত ৩৩ দিবস অতিবাহিত হইয়াছিল কিন্তু ইবনে কসীর ও ইবনুল ইমাদ লিখিয়াছেন ৪০ দিবস আর যহবী বলিয়াছেন ৩৪ দিবস। দিবস এবং রাত্রির সকল সময় অবাধ ভাবে হত্যাকাণ্ড চলিয়াছিল। নিহতদের সংখ্যা ইবনে খল্লদুনের বর্ণনা সূত্রে তেইশ লক্ষ, যহবী ও ইবনুল ইমাদের কথাসূত্রে আটাশ লক্ষ, ইবনে কসীর তাঁর ইতিহাসে আট লক্ষ হইতে চল্লিশ লক্ষ পর্যন্ত বিভিন্নরূপ উক্তি উধৃত করিয়াছেন। স্ত্রী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবক কাহাকেও বাদ দেওয়া হয় নাই। যাহারা দ্বার রুদ্ধ করিয়া গৃহকোণে লুকাইয়া ছিল দুয়ার ভাঙ্গিয়া অথবা গৃহে আগুন লাগাইয়া তাহাদিগকে হত্যা করা হইয়াছিল। উচ্চ দ্বিতল ও ত্রিতল গৃহের ছাদ হইতে নালী দিয়া রক্তের প্রবল স্রোত প্রবাহিত হইতেছিল। হযরত আব্বাসের বংশধরগণের সকল সন্তানকে কবরস্থানে সমবেত করিয়া ছাগলের মত যবেহ করা হইয়াছিল। খলীফার কনিষ্ঠ পুত্র মুবারক এবং তিন কন্যা ফাতিমা, খাদিজা ও মরিয়ম এবং রাজ প্রাসাদ হইতে সহস্রাধিক কুমারীকে নর পিশাচের দল দাস দাসীতে পরিণত করিয়া ধৃত করিয়া লইয়া গিয়াছিল। পথে ঘাটে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পুরুষ মহিলাগণের সহিত নর পশু-তাতারী সৈন্য প্রকাশ্যভাবে বলাৎকার করিয়া বেড়াইতে ছিল। হত্যাকাণ্ড ও বলাৎকারে তাহারা শিয়া, সুন্নী ও হানাফী, শাফেয়ী কাহাকেও বাদ দেয় নাই। ইমাম ইবনে জওযীর পুত্র ইমাম মহীউদ্দীন ইউসুফ এবং তাঁর তিন পুত্র আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ও আবদুল করিম, মুজাহেদুদ্দীন আইবেক, শিহাবুদ্দীন আলী এবং সুন্নী উলামা, ফকীহ, মুহাদ্দেস, হাফিজ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদিগকে বাছিয়া বাছিয়া হত্যা করা হইয়াছিল। সমস্ত নগর অগ্নিদগ্ধ, মসজিদ মাদরাসা, কলেজ ও খানকা প্রভৃতি শ্মশানে পরিণত হইয়াছিল। ছয় শতাব্দী ধরিয়া বাগদাদে জ্ঞান বিজ্ঞানের যে যে অমূল্য গ্রন্থ ভান্ডার সঞ্চিত হইয়াছিল, তাতারী বর্বরের দল এক সপ্তাহের ভিতর সমস্তই দজলার বুকে ডুবাইয়া দিয়া নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলিয়াছিল। শেষ পরিণতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনে কসীর লিখিয়াছেন, অদৃষ্টে যাহা ঘটিবার ছিল যখন তাহা ঘটিয়া শেষ হইল এবং চল্লিশ দিন অতিক্রান্ত হইয়া গেল তখন ইসলাম জগতের কেন্দ্র মহানগরী বাগদাদ শুধু ধ্বংসস্তূপের আকারে অবশিষ্ট ছিল, কদাচিৎ লোক দৃষ্টিগোচর হইত। পথে ঘাটে শবদেহগুলি ঢিপির মত থাক লাগিয়া পতিত ছিল। বৃষ্টির দরুণ লাশগুলি পচিয়া আকাশ ও বাতাস দূর্গন্ধে পূর্ণ করিয়া তুলিয়াছিল। বায়ু দূষিত হওয়ায় ভীষণ মড়ক দ্রুত বেগে বিস্তার লাভ করিতেছিল এবং সিরিয়া পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। ইরাক ও শামের অধিবাসীবৃন্দ একযোগে দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং মৃত্যুর কবরে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল। [ইবনে কসীর ২০২-২০৫ পৃষ্ঠা; শযরাত (৫) ২৭০ পৃষ্ঠা; ইবনে খলদুন (৫) ৫৪৩ পৃষ্ঠা ও দুওয়ালুল ইসলাম (২) ১২২ ও ১২৩ পৃষ্ঠা]।।

প্রফেসর ব্রাউনের ভাষায় বাগদাদের পতন কাহিনী শেষ করিবঃ "বাগদাদের লুণ্ঠন কার্য ১২৫৮ খৃষ্টাব্দের ১৩ই ফেব্রুয়ারী তারিখে আরম্ভ হয় এবং সপ্তাহকাল চলিতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে আট লক্ষ অধিবাসীকে হত্যা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে যে বাগদাদ মহানগরী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া আব্বাসী খলীফাগণের বিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল তাঁর সমুদয় ধনসম্ভার এবং সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক সম্পদ যাহা দীর্ঘকাল হইতে সঞ্চিত হইয়া আসিতেছিল সমস্তই লুণ্ঠিত ও বিধ্বস্ত করা হয়। তাতারীদের দ্বারা মুসলিম সংস্কৃতির যে মহান সর্বনাশ সাধিত হইয়াছিল পরবর্তী যুগে তাহা কখনও পূরণ হইতে পারে নাই। এই ক্ষতির বিবরণ প্রদান করা অসম্ভব এবং কল্পনার অতীত! কেবল যে লক্ষ লক্ষ গ্রন্থরাজী সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলা হইয়াছিল তা নয়, অগণিত বিদ্বজ্জন মণ্ডলীর বিনাশ সাধন দ্বারা অথবা রিক্ত হস্তে শুধু প্রাণ লইয়া তাঁহাদের পলায়ন করার দরুণ মৌলিক গবেষণার পদ্ধতি এবং সঠিক রেওয়ায়তসমূহের সনদগুলি যাহা আরাবী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ও বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হইয়া যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় বিরাট ও মহান সভ্যতাকে এত শীঘ্র আগুনে ভস্মীভূত ও রক্তসমুদ্রে নিমজ্জিত করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যাইবে না।"

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 বাগদাদের বাহিরে

📄 বাগদাদের বাহিরে


তাতারী অভিযানের ফলে ইসলামী সম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানগুলি কিরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল তাঁর মোটামুটি বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হইল:
৬১৭-৬১৮ হিজরীতে নিম্নলিখিত দেশ ও নগরগুলি বিধ্বস্ত হয়: সমরকন্দ, বুখারা, খোরাসান, খোওয়ার্যম, রয়, হামদান, আযর বাইজান, দরবন্দ-শিরওয়ান, কষবীন, তবরেয, মরাগান, মরাগ, আরবল্, সল্ফান, তিরমিয, বলখ, নাসা, নেশাপুর, মঞ্জু, হিরাত ও বামীয়ান।
৬২০-৬২১ হিজরীতে নিম্নলিখিত স্থানগুলি আক্রান্ত ও পুনরাক্রান্ত হয়: কিপচাপ, কুম, কাশান, তুরিয, রয়, হামদান।
৬২৪ হিজরীতে ইসফাহান বিধ্বস্ত হয়।
৬২৮ হিজরীতে খোরাসান, আযরবাইজান ও মুরাগা পুনরাক্রান্ত হয় এবং মাদীন ও আসআর্দের পতন ঘটে।
৬২৯ হিজরীতে শহরযোরের পতন হয়।
৬৩৩-৬৩৪ হিজরীতে নিম্নলিখিত নগরগুলি পুনরাক্রান্ত এবং নতুনভাবে আক্রান্ত হয়: সমরকন্দ, শিরওয়ান, আবরন ও মসুল।
৬৩৪ হিজরীতে দকুকা বিজিত হয়।
৬৪১ হিজরীতে ইউরোপের কতকাংশ আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত হয়।
৬৫০ হিজরীতে দেয়ারে বকরের নসিবয়েন ও সঞ্জার প্রভৃতি অধিকৃত হয়।
৬৫৫ হিজরীতে মসুল পুনরাক্রান্ত হয়।
৬৫৬ হিজরীতে বাগদাদের পতন হয়।
৬৫৭ হিজরীতে আরবল পুনরাক্রান্ত, ময়াফার্কিন ও হাররান বিধ্বস্ত হয়।
৬৫৮-৬৫৯ হিজরীতে বিরা ও হলব অধিকৃত হয়।
৬৬০ হিজরীতে মসুল পুনরাক্রান্ত হয়।

ইসলাম জগতের বিধ্বস্তির উপরিউক্ত তালিকা হালাকুর মৃত্যু পর্যন্ত শেষ করা হইল। ৬৬২ হিজরীতে হালাকুর মৃত্যু ঘটে। যতগুলি স্থান তাতারী নর-রাক্ষস দল কর্তৃক আক্রান্ত হইয়াছিল সমস্তগুলিই সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত এবং নরনারী নির্বিশেষে সমুদয় অধিবাসী নিধন প্রাপ্ত হইয়াছিল। খোওয়ার্যম শহরে বার লক্ষ মুসলিম নরনারীকে হত্যা করা হয়, ইহাদের মধ্যে বিখ্যাত সাধক শায়খুল ইসলাম নাজিমুদ্দিন কুবরা অন্যতম। ৬২৮ হিজরীতে খোরাসানে জন প্রাণীর বসবাস করার উপায় ছিল না। নেশাপুরে নিহত অধিবাসীবর্গের মস্তক ছেদন করিয়া স্ত্রী, পুরুষ ও শিশুদের মাথার খুলির পৃথক পৃথক তিনটি পিরামিড প্রস্তুত করা হইয়াছিল। মরও নগরে তের লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়, যাহারা পলায়ন করিয়া বাঁচিয়াছিল দ্বিতীয় পর্যায়ে তাহাদিগকে নিঃশেষিত করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে নিহতদের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। বামীয়ান নগরীতে ১০০ বৎসর পর্যন্ত ঘাস জন্মিতে পারে নাই, সমস্ত শহর জনমানব শূন্য মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছিল।

আলাউদ্দীন আতা মালিক জুওয়ায়নী তাঁর "জাহাঁকুশা" নামক ইতিহাস গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, মুসলামান দেশ সমূহে হাজারে একজন লোকেরও প্রাণ রক্ষা হয় নাই। [Brown's History (২) ৪৩৯ পৃঃ]।।

জাতীয় জীবনের উল্লিখিত ভয়াবহ বিপর্যয় এবং সংকটের মূল কারণ ছিল মুসলমানদের গৃহ বিবাদ এবং এই গৃহ বিবাদের অন্যতম কারণ ছিল মযহবী কোন্দল এবং তকলীদপরস্তদের গোঁড়ামী ও বিদ্বেষ! দুঃখের বিষয় এত বড় আঘাতের পরও মুসলমানগণ সমবেতভাবে চৈতন্য লাভ করিতে পারেন নাই এবং ইহাই নিদারুণ পরিণতি স্বরূপ আজ তাতারী অভিযানের স্থানে নাস্তিকতা ও জড়বাদের যে সয়লাব সমগ্র ইসলাম জগতকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইয়াছে, তাঁর প্রতিকার কল্পে মুসলমানগণ কুরআন ও সুন্নতের মর্মকেন্দ্রের দিকে প্রত্যাবর্তন করিয়া জাতীয় জীবনকে সংহত ও সমৃদ্ধ করিয়া তুলিতে প্রস্তুত হইতেছেন না। والله المستعان

ফন্ট সাইজ
15px
17px