📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 শিকারের পরিচয়, হুকুম ও শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল

📄 শিকারের পরিচয়, হুকুম ও শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল


১. শিকারের পরিচয়: صيد বা শিকার শব্দটি صاد، يصيد، صيدا ক্রিয়ামূল হতে গৃহীত। অর্থ: গোপনে ও কৌশলে পাকড়াও করা। চাই সেটি ভক্ষণযোগ্য হোক বা ভক্ষণযোগ্য না হোক। আর صيد শব্দটি ক্রিয়া বিশেষ্য নামে কর্মবাচক বিশেষ্য অর্থে শিকারকৃত পশুকে বুঝাবে। তাই শিকারকৃত পশুকে صيد বা শিকার বলা হয়। পরিভাষায়: হালাল, স্বভাবগতভাবে বন্য, কারো মালিকানাধীন নয় ও নিয়ন্ত্রণহীন প্রাণী শিকার করা। আর বন্যপ্রাণী হলো: গৃহপালিত স্থলজ প্রাণী নয় এমন সব প্রাণীই বন্য প্রাণী।
২. শিকার করার শারঈ হুকুম: শিকার শরীয়ত সম্মত ও বৈধ। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ ) "তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হলো- সেগুলো ছাড়া, যেগুলোর বিবরণ তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। আর ইহরাম অবস্থায় শিকার করা অবৈধ।" [সূরা মায়িদাহ: ১]

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 বৈধ ও অবৈধ শিকার

📄 বৈধ ও অবৈধ শিকার


প্রথম অবস্থা: মুহরিম নয় এমন ব্যক্তির জন্য বন্যপ্রাণী শিকার করা বৈধ। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
﴿وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا﴾
"আর যখন তোমরা ইহরামমুক্ত হবে, তখন শিকার করতে পারো।” [সূরা মায়িদাহ: ২]
দ্বিতীয় অবস্থা: মুহরিমের উপর স্থলভাগের কোনো কিছু শিকার করা, শিকার করতে চাওয়া অথবা ইশারা-ইঙ্গিত দিয়ে কাউকে শিকার করতে সাহায্য করা হারাম। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُم “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা মুহরিম অবস্থায় শিকারকে হত্যা করো না।" [সূরা মায়িদাহ : ৯৫]
অনুরূপভাবে সে যা শিকার করেছে অথবা তার উদ্দেশ্যে যা শিকার করা হয়েছে অথবা সে যা শিকার করতে সহযোগিতা করেছে, সবকিছু খাওয়া তার উপর হারাম। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمَا "যতক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে ততক্ষণ তোমাদের জন্য স্থলের শিকার হারাম।" [সূরা মায়িদাহ : ৯৬]
আর সা'ব ইবনে জাসসামাহ বন্য গাঁধা নাবী কে হাদীয়া দিলে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন: إِنَّا لَمْ نَرُدَّهُ عَلَيْكَ إِلَّا أَنَّا حُرُمٌ “আমরা ইহরাম অবস্থায় না থাকলে তোমার হাদিয়া ফিরিয়ে দিতাম না।” অর্থাৎ আমরা ইহরাম অবস্থায় আছি বলে ফিরিয়ে দিলাম।

টিকা:
১৮৭০ সহীহুল বুখারী, হা. ১৮২৫।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 শিকার বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ

📄 শিকার বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ


শিকার হালাল ও বৈধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। তা শিকারী ও শিকারের অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রথমতঃ শিকারীর জন্য শতসমূহ: যে শিকারীর শিকার ভক্ষণ করা বৈধ হবে, তার ক্ষেত্রে সেটাই শর্ত যা যবেহকারীর জন্য শর্ত। যেমন মুসলিম হওয়া অথবা আহলে কিতাব হওয়া ও ভালো-মন্দ বুঝা। অতএব পাগল, মাতাল এবং শিকার করতে অযোগ্য ব্যক্তির শিকার খাওয়া বৈধ হবে না। অনুরূপভাবে মূর্তিপূজারী, অগ্নিপূজক বা মুরতাদ যা শিকার করবে সেটাও খাওয়া বৈধ হবে না। আর মাছ বা পঙ্গপালের মতো প্রাণী, যা যবেহ এর প্রয়োজন হয় না, তা যদি এমন কেউ শিকার করে যার যবেহকৃত জন্তু খাওয়া বৈধ নয়, তবুও তার শিকার বৈধ হবে।
শিকারের জন্য আরেকটি শর্ত: শিকারীর অবশ্যই শিকার করার নিয়ত থাকতে হবে। কারণ অস্ত্র নিক্ষেপ করা ও প্রশিক্ষিত প্রাণী প্রেরণ করা যবেহ করার ন্যায়। সুতরাং এক্ষেত্রে নিয়ত করা শর্ত।
দ্বিতীয়তঃ শিকারের অস্ত্রর শর্তসমূহ: অস্ত্র দুই প্রকার:
১. এমন অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা যার ধার আছে: যেমন তরবারী, ছুরি, তীর। এক্ষেত্রে যবেহ করার অস্ত্রের বেলায় যে শর্ত প্রযোজ্য, এই শিকার করার অস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য। আর তা হলো: রক্ত প্রবাহিত করা, দাঁত ও নখ দ্বারা না হওয়া, শিকারকে অস্ত্রের ভারী অংশ দিয়ে নয়; বরং ধারালো অংশ দ্বারা আঘাত করা। রাফে ইবনে খাদীজ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন: مَا أَنْهَرَ الدَّمَ، وَذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ، فَكُلُوهُ، "যা রক্ত প্রবাহিত করে এবং যবেহ-এর সময় 'বিসমিল্লাহ' বলা হয়, তা খাও!" আল্লাহর রসূল কে তীরের ফণা দ্বারা শিকার করা জন্তু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন: مَا خَزَقَ فَكُلْ، وَمَا أَصَابَ بِعَرْضِهِ فَلَا تَأْكُلُ "তীরের ধারালো অংশ দ্বারা যেটি নিহত হয়েছে তা খাও। আর বাটের আঘাতে যেটি নিহত হয়েছে, তা খেয়ো না।”
المعراض বা বাটের অন্তর্ভুক্ত: পাথর, লাঠি, ফাঁদ, লোহার টুকরা ও অনুরূপ ধারবিহীন অস্ত্র। তবে বর্তমানে বন্দুকের যে গুলি ব্যবহৃত হয় তা ভিন্ন। এরূপ বন্দুক দিয়ে শিকার করা বৈধ। কারণ, বন্দুকের গুলির একটা শক্তি আছে, যার তীব্র আঘাত প্রাণীকে ছিন্ন করে এবং রক্ত প্রবাহিত করে।
২. শিকারী পশু বা শিকারী পাখি হওয়া: যে চতুষ্পদ প্রাণী দাঁত দিয়ে এবং যে পাখি নখ দিয়ে শিকার করে, সেসব প্রাণী দিয়ে শিকার করানো বৈধ। আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ
"আর শিকারী পশু-পাখি যাদেরকে তোমরা শিক্ষা দিয়েছ, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং তার তোমাদের জন্য যা ধরে আনে তা তোমরা ভক্ষণ করো আর তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো।" [সূরা মায়িদাহ: ৪]
سباع البهائم বা হিংস্র জন্তুর উদাহরণ: কুকুর, বাঘ ও চিতাবাঘ।
শিকারী পাখির উদাহরণ: চিল, ঈগল, ও বাজপাখি।
শিকারী প্রাণী ও পাখি দ্বারা শিকারের শর্তসমূহ:
শিকারী পশু-পাখি দ্বারা শিকার করার শর্ত হলো- প্রশিক্ষিত হতে হবে। অর্থাৎ, তাকে শিকার ধরার নিয়ম কানুন শিক্ষা দিতে হবে। আর প্রশিক্ষিত পশু-পাখিতে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে: ১. যে প্রাণীকে শিকারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হবে, সে তা-ই টার্গেট করবে; অন্যকোনো প্রাণী টার্গেট করবে না। ২. ধমক দিলে ভয় পাবে এবং মালিক থামতে বললে থেমে যাবে। এ দুটি শর্ত বিশেষ করে কুকুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ চিতাবাঘ কখনো ডাকে সাড়া নাও দিতে পারে, যদিও তা প্রশিক্ষিত হয়। আর অনুরূপভাবে পাখির প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ্য করা হবে; তাকে ছেড়ে দিলে উড়ে যাবে এবং ডাক দিলে ফিরে আসবে। ৩. শিকার করা জন্তু মালিকের কাছে নিয়ে আসার আগে তা থেকে খাবে না। এই শর্তগুলোর ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ)
"বলুন! তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তু বৈধ করা হয়েছে আর শিকারী পশু-পাখি যাদেরকে তোমরা শিক্ষা দিয়েছ যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং তারা যা তোমাদের জন্য ধরে রাখে তা তোমরা ভক্ষণ কর।" [সূরা মায়িদাহ: ৪] আদী ইবনে হাতিম নাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:
إِذَا أَرْسَلْتَ الْكَلْبَ الْمُعَلَّمَ وَسَمَّيْتَ فَأَمْسَكَ وَقَتَلَ فَكُلْ، وَإِنْ أَكَلَ فَلَا تَأْكُلْ، فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى نَفْسِهِ
"যখন তুমি প্রশিক্ষিত কুকুর শিকারের জন্য পাঠাও এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো, অতঃপর সে হত্যা করে আটকে রাখে, তাহলে তা খাও। আর যদি তা থেকে খায় (প্রাণী), তাহলে খেয়ো না। কেননা তা সে নিজের জন্যই শিকার করেছে।"
শিকার নিক্ষেপের সময় 'বিসমিল্লাহ' বলা: শিকার করার আরেকটি শর্ত হলো: তীর নিক্ষেপ বা প্রশিক্ষিত পশুপাখি প্রেরণের সময় 'বিসমিল্লাহ' বলা। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ( فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ "সুতরাং তোমাদের জন্য যা আটকে রাখে তা খাও এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো।” [সূরা মায়িদাহ : ৪]
আদী ইবনে হাতীম হতে মারফু হাদীস। ( إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللهُ عَلَيْهِ... وَإِنْ رَمَيْتَ سَهْمَكَ، فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهُ عَلَيْهِ "যখন তুমি (শিকারের জন্য) কুকুর প্রেরণ করবে তখন আল্লাহ নাম উচ্চারণ করো...আর যদি তীর নিক্ষেপ করো, তাহলে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। " অন্য শব্দে এসেছে: إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ الْمُعَلَّمَ، وَذَكَرْتَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ فَكُلْ
“যখন তুমি তোমার প্রশিক্ষিত কুকুর প্রেরণ করবে এবং 'বিসমিল্লাহ' বলবে, তাহলে তখন খাও!” তবে যদি ভুলে 'বিসমিল্লাহ' ছেড়ে দেয়, তবুও তা খাওয়া বৈধ। আল্লাহই অধিক ভালো জানেন। শিকার জীবন্ত পেলে বিধান: শিকারী যদি শিকারকে জীবন্ত অবস্থায় পায়, তাহলে তা যবেহ করা ওয়াজিব। যবেহ ছাড়া হালাল হবে না। আর যদি জীবন্ত অবস্থায় না পায়, তাহলে জবাই ছাড়াই খাওয়া বৈধ হবে।

টিকা:
১০২১ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫০৩; সহীহ মুসলিম, হা. ১৯৬৮।
১০২২ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১৬৮; সহীহ মুসলিম, হা. ১৯২৯। المعراض এমন তীর যার পালক ও ফলা নেই, সীমানা ছাড়াই আঘাত করে।
১০২৩ সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪৮৪।
১০০৪ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৭৫, ফুআ, ১৯২৯-৬।
১০২৫ সহীহুল বুখারী, হা, ৫৪৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00