📄 যবেহ বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ
এ শর্তগুলো তিন ভাগে বিভক্ত:
ক. জবাইকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট শতসমূহ।
খ. জবাইকৃত পশুর সাথে সংশ্লিষ্ট শতসমূহ।
গ. জবাই করার অস্ত্র সংশ্লিষ্ট শর্তসমূহ।
প্রথমতঃ জবাইকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তসমূহ:
১. জবাইকারীর যোগ্যতা থাকা: জবাইকারী বুদ্ধিমান ও ভালো-মন্দ পার্থক্য করার মতো ক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে। সে পুরুষ অথবা মহিলা হোক, মুসলিম বা আহলে কিতাব হোক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
প্রাণী ফাঁদে পড়েছে বা যে প্রাণীকে মৃত্যু থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, এসকল প্রাণীকে যদি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়, যেমন হাত-পা নড়ছে বা চোখের পলক পড়ছে, তাহলে জবাই করলে সে প্রাণী খাওয়া হালাল। আল্লাহ তায়ালা বাণী:
إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ “তোমরা যা জবাই করেছ তা ব্যতীত।” [সূরা মায়িদাহ : ৩]
অর্থাৎ যা জবাই করেছ তা হারাম নয়।
উপরিউক্ত অবস্থায় যদি কোনো প্রাণী জবাই করা সম্ভব না হয়; যেমন শিকার, বন্য প্রাণী, কূপে পড়ে যাওয়া প্রাণী ইত্যাদি। তার শরীরের যেকোনো অংশে আঘাত করলেই তা জবাই হয়ে যাবে। পালিয়ে যাওয়া উট সম্পর্কে পূর্বে উল্লিখিত রাফে ইবনে খাদিজের হাদীস এসেছে, তিনি বলেন, একটি উট পালিয়ে গেল। অতঃপর একজন লোক উটটিকে লক্ষ্য করে একটি তীর ছুঁড়ে মেরে সেটিকে আটকে ফেলল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
مَا نَدَّ عَلَيْكُمْ، فَاصْنَعُوا بِهِ هَكَذَا "তোমাদের কোনো প্রাণী পালিয়ে গেলে তার সাথে এমন পন্থা অবলম্বন করো।”
২. জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ "আর (যে প্রাণী জবাইয়ের সময়) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তা তোমরা খেয়ো না। আর নিশ্চয়ই তা পাপ।” [সূরা আনআম: ১২১]
আর 'বিসমিল্লাহ' বলার সাথে সাথে 'আল্লাহু আকবার' বলা সুন্নাহ। নাবী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কুরবানির পশু যবাইয়ের সময় 'বিসমিল্লাহ' ও 'আল্লাহু আকবার' বলেছেন। অন্য বর্ণায় এসেছে: "তিনি যবেহ করার সময় বলতেন: বিসমিল্লাহি ও আল্লাহু আকবার। "
তৃতীয়: যবাই করার অস্ত্র সংক্রান্ত শর্তসমূহ:
যে অস্ত্র দ্বারা যবেহ করা হবে, তা যেন ধারালো হয়। চাই সেটি লোহা বা তামা বা পাথরের বা অনুরূপ যে কোনো অস্ত্র হোক, যা দিয়ে কণ্ঠনালী কাটা যায় ও রক্ত প্রবাহিত করা যায়। তবে দাঁত ও নখ ব্যতীত। রাফে ইবনে খাদিজ হতে বর্ণিত হাদীস তিনি বলেন, নাবী বলেছেন:
مَا أَنْهَرَ الدَّمَ، وَذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ، فَكُلْ، لَيْسَ السِّنَّ، وَالظُّفُرَ
“যার রক্ত প্রবাহিত করা হয়েছে ও যবেহ করার সময় "বিসমিল্লাহ' বলা হয়েছে, তা খাও! তবে দাঁত বা নখ দ্বারা জবাইকৃত পশু খাবে না।”
সব ধরনের হাড় দ্বারা যবেহ করা দাঁত ও নখ দ্বারা ক্ষত করে যবেহ করা নিষিদ্ধ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। সেটা মানুষ বা অন্য কিছুর হাড় দিয়ে হোক না কেন।
এই নিষেধের কারণ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অংশ وَسَأُحَدِّثُكُمْ عَنْ ذَلِكَ : أَمَّا السِّنُّ فَعَظْمٌ، وَأَمَّا الظُّفُرُ فَمُدَى الْحَبَشَةِ "আমি তোমাদেরকে এর কারণ বর্ণনা করছি: দাঁত হাড্ডির মতো এবং নখ হাবশীদের ছুরি। " [অর্থাৎ স্কেল জাতীয় এক প্রকার অস্ত্র, যা দিয়ে কোনো প্রাণী যবেহ করলে স্খলিত বেগে রক্ত বের হয় না। ফলে এটি খাওয়া হারাম।-সম্পাদক]
আর হাড্ডি দ্বারা যবাই করা নিষেধের কারণ হচ্ছে, তা রক্তের দ্বারা আপবিত্র হয়ে যায়। আর নাবী হাড্ডি অপবিত্র করতে নিষেধ করেছেন; কারণ তা আমাদের ভাই জীনদের খাবার।
আর কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার কারণে নখ দ্বারা যবাই করতে নিষেধ করা হয়েছে।
টিকা:
১০০০ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৩০৭৫, ৫৫০৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৬৮।
১০০১ সহীহ মুসলিম, হা, ৪৯৮১, ফুআ. ১৯৬৬।
১০০২ সহীহ মুসলিম, হা, ৪৯৮৪, ফুআ, ১৯৬৬-(১৮)।
১০০৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫০৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৯৬৮।
১০০৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৪৮৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৬৮।
📄 যবেহ-এর আদব বা নিয়মসমূহ
যবেহ করার কিছু আদব বা নিয়ম আছে, যেগুলো যবেহকারীর জন্য মেনে চলা উচিত। আর সেগুলো হলো:
১. যবেহকারী তার ছুরি ধারালো করে নিবে: শাদ্দাদ ইবনু আউস এর হাদীস। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ .
"নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে ইহসান তথা দয়া অত্যাবশ্যক করে দিয়েছেন। অতএব, যখন তোমরা হত্যা করবে উত্তমভাবে হত্যা কর। আর যখন যবেহ করবে উত্তম ভাবে যবেহ করবে। আর তোমাদের কেউ যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং যবেহকৃত পশুকে স্বস্তি দেয়।”
২. প্রাণীকে বাম কাত করে শোয়াবে, ডান পা ছেড়ে দিবে, যাতে যবেহ করার পর তা নড়াচড়া করে স্বস্তি লাভ করতে পারে। যা একটু আগে শাদ্দাদ ইবনে আউসের হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। আবুল খায়ের এর হাদীসে এসেছে: আনসারগণের একজন ব্যক্তি তার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি আল্লাহর রসূল হতে বর্ণনা করেন:
أنه أَضْجَعَ أُضْحِيَّتَهُ لِيَذْبَحُهَا فَقَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ للرجل: أَعِنِّي عَلَى أُضْحِيَّتِي. فَأَعَانَهُ.
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির পশু যবেহ করার জন্য শোয়ালেন এবং লোকটিকে বললেন: “তুমি আমাকে আমার কুরবানি করতে সহায়তা করো! অতঃপর লোকটি তাঁকে সহায়তা করল। "
৩. উট বাম হাটু বেধে দাঁড়ানো অবস্থায় নহর করতে হবে: আর নহর হলো- ধারালো অস্ত্র দ্বারা গলায় আঘাত করা। আর তা ঘাড় ও বুকের মাঝামাঝি জায়গায়। আল্লাহ তায়ালার বাণী:
فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَ
"পায়ের উপর দন্ডায়মান অবস্থায় সেগুলোর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো।” [সূরা হাজ্জঃ ৩৬] আর صواف অর্থ তিন পায়ের উপর দাঁড়ানো অবস্থায় উট নহর করা।
ইবনু উমার একজন লোকের পাশ দিয়ে গমন করলেন এবং দেখতে পেলেন একজন লোক নহর করার জন্য তার উটটিকে বসিয়ে দিয়েছে। তিনি লোকটিকে বললেন,
ابْعَثْهَا قِيَامًا مُقَيَّدَةٌ سُنَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
"তাকে (নহর করতে গিয়ে) ওঠিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় বেঁধে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুসরণ করে নহর করো!”
৪. উট ছাড়া বাকি সকল প্রাণী যবেহ করতে হবে: এ মর্মে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تَذْبَحُوا بَقَرَةً
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে গাভী যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।” [সূরা বাক্বারাহ: ৬৭] আনাস বিন মালিক এর হাদীসে এসেছে:
أن النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أضجع الكَبْشَيْنِ اللذين ضحى بهما
"নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দুটি মেষ কুরবানি করেছিলেন তা জবাই করেছিলেন। "
টিকাঃ
১০০৫ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৯৪৯, ফুআ, ১৯৫৫।
১০০৬
১০০৭ যাদুল মুয়াসসার ৫/৪৩২
১০০৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৭১৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৩২০।
১০০৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৫৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৬৬।
📄 যবেহ-এর মাকরূহ বিষয়সমূহ
১. ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা যবেহ করা মাকরূহ: এটা এ কারণে যে, এতে প্রাণির কষ্ট হয়। শাদ্দাদ ইবনে আউসের হাদীসে পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। আর তাতে রয়েছে-
وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ .
"আর তোমাদেও কেউ যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং যবেহকৃত জন্তুকে স্বস্তি দেয়। " ইবনু উমার এর হাদীসে এসেছে-
أَمَرَ رَسُوْلُ الله ﷺ أَنْ تُحَدَّ الشَّفَارُ، وَأَنْ تُوَارَى عَنِ الْبَهَائِمِ.
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছুরিগুলো ধারালো করার আদেশ দিয়েছেন এবং তা প্রাণীসমূহে আড়ালে করতে বলেছেন।”
২. প্রণীর ঘাড় মটকে দেওয়া ও রূহ বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই চামড়া ছাড়ানো মাকরূহ: শাদ্দাদ ইবনে আউসের হাদীস। রসূলুল্লাহ বলেন:
وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحِ
"আর যখন তোমরা যবেহ করবে, তখন উত্তমরূপে যবেহ করো।”
وَلَا تَعَجَّلُوا الْأَنْفُسَ أَنْ تُزْهَق. ۱۰۰۰ "প্রাণির রূহ বেরিয়ে যাওয়ার আগে (চামড়া ছাড়ানোর ব্যাপারে) তাড়াহুড়ো করো না।”
৩. প্রাণী দেখছে এমতাবস্থায় তার সামনে ছুরি ধারালো করা মাকরূহ: পূর্বে উল্লিখিত ইবনু উমার এর হাদীসে এসেছে। وَأَنْ تُوَارَى عَنِ الْبَهَائِمِ "যেন প্রাণির আড়ালে করা হয়।”
টিকাঃ
১০১০ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৯৪৯, ফুআ, ১৯৫৫।
১০১১ আহমাদ ২/১০৮; ইবনু মাজাহ, হা. ৩১৭২; শাইখ আলবানী যঈফ বলেছেন, যঈফ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ৬৮১; তবে এর সাক্ষ্য হাদীস রয়েছে।
১০১২ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৯৪৯, ফুআ, ১৯৫৫।
১০০০ বায়হাকী ৯/২৭৮; শাইখ আলবানী বলেন, এই সানাদ উত্তমভাবে বর্ণিত হয়েছে, ইরওয়াউল গালীল ৮/১৭৬
১০১৩ আহমাদ ২/১০৮; ইবনু মাজাহ, হা. ৩১৭২; শাইখ আলবানী যঈফ বলেছেন, যঈফ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ৬৮১; তবে এর সাক্ষ্য হাদীস রয়েছে।
📄 আহলে কিতাবদের যবেহকৃত পশুর বিধান
আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী ও নাসারাদের যবেহকৃত জন্তু খাওয়া বৈধ। আল্লাহ তা'আলার বানী: ﴿ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتُبَ حِلٌّ لَكُمْ ﴾ "যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের খাবার তোমাদের জন্য হালাল।" [সূরা মায়িদাহ : ৫ অর্থাৎ হে মুসলিমগণ, আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও নাসারাদের যবেহকৃত জন্তু খাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ। ইবনু আব্বাস বলেছেন: এখাا طعامهم বা খাদ্য দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ذبائحهم বা তাদের যবেহ।
সুতরাং আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও নাসারাদের যবেহকৃত জন্তু মুসলিমগণের ঐকমত্যে বৈধ। কারণ তারা বিশ্বাস করে- আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যবেহকৃত প্রাণী এবং মৃত প্রাণী খাওয়া হারাম। তাদের এ বিশ্বাস অন্যান্য মুর্তিপূজারী, বে-দ্বীন, মুরতাদ ও অগ্নিপুজারী কাফেরদের বিপরীত। কাজেই এসব কাফেরদের যবেহকৃত প্রাণী বৈধ নয়। অনুরূপভাবে বড়ো শিক্ককারীদের যবেহ- যেমন কবর পূজারী ও মাজার পুজারী ও অন্যদের যবেহকৃত প্রাণিও বৈধ নয়।
টিকা:
১০১৪ ফাতহুল বারী ৯/৫৫২-৫৫৩।