📄 খাওয়ার আদাব
খাওয়ার কিছু আদব আছে, যার প্রতি যত্নশীল হওয়া উচিত। আর সেগুলো হলো:
১. খাবার খাওয়ার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা: এ ব্যাপারে উমার বিন আবি সালামার এর হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ এর কোলে বসা ছোটো বালক ছিলাম। আমার হাত খাওয়ার সময় পাত্রের এদিক ওদিক চলে যেত। তখন আল্লাহর রসূল আমাকে বললেন: يَا غُلَامُ، سَمُ اللَّهُ، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ "হে বালক! 'বিসমিল্লাহ' বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছ থেকে খাও।” পরবর্তীতে এটাই ছিল আমার খাওয়ার পদ্ধতি।
২. ডান হাতে খাওয়া: এটি পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে।
৩. বাসনের যে অংশ ব্যক্তির কাছে রয়েছে সেখান থেকে খাওয়া: এর আলোচনা পূর্ববর্তী হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। তবে যখন জানতে পারবে যে, পাত্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার খাওয়াতে তার সঙ্গী কষ্টবোধ করবে না এবং তা অপছন্দও করবে না, তখন কোনো সমস্যা নেই। কেননা এ বিষয়ে আনাস থেকে একজন দর্জির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যে রসূলুল্লাহ কে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিল। আনাস বলেন:
رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَتَبَّعُ الدُّبَّاءَ مِنْ حَوَالَي القَصْعَةِ
“আমি নাবী কে দেখলাম যে তিনি প্লেটের চারপাশ থেকে লাউ খুঁজছেন।" অথবা যদি লোকটি একাকী একটি প্লেটে খায়, তার সাথে আর কেউ নেই অথবা খাবারের (প্লেটে) বিভিন্ন প্রকারে খাবার আছে, তখন অপর সাথীকে কষ্ট না দিয়ে নিজের সামনে খাবার না থাকলে প্লেটের অন্যান্য জায়গা থেকেও খাবার খাওয়া জায়েয।
৪. খাবার শেষে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলা: আবু উমামা এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ এর সামনে থেকে যখন দস্তরখানা উঠিয়ে নেওয়া হতো, তখন তিনি বলতেন:
الحَمْدُ للهِ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ غَيْرَ مُوَدَّعٍ وَلَا مُسْتَغْنَى عَنْهُ رَبُّنَا
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। অনেক অনেক প্রশংসা, যা পবিত্র ও কল্যাণময়। হে আমাদের রব! যে খাবার ছাড়া যায় না এবং তা থেকে অমুখাপেক্ষীও থাকা যায় না।” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الْأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا، أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর সন্তুষ্ট হন, যে খাবার খেয়ে অথবা পান করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”
৫. দস্তরখানায় খাওয়া: আনাস বিন মালেক এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন:
مَا أَكَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى خِوَانٍ، وَلاَ فِي سُكْرُجَةٍ، وَلا خُبِزَ لَهُ مُرَقَّقُ. قُلْتُ لِقَتَادَةَ: عَلامَ يَأْكُلُونَ؟ قَالَ: عَلَى السُّفَرِ
"নাবী কখনো টেবিলের উপর খাবার খাননি, কখনো তিনি সুকুররুজাহ তথা ছোটো ছোটো (বিশেষ) পাত্রে আহার করেননি এবং তার জন্য কখনো মিহি আটার রুটি তৈরী করা হয়নি।”
বর্ণনাকারী বলেন: আমি কাতাদাকে জিজ্ঞেস করলাম: তাহলে তারা কীসের উপর খাবার খেতেন? তিনি বললেন: এ দস্তরখানার উপরে।
৬. হেলান দিয়ে খাবার খাওয়া মাকরূহ: আয়িশাহ-এর হাদীস। তিনি বলেন, আমি বললাম, يَا رَسُولَ الله ، كُلْ ، جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ ، مُتَّكِنًا ، فَإِنَّهُ أَهْوَنُ عَلَيْكَ ، فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الأَرْضَ ، قَالَ : لَا ، بَلْ اَكُل كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ، وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ
“হে আল্লাহর রসূল! আপনি হেলান দিয়ে খান (আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করে দিন), নিশ্চয়ই এটা আপনার জন্য অধিক সহজ। তখন তিনি তার মাথা নিচু করলেন এমনকি তা জমিনে ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হলো। আর তিনি বললেন: না, বরং দাস যেভাবে আহার করে আমি সেভাবে আহার করব এবং গোলাম/দাস যেভাবে বসে আমি সেভাবেই বসব।” আবু জুহাইফাহ এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: لَا آكُل مُتَّكِمًا "আমি হেলান দিয়ে খাবার খাই না।"
৭. খাবার খেতে মন না চাইলে তার দোষ না ধরা: আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, مَا عَابَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا قَطُّ ، إِنِ اشْتَهَاهُ أَكَلَهُ وَإِلَّا تَرَكَهُ “রসূলুল্লাহ কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। ইচ্ছা হলে খেতেন, আর না হলে ছেড়ে দিতেন।”
৮. প্লেটের একপাশে থেকে খাওয়া; মাঝখান থেকে খাওয়া মাকরূহ: ইবনু আব্বাস নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একটি পাত্রে ছারীদ (গোশতের ঝোলমিশ্রিত রুটি) নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: كُلُوا مِنْ جَوَانِبِهَا، وَلَا تَأْكُلُوا مِنْ وَسَطِهَا، فَإِنَّ الْبَرَكَةَ تَنْزِلُ فِي وَسَطِهَا
"তোমার প্লেটের পাশ থেকে খাও! মাঝখান থেকে খেয়ো না। কেননা প্লেটের মাঝখানে রবকত নেমে আসে।"
৯. তিন আঙ্গুলে খাওয়া এবং খাওয়ার পর আঙ্গুল চেঁটে খাওয়া: কা'ব বিন মালেক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ بِثَلَاثِ أَصَابِعَ ، وَلَا يَمْسَحُ يَدَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا
“রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন আঙুলে খেতেন এবং আঙুল চেঁটে না খাওয়া পর্যন্ত হাত মুছতেন না।”
১০. খাওয়ার সময় পড়ে যাওয়া ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়া খাবার উঠিয়ে খওয়া: এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الْأَذَى وَلْيَأْكُلْهَا، وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ
"যখন তোমাদের কারো খাবার লুকমা পড়ে যায়, তাহলে সে যেন এর ময়লা দূর করে খেয়ে নেয়। শয়তানের জন্য যেন ছেড়ে না দেয়। "
১১. খাবারের পাত্র মুছে খাওয়া এবং চেঁটে খাওয়া: এই প্রসঙ্গে পূর্বে উল্লিখিত আনাস এর বক্তব্য: وَأَمَرَنَا أَنْ نَسْلُتَ الْقَصْعَةَ
"নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে খাবার পাত্র মুছে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।” অন্য বর্ণনায় এসেছে: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِلَعْقِ الْأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ، وَقَالَ: إِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيِّهِ الْبَرَكَةُ
নাবী আঙ্গুলসমূহ ও প্লেট চেঁটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন: "তোমরা জানো না, তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত আছে। "
টিকা:
৯৮৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৭৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ২০২২।
৯৮৬ 'সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৭৯।
৯৮৭ সুনানুত তিরমিযী, হা. ৩৪৫৬ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন। [মূল বইতে তাখরীজ ভুল রয়েছে-সম্পাদক]
৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হা. ৬৮২৫, ফুআ. ২৭৩৪।
৯৮৯ সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪১৫। الخوان -যার উপর খাওয়া হয়। অর্থাৎ দস্তরখান, এটা মুরাব শব্দ। السفرة -যার উপর খাওয়া হয়। এই নামে নামকরণের কারণ হলো, যখন এর উপর খাওয়া হয় তখন একে বিছিয়ে দেওয়া হয়। السكرجة এমন ছোটো পাত্র যার মধ্যে অল্প পরিমাণ তরকারি রেখে খাওয়া হয়। এটা ফারসি শব্দ।
৯৯০ ইমাম বাগবা তার শারহুস সুন্নাহতে ১১/২৮৬-২৮৭; ইমাম আহমাদ তার যুহদের ৫ ও ৬ পৃষ্ঠায়। শাইখ আরনাউত মুরসাল শাহেদ থাকার কারণে এটাকে সহীহ বলেছেন, হশিয়া শারহুস সুন্নাহ। আহমাদ ১/২৭০; তিরমিযী, হা. ১৮০৫ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন। সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৭২; ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৭৭। ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ২৬৫০।
৯৯১ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৫৬৩, ৫৪০৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ২০৬৪।
৯৯২ আহমাদ ১/২৭০; তিরমিযী, হা. ১৮০৫ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৭২; ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৭৭। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ২৬৫০
৯৯৩ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১৯১, ফুআ, ২০৩২।
৯৯৪ সহীহ মুসলিম, হা. ৫২০১, ফুআ, ২০৩৪।
৯৯৫ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১৯৫, ফুআ. ২০৩৩।