📄 শরীয়ত প্রণেতা যেসব খাবার হারাম করেছেন
হারাম খাদ্যসমূহের মূলনীতি হলো: যেসব খাবার অপবিত্র, নোংরা ও ক্ষতিকর, তা খাওয়া জায়েয নেই। আর তা নিম্নরূপ:
১. আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনে উল্লিখিত হারাম খাদ্যসমূহ ১০টির মাঝে সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তা'য়ালার বাণীতে উল্লিখিত হয়েছে:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ "তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী, রক্ত, শুকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গকৃত পশু, কণ্ঠরোধে মারা যাওয়া পশু, আঘাত লেগে মারা যাওয়া পশু, পতনের ফলে মৃত পশু, শিংয়ের আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র প্রাণির আক্রমণে মারা যাওয়া পশু হারাম। তবে তোমরা মারা যাওয়ার আগেই যা যবেহ করতে পারবে, তা হালাল। যে সমস্ত পশুকে পূজার বেদিতে বলি দেওয়া হয়েছে সেটাও হারাম।" [সুরা মায়িদাহ : ৩]
الميئة বা মৃত প্রাণী হলো: যার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে এবং শারঈ পদ্ধতিতে যবেহ করা ছাড়াই মারা যায়। এটা রক্ত জমাট হওয়া ও খারাপ খাবার হওয়ার কারণে ক্ষতিকর হওয়ায় হারাম করা হয়েছে। তবে একান্ত বাধ্য হলে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু খাওয়া বৈধ। আর মৃত প্রাণীর মধ্যে থেকে মাছ ও টিড্ডিকে আলাদা করা হয়েছে। কারণ এগুলো মৃত অবস্থাতেও খাওয়া বৈধ।
> الدم বা রক্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রবাহিত রক্ত। এটা হারাম। কারণ আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন: "اَوْ دَمًا مَّسْفُوْحًا" "অথবা প্রবাহিত রক্ত (খাওয়া হারাম)।” [সূরা আনআম: ১৪৫]
তবে যবেহ করার পর যে সমস্ত রক্ত রঙের ভিতর বা গোশতের ভিতর অবশিষ্ট থাকে, তা খাওয়া বৈধ। কলিজা ও প্লীহা খাওয়া হালাল।
> الخنزير لحم বা শুকরের গোশত: এটা নোংরা প্রাণী। আর এটা নোংরা খাবারসমূহ খেয়ে পুষ্টি লাভ করে, যা খুবই মারাত্নক। এজন্য আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াতে (কঠোরর) এ তিনটি বিষয় একত্রে উল্লেখ করেছেন:
"إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ"
“তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত এবং শুকরের গোশত হারাম। কারণ তা অপবিত্র এবং ঘৃণিত। ঠিক তেমনিই আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয়েছে, তাও হারাম।” [সূরা আনআম : ১৪৫]
> ما أهل لغير الله به ما বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ঐ প্রাণী যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা হয়েছে। আর তাওহীদ পরিপন্থী শিরকী কাজ হওয়ায় এটা খাওয়া হারাম। কারণ প্রাণী যবেহ করা ইবাদাত। আর তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা যায়েয নয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ" “অতএব, আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” [সূরা কাওসার : ২]
> المنخنقة হলো : ঐ প্রাণী যা শ্বাসরোধে মারা যায়; স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।
> الموقوذة হলো : ঐ প্রাণী যা লাঠি বা ভারি কিছুর আঘাতে মারা যায়।
> المتردية হলো : ঐ প্রাণী যা উঁচু স্থান থেকে পড়ে মারা যায়।
> النطيحة হলো : ঐ প্রাণী যা অন্য কোনো পশুর শিংয়ের আঘাতে মারা যায়।
> ما أكل السبع ما দ্বারা উদ্দেশ্য হলো : ঐ প্রাণী যা কোনো সিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়ে বাঘ বা কুক্কুর কামড় দিয়ে যার কিছু গোশত খেয়ে ফেলেছে আর এ কারণে প্রাণীটি মারা গেছে। শেষে উল্লিখিত এ পাঁচ প্রকারের প্রাণী যদি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং যবেহ করা হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: "إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ " “তোমরা যা যবেহ করেছ তা ব্যতীত।” [সূরা মায়েদাহ: ৩] অর্থাৎ যবেহ-এর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করলে সে প্রাণী খাওয়া হালাল।
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ এখানে নুসুব বা বেদি হলো এমন পাথর, যা কা'বার পাশে প্রোথিত ছিল। জাহেলী যুগে লোকেরা এর নিকট যবেহ করত। এ যবেহকৃত প্রাণী খাওয়া জায়েয নয়। কেননা এটা শির্ক, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। যেমনটি مَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত দ্বারা উদ্দেশ্য' অংশে আলোচনা গত হয়েছে।
অনুরূপভাবে আরও কিছু প্রাণী আছে, যা খাওয়া হারাম।
২. যেগুলো খাওয়াতে ক্ষতি রয়েছে: যেমন বিষ, মদ, যাবতীয় নেশাজাত দ্রব্য এবং যা শরীর ভঙ্গুর করে দেয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” [সুরা বাক্বারাহ : ১৯৫]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ “তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।” [সূরা নিসা : ২৯]
৩. জীবিত প্রাণী থেকে যে অংশটুকু কাটা হয়: কারণ আবু ওয়াকীদ আল-লাইছীর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا قُطِعَ مِنَ الْبَهِيمَةِ وَهِيَ حَيَّةٌ فَهِيَ مَيْتَةٌ "জীবিত প্রাণী থেকে যে অংশটুকু কাটা হবে, তার হুকুম মৃত প্রাণির মতোই।" অর্থাৎ মৃত প্রাণী যেমন খাওয়া হারাম, ঠিক তেমনি জীবিত প্রাণির কোনো অংশ কেটে খাওয়াও হারাম।
৪. হিংস্র চতুষ্পদ প্রাণী: তা হচ্ছে ঐ সমস্ত স্থলভাগের প্রাণী, যেগুলো ধারালো দাঁত দ্বারা প্রাণী শিকার করে। যেমন: সিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়েবাঘ ও কুকুর। আবু ছা'লাবা আল-খুশানী এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন:
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ "রসূলুল্লাহ প্রত্যেক ধারালো দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জন্তু খেতে নিষেধ করেছেন।”
অন্য হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ ، فَأَكَلَهُ حَرَامٌ “প্রত্যেক ধারালো দাঁত বিশিষ্ট হিংস্রপ্রাণী খাওয়া হারাম।"
৬. হিংস্র পাখি: ঐ সমস্ত পাখি, যেগুলো ধারালো নখ দ্বারা শিকার করে থাকে। যেমন- ঈগল, বাজ, চিল, পেঁচা এবং এজাতীয় অন্যান্য পাখি। ইবনু আব্বাস এর হাদীসে এসেছে তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبَاعِ، وَعَنْ كُلِّ ذِي يَخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ .
"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক ধারালো দাঁতবিশিষ্ট হিংস্রপ্রাণী এবং ধারালো নখবিশিষ্ট পাখি খেতে নিষেধ করেছেন।
৭. পঁচা খাবার খাওয়া পাখি: যে সমস্ত পাখি মরা-পঁচা প্রাণী খায়, সেগুলো খাওয়াও হারাম। যেমন- শকুন, বহু পালক বিশিষ্ট মারবেল পাখি ও কাক। কারণ এগুলো অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তু খায়।
৮. যে সমস্ত প্রাণীক হত্যা করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে: যেমন- সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ও চিল। কারণ আয়িশাহ-এর হাদীসে এসেছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
خَمْسٌ مِنَ الدَّوَابُ، كُلُّهُنَّ فَاسِقٌ، يَقْتُلُهُنَّ فِي الحَرَمِ الغُرَابُ، وَالحِدَأَةُ، وَالْعَقْرَبُ، وَالفَأْرَةُ، وَالكَلْبُ العَقُورُ.
“পাঁচ প্রকার প্রাণী, সবগুলোই ক্ষতিকর। এ গুলোকে হারাম সীমানাতেও হত্যা করা যাবে। সেগুলো হলো: কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর এবং পাগলা কুকুর।" কারণ এগুলো অপবিত্র ও নোংরা।
৯. গৃহপালিত গাধা: জাবির বর্ণনা করেন।
تَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ غَزْوَةِ خَيْبَرَ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ “নাবী খায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোস্ত খেতে নিষেধ করেছেন।
১০. নোংরা খাবার গ্রহণকারী প্রাণী: যে সমস্ত প্রাণী অপবিত্র ও নোংরা খাবার খায়। যেমন: ইঁদুর, সাপ, মাছি, ভীমরুল ও মৌমাছি। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَابِثَ
"আর তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তু হারাম করেছেন।" [সূরা আরাফ: ১৫৭]
১১. জাল্লালাহ: তা হচ্ছে ঐ সমস্ত প্রাণী, যেগুলোর বেশিরভাগ নোংরা খাবার খায়। ইবনু উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ الْجَلَالَةِ "রসূলুল্লাহ জাল্লাল্লাহ (অধিক পরিমাণে নাজাসাত খায় এমন প্রাণী) খেতে নিষেধ করেছেন।”
চাই তা উট, গরু, ছাগল, মুরগী বা এ জাতীয় অন্যান্য যে-কোনো প্রাণীই হোক না কেন। তবে এগুলোকে যদি বেঁধে রেখে দীর্ঘদিন পেটের নোংরা খাবার থেকে দূরে রাখা হয় এবং পবিত্র খাবার খাওয়ানো হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। ইবনু উমার (রাঃ) এ জাতীয় কোনো প্রাণী খেতে চাইলে সেটি ৩ দিন বেঁধে রাখতেন। কেউ কেউ বলেছেন: ৩ দিনেরও বেশি সময় বেঁধে রাখতে হবে।
টিকা:
৯৭৪ ইমাম আহমাদ তা মুসনাদে বর্ণনা করেন ৫/২১৮; সুনান আবু দাউদ, হা. ২৮৫৮; তিরমিযী, হা. ১৪৮০ এবং তিনি হাসান বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুত তিরমিযী, হা. ১১৯৭।
৯৭৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৩০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৩২।
৯৭৬ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৮৬, ফুআ. ১৯৩৩।
৯৭৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৮৮, ফুআ. ১৯৩৪।
৯৭৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৮২৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১১৯৮।
৯৭৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৩০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৩২।
৯৮০ সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৮৫; ইবনু মাজাহ, হা. ৩১৮৯; সহীহ, দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৮/১৪৯।
📄 শরীয়ত প্রণেতা যা বর্ণনা করা থেকে বিরত থেকেছেন
যেসব প্রাণির ব্যাপারে শরীয়ত প্রণেতা চুপ থেকেছেন এবং যে ব্যাপারে কোনো নিষেধের দলীল নেই, সেসব প্রাণির ব্যাপারে মূলনীতি হলো: সাধারণ বৈধতা। কারণ কোনো জিনিসের মূল হচ্ছে বৈধ। এ বিষয়ে দলীল হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী: ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا﴾ "তিনিই (আল্লাহ) যিনি তোমাদের জন্য জমিনের সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন।” [সুরা বাক্বারাহ : ২৯]
ঠিক তেমনিভাবে আবু দারদা (রাঃ) এর হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: مَا أَحَلَّ اللهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو، فَاقْبَلُوا مِنَ اللَّهِ الْعَافِيَتِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُنْ لِينْسَي شَيْئًا» ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ ﴿وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا "আল্লাহ তার কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল। আর যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা হারাম। আর যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা তোমাদের জন্য বৈধ। অতএব, তোমরা আল্লাহর সাধারণ বৈধতাকে গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ তায়ালা কোনো কিছুই ভুলে যান না। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: "আপনার প্রতিপালক কোনো কিছুই ভুলে যান না।” [সূরা মারইয়াম: ৬৪]
টিকা:
৩৮১ হাকিম ২/৩৭৫ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; ইমাম যাহাবী ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
📄 যে সকল খাবার খাওয়া মাকরূহ
পেঁয়াজ ও রসুন এবং এ জাতীয় দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু, যেমন মূলা ও কাঁকুড় (পেঁয়াজ জাতীয় এক প্রকার সজিবিশেষ) এগুলো খাওয়া মাকরূহ। বিশেষ করে মসজিদে ও অন্যান্য দ্বীনি বৈঠকগুলোতে উপস্থিত হওয়ার সময়। কারণ জাবির (রাঃ) হাদীসে আছে, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ المُنْتِنَةِ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا ، فَإِنَّ المَلَائِكَةَ تَأَنَّى، مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ الْإِنْسُ "যে ব্যক্তি এ দুর্গন্ধযুক্ত গাছ থেকে কিছু খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। নিশ্চয়ই মানুষ যে জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও সেই জিনিসে কষ্ট পায়। " الشَّجَرَةِ الْمُنْتِنَةِ অর্থ রসুন গাছ। অন্য বর্ণনায় রয়েছে: حَتَّى يَذْهَبَ رِيحُهَا "যতক্ষণ না তার দুর্গন্ধ চলে যায়, (ততক্ষণ মসজিদে যাবে না)।" তবে এ সবজি দুটিকে (পিঁয়াজ-রসুন) যখন রান্না করা হবে এবং গন্ধও চলে যাবে, তখন তা খেতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা উমার বলেছেন: فَمَنْ أَكَلَهُمَا فَلْيُمِتْهُمَا طَبْحًا "যে ব্যক্তি এ সবজি দুটিকে খাবে, সে যেন রান্না করে এর দুর্গন্ধ ধ্বংস করে দেয়।” জাবির হতে অন্য বর্ণনায় রয়েছে: مَا أَرَاهُ إِلَّا نِيَمَّهُ "আমি মনে করি, এ নিষেধাজ্ঞাটা শুধুমাত্র কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার ক্ষেত্রে। "
টিকা:
৯৮২ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪৫২; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৫৬৪।
৯৮৩ সহীহ মুসলিম, হা. ১১৪৫, ফুআ. ৫৬৭।
৯৮৪ জামিউল উসুল ৮/২৮০।
📄 খাওয়ার আদাব
খাওয়ার কিছু আদব আছে, যার প্রতি যত্নশীল হওয়া উচিত। আর সেগুলো হলো:
১. খাবার খাওয়ার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা: এ ব্যাপারে উমার বিন আবি সালামার এর হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ এর কোলে বসা ছোটো বালক ছিলাম। আমার হাত খাওয়ার সময় পাত্রের এদিক ওদিক চলে যেত। তখন আল্লাহর রসূল আমাকে বললেন: يَا غُلَامُ، سَمُ اللَّهُ، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ "হে বালক! 'বিসমিল্লাহ' বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছ থেকে খাও।” পরবর্তীতে এটাই ছিল আমার খাওয়ার পদ্ধতি।
২. ডান হাতে খাওয়া: এটি পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে।
৩. বাসনের যে অংশ ব্যক্তির কাছে রয়েছে সেখান থেকে খাওয়া: এর আলোচনা পূর্ববর্তী হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। তবে যখন জানতে পারবে যে, পাত্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার খাওয়াতে তার সঙ্গী কষ্টবোধ করবে না এবং তা অপছন্দও করবে না, তখন কোনো সমস্যা নেই। কেননা এ বিষয়ে আনাস থেকে একজন দর্জির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যে রসূলুল্লাহ কে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিল। আনাস বলেন:
رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَتَبَّعُ الدُّبَّاءَ مِنْ حَوَالَي القَصْعَةِ
“আমি নাবী কে দেখলাম যে তিনি প্লেটের চারপাশ থেকে লাউ খুঁজছেন।" অথবা যদি লোকটি একাকী একটি প্লেটে খায়, তার সাথে আর কেউ নেই অথবা খাবারের (প্লেটে) বিভিন্ন প্রকারে খাবার আছে, তখন অপর সাথীকে কষ্ট না দিয়ে নিজের সামনে খাবার না থাকলে প্লেটের অন্যান্য জায়গা থেকেও খাবার খাওয়া জায়েয।
৪. খাবার শেষে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলা: আবু উমামা এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ এর সামনে থেকে যখন দস্তরখানা উঠিয়ে নেওয়া হতো, তখন তিনি বলতেন:
الحَمْدُ للهِ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ غَيْرَ مُوَدَّعٍ وَلَا مُسْتَغْنَى عَنْهُ رَبُّنَا
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। অনেক অনেক প্রশংসা, যা পবিত্র ও কল্যাণময়। হে আমাদের রব! যে খাবার ছাড়া যায় না এবং তা থেকে অমুখাপেক্ষীও থাকা যায় না।” রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الْأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا، أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর সন্তুষ্ট হন, যে খাবার খেয়ে অথবা পান করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”
৫. দস্তরখানায় খাওয়া: আনাস বিন মালেক এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন:
مَا أَكَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى خِوَانٍ، وَلاَ فِي سُكْرُجَةٍ، وَلا خُبِزَ لَهُ مُرَقَّقُ. قُلْتُ لِقَتَادَةَ: عَلامَ يَأْكُلُونَ؟ قَالَ: عَلَى السُّفَرِ
"নাবী কখনো টেবিলের উপর খাবার খাননি, কখনো তিনি সুকুররুজাহ তথা ছোটো ছোটো (বিশেষ) পাত্রে আহার করেননি এবং তার জন্য কখনো মিহি আটার রুটি তৈরী করা হয়নি।”
বর্ণনাকারী বলেন: আমি কাতাদাকে জিজ্ঞেস করলাম: তাহলে তারা কীসের উপর খাবার খেতেন? তিনি বললেন: এ দস্তরখানার উপরে।
৬. হেলান দিয়ে খাবার খাওয়া মাকরূহ: আয়িশাহ-এর হাদীস। তিনি বলেন, আমি বললাম, يَا رَسُولَ الله ، كُلْ ، جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ ، مُتَّكِنًا ، فَإِنَّهُ أَهْوَنُ عَلَيْكَ ، فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الأَرْضَ ، قَالَ : لَا ، بَلْ اَكُل كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ، وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ
“হে আল্লাহর রসূল! আপনি হেলান দিয়ে খান (আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করে দিন), নিশ্চয়ই এটা আপনার জন্য অধিক সহজ। তখন তিনি তার মাথা নিচু করলেন এমনকি তা জমিনে ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হলো। আর তিনি বললেন: না, বরং দাস যেভাবে আহার করে আমি সেভাবে আহার করব এবং গোলাম/দাস যেভাবে বসে আমি সেভাবেই বসব।” আবু জুহাইফাহ এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: لَا آكُل مُتَّكِمًا "আমি হেলান দিয়ে খাবার খাই না।"
৭. খাবার খেতে মন না চাইলে তার দোষ না ধরা: আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, مَا عَابَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا قَطُّ ، إِنِ اشْتَهَاهُ أَكَلَهُ وَإِلَّا تَرَكَهُ “রসূলুল্লাহ কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। ইচ্ছা হলে খেতেন, আর না হলে ছেড়ে দিতেন।”
৮. প্লেটের একপাশে থেকে খাওয়া; মাঝখান থেকে খাওয়া মাকরূহ: ইবনু আব্বাস নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একটি পাত্রে ছারীদ (গোশতের ঝোলমিশ্রিত রুটি) নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: كُلُوا مِنْ جَوَانِبِهَا، وَلَا تَأْكُلُوا مِنْ وَسَطِهَا، فَإِنَّ الْبَرَكَةَ تَنْزِلُ فِي وَسَطِهَا
"তোমার প্লেটের পাশ থেকে খাও! মাঝখান থেকে খেয়ো না। কেননা প্লেটের মাঝখানে রবকত নেমে আসে।"
৯. তিন আঙ্গুলে খাওয়া এবং খাওয়ার পর আঙ্গুল চেঁটে খাওয়া: কা'ব বিন মালেক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ بِثَلَاثِ أَصَابِعَ ، وَلَا يَمْسَحُ يَدَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا
“রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন আঙুলে খেতেন এবং আঙুল চেঁটে না খাওয়া পর্যন্ত হাত মুছতেন না।”
১০. খাওয়ার সময় পড়ে যাওয়া ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়া খাবার উঠিয়ে খওয়া: এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الْأَذَى وَلْيَأْكُلْهَا، وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ
"যখন তোমাদের কারো খাবার লুকমা পড়ে যায়, তাহলে সে যেন এর ময়লা দূর করে খেয়ে নেয়। শয়তানের জন্য যেন ছেড়ে না দেয়। "
১১. খাবারের পাত্র মুছে খাওয়া এবং চেঁটে খাওয়া: এই প্রসঙ্গে পূর্বে উল্লিখিত আনাস এর বক্তব্য: وَأَمَرَنَا أَنْ نَسْلُتَ الْقَصْعَةَ
"নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে খাবার পাত্র মুছে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।” অন্য বর্ণনায় এসেছে: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِلَعْقِ الْأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ، وَقَالَ: إِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيِّهِ الْبَرَكَةُ
নাবী আঙ্গুলসমূহ ও প্লেট চেঁটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন: "তোমরা জানো না, তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত আছে। "
টিকা:
৯৮৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৭৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ২০২২।
৯৮৬ 'সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৭৯।
৯৮৭ সুনানুত তিরমিযী, হা. ৩৪৫৬ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন। [মূল বইতে তাখরীজ ভুল রয়েছে-সম্পাদক]
৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হা. ৬৮২৫, ফুআ. ২৭৩৪।
৯৮৯ সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪১৫। الخوان -যার উপর খাওয়া হয়। অর্থাৎ দস্তরখান, এটা মুরাব শব্দ। السفرة -যার উপর খাওয়া হয়। এই নামে নামকরণের কারণ হলো, যখন এর উপর খাওয়া হয় তখন একে বিছিয়ে দেওয়া হয়। السكرجة এমন ছোটো পাত্র যার মধ্যে অল্প পরিমাণ তরকারি রেখে খাওয়া হয়। এটা ফারসি শব্দ।
৯৯০ ইমাম বাগবা তার শারহুস সুন্নাহতে ১১/২৮৬-২৮৭; ইমাম আহমাদ তার যুহদের ৫ ও ৬ পৃষ্ঠায়। শাইখ আরনাউত মুরসাল শাহেদ থাকার কারণে এটাকে সহীহ বলেছেন, হশিয়া শারহুস সুন্নাহ। আহমাদ ১/২৭০; তিরমিযী, হা. ১৮০৫ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন। সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৭২; ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৭৭। ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ২৬৫০।
৯৯১ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৫৬৩, ৫৪০৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ২০৬৪।
৯৯২ আহমাদ ১/২৭০; তিরমিযী, হা. ১৮০৫ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৭২; ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৭৭। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুবনু মাজাহ, হা. ২৬৫০
৯৯৩ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১৯১, ফুআ, ২০৩২।
৯৯৪ সহীহ মুসলিম, হা. ৫২০১, ফুআ, ২০৩৪।
৯৯৫ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১৯৫, ফুআ. ২০৩৩।