📄 যে সমস্ত খাবারকে শরীয়ত প্রণেতা হালাল ও বৈধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন
এর মূলনীতি ও সূত্র হলো: যে সমস্ত খাবার পবিত্র এবং কোনো প্রকার ক্ষতির আশংকা নেই, তা খাওয়া ও পান করা বৈধ। আর বৈধ খাবার-পানীয় দুই প্রকার: প্রাণী জাতীয় ও উদ্ভিদ জাতীয়। উদ্ভিদ জাতীয় খাবার যেমন শস্যের দানা বা বিচি ও ফল-ফলাদি। আর প্রাণী জাতীয় খাবারও দুই প্রকার: স্থলজ ও সামুদ্রিক।
প্রথমত: সামুদ্রিক প্রাণী: তা হলো ঐ সমস্ত প্রাণী, যা শুধুমাত্র সমুদ্রেই বসবাস করে থাকে। যেমন বিভিন্ন প্রকার মাছ এবং এ জাতীয় অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী। তবে যেগুলো বিষাক্ত প্রাণী সেগুলো ক্ষতিকর হওয়ার কারণে হারাম। ঠিক তেমনিভাবে যে সমস্ত সামুদ্রিক প্রাণী নাপাক বস্তু ও ময়লা- আবর্জনা খায়, সেগুলোও হারাম। যেমন ব্যাঙ ও তৎসঙ্গে এটি হত্যা করাও নিষেধ। ঠিক তেমনিভাবে কুমিরও হারাম। কেননা তা নোংরা এবং তার বড়ো বড়ো শিকারী দাঁত রয়েছে, যার দ্বারা সে আক্রমণ করে। আর এগুলো হারাম হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার বাণী রয়েছে:
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَابِتَ
"আর তিনি নিকৃষ্ট ও অপবিত্র প্রাণীগুলিকে তাদের জন্য হারাম করেন।" [সুরা আরাফ: ১৫৭]
আর সামুদ্রিক প্রাণী খাওয়া বৈধ। চাই মুসলিম ব্যক্তি শিকার করুক বা অন্য কেউ। আর তা স্থলের বৈধ বা অবৈধ প্রাণির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হোক বা না হোক। সামুদ্রিক প্রাণী যবেহ করারও কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন:
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ
"সমুদ্রের শিকার ও খাদ্য তোমাদের জন্য বৈধ করে দেওয়া হয়েছে, তোমাদের জন্য ও সমুদ্র ভ্রমণকারীদের ভোগবিলাসের উপকরণ স্বরূপ।” [সূরা মায়িদাহ: ৯৬]
ইবনু আব্বাস বলেন: "জেনে রেখো, সমুদ্রের শিকার সেটাই যা সমুদ্র হতে শিকার করা হয়। আর সমুদ্রের খাবার হলো, যা সমুদ্র নিক্ষেপ করে। "
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
سَأَلَ رَجُلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهَ إِنَّا نَرْكَبُ الْبَحْرَ ، وَنَحْمِلُ مَعَنَا الْقَلِيلَ مِنَ المَاءِ، فَإِنْ تَوَضَّأْنَا بِهِ عَطِشْنَا، أَفَتَتَوَضَّأُ بِمَاءِ الْبَحْرِ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هُوَ الطَّهُورُ mاؤُهُ الحِلُّ مَيْتَتُهُ
“একজন ব্যক্তি রসূলকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা সমুদ্রে ভ্রমণ করি। আর আমাদের কাছে (সুপেয়) পানি অল্প পরিমাণে থাকে। তা দ্বারা যদি ওযু করি, তবে আমরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ব। তাহলে কি আমরা সমুদ্রের পানি দ্বারা ওযু করতে পারি? তখন জবাবে আল্লাহর রসূলবললেন: তার পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণিও খাওয়া বৈধ।"
দ্বিতীয়ত: স্থলজ প্রাণী: স্থল ভাগের যে সমস্ত প্রাণির বৈধতার দলীল এসেছে, সেগুলোকে নিম্নে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো: ক. الأنعم বা চতুষ্পদ জন্তুসমূহ: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ﴾ "তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন: তাতে তোমাদের জন্য রয়েছে উষ্ণতা, বিভিন্ন উপকারিতা এবং তা হতে তোমরা (গোশত) খেয়ে থাকো।” [সূরা নাহল: ৫] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ أُحِلَّتْ لَكُمْ بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ﴾ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহ হালাল করে দেওয়া হয়েছে। তবে যা হারাম হিসেবে পাঠ করা হয়, তা ব্যতীত।” [সূরা মায়িদাহ: ১] এখানে চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: উট, গরু ও ছাগল। খ. الخيل বা ঘোড়া: জাবির বিন আব্দুল্লাহ-এর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন,
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ خَيْبَرَ عَنْ حُومِ الْحُمُرِ، وَرَخَّصَ فِي لُحُومِ الخَيْلِ "নাবীখায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।”
গ. الضب বা গুইসাপ: ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أُكِلَ الضَّبُّ عَلَى مَائِدَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "রসূলেরদস্তরখানায় গুইসাপ খাওয়া হয়েছে।” অন্য হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেন:
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ لَحْمَ دَجَاجِ
“আমি আল্লাহর রসূল কে মোরগের গোশত খেতে দেখেছি।” আর মোরগ-মুরগীর সাথে রাজহাস ও পাঁতিহাসকেও সংযুক্ত করা হয়। কারণ উভয়টি পবিত্র প্রাণির অন্তর্ভুক্ত। ফলে তা আল্লাহর এই বাণির আওতাভুক্ত হবে:
أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ “তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করে দেওয়া হয়েছে।” [সূরা মায়িদাহ: ৪] জ. الجراد বা টিড্ডি: আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
غَزَوْنَا مَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ أَوْ سِرًّا، كُنَّا نَأْكُلُ مَعَهُ الجَرَادَ "আমরা নাবী এর সাথে সাতটি বা ছয়টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তাতে আমরা তার সাথে টিড্ডি খেতাম। "
টিকা:
৯৬৩ দারাকুৎনী ৪/২৭০; বায়হাকী ১০/১২; দেখুন, তাফসীর ইবনে কাসীর ৩/১৮৯, উক্ত আয়াতের তাফসীর।
৯৬৪ সুনান আবু দাউদ, হা. ৮৩। সুনানুন নাসাঈ, হা. ৫৯; ইবনু মাজাহ, হা. ৩৮৬; তিরমিযী, হা. ৬৯ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন; ইমাম মালেক তার মুয়াত্তার ২০ পৃষ্ঠায়; ইমাম হাকিম তার মুসতাদরাকে ১/১৪৭০ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুন নাসাঈ, নং ৫৮।
৯৬৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫২০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৯৪১।
৯৬৬ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫২১৭; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৯৪৫।
৯৭২ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫১৭; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৬৪৯; শব্দ ইমাম তিরমিযীর।
৯৭৩ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪৯৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৫২।
📄 শরীয়ত প্রণেতা যেসব খাবার হারাম করেছেন
হারাম খাদ্যসমূহের মূলনীতি হলো: যেসব খাবার অপবিত্র, নোংরা ও ক্ষতিকর, তা খাওয়া জায়েয নেই। আর তা নিম্নরূপ:
১. আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনে উল্লিখিত হারাম খাদ্যসমূহ ১০টির মাঝে সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তা'য়ালার বাণীতে উল্লিখিত হয়েছে:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ "তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী, রক্ত, শুকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গকৃত পশু, কণ্ঠরোধে মারা যাওয়া পশু, আঘাত লেগে মারা যাওয়া পশু, পতনের ফলে মৃত পশু, শিংয়ের আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র প্রাণির আক্রমণে মারা যাওয়া পশু হারাম। তবে তোমরা মারা যাওয়ার আগেই যা যবেহ করতে পারবে, তা হালাল। যে সমস্ত পশুকে পূজার বেদিতে বলি দেওয়া হয়েছে সেটাও হারাম।" [সুরা মায়িদাহ : ৩]
الميئة বা মৃত প্রাণী হলো: যার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে এবং শারঈ পদ্ধতিতে যবেহ করা ছাড়াই মারা যায়। এটা রক্ত জমাট হওয়া ও খারাপ খাবার হওয়ার কারণে ক্ষতিকর হওয়ায় হারাম করা হয়েছে। তবে একান্ত বাধ্য হলে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু খাওয়া বৈধ। আর মৃত প্রাণীর মধ্যে থেকে মাছ ও টিড্ডিকে আলাদা করা হয়েছে। কারণ এগুলো মৃত অবস্থাতেও খাওয়া বৈধ।
> الدم বা রক্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রবাহিত রক্ত। এটা হারাম। কারণ আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন: "اَوْ دَمًا مَّسْفُوْحًا" "অথবা প্রবাহিত রক্ত (খাওয়া হারাম)।” [সূরা আনআম: ১৪৫]
তবে যবেহ করার পর যে সমস্ত রক্ত রঙের ভিতর বা গোশতের ভিতর অবশিষ্ট থাকে, তা খাওয়া বৈধ। কলিজা ও প্লীহা খাওয়া হালাল।
> الخنزير لحم বা শুকরের গোশত: এটা নোংরা প্রাণী। আর এটা নোংরা খাবারসমূহ খেয়ে পুষ্টি লাভ করে, যা খুবই মারাত্নক। এজন্য আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াতে (কঠোরর) এ তিনটি বিষয় একত্রে উল্লেখ করেছেন:
"إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ"
“তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত এবং শুকরের গোশত হারাম। কারণ তা অপবিত্র এবং ঘৃণিত। ঠিক তেমনিই আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয়েছে, তাও হারাম।” [সূরা আনআম : ১৪৫]
> ما أهل لغير الله به ما বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: ঐ প্রাণী যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা হয়েছে। আর তাওহীদ পরিপন্থী শিরকী কাজ হওয়ায় এটা খাওয়া হারাম। কারণ প্রাণী যবেহ করা ইবাদাত। আর তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা যায়েয নয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ" “অতএব, আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” [সূরা কাওসার : ২]
> المنخنقة হলো : ঐ প্রাণী যা শ্বাসরোধে মারা যায়; স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।
> الموقوذة হলো : ঐ প্রাণী যা লাঠি বা ভারি কিছুর আঘাতে মারা যায়।
> المتردية হলো : ঐ প্রাণী যা উঁচু স্থান থেকে পড়ে মারা যায়।
> النطيحة হলো : ঐ প্রাণী যা অন্য কোনো পশুর শিংয়ের আঘাতে মারা যায়।
> ما أكل السبع ما দ্বারা উদ্দেশ্য হলো : ঐ প্রাণী যা কোনো সিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়ে বাঘ বা কুক্কুর কামড় দিয়ে যার কিছু গোশত খেয়ে ফেলেছে আর এ কারণে প্রাণীটি মারা গেছে। শেষে উল্লিখিত এ পাঁচ প্রকারের প্রাণী যদি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং যবেহ করা হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: "إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ " “তোমরা যা যবেহ করেছ তা ব্যতীত।” [সূরা মায়েদাহ: ৩] অর্থাৎ যবেহ-এর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করলে সে প্রাণী খাওয়া হালাল।
وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ এখানে নুসুব বা বেদি হলো এমন পাথর, যা কা'বার পাশে প্রোথিত ছিল। জাহেলী যুগে লোকেরা এর নিকট যবেহ করত। এ যবেহকৃত প্রাণী খাওয়া জায়েয নয়। কেননা এটা শির্ক, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। যেমনটি مَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত দ্বারা উদ্দেশ্য' অংশে আলোচনা গত হয়েছে।
অনুরূপভাবে আরও কিছু প্রাণী আছে, যা খাওয়া হারাম।
২. যেগুলো খাওয়াতে ক্ষতি রয়েছে: যেমন বিষ, মদ, যাবতীয় নেশাজাত দ্রব্য এবং যা শরীর ভঙ্গুর করে দেয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” [সুরা বাক্বারাহ : ১৯৫]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ “তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।” [সূরা নিসা : ২৯]
৩. জীবিত প্রাণী থেকে যে অংশটুকু কাটা হয়: কারণ আবু ওয়াকীদ আল-লাইছীর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا قُطِعَ مِنَ الْبَهِيمَةِ وَهِيَ حَيَّةٌ فَهِيَ مَيْتَةٌ "জীবিত প্রাণী থেকে যে অংশটুকু কাটা হবে, তার হুকুম মৃত প্রাণির মতোই।" অর্থাৎ মৃত প্রাণী যেমন খাওয়া হারাম, ঠিক তেমনি জীবিত প্রাণির কোনো অংশ কেটে খাওয়াও হারাম।
৪. হিংস্র চতুষ্পদ প্রাণী: তা হচ্ছে ঐ সমস্ত স্থলভাগের প্রাণী, যেগুলো ধারালো দাঁত দ্বারা প্রাণী শিকার করে। যেমন: সিংহ, চিতাবাঘ, নেকড়েবাঘ ও কুকুর। আবু ছা'লাবা আল-খুশানী এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন:
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ "রসূলুল্লাহ প্রত্যেক ধারালো দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জন্তু খেতে নিষেধ করেছেন।”
অন্য হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ ، فَأَكَلَهُ حَرَامٌ “প্রত্যেক ধারালো দাঁত বিশিষ্ট হিংস্রপ্রাণী খাওয়া হারাম।"
৬. হিংস্র পাখি: ঐ সমস্ত পাখি, যেগুলো ধারালো নখ দ্বারা শিকার করে থাকে। যেমন- ঈগল, বাজ, চিল, পেঁচা এবং এজাতীয় অন্যান্য পাখি। ইবনু আব্বাস এর হাদীসে এসেছে তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبَاعِ، وَعَنْ كُلِّ ذِي يَخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ .
"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক ধারালো দাঁতবিশিষ্ট হিংস্রপ্রাণী এবং ধারালো নখবিশিষ্ট পাখি খেতে নিষেধ করেছেন।
৭. পঁচা খাবার খাওয়া পাখি: যে সমস্ত পাখি মরা-পঁচা প্রাণী খায়, সেগুলো খাওয়াও হারাম। যেমন- শকুন, বহু পালক বিশিষ্ট মারবেল পাখি ও কাক। কারণ এগুলো অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তু খায়।
৮. যে সমস্ত প্রাণীক হত্যা করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে: যেমন- সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ও চিল। কারণ আয়িশাহ-এর হাদীসে এসেছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
خَمْسٌ مِنَ الدَّوَابُ، كُلُّهُنَّ فَاسِقٌ، يَقْتُلُهُنَّ فِي الحَرَمِ الغُرَابُ، وَالحِدَأَةُ، وَالْعَقْرَبُ، وَالفَأْرَةُ، وَالكَلْبُ العَقُورُ.
“পাঁচ প্রকার প্রাণী, সবগুলোই ক্ষতিকর। এ গুলোকে হারাম সীমানাতেও হত্যা করা যাবে। সেগুলো হলো: কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর এবং পাগলা কুকুর।" কারণ এগুলো অপবিত্র ও নোংরা।
৯. গৃহপালিত গাধা: জাবির বর্ণনা করেন।
تَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ غَزْوَةِ خَيْبَرَ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ “নাবী খায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোস্ত খেতে নিষেধ করেছেন।
১০. নোংরা খাবার গ্রহণকারী প্রাণী: যে সমস্ত প্রাণী অপবিত্র ও নোংরা খাবার খায়। যেমন: ইঁদুর, সাপ, মাছি, ভীমরুল ও মৌমাছি। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَابِثَ
"আর তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তু হারাম করেছেন।" [সূরা আরাফ: ১৫৭]
১১. জাল্লালাহ: তা হচ্ছে ঐ সমস্ত প্রাণী, যেগুলোর বেশিরভাগ নোংরা খাবার খায়। ইবনু উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ الْجَلَالَةِ "রসূলুল্লাহ জাল্লাল্লাহ (অধিক পরিমাণে নাজাসাত খায় এমন প্রাণী) খেতে নিষেধ করেছেন।”
চাই তা উট, গরু, ছাগল, মুরগী বা এ জাতীয় অন্যান্য যে-কোনো প্রাণীই হোক না কেন। তবে এগুলোকে যদি বেঁধে রেখে দীর্ঘদিন পেটের নোংরা খাবার থেকে দূরে রাখা হয় এবং পবিত্র খাবার খাওয়ানো হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। ইবনু উমার (রাঃ) এ জাতীয় কোনো প্রাণী খেতে চাইলে সেটি ৩ দিন বেঁধে রাখতেন। কেউ কেউ বলেছেন: ৩ দিনেরও বেশি সময় বেঁধে রাখতে হবে।
টিকা:
৯৭৪ ইমাম আহমাদ তা মুসনাদে বর্ণনা করেন ৫/২১৮; সুনান আবু দাউদ, হা. ২৮৫৮; তিরমিযী, হা. ১৪৮০ এবং তিনি হাসান বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুত তিরমিযী, হা. ১১৯৭।
৯৭৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৩০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৩২।
৯৭৬ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৮৬, ফুআ. ১৯৩৩।
৯৭৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৮৮, ফুআ. ১৯৩৪।
৯৭৮ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৮২৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১১৯৮।
৯৭৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৩০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯৩২।
৯৮০ সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৭৮৫; ইবনু মাজাহ, হা. ৩১৮৯; সহীহ, দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৮/১৪৯।
📄 শরীয়ত প্রণেতা যা বর্ণনা করা থেকে বিরত থেকেছেন
যেসব প্রাণির ব্যাপারে শরীয়ত প্রণেতা চুপ থেকেছেন এবং যে ব্যাপারে কোনো নিষেধের দলীল নেই, সেসব প্রাণির ব্যাপারে মূলনীতি হলো: সাধারণ বৈধতা। কারণ কোনো জিনিসের মূল হচ্ছে বৈধ। এ বিষয়ে দলীল হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী: ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا﴾ "তিনিই (আল্লাহ) যিনি তোমাদের জন্য জমিনের সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন।” [সুরা বাক্বারাহ : ২৯]
ঠিক তেমনিভাবে আবু দারদা (রাঃ) এর হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: مَا أَحَلَّ اللهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو، فَاقْبَلُوا مِنَ اللَّهِ الْعَافِيَتِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُنْ لِينْسَي شَيْئًا» ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ ﴿وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا "আল্লাহ তার কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল। আর যা হারাম ঘোষণা করেছেন তা হারাম। আর যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা তোমাদের জন্য বৈধ। অতএব, তোমরা আল্লাহর সাধারণ বৈধতাকে গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ তায়ালা কোনো কিছুই ভুলে যান না। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: "আপনার প্রতিপালক কোনো কিছুই ভুলে যান না।” [সূরা মারইয়াম: ৬৪]
টিকা:
৩৮১ হাকিম ২/৩৭৫ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; ইমাম যাহাবী ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
📄 যে সকল খাবার খাওয়া মাকরূহ
পেঁয়াজ ও রসুন এবং এ জাতীয় দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু, যেমন মূলা ও কাঁকুড় (পেঁয়াজ জাতীয় এক প্রকার সজিবিশেষ) এগুলো খাওয়া মাকরূহ। বিশেষ করে মসজিদে ও অন্যান্য দ্বীনি বৈঠকগুলোতে উপস্থিত হওয়ার সময়। কারণ জাবির (রাঃ) হাদীসে আছে, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ المُنْتِنَةِ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا ، فَإِنَّ المَلَائِكَةَ تَأَنَّى، مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ الْإِنْسُ "যে ব্যক্তি এ দুর্গন্ধযুক্ত গাছ থেকে কিছু খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। নিশ্চয়ই মানুষ যে জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও সেই জিনিসে কষ্ট পায়। " الشَّجَرَةِ الْمُنْتِنَةِ অর্থ রসুন গাছ। অন্য বর্ণনায় রয়েছে: حَتَّى يَذْهَبَ رِيحُهَا "যতক্ষণ না তার দুর্গন্ধ চলে যায়, (ততক্ষণ মসজিদে যাবে না)।" তবে এ সবজি দুটিকে (পিঁয়াজ-রসুন) যখন রান্না করা হবে এবং গন্ধও চলে যাবে, তখন তা খেতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা উমার বলেছেন: فَمَنْ أَكَلَهُمَا فَلْيُمِتْهُمَا طَبْحًا "যে ব্যক্তি এ সবজি দুটিকে খাবে, সে যেন রান্না করে এর দুর্গন্ধ ধ্বংস করে দেয়।” জাবির হতে অন্য বর্ণনায় রয়েছে: مَا أَرَاهُ إِلَّا نِيَمَّهُ "আমি মনে করি, এ নিষেধাজ্ঞাটা শুধুমাত্র কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার ক্ষেত্রে। "
টিকা:
৯৮২ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪৫২; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৫৬৪।
৯৮৩ সহীহ মুসলিম, হা. ১১৪৫, ফুআ. ৫৬৭।
৯৮৪ জামিউল উসুল ৮/২৮০।