📄 النذر (মানত করা) এর সংজ্ঞা, তার বৈধতা ও হুকুম
১. النذر এর সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থ: আবশ্যক করে নেওয়া )الإيجاب(। বলা হয় نذرت كذا অর্থাৎ আমি এটা মানত করলাম, এই কথার মাধ্যমে নিজের উপর আবশ্যক করে নেওয়া।
পরিভাষায়: কোনো মুকাল্লাফ ব্যক্তির (শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আল্লাহর তা'আলার জন্য স্বেচ্ছায় কোনো বিষয় নিজের উপর আবশ্যক করে নেওয়াকে النذر বা মানত বলে।
২. النذر )মানত) এর বৈধতা ও হুকুম: কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা النذر বা মানত করা শরীয়ত সম্মত বলে প্রমাণিত। দলীল- প্রমাণসহ বিবরণ আসছে।
প্রাথমিকভাবে মানত করার হুকুম হচ্ছে 'মাকরূহ'; মুস্তাহাব নয়। কেননা ইবনু উমারের-এর হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ ﷺ মানত করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরও বলেন: إِنَّهُ لَا يَرُدُّ شَيْئًا، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الشَّحِيحِ
“নিশ্চয়ই এটা (মানত) কোনো কিছুই (বিপদ-আপদ) প্রতিরোধ করতে পারে না। আর এর দ্বারা তো কৃপনের ধন-সম্পদ হতে কিছু সম্পদ বের করা হয় মাত্র।”
মানতকারী নিজের উপর এমন বিষয় আবশ্যক করে নেয়, যা মূলত শরীয়ত আবশ্যক করেনি। ফলে সে নিজেকে সংকটে ফেলে দেয় এবং সেটা পালন করা তার উপর কষ্টসাধ্য হয়। মুসলিম ব্যক্তির কাম্য হচ্ছে, সে কোনোরূপ মানত ছাড়াই ভালো কাজ করবে। তবে কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্যে কোনো কাজ করার মানত করে, তাহলে তার উপর তা পূর্ণ করা আবশ্যক হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ نَفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُمْ مِنْ نَذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ
"তোমরা যা কিছু (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো না কেন এবং যা কিছু মানত করো না কেন, আল্লাহ তা অবগত আছেন।” [সূরা বাকারা: ২৭০]
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং তারা এমন দিনকে ভয় করে, যার অনিষ্টতা ভয়াবহ।" [সূরা ইনসান : ৭)]
আয়িশাহ এর হাদীসে এসেছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ، وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَ اللَّهُ فَلَا يَعْصِهِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়ে মানত করে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মানত করে, সে যেন তাঁর অবাধ্যতা না করে।"
যারা মানত পূর্ণ করে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রশংসা করেছেন এবং গুণ বর্ণনা করেছেন। রসূলুল্লাহ মানত পূর্ণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, এটা প্রমাণ বহন করে যে, পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ছিল 'মাকরূহ' বুঝাতে; হারাম সাব্যস্ত করতে নয়। মানত করা মূলত নিষিদ্ধ ও মাকরূহ। কিন্তু যে নিজের উপর তা আবশ্যক করে নিবে, তার উপর তা পূরণ করা আবশ্যক এবং এক প্রকার আনুগত্যমূলক কাজ। অতএব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য মানت করা বৈধ নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো কবর, ওলী বা অনুরূপ কারো নামে মানত করল, সে আল্লাহর সাথে বড়ো শির্ক করল। আমরা আল্লাহর নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
টিকা:
৯৫৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৬৯২; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৩৯।
৯৫৫ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৬৯৬।
📄 মানতের শর্তসমূহ ও তার শব্দাবলী
১. মানতের শর্তসমূহ: প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধি সম্পন্ন ও স্বেচ্ছাধীন ব্যক্তি ছাড়া মানত করা বিশুদ্ধ হবে না। কাজেই শিশু, পাগল, জ্ঞানহীন ও বাধ্যকৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে মানত করা বিশুদ্ধ হবে না। কেননা রসূলুল্লাহ বলেন: ..... رفع القلم عن ثلاثة অর্থাৎ তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে...। অন্য হাদীসে তিনি বলেন: إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَنْ الخطأ নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলগুলো এড়িয়ে গেছেন....।" এ দুটি হাদীস একাধিবার আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. মানতের শব্দবলী: মানতের বাক্যরূপ ও শব্দাবলির অন্যতম হচ্ছে কোনো ব্যক্তি বলবে- আল্লাহর শপথ! আমার উপর এ কাজটি করা আবশ্যক। অথবা আমি এরূপ মানত আবশ্যক করলাম। এ জাতীয় আরও বিভিন্ন শব্দাবলী, যাতে মানতের কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
📄 মানতের প্রকারভেদ
১. বিশুদ্ধ মানত এবং অশুদ্ধ মানত: মানত বিশুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার দিক থেকে দুই প্রকার: বিশুদ্ধ মানত, অশুদ্ধ মানت। অথবা জায়েয মানত ও নিষিদ্ধ মানত। অথবা সংঘটিত মানত ও অসংঘটিত মানত।
অতএব, মানতটি তখন বিশুদ্ধ, সংঘটিত ও পূর্ণ করা আবশ্যক হবে, যখন তা আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্যের ক্ষেত্রে হবে, যার মাধ্যমে মানতকারী আল্লাহর নৈকট্য অর্জন উদ্দেশ্য করবে। আবার মানতটি অশুদ্ধ, অসংঘটিত ও পূর্ণ করা আনাবশ্যক হবে, যদি তা আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে হয়। যেমন, কোনো ব্যক্তি কবর, ওলী-আউলিয়া বা নাবীগণের নামে মানত করল, অথবা কাউকে হত্যা করা, মদ পান করা বা এ জাতীয় অন্য পাপকাজের মানত করল, তাহলে এ মানত সংঘটিত হবে না। আর তা পূর্ণ করা হারাম হবে।
২. النذر المطلق والمقيد বা শর্তমুক্ত ও শর্তযুক্ত মানত:
النذر المطلق বা শর্তমুক্ত মানত: কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে প্রাথমিকভাবে শর্ত ছাড়া মানত করবে; হতে পারে সেটা কোনো নিয়ামত পেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অথবা কোনো কারণ
ছাড়াই। যেমন কোনো ব্যক্তি বলবে, 'আমি অবশ্যই আল্লাহর উদ্দেশ্যে এত রাকাআত সালাত আদায় করব বা এতদিন সিয়াম পালন করব।' সুতরাং এটা পূর্ণ করা তার উপর ওয়াজিব।
খ. النذر المطلق বা শর্তযুক্ত মানত: যা নির্দিষ্ট কোনো শর্ত বা কোনো কিছু অর্জন করার সাথে শর্তযুক্ত। যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, যদি আল্লাহ আমাকে সুস্থ করে দেন অথবা আমার নিরুদ্দেশ ছেলে/মেয়ে/স্বজন যদি ফিরে আসে, তাহলে আমি এটা করব। এরূপ মানতের শর্ত পূর্ণ হলে এবং উদ্দিষ্ট বস্তু পেয়ে গেলে সেই মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।
📄 মানতের শ্রেণিভেদ ও তার হুকুমসমূহ
হুকুম কার্যকর হওয়া এবং পূর্ণ করা বা না কার দিকে থেকে মানত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:
১. النذر المطلق বা শর্তমুক্ত মানত: যেমন কোনো ব্যক্তি বলবে: আমি মানত করলাম। কিন্তু সে নির্দিষ্ট কোনো কাজের কথা বলল না, তাহলে তার জন্য শপথের কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব। চাই সে মানতটি শর্তমুক্ত হোক বা শর্তযুক্ত হোক। 'উক্ববাহ বিন আমের এর হাদীসে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: كَفَّارَةُ النَّذْرِ إِذَا لَمْ يُسَمَّ كَفَّارَةٌ يَمِينٍ "নির্দিষ্ট কাজের কথা না বলে মানত করলেও তার উপর শপথ ভঙ্গের কাফফারা বর্তাবে।"
২. نذر اللجاج والغضب বা জেদ ও ক্রোধবশত মানত: এ মানতটি সংযুক্ত থাকবে একটি শর্তের সাথে, যে শর্তটি দ্বারা কোনো কাজ হতে বাধা প্রদান করা বা কাজটি করার উপর উৎসাহিত করা বা কোনো বিষয়কে সত্যায়িত বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা উদ্দেশ্য হবে। যেমন কোনো ব্যক্তি বলল: আমি যদি তোমার সাথে কথা বলি, অথবা তোমাকে সংবাদ না জানাই, অথবা এ সংবাদটি যদি সঠিক না হয় অথবা যদি মিথ্যা হয়, তাহলে আমি হাজ্জ পালন করব বা দাস মুক্ত করব। এই মানত অন্যকে কোনো কাজ করতে উৎসাহ প্রদান করা অথবা নিষেধ করার ক্ষেত্রে শপথের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এর দ্বারা মানত বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্য নেওয়া হয়নি। সুতরাং, এ ক্ষেত্রে ঐ লোকটির এখতিয়ার বা স্বাধীনতা রয়েছে, সে যা মানত করেছে, তা করবে অথবা শপথ ভেঙ্গে কাফফারা দিয়ে দিবে। রসূলুল্লাহ বলেছেন: كَفَّارَةُ النَّذْرِ كَفَّارَةُ الْيَمِينِ “মানতের কাফফারা শপথ ভঙ্গের কাফফারার মতোই।”
৩. النذر المباح বা সাধারণ বৈধ মানত: এটা হলো কোনো বৈধ কাজ করার মানত করা। যেমন কোনো একটি কাপড় পরিধানের বা প্রাণির উপর আরোহণ ইত্যাদি কাজ করার মানত করা। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এর মতে, এই প্রকার মানতকারীর উপর মানত পূর্ণ করা বা কাফফারা আদায় করা কোনোটিই আবশ্যক নয়। কেননা এ ব্যাপারে ইবনু আব্বাস এর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় দেখলেন যে, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। তখন তিনি তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সাহাবীগণ বললেন: এ হলো আবু ইসরাইল। সে সূর্যের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকবে, ছায়া গ্রহণ করবে না, কারো সাথে কথা বলবে না এবং সিয়াম পালন করবে মর্মে মানত করেছে। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
مُرْهُ فَلْيَتَكَلَّمْ وَلْيَسْتَظِلَّ وَلْيَقْهُ وَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ
"তুমি তাকে আদেশ দাও! সে যেন কথা বলে, ছায়া গ্রহণ করে, বসে এবং তার সওমকে পূর্ণ করে।"
৪. نذر المعصية বা পাপ কাজের মানত: তা হলো কোনো পাপ কাজের মানত করা। যেমন মদপানের মানত করা, কবরের উদ্দেশ্যে মানত করা, কবরে শায়িত মৃত ব্যক্তিদের জন্য মানত করা, হায়েযের দিনগুলোতে সিয়াম পালন করা বা কুরবানির দিন সিয়াম রাখার মানত করা। এ জাতীয় মানত কার্যকর হবে না। ফলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হবে না। আয়িশাহ-এর হাদীস। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَ اللَّهُ فَلَا يَعْصِهِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করার মানত করবে, সে যেন তার নাফরমানী না করে।" কেননা আল্লাহর নাফরমানী করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয় এবং তার জন্য কোনো কাফফারা আবশ্যক হবে না।
৫. نذر التبرر বা ভালো কাজের মানত করা: তা হলো আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়ে মানত করা। যেমন সালাত, সিয়াম বা হজ্জ পালনের মানত করা। চাই তা শর্তবিহীন হোক বা কোনো কিছু অর্জিত হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত হোক। যদি তা শর্তবিহীন হয়, তবে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। আর যদি শর্তযুক্ত হয়, তবে শর্ত পূর্ণ হলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। কারণ আয়িশাহ এর হাদীসে এসেছে, নাবী বলেন:
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ
"যে ব্যক্তি মানত করে যে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে।”
টিকাঃ
৯৫৬ তিরমিযী, হা. ১৫২৮ এবং তিনি হাসান সহীহ গরীব বলেছেন; অন্যান্যরা যঈফ বলেছেন। তবে সুনান আবু দাউদে ইবনু আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত হাদীস একে শক্তিশালী করে, হা. ৩৩২২; ইমামগণ একেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং একে মাওকুফ বলেছেন। দেখুন, সুবুলুস সালাম ৮/৪২।
৯৫৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৪১৬৪, ফুআ. ১৬৪৫।
৯৫৮ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৬৯২।
৯৫৯ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৬৯৬।
৯৬০ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৬৯৬।