📄 الردة এর পরিচয়, তার শর্তসমূহ এবং ধর্মত্যাগীর বিধান
১. الردة বা ধর্মত্যাগের পরিচয়: الردة এর শাব্দিক অর্থ: কোনো কিছু থেকে ফিরে আসা। এ থেকেই ইসলাম গ্রহণের পর ফিরে যাওয়া অর্থ নেওয়া হয়েছে।
الكفر بعد الإسلام طوعاً بنطق، أو اعتقاد، أو شك، أو فعل : পরিভাষায়:
ইসলাম গ্রহণের পর স্বেচ্ছায় কোনো কথা, বিশ্বাস, সন্দেহ অথবা কর্মের মাধ্যমে কুফরী করা (কাফের হওয়া)।
২. তার শর্তসমূহ: জ্ঞানবান হওয়া, ভালোমন্দ পার্থক্য করতে সক্ষম হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি করা।
সুতরাং পাগল, নাবালক যে ভালো মন্দ পার্থক্য করতে পারে না অথবা ধর্মত্যাগ বাধ্য করা হয়েছে এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে যদি কাজটি ঘটে থাকে, তবে তাদের উপর কোনো প্রকার শাস্তি নেই।
৩. মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীর বিধান: দুনিয়াতে ধর্মত্যাগীর বিধান হচ্ছে তাদেরকে হত্যা করতে হবে। নাবী ﷺ বলেন: مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ :
"যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করবে, তাকে তোমরা হত্যা করো।" তবে এক্ষেত্রে উচিত হচ্ছে, হত্যা করার পূর্বে তাকে তাওবা করতে বলা, ইসলামের দিকে ফিরে আসার আহ্বান করতে বয়কট করা এবং তিন দিন বন্দী করে রাখা। যদি তাওবা করে, তাহলে কোনো শাস্তি নেই, আর না করলে হত্যা করতে হবে।
একজন ইহুদি ইসলাম গ্রহণের পর মুরতাদ হয়েছিল। তার ব্যপারে হাদীসে আছে যে, আবু মুসা আনহু কে মুয়াজ বলেন, আ
لَا أُنْزِلُ عَنْ دَابَّتِي حَتَّى يُقْتَلَ، فَقُتِلَ
"তুমি তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি বাহন থেকে নামব না। অতঃপর তাকে হত্যা করা হয়।” وفي رواية : وَكَانَ قَدْ اسْتُتِيبَ قَبْلَ ذَلِكَ অন্য বর্ণনায় রয়েছে: "হত্যা করার পূর্বে তাকে তাওবা করতে বলা হয়েছিল।"
একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়েছিল। অতঃপর তাকে তাওবা চাওয়ার পূর্বেই তার গর্দান কর্তন করা হয়েছিল। উক্ত সংবাদ উমার নিকট পৌঁছালে তিনি বলেন:
فَهَلَّا حَبَسْتُمُوهُ ثَلَاثًا، وَأَطْعَمْتُمُوهُ كُلَّ يَوْمٍ رَغِيفًا، وَاسْتَبْتُمُوهُ لَعَلَّهُ يَتُوبُ وَيُرَاجِعُ أَمْرَ اللَّهِ اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ أَحْفُرْ، وَلَمْ أَرْضَ إِذْ بَلَغَنِي
"কেন তোমরা তাকে তিন দিন বন্দী করে রাখলে না? তোমরা তাকে প্রতিদিন পাতলা রুটি খেতে দিতে এবং তোমরা তাওবা করতে বলতে, হয়তো সে তাওবা করে আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসত! 'হে আল্লাহ আমি আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না আর আমার কাছে সংবাদ আসার পর আমি খুশীও হইনি। "
তার হত্যার বিষয়টি বিচারক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত কেউ বাস্তবায়ন করবেন। কারণ এটি আল্লাহর অধিকার। সুতরাং তা বিচারকের নিকট সমর্পণ কতে হবে।
ভালো মন্দ পার্থক্য করতে সক্ষম শিশুকে হত্যা করা যাবে না, যদিও তার ধর্মত্যাগের বিষয়টি সঠিক হয়ে থাকে, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হবে।
আখিরাতে ধর্মত্যাগের বিধান: আল্লাহ তা'আলা এই বিষয় বর্ণনা করে বলেন:
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَبِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَبِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম (ইসলাম) ত্যাগ করে ফিরে যাবে (বের হয়ে যাবে) এবং কাফের অবস্থায় মারা যাবে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের আমলসমূহ বৃথা হয়ে যাবে। আর এরাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী থাকবে।” [সূরা বাক্বারাহ: ২১৭]
টিকা:
৯৩৭ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৫২৪।
৯৩৮ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৩৫৫; ইবনে হাজার শক্তিশালী বলেছেন, ফাতহুল বারী ১২/২৮৭।
৯৩৯ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৩৫৫; ইবনে হাজার শক্তিশালী বলেছেন, ফাতহুল বারী ১২/২৮৭।
৯৪০ মুয়াত্তা মালেক ২/৭৩৭, নং ১৬।
📄 ধর্মত্যাগ সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়সমূহ
ভাবগাম্ভীর্য অথবা রসিকতা অথবা বিদ্রূপের ছলে ধর্মত্যাগ সাব্যস্ত হয় এমন কোনো কাজ করলে ধর্মত্যাগ সাব্যস্ত হবে। সকল ধরনের শিরকী কাজে জড়িয়ে যাওয়া, সলাত অথবা ইসলামের অন্যান্য রুকন অস্বীকার করা, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলকে গালি দেওয়া, সম্পূর্ণ কুরআন অথবা তার কিয়দাংশ অস্বীকার করা, সীমালংঘনকারী সুফীদের ন্যায় এই বিশ্বাস করা যে, কিছু কিছু মানুষের জন্য মুহাম্মাদ এর শরীয়ত থেকে বের হওয়া জায়েয। অনুরূপ মুশরিকদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করা। এ ছাড়াও মুরতাদ হওয়ার আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যা ইসলাম ভঙ্গের কারণসমূহের কোনো একটি কারণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়। তার মধ্য হতে: ইসলামী শরীয়ত যা নিয়ে এসেছে তার থেকে দুনিয়ার বিচার-ফয়সালাকে অধিক উপযুক্ত মনে করা বা এর সমান মনে করে বিচারকার্য পরিচালনা করা।
এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, যে সমস্ত কাজের মাধ্যমে মানুষ মুরতাদ হয়ে যায় তা কয়েকটি জিনিসের মাঝে সীমাবদ্ধ। সেগুলো হলো:
১. কথার মাধ্যমে: যেমন আল্লাহ তা'আলা, তার রসূল বা তার ফেরেশতাগণকে গালি দেওয়া অথবা নবুয়ত বা অদৃশ্যের জ্ঞানের দাবি করে। তেমনিভাবে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করা।
২. কাজের মাধ্যমে: যেমন মূর্তি বা কবরকে সাজদাহ করা। অথবা কুরআন ছুড়ে ফেলা বা ইচ্ছা করে কুরআনকে অপমান করা। অথবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাহায্য করা ইত্যাদি।
৩. বিশ্বাসের মাধ্যমে: যেমন আল্লাহর সাথে অন্য কেউ শরীক আছে, অথবা তার স্ত্রী-সন্তান আছে এমন বিশ্বাস করা। অথবা ব্যভিচার করা বা মদ খাওয়া বৈধ, বা নাবী ছাড়া অন্য কারো পদর্শিত জীবনব্যবস্থা অধিক বেশি পরিপূর্ণ এমন বিশ্বাস রাখা।
৪. সন্দেহের মাধ্যমে: যেমন যে বিষয়টি হালাল হিসেবে সকলে ঐকমত্য পোষণ করেন সেটাকে হারাম বলে সন্দেহ করা। বা যে বিষয়টি হারাম হিসেবে সকলে ঐকমত্য পোষণ করেন সেটাকে হালাল হিসেবে সন্দেহ করা। এ উদাহরণটি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি মুসলিমদের মাঝে বেড়ে উঠেছে, ফলে তার সে বিষয়টি অজানা নয়।
📄 ধর্মত্যাগী হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত বিধিবিধান
১. যে ব্যক্তি বাধ্য হয়ে মুরতাদ হওয়ার শব্দ উচ্চারণ করে, তাকে মুরতাদ বলে হুকুম দেওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌ بِالْإِيمَانِ “তবে যে ব্যক্তিকে বাধ্য করা হয়েছে, অথচ তার অন্তর ঈমানের উপর স্থির থাকে।” [সূরা নাহল: ১০৬]
২. মুরতাদকে তিন দিন তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে। সে তাওবা করলে ভালো, নয়তো তাকে হত্যা করতে হবে। আর তাকে হত্যা করার বিষয়টি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল বা স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির উপর বর্তাবে।
৩. মুরতাদকে তার মাল লেনদেন করা থেকে বাধা প্রদান করা হবে। অতঃপর যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার সম্পদ তাকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে। আর সে যদি মুরতাদ অবস্থায় মারা যায় বা তাকে শাস্তি স্বরূপ হত্যা করা হয়, তাহলে তার সম্পদ মুসলিমদের বায়তুল মালে (কোষাগারে) মালে ফায় হিসেবে জমা হবে। কেননা তার কোনো ওয়ারিস নেই। কারণ মুসলিম ব্যক্তি কাফেরের ওয়ারিস হবে না এবং কাফের ব্যক্তি মুমিনের ওয়ারিস হতে পারবে না। কেননা মুরতাদ অবস্থায় তাকে (সম্পদ ব্যবহারের) অনুমতি দেওয়া হয় না।
৪. মুরতাদকে গোসল দেওয়া হবে না, তার জানাযার সলাত আদায় করা হবে না এবং তাকে মুসলিমদের কবরস্থানেও দাফন করা যাবে না, যদি তাকে ধর্মত্যাগের কারণে হত্যা করা হয়।
৫. দুই শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে মুরতাদ ব্যক্তির তাওবা গ্রহণ করা হবে। কারণ আল্লাহর রসূল হাদীসে বলেন:
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا : لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ، فَإِذَا قَالُوهَا عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا
"আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা বলে: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই)। অতএব তারা যখন এটা বলবে, তখন তারা তাদের রক্ত ও সম্পদকে আমার থেকে বাঁচিয়ে নিবে। তবে তার (কালিমার) হক বাকি থাকবে।"
আর যে ব্যক্তি দ্বীনের কোনো বিষয়কে অস্বীকার করার কারণে মুরতাদ হয়ে যাবে, তার তাওবার জন্য শাহাদাতের সাথে দুটি বিষয় স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রথমতঃ দ্বীনের যে বিষয়টি অস্বীকার করেছিল, তার স্বীকৃতি দিবে। দ্বিতীয়তঃ সে যা কুফরী করেছিল, তা থেকে ফিরে আসবে।
টিকা:
৯৪১ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ২১।