📄 শিক্ষামূলক শাস্তির পরিচয়, তার বিধান এবং এর উপকারিতা
১. শিক্ষামূলক শাস্তির পরিচয়: التعزير এর শাব্দিক অর্থ: المنع والرد বা নিষেধ করা, বাধা দেওয়া। এবং তা সম্মানের সাথে সাহায্য করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَكِّرُوهُ "তোমরা তাকে সাহায্য সম্মান করো।” [সূরা ফাতহ : ৯]
এই বিষয়টি শত্রুকে অনিষ্ট থেকে বাঁধা প্রদান করে।
কখনো কখনো التعزير শব্দটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়ে থাকে عزره যার অর্থ হচ্ছে, তাকে পাপ কাজে পতিত হওয়ার কারণে শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ অর্থে এটি আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী الأضداد বা একই মৌলের বিপরীত অর্থবোধক শব্দ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু এই মৌলের মূল অর্থ বাধা দেওয়া। পারিভাষিক অর্থ:
التأديب في كل معصية لا حد فيها ولا كفارة "ঐ সমস্ত অপরাধের জন্য শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়া যে অপরাধে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কোনো শাস্তি এবং কাফফারা নেই।”
২. শিক্ষামূলক শাস্তির বিধান: ইমাম প্রয়োজন মনে করলে, শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কোনো শাস্তি ও কাফফারা নেই, এমন পাপ কাজে জড়িত ব্যক্তিকে শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়া আবশ্যক; যাতে হারাম কাজ করা হয় ও ওয়াজিব বর্জন করা হয়। আবু বুরদাহ ইবনে নাইয়ার হতে বর্ণিত হাদীস। নাবী বলেন: لا يُجْلَدُ فَوْقَ عَشْرِ جَلَدَاتٍ إِلَّا فِي حَدٌ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ
"আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শাস্তিসমূহ ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের শাস্তি ১০ বেত্রাঘাত এর বেশি নেই।"
নাবী অনুমানের ভিত্তিতে আটক করেছিলেন।
উমার দেশান্তর, মাথা মুণ্ডন বা এরকম কিছুর মাধ্যমে শিক্ষামূলক শাস্তি দিতেন। এই শিক্ষামূলক শাস্তির বিষয়টি বিচারক বা তার স্থলাভিষিক্ত যে থাকবে তার অধীন হবে। যখন শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়ার মধ্যে উপকার দেখবে, তখন শাস্তি দিবে। আর তা পরিত্যাগ করার মধ্যে উপকার দেখলে, পরিত্যাগ করবে।
৩. শিক্ষামূলক শাস্তি শরীয়ত সম্মত হওয়ার পেছনে হিকমাহ: সমাজকে অন্যায়, বিশৃঙ্খলামূলক কাজ থেকে রক্ষা, অন্যায়কে প্রতিহত করা, অপরাধীদের ধমক ও শিষ্টাচার শিক্ষা স্বরূপ শিক্ষামূলক শাস্তি শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে।
টিকাঃ
৯৩২ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৪৮, ৬৮৪৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৭০৮।
৯৩৩ তিরমিযী হা. ১৪৫০; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৬৩০; ইমাম আলবানী হাসান বলেছেন, সহীহুত তিরমিযী নং ১১৪৫।
📄 ঐ সমস্ত অপরাধের প্রকারসমূহ যার ব্যাপারে শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়া আবশ্যক হয়
যে সমস্ত অপরাধের জন্য শিক্ষামূলক শাস্তি আবশ্যক তা দুই প্রকার:
১. শরীয়ত কর্তৃক ওয়াজিব কাজ বাস্তবায়নে সক্ষম হওয়া সত্বেও ছেড়ে দেওয়া। যেমন ঋণ পরিশোধ করা, আমানত রক্ষা করা ও ইয়াতীমদের মাল বুঝিয়ে দেওয়া। সুতরাং এই সমস্ত বিষয় বা অনুরূপ কিছু বিষয় যা পূর্ণভাবে আদায় না করলে তাকে শাস্তি দিতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আদায় করবে। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেন:
مَثْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ "ধনী ব্যক্তির (ঋণ পরিশোধে) তালবাহানা করা অন্যায়।"
অন্য বর্ণনায় এসেছে, لَيُّ الْوَاجِدِ يُحِلُّ عِرْضَهُ، وَعُقُوبَتَهُ "যে সচ্ছল ব্যক্তি দেনা পরিশোধ করতে গড়িমসি করে, তাকে অপমান ও শাস্তি দেওয়া উভয়ই আমার জন্য হালাল।”
২. হারাম কাজ করা। যেমন একজন ছেলে অপরিচিতা একজন মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান করা বা লজ্জাস্থান ছাড়া তার সাথে অন্যভাবে মেলামেশা করা, চুম্বন করা অথবা তার সাথে মজা করা। আবার এমনও হতে পারে যে, মহিলা-মহিলা সমকামিতা করা। সুতরাং এরকম বা অনুরূপ কাজের জন্য শিক্ষামূলক শাস্তি রয়েছে। কারণ এসকল বিষয়কে কেন্দ্র করে শরীয়তে কোনো নির্ধারিত শাস্তির বিধান আসেনি।
টিকাঃ
৯৩৪ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৪০০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৬৩।
৯৩৫ সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৬২৮; নাসাঈ ৭/৩১৬; ইবনু মাজাহ, হা. ২৪২৭; ইমাম আলবানী হাসান বলেছেন, দেখুন, সহীহ সুনানুন নাসাঈ, নং ৪৩৭২, ৪৩৭৩। - গড়িমসি করা।
📄 তা'ঝীর বা শিক্ষামূলক শাস্তির পরিমাণ
শিক্ষামূলক শাস্তির পরিমাণের ক্ষেত্রে শরীয়তে কোনো নির্ধারিত সীমা নেই। বিচারকের পর্যালোচনা ও তার দৃষ্টিতে কাজটির জন্য উপযুক্ত শাস্তিবিধি-ই সে অপরাধের শিক্ষামূলক শাস্তি। এমনকি কোনো কোনো আলেম মনে করেন যে, মাসলাহাত বা কল্যাণকর দিক লক্ষ্য করে, কখনো কখনো মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে তা'যীর বাস্তবায়ন করা হবে। যেমন- মুসলিম গুপ্তচর, মুসলিম সমাজের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টিকারী কিংবা এই ধরনের মানুষদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া, যাদের অনিষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র পথই এটি।
📄 শিক্ষামূলক শাস্তির প্রকারসমুহ
শিক্ষামূলক শাস্তি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করে একে কয়েক ভাগে বিভক্ত করা যায়: ১. দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়: যেমন বেত্রাঘাত ও মৃত্যুদণ্ড। ২. সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়: যেমন- কোনো কিছু নষ্ট করে ফেলা, জরিমানা আদায় করা। উদাহরণ: মূর্তি, অনর্থক বস্তু, বাদ্যযন্ত্র, মদের পাত্র ভেঙ্গে ফেলা। ৩. দেহ ও সম্পদ উভয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়: যেমন- চোর যদি কোনো অরক্ষিত স্থান থেকে চুরি করে, তবে বেত্রাঘাতের পাশাপাশি তাকে দ্বিগুণ জরিমানা করা হবে। গাছের ফল চাতালে নেওয়ার পূর্বেই চুরি করেছিল, এমন এক চোরের ব্যাপারে নাবী ফয়সালা দিয়েছিলেন: তার উপর হদ্দ প্রয়োগ করা হবে এবং সে দ্বিগুণ জরিমানা প্রদান করবে। الجرين অর্থ: খেজুর শুকানোর স্থান। ৪. সীমাবদ্ধতার সাথে সম্পৃক্ত: যেমন- কারাবন্দী ও নির্বাসন। ৫. মানসিক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত: যেমন- তিরস্কার ও ধমক দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিকে মানসিক কষ্টে ফেলা।
টিকা:
১০০ সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৬২৮; নাসাঈ ৭/৩১৬; ইবনু মাজাহ, হা. ২৪২৭; ইমাম আলবানী হাসান বলেছেন, দেখুন, সহীহ সুনানুন নাসাঈ, নং ৪৩৭২, ৪৩৭৩। - গড়িমসি করা।