📄 মদের পরিচয়, তার বিধান এবং তা হারাম হওয়ার হিকমাহ
১. মদের পরিচয়:
الخمر এর শাব্দিক অর্থ: প্রত্যেক ঐ সকল জিনিস যা আকল, জ্ঞান ও বুদ্ধিতে প্রভাব ফেলে, সেটা যে-কোনো বস্তু হোক না কেন।
পরিভাষায়: كل ما أسكر سواء كان عصيراً أو نقيعاً من العنب أو غيره، أو مطبوخاً أو غير مطبوخ. “প্রত্যেক ঐ জিনিস যা নেশাগ্রস্ত করে, চাই তা কোনো প্রকার জুস হোক অথবা আঙ্গুর ফলের রস হোক বা অন্যান্য কিছু হোক; রান্না করা হোক বা না হোক।”
السكر হচ্ছে বুদ্ধি-বিবেক বিকৃতি ঘটা।
المسكر হচ্ছে এমন পানি জাতীয় বস্তু যা তার পানকারীকে পাগল, বিবেকহীন ও মাতাল বানায়। আর السكران হচ্ছে বিবেকবান ব্যক্তির বিপরীত।
২. বিধান: মদ পান করা হারাম। অনুরূপভবে যে পানি জাতীয় বস্তু বিবেককে বিকৃত করে তা হরাম। আর প্রত্যেক বিবেক বিকৃতকারী বস্তুই মদ। সুতরাং মদ পান করা জায়েয নেই। চাই কম হোক বা বেশি হোক। মদ পান করা কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন-সুন্নাহ এবং ওলামাদের ঐকমত্যে মদ হারাম জিনিসের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর বাণী:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মুর্তিপূজার দেবী ও ভাগ্য নির্ণয় করার তীর; এসব ঘৃণার বস্তু, শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলোকে বর্জন করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” [সূরা মায়িদাহ : ৯০]
এখানে বিরত থাকার প্রতি নির্দেশটি হারামের উপর প্রমাণ করে। আয়িশাহ হতে বর্ণিত হাদীস। নাবী বলেন:
كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ
“প্রত্যক ঐ সকল পানীয় দ্রব্য যা জ্ঞানকে বিকৃত করে, তাই হরাম।”
ইবনে উমার থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে,
كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ
“প্রত্যেক নেশাদার দ্রব্য মদ, আর প্রত্যক মদ হারাম।” মদ হারাম এবং তা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে হাদীস এত বেশি যে তা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আর মদ হারাম হওয়ার উপর সকল উম্মত ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
৩. মদ হারাম হওয়ার পিছনে হিকমাহ: আল্লাহ তা'আলা অনেক নিয়ামত দ্বারা মানুষরের উপর অনুগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে একটি অনুগ্রহ হচ্ছে বিবেক বা জ্ঞান। যার মাধ্যমে অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টি থেকে মানুষকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। কিন্তু প্রত্যেক বিবেক বিকৃতকারী বস্তু এমন যে, যার মাধ্যমে মানুষে বিবেক নামক অনুগ্রহ হারিয়ে ফেলে, মুমিনদের মাঝে শত্রুতা ও হিংবা বিদ্বেষ ছড়িয়ে যায় এবং যা (মানুষকে) সলাত, আল্লাহর স্মরণ থেকে বাধা প্রদান করে। আল্লাহ এটা হারাম করেছেন। কারণ এই মদের ক্ষতি অনেক বড়ো এবং তার অনিষ্ট অনেক বেশি। শুধু তাই নয় এটি শয়তানের বাহন, সে মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের জন্য এর উপর আরোহন করে বেড়ায়। আল্লাহর বাণী:
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ
"শয়তান চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরনে ও সলাতে বাঁধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না?" [সূরা মায়িদাহ : ৯১]
টিকাঃ
৯১৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৮৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ২০০১।
৯১৬ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১১৩, ফুআ, ২০০৩-(৭৫)।
📄 মদ পানকারীর জন্য নির্ধারিত শাস্তি, এর শর্তসমূহ এবং কোন বিষয়ের মাধ্যমে শাস্তি সাব্যস্ত হবে?
১. মদ পানকারীর জন্য শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি: মদ পানকারীর জন্য শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি বেত্রাঘাত, যর পরিমাণ হচ্ছে ৪০টি। তবে ৮০ বেত্রাঘাত করা জায়েয আছে, যা কার্যকর হবে বিচারকের ইজতেহাদের উপর। আর এটা তখন যখন মানুষ মদপানে মগ্ন হয়ে যাবে। তখন বিচারক এই বিষয়ে প্রয়োজন অনুসারে অতিরিক্ত বেত্রাঘাত করতে পারে। কেননা চল্লিশটি সীমাবদ্ধ করা হয়নি। ওয়ালিদ ইবনে উকবাহ এর থেকে হাদীস রয়েছে-
جَلَدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْبَعِينَ، وَجَلَدَ أَبُو بَكْرٍ أَرْبَعِينَ، وَعُمَرُ ثَمَانِينَ، وَكُلُّ سُنَّةٌ، وَهَذَا أَحَبُّ إِلَيَّ "নাবী চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন। আবু বকর চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং উমার আশিটি বেত্রাঘাত করেছেন। এই সবগুলোই সুন্নাত এবং এটাই আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। "
আনাস থেকে বর্ণিত।
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَضْرِبُ فِي الْخَمْرِ بِالنِّعَالِ وَالْجَرِيدِ أَرْبَعِينَ "নাবী মদ পান করার ক্ষেত্রে জুতা এবং খেজুরের ডাল দিয়ে ৪০ টি প্রহার করেছেন।”
২. মদ পানের শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে শর্তসমূহ: মাতাল ব্যক্তির ওপর হদ্দ কার্যকর করার জন্য কিছু শর্ত করা হয়েছে: মুসলিম হতে হবে। সুতরাং কাফেরের উপর কোনো প্রকার হদ্দ নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। সুতরাং নাবালকের উপর কোনো প্রকার হদ্দ নেই। জ্ঞানবান হতে হবে। সুতরাং পাগল বা অর্ধ পাগলের উপর কোনো প্রকার হদ্দ নেই। ইচ্ছাকৃতভাবে পান করতে হবে। সুতরাং বাধ্য বা ভুলক্রমে অথবা অনুরূপ কিছুর কারণে পানকারীর ওপর কোনো প্রকার হদ্দ নেই। নাবী এর বক্তব্য এই তিনটি শর্ত উপর প্রমাণ বহন করে। তা হচ্ছে,
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي الْخَطَأً، وَالنَّسْيَانَ، وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া বিষয়গুলো এবং তাদের ওপর যা চাপিয়ে দেওয়া হয় তা ক্ষমা করে দিবেন।"
আল্লাহর রসূল আরও বলেন: ... رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ
"তিন ধরনের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে....।” পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। > মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে অবগত থাকবে। সুতরাং অজ্ঞ, মূর্খ ব্যক্তির উপর কোনো প্রকার হদ্দ নেই। > এই পানীয় দ্রব্য মদ হওয়ার ব্যাপারে অবগত হতে হবে। সুতরাং যদি হালাল পানি মনে করে পান করে তাহলে কোনো হদ্দ নেই।
৩. যে জিনিস এর মাধ্যমে মদ পানের নির্ধারিত শাস্তি সাব্যস্ত হবে: নিম্নের দুটির কোনে একটির মাধ্যমে মদপানের নির্ধারিত শাস্তি সাব্যস্ত হবে: ক. পান করার ব্যাপারে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে। যেমন সে স্বীকার করবে যে সে ইচ্ছাকৃতভাবে পান করেছে। খ. সুস্পষ্ট প্রমাণ এর মাধ্যমে। আর তা হচ্ছে দুইজন মুসলিম ও ন্যায়পরায়ন পুরুষ ব্যক্তির সাক্ষ্য দেওয়া।
টিকাঃ
৯১৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৪৯, ফুআ. ১৭০৭।
৯১৮ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৪৪, ফুআ. ১৭০৬।
৯১৯ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৩৯৯; ৪৪০১; ৪৪০২।
📄 সমসাময়িক ক্ষতিকারক দ্রব্য বা সিগারেট এবং তার দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার বিধান
১. মদ ছাড়াও সমসাময়িক ক্ষতিকর দ্রব্য: এখানে ক্ষতিকারক বস্তু দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল জিনিস যা বুদ্ধি, বিবেক, জ্ঞানকে আবৃত করে নেয়। যে এগুলো গ্রহণ করে তাকে অলসতা, শরীর ভারী ভারী মনে হওয়া, শৈথিল্য ভাব পেয়ে বসে। যেমন- এনেস্থেটিক, আফিম, একপ্রকার পাতা জাতীয় উপাদান বিশেষ ইত্যাদি। সুতরাং এতে যে ব্যক্তি অভ্যস্ত হোক না কেন, তা হারাম। আয়িশাহ এর হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেন: كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ “প্রত্যেক পানীয় দ্রব্য যা বিবেককে বিকৃত করে সেটাই হারাম।"
উমার এর আরেকটি হাদীস নাবী বলেন: كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ "প্রত্যেক নেশাদার দ্রব্য মদ, আর প্রত্যক মদ হারাম। "
এ সমস্ত ক্ষতিকারক দ্রব্য (সিগারেট) এর ক্ষতি অনেক জটিল ও কঠিন। এমনকি এর মাধ্যমে ব্যাপক গোলযোগ, উম্মতের যুবকদের ধ্বংস, তাদের প্রতিপালকের আনুগত্য থেকে এবং তাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ করা থেকে অন্যমনষ্ক হওয়া সহ দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে অনেক বড়ো ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে।
২. এই সমস্ত ক্ষতিকারক দ্রব্যর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করার বিধান: মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর রসূল থেকে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। জাবির নাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, নাবী বলেন: إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالمَيْتَةَ، وَالْخِنْزِيرَ، وَالْأَصْنَامَ "আল্লাহ তা'আলা মদ, মৃত জানোয়ার এবং প্রতিমা হারাম করেছেন।” নাবী আরও বলেন: إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ "আল্লাহ যখন কোনো কিছু হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেন।”
এ কারণে আলেমগণ বলেন, আল্লাহ তা'আলা যে জিনিসের মাধ্যমে উপকার লাভ করা হারাম করেছেন, তা ক্রয়-বিক্রয় করা এবং তার মূল্য খাওয়া হারাম। তাই মদের ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে একে ক্ষতিকারক দ্রব্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং এগুলো ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয নেই এবং এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদও হারাম হবে।
টিকাঃ
৯২০ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৫৮৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ২০০১।
৯২১ সহীহ মুসলিম, হা. ৫১১৩, ফুআ. ২০০৩।
৯২২ সহীহ মুসলিম, হা. ৩৯৪০, ফুআ. ১৫৮১।
৯২৩ সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৮৮; আহমাদ ১/২৪২।