📄 القسامة এর পরিচয়, হুকুম ও তা প্রণয়নের তাৎপর্য
১. القسامة এর পরিচয়: শাব্দিক অর্থ: আরবদের কথা أَقْسَمَ يُقْسِمُ إِقْسَامًا وقسامة থেকে নেওয়া হয়েছে। অর্থ সে সুদৃঢ়ভাবে কসম করেছে।
هي الأيمان المكررة في دعوى القتيل المعصوم : "নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার দাবির ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি শপথ করা।” قسامة (ক্বসামাহ) নামে নামকরণ: শপথগুলো মৃত ব্যক্তির অভিভাবকদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়। ফলে তারা পঞ্চাশবার শপথ করে বলে যে, দাবিকৃত ব্যক্তিই তাদের লোককে হত্যা করেছে।
এটার পদ্ধতি: একজন নিহত ব্যক্তিকে পাওয়া গেল, কিন্তু তাকে কে হত্যা করেছে সেটা জানা গেল না। তখন একদল লোক কসম করবে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যে ব্যক্তি/যারা তাকে হত্যা করার সম্ভাবনা রাখে। এটা তখন হবে যখন আগত শর্তগুলো পূর্ণ হবে।
২. কুসামার বৈধতা: قسامة (কুসামাহ) শরীয়তসম্মত। এর মাধ্যমে কিসাস ও দিয়াত সাব্যস্ত হবে। যখন দাবিীর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ ও স্বীকৃত পাওয়া না যাবে। সেই সাথে যখন اللوث (লাউছ) পাওয়া যাবে। অর্থাৎ হত্যাকৃত ব্যক্তি ও যাকে হত্যাকারী সব্যেস্ত করা হচ্ছে তাদের মাঝে যখন প্রকাশ্য শত্রুতা থাকবে। যেমন কোনো গোত্র অন্য কোনো গোত্রের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাচ্ছে। তবে এটাও বলা হয়েছে যে, এটা শুধুমাত্র এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নয়, বরং দাবির স্বপক্ষে সম্ভাবনাময় যতগুলো প্রমাণ পাওয়া যাবে, সবগুলোই এটার অন্তর্ভুক্ত হবে।
শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: সাহল বিন আবী হাছমাহ -এর হাদীস।
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَهْلٍ وَمُحَيَّصَةً خَرَجَا إِلَى خَيْبَرَ مِنْ جَهْدٍ أَصَابَهُمْ فَأُتِيَ مُحَيَّصَةٌ فَأُخْبِرَ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ سَهْلِ قَدْ قُتِلَ وَطُرِحَ فِي فَقِيرٍ أَوْ عَيْنٍ فَأَتَى يَهُودَ فَقَالَ : أَنْتُمْ وَاللَّهِ قَتَلْتُمُوهُ ، قَالُوا : وَاللَّهِ مَا قَتَلْنَاهُ ، ثُمَّ أَقْبَلَ حَتَّى قَدِمَ عَلَى قَوْمِهِ فَذَكَرَ لَهُمْ ذَلِكَ ، ثُمَّ أَقْبَلَ هُوَ وَأَخُوهُ حُوَيْصَةُ - وَهُوَ أَكْبَرُ مِنْهُ - وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَهْلٍ . ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لِحُوَيْصَةً وَمُحَيَّصَةً وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ : أَتَحْلِفُونَ وَتَسْتَحِقُّونَ دَمَ صَاحِبِكُمْ؟ وفي رواية: تَأْتُونَ بِالْبَيِّنَةِ. قَالُوا : مَا لَنَا بَيِّنَةٌ. فَقَالَ : أَتَحْلِفُونَ؟ قَالُوا : وَكَيْفَ نَحْلِفُ وَلَمْ نَشْهَدْ وَلَمْ تَرَ؟ قَالَ : فَتَخْلِفُ لَكُمْ يَهُودُ؟ قَالُوا : لَيْسُوا بِمُسْلِمِينَ، فَوَادَاهُ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عِنْدِهِ، فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَةَ نَاقَةٍ حَتَّى أُدْخِلَتْ عَلَيْهِمِ الدَّارَ، فَقَالَ سَهْلٌ : فَلَقَدْ رَكَضَتْنِي مِنْهَا نَاقَةٌ حَمْرَاءُ.
"আব্দুল্লাহ বিন সাহল ও মুহাইস্বাহ বিন মাসউদ দুর্ভিক্ষে খায়বারে যান। অতঃপর মুহাইয়াসা তাদের নিকট ফিরে এসে সংবাদ দিলো যে, আব্দুল্লাহ ইবনু সাহল -কে হত্যা করে গর্তে বা কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তখন তিনি ইহুদিদের কাছে এসে বললেন যে, আল্লাহর শপথ! তোমরাই তাকে হত্যা করেছ। তখন তারা বলল: আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে হত্যা করিনি। এরপর নিজের গোত্রের নিকট এসে সে ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। পরিশেষে তিনি ও তার বড়ো ভাই হুয়াইসাহ ও আব্দুর রহমান ইবনে সাহল নাবী এর নিকট আগমন করলেন।.... অতঃপর আল্লাহর রসূল হুয়াইসাহ, মুহাইসাহ ও আব্দুর রহমানকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা কি শপথ করবে এবং তোমাদের সাথীর রক্তপণ আদায়ের হকদার হবে?
অন্য বর্ণনায় রয়েছে: তোমরা প্রমাণ নিয়ে আসো। তারা বললেন: আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বললেন: তবে কি তোমরা শপথ করবে? তখন তারা বলল: আমরা কীভাবে শপথ করব? অথচ আমরা উপস্থিত ছিলাম না এবং প্রত্যক্ষও করিনি? তিনি বললেন: তবে ইহুদিরা তোমাদের বিরুদ্ধে শপথ করবে? তখন তারা বলল: তারা তো মুসলিম নয়। তখন আল্লাহর রসূল তার নিজের পক্ষ থেকে রক্তপণ আদায় করে দিলেন। রাসুল তাদের একশত উটনী প্রদান করেন এবং ঐগুলো তাদের বাড়িতে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয়। সাহল বলেন: ঐগুলোর মধ্য হতে একটি লাল উটনী আমাকে পদাঘাত করেছিল।
অত্র হাদীসটি ক্বাসামাহ (القسامة) শরীয়ত সম্মত হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। আর এটা ইসলামের মূলনীতিগুলোর অন্যতম একটি স্বতন্ত্র মূলনীতি।
৩. কুসামার হিকমাহ বা তাৎপর্য:
রক্ত সংরক্ষণ এবং রক্তমূল্য যাতে বৃথা না যায় সেই উদ্দেশ্যে ক্বাসামার বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। কারণ ইসলামী শরীয়ত মানবজীবন সংরক্ষণ ও অবৈধ রক্তপাত বন্ধের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। যখন হত্যাকাণ্ড অধিকহারে সংঘটিত হয়, তখন সাক্ষীর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে খুব কম থাকে। কারণ হত্যাকারী সর্বদা নির্জনস্থানে হত্যা করার সুযোগ খোঁজে। আর এ কারণেই ক্বাসামার বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে করে রক্ত সংরক্ষণ করা যায়।
টিকাঃ
৮৯৩ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৯৮, ৬৮৯৯, ৭১৯২; সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৩৪-৪২৪১, ফুআ, ১৬৬৯।
📄 ক্বাসামার শর্তসমূহ
১. এ ক্ষেত্রে لوث বিদ্যামান থাকতে হবে অর্থাৎ নিহত ব্যক্তি ও হত্যায় অভিযুক্ত উভয় ব্যক্তির মাঝে প্রকাশ্য শত্রুতা থাকতে হবে। পূর্বে এর অর্থ আলোচনা হয়েছে।
২. হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শরীয়ত কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে হবে। অতএব শিশু ও পাগলকে হত্যার অভিযুক্ত করা সঠিক হবে না।
৩. তেমনিভাবে অভিযুক্তকারী ব্যক্তিকেও শরীয়ত কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে হবে। অতএব শিশু ও পাগলেল অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।
৪. হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট থাকবে হবে। অতএব, অনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার দাবি গ্রহনযোগ্য হবে না।
৫. হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। অতএব ব্যক্তি যদি ঘটনার স্থান হতে দূরে থাকার কারণে তাকে হত্যা করা সম্ভব না হয়, তবে এ দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না।
৬. অভিযোগকারী ব্যক্তির দাবি পরস্পর বিরোধী হবে না।
৭. ক্বাসামার দাবি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত হতে হবে। সুতরাং এভাবে বলতে হবে যে, এ ব্যক্তি আমার অভিভাবক/আত্মীয়-স্বজন অমুক বিন অমুককে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুল করে হত্যা করেছে এবং হত্যা করার পদ্ধতি সে বর্ণনা করবে।
📄 ক্বাসামার পদ্ধতি
যখন ক্বাসামার শর্তগুলো পূরণ হয়ে যাবে তখন প্রথমে হত্যার অভিযোগকারীদেরকে ডাকা হবে, পঞ্চাশ বার শপথ করতে বলা হবে। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারের স্তর অনুযায়ী তাদের মাঝে এই ৫০টি শপথ বণ্টন করে দেওয়া হবে। শপথ করে বলবে যে, উমুক ব্যক্তিই তাকে হত্যা করেছে। আর এটা হবে হত্যার অভিযুক্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে। পূর্ববর্তী ইবনু আবী হাছমার হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেছেন: أَفَتَسْتَحِقُونَ الدِّيَةَ بِأَيْمَانِ خَمْسِينَ مِنْكُمْ : 1 10 MIC WERE
“তোমরা পঞ্চাশ বার শপথ করে রক্তপণ আদায়ের হকদার হবে কী?” মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসরা যদি শপথ করতে অথবা পঞ্চাশ বার শপথ পূর্ণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পঞ্চাশ বার শপথ করতে বলা হবে; যদি অভিযুক্তকারীরা এতে সন্তুষ্ট থাকে। পূর্ববর্তী হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেছেন: فَتَحْلِفُ لَكُمْ يَهُودُ؟ قَالُوا : لَيْسُوا بِمُسْلِمِينَ
"তবে ইহুদিরা তোমাদের বিরুদ্ধে শপথ করবে কী? তারা বলল: তারা তো মুসলিম নয়।” তারা তাদের শপথে সন্তুষ্ট ছিল না। তবে তারা যদি শপথ করে তবে তারা মুক্তপণ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি অভিযুক্তকারীরা শপথে সন্তুষ্ট না থাকে তবে রাষ্ট্রের নেতা বায়তুল মাল হতে তার রক্তপন পরিশোধ করবেন যেমনটি আল্লাহর রসূল করেছেন। আনসারীরা ইহুদিদের শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি রায়তুল মাল থেকে রক্তপণ আদায় করে ছিলেন। কেননা অভিযোগকারীদের থেকে রক্তপণ আদায়ের কোনো পথই আর থাকে না। সুতরাং, বায়তুল মাল থেকে রক্তপণ আদায় করা আবশ্যক, যাতে করে নিরাপরাধ ব্যক্তির রক্ত মূল্যহীন হয়ে না যায়। আর যে ব্যক্তি মানুষের ভীড়ের মাঝে মারা যাবে, তার দিয়াত/মুক্তিপণ বায়তুল মাল হতে আদায় করা হবে। এ ব্যাপারে আলী হতে একটি আসার বর্ণিত রয়েছে। أنه قال لعمر رضي الله عنه في رجل قتل في زحام الناس بعرفة: (يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ لَا يُطَلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ ، إِن علمت قاتله، وإلا فأعط ديته من بيت المال)
"একজন ব্যক্তি আরাফার ভীড়ে মারা গেলে তিনি উমার কে বলেন: হে আমীরুল মুমীনিন, মুসলিমের রক্ত অনর্থক বৃথা যাওয়ার নয়। যদি পারেন তবে তার হত্যাকারীকে আপনি খুঁজে বের করুন, নয়তো বায়তুল মাল হতে তার মুক্তিপণ আদায় করে দিন।”
টিকাঃ
৮৯৪ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৯৯।
৮৯৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৯৯; সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৩৪-৪২৪১, ফুআ. ১৬৬৯।
৮৯৬ আবদুর রাযযাক তার মুসান্নাফে বর্ণনা করেন ১০/৫১; ইবনে আবি শায়বাহ ৯/৩৯৫।