📄 তার পরিচয়
শাব্দিক অর্থ: الدية শব্দটি আরবী বাক্যরীতি وديت القتيل أديه دية থেকে গৃহীত। কেউ যখন দিয়াত আদায় করে তখন এই কথাটি ব্যবহার করা হয়। الدية শব্দটি বহুবচন ديات।
পরিভাষায়:
هي المال المؤدى للمجني عليه أو لوليه بسبب الجناية. "অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রদানকৃত সম্পদকে দিয়াত বলে।"
عقل - বা 'বন্ধন' নামকরণ: যেহেতু হত্যাকারী তার অপরাধের শাস্তি স্বরূপ নির্ধারিত সংখ্যক উট সংগ্রহ করে সেগুলো নিহত ব্যক্তির পরিবারের বাড়ির আঙিনায় বেঁধে রেখে আসে, একারণে দিয়াতকে عقل বা বন্ধনও বলে।
📄 দিয়াত শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল এবং হিকমাহ
১. শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা' দ্বারা দিয়াত প্রমাণিত।
কুরআন থেকে দলীল: মহান আল্লাহ বলেন: وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ "আর যে ব্যক্তি ভুলবশত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, সে একটি মুমিন দাস মুক্ত করবে এবং মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিবে।” [সূরা নিসা: ৯২]
সুন্নাহ থেকে দলীল: পূর্বোক্ত আবু হুরায়রা এর হাদীসে রয়েছে, مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيلٌ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ : إِمَّا أَنْ يَقْتُلَ، وَإِمَّا أَنْ يُفْدَى "যার কোনো আত্মীয় নিহত হয়েছে তার দুটি ব্যবস্থার যে-কোনো একটি গ্রহণের অধিকার রয়েছে। হয় রক্তপণ গ্রহণ করবে নতুবা কিসাস স্বরূপ হত্যাকারীকে হত্যা করতে হবে।” নাবী-কর্তৃক আমর বিন হাযমের কাছে প্রেরিত চিঠিতেও একই কথা রয়েছে। সেখানে দিয়াতের পরিমাণ বলে দেওয়া আছে।
সকল আলেম দিয়াত ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে একমত।
২. দিয়াত শরীয়ত-সম্মত হওয়ার হিকমাহ: ব্যক্তিসত্তাকে রক্ষা করা, নির্দোষ ব্যক্তির রক্ত প্রবাহে বাধা দেওয়া, মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা থেকে সতর্ক করা।
টিকাঃ
৮৮৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৪২৯৫ ও সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৩৫৪।
📄 কাদের উপর দিয়াত ওয়াজিব এবং কে দায়ভার গ্রহণ করবে?
হত্যাকারী বা শারীরিক ক্ষতি সাধনকারী ব্যক্তি দুটি বিষয়ের যে-কোনো একটি থেকে মুক্ত নয়: ১. যদি সে অপরাধটি স্বেচ্ছায় সম্পাদন করে থাকে এবং এর কারণে যদি কেউ মারা যায়, অতঃপর যদি নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং কিসাস রহিত হয়ে যায়, তবে দিয়াত বা রক্তমূল্য বা ধার্যকৃত ক্ষতিপুরণ পরিশোধের ক্ষেত্রে স্বয়ং সে-ই দায়বদ্ধ থাকবে, অন্য কেউ নয়। কেননা ক্ষতির বদলা তার কর্তার উপরই বর্তাবে। আল্লাহ বলেন: وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" [সূরা আন'আম: ১৬৪]
২. পক্ষান্তরে, যদি সে ভুলবশত অথবা ইচ্ছাকৃত ও ভুলের মাঝামাঝি অবস্থায় অপরাধ সংঘটিত করে, তবে তার দিয়াতের দায়ভার তার নিকট আত্মীয়ের উপর বর্তাবে। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, قَضَى رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جَنِينِ امْرَأَةٍ مِنْ بَنِي لَحْيَانَ سَقَطَ مَيْتًا بِغُرَّةٍ، عَبْدِ أَوْ أَمَةٍ، ثُمَّ إِنَّ المَرْأَةَ الَّتِي قَضَى لَهَا بِالْغُرَّةِ تُوُفِّيَتْ، فَقَضَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَنَّ مِيرَاثَهَا لِبَنِيهَا وَزَوْجِهَا، وَأَنَّ العَقْلَ عَلَى عَصَبَتِهَا
“রানী লিহয়ান গোত্রের এক মহিলার গর্ভের সন্তান মৃত অবস্থায় পতিত হয়েছিল। আল্লাহর রসূল একটি গোলাম বা দাসী প্রদানের ফয়সালা দিলেন। এরপর তিনি যে মহিলাটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে মারা গেল। তখন আল্লাহর রসূল ফয়সালা দিলেন, তার রেখে যাওয়া সম্পদ তার পুত্রগণ এবং স্বামীর জন্য। আর দিয়াত পাবে তার নিকটতম আত্মীয়গণ।"
অতএব, তার দিয়াত মূলত তার আত্মীয়দের উপর বর্তাবে। কারণ ভুলবশত অপরাধগুলোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশিই হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অপরাধীর কিছুই করার থাকে না। সুতরাং এধরনের অপরাধীদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের বোঝা হালকা করা একান্ত কর্তব্য। তবে ইচ্ছাকৃত অপরাধীর বিষয়টি ভিন্ন। সে এক্ষেত্রে নিজের অপরাধের মুক্তিপণ হিসেবে নিজেই দিয়াত পরিশোধ করবে। কারণ ইতঃপূর্বে সে কিসাসের উপযুক্ত ছিল। মাজলুম পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার পর তাকে দিয়াতের ভার বহন করতে হচ্ছে।
টিকাঃ
৮৮৬ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৭৪০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৮১।
📄 দিয়াতের প্রকারভেদ ও পরিমাণ
১. দিয়াতের প্রকারসমূহ: ক্ষতিপূরণ পরিশোধের ক্ষেত্রে মূল প্রাণী হলো উট। আল্লাহর রসূল বলেছেন: فِي النَّفْسِ الْمُؤْمِنَةِ مِائَةٌ مِنَ الْإِبِلِ ... "একটি মুমিন প্রাণের বিনিময়ে ১০০টি উট দিয়াত দিতে হবে..." অন্য হাদীসে নাবী বলেছেন: أَلَا وَإِنَّ قَتِيلَ الْخَطَإِ شِبْهِ الْعَمْدِ مَا كَانَ بِالسَّوْطِ وَالْعَصَا، مِائَةٌ مِنَ الْإِبِلِ "মনে রাখবে, যে ব্যক্তি ভুলবশত হত্যার শিকার হবে যা ইচ্ছাকৃত হত্যার মতো হত্যা; ছড়ি বা লাঠির আঘাতে হত্যা-এরূপ হত্যার জন্য দিয়াত একশত উট।" আমর বিন শুয়াইব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, كَانَتْ قِيمَةُ الدِّيَةِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ثَمَانَ مِائَةِ دِينَارٍ أَوْ ثَمَانِيَةَ آلَافٍ دِرْهَم... فَكَانَ ذَلِكَ كَذَلِكَ حَتَّى اسْتُخْلِفَ عُمَرُ ، فَقَامَ خَطِيبًا فَقَالَ: أَلَا إِنَّ الْإِبِلَ قَدْ غَلَتْ، قَالَ: فَفَرَضَهَا عُمَرُ عَلَى أَهْلِ
الذَّهَبِ أَلْفَ دِينَارٍ، وَعَلَى أَهْلِ الْوَرِقِ اثْنَيْ عَشَرَ أَلْفًا، وَعَلَى أَهْلِ الْبَقَرِ مِائَتَيْ بَقَرَةٍ، وَعَلَى أَهْلِ الشَّاءِ أَلْفَيْ شَاةٍ، وَعَلَى أَهْلِ الْحُلَلِ مِائَتَيْ حُلَّةٍ
“রসূলুল্লাহ -এর যুগে মুদ্রার দিয়াত ছিল আটশো দীনার অথবা আট হাজার দিরহাম.......। দিয়াতের এ পরিমাণ ‘উমার -এর খলীফাহ নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকর ছিল। খলীফাহ হয়ে তিনি ভাষণদানকালে বলেন, উটের দাম বেড়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর ‘উমার দিয়াতের পরিমাণ নির্ধারণ করলেন: স্বর্ণের মালিকদের জন্য এক হাজার দীনার, রৌপ্যের মালিকদের জন্য বারো হাজার দিরহাম, গাভীর মালিকদের জন্য দুইশো গাভী, ছাগলের মালিকদের জন্য দুই হাজার ছাগল ও কাপড়ের মালিক বা ব্যবসায়ীদের জন্য দুইশো জোড়া কাপড় ধার্য করলেন।”
এর মাধ্যমে দিয়াতের আসল উটের বিষয়টি প্রমাণিত হলো। এছাড়া অন্যান্য যা কিছু উল্লেখ করা হলো তা বস্তুর মূল্যমান হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অসংখ্য সাহাবীর উপস্থিতিতে উমার এমনটি করেছিলেন; কেউ তার বিরোধিতা করেছেন বলেও কোনো প্রমাণ নেই। অতএব, ‘মূল্য দ্বারা দিয়াত পরিশোধের’ বিষয়টির ওপর ‘ইজমা সংঘটিত হলো। সুতরাং উট অথবা উল্লিখিত বস্তুগুলোর সমমূল্য দিয়ে দিয়াত পরিশোধ করা যাবে।
২. দিয়াতের পরিমাণ:
> স্বাধীন মুসলিমের দিয়াত: ১০০টি উট। এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ও ইচ্ছাকৃত হত্যার সদৃশ হত্যার ক্ষেত্রে বিষয়টিকে শরীয়ত-কর্তৃক কঠিন করা হয়েছে। ফলে, ১০০টি উট প্রদান করতে হবে; তন্মধ্যে ৪০টি উটের পেটে বাচ্চা থাকতে হবে। উপরিউক্ত আমর বিন শুয়াইব তার পিতা থেকে, তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনাকৃত হাদীসের আলোচনা গত হয়েছে। তাতে রয়েছে: وَأَرْبَعُونَ خَلِفَةً বা চল্লিশটি গর্ভবতী উটনী।
> স্বাধীন আহলে কিতাবের দিয়াত: স্বাধীন মুসলিমের অর্ধেক; চাই সে যিম্মী হোক বা না হোক। এব্যাপারে আমর বিন শু'য়াইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রসূল বলেছেন: عَقْلُ أَهْلِ الذِّمَّةِ نِصْفُ عَقْلِ الْمُسْلِمِينَ “যিম্মিদের দিয়াত মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক।” অন্য শব্দেও এসেছে: دِيَةَ الْمُعَاهِدِ نِصْفُ دِيَةِ الْمُسْلِمِ "যিম্মিদের দিয়াত মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক।”
> মহিলার দিয়াত: স্বাধীন পুরুষের দিয়াতের অর্ধেক। এ বিষয়ে আমর বিন হাযম এর কাছে পাঠানো চিঠিতে রয়েছে, دية المرأة على النصف مِنْ دِيةِ الرَّجُلِ
"মহিলার দিয়াত পুরুষের দিয়াতের অর্ধেক।” ইবনু আব্দুল বার এবং ইবনুল মুনযির এব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন।
> মাজুসী বা অগ্নিপুজকদের দিয়াত: স্বাধীন মাজুসী ব্যক্তি যিম্মী, চুক্তিভুক্ত কিংবা ইত্যাদি যে- কোনো পর্যায়েরই হোক না কেন, তাকে ৮০০ দিরহাম সমপরিমাণ দিয়াত গুনতে হবে। মূর্তিপূজকদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে উকবা বিন আমির কর্তৃক একটি মারফু হাদীসে রয়েছে: دِيَةِ الْمَجُوسِي ثَمَانِمِائَةِ دِرْهَم
“অগ্নিপুজারী ব্যক্তির দিয়াত ৮০০ দিরহাম।"
> অগ্নি-পূজারিণী, আহলে কিতাবের স্ত্রী এবং মূর্তি-পূজারিণীর দিয়াত: মুসলিম রমণীদের দিয়াত যেভাবে তাদের পুরুষের অর্ধেক, তেমনিভাবে এ ধরনের নারীদের দিয়াতও তাদের পুরুষের অর্ধেক। এর স্বপক্ষে আমর বিন শুয়াইব এর হাদীস চলে গেছে; عَقْلَ أَهْلِ الْكِتَابِ نِصْفُ عَقْلِ الْمُسْلِمِينَ
"আহলে কিতাবদের দিয়াত মুসলমানদের দিয়াতের অর্ধেক।”
> ভ্রুণের দিয়াত: মাকে কষ্ট দেওয়ার কারণে (ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়) যদি ভ্রুণটি মৃত অবস্থায় পড়ে যায় তবে তার দিয়াত হলো একজন দাস অথবা দাসী আজাদ করা। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جَنِينِ امْرَأَةٍ مِنْ بَنِي لَحَيَانَ سَقَطَ مَيْتًا بِغُرَةٍ، عَبْدِ أَوْ أَمَةٍ.
"বানী লিহয়ান গোত্রের এক মহিলার গর্ভপাত হয়েছিল মৃত অবস্থায়। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গোলাম বা দাসী প্রদানের ফয়সালা দিলেন। " আর এক্ষেত্রে তার দিয়াতের পরিমাণ মায়ের দিয়াতের পরিমাণের দশ ভাগের একভাগ; অর্থাৎ পাঁচটি উট। এক্ষেত্রে মা উক্ত দাসটিকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে; বিষয়টি এমন যেন সে (সন্তানটি) জীবিত অবস্থায় পড়েছে।
টিকাঃ
৮৮৭ নাসাঈ, হা. ৪৮৫৭; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহহুন নাসাঈ, হা. ৪৫১৩।
৮৮৮ নাসাঈ, হা. ৪৭৯১; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহহুন নাসাঈ, হা. ৪৪৬০।
৮৮৯ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৫৪২; শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন, ইরওয়া ২২৪৭।
৮৯০ নাসাঈ, হা. ৪৮০৬; ইমাম আলবানী হাসান বলেছেন, ইরওয়াউল গালীল, নং ২২৫১।
৮৯১ মু'জামুল আওসাত, হা. ৭৫৮২।
৮৯২ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৭৪০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৮১।