📄 কোনো ব্যক্তি প্রাণনাশ ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্যাতন করা
তা হলো, ব্যক্তির উপর এমন প্রত্যক আঘাত করা যার ফলে ব্যক্তির প্রাণনাশ হয় না। যেমন যেকোনো ধরনের আঘাত, অঙ্গহানি ইত্যাদি। এই ধরনের অপরাধে কিসাস বাস্তবায়ন করতে হলে কুরআন, হাদীস, ইজমার দলীল আবশ্যক।
কুরআন থেকে দলীল: আল্লাহ তাআলার বাণী: وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ "নিশ্চয়ই আর আমি তাদের প্রতি রাতে ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময় চোখ, নাকের বিনিময় নাক, কানের বিনিময় কান, দাঁতের বিনিময় দাত, (তদ্রুপ অন্যান্য) বিশেষ জখমেরও বিনিময় রয়েছে।” [সূরা মায়িদাহ: ৪৫]
হাদীস থেকে দলীল: রুবাইয়্যা কর্তৃক এক দাসীর "সানিয়া" দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় আল্লাহর রসূল বলেন: كِتابُ اللهِ القِصَاصُ "কুরআনের বিধান হলো কিসাস।”
যদি সম্ভব হয় তাহলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটনা ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে আলেমগণ কিসাস আবশ্যক এর উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
এর তিন প্রকার: ১. আঘাতজনিত অপরাধ।
২. অঙ্গহানি জনিত অপরাধ।
৩. কোনো অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া।
প্রথম প্রকার: আঘাতজনিত অপরাধ: এটা দুইভাগে বিভক্ত:
প্রথম: মাথা বা চেহারায় আঘাত করা। যেটাকে বলা হয় الشجاج তথা ফাটল বা ক্ষত, شَجَّةٌ এর বহুবচন। মাথায় এক প্রকার ক্ষত।
দ্বিতীয়: সম্পূর্ণ শরীরে আঘাত যেটাকে বলা হয় الجرح তথা জখম; যা شَجَّةٌ নয়।
প্রথম ভাগ: মাথা বা চেহারায় আঘাতসমূহ। এটা দশ প্রকার:
১. الحارصة তথা এমন আঘাত যা চামড়াকে ঝলসে দেয়। অর্থাৎ যে আঘাত সামান্য বিদীর্ণ করে, রক্তাক্ত করে না। যেমন আঁচড় বা খামচির দাগ। যাকে বলা হয়: القاشرة এবং الملبطاء তথা আঁচড় কাটা।
২. الدامية তথা এমন আঘাত যার ফলে আক্রান্ত জায়গাটা রক্তাক্ত হয়। ফলে সেখান থেকে হালকা রক্ত বের হয়। তাকে বলা হয় البازلة এবং الدَامِعَةٌ । এটা চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩. الباضعة তথা এমন আঘাত যা চামড়ার নীচের মাংসকে বিদীর্ণ করে কিন্তু তা হাড় পর্যন্ত পৌঁছায় না। অর্থাৎ অত্যন্ত সূক্ষ্ম আঘাত।
৪. المتلاحمة তথা এমন আঘাত যা মাংসকে বিদীর্ণ করে, কিন্তু মাংস এবং হাড়ের মাঝখানে যে চামড়া আছে সে পর্যন্ত পৌঁছায় না।
৫. السمحاق তথা এমন আঘাত যেটা মাথার গোশত ও হাড়ের মাঝের পাতলা চামড়া (অস্থি আবরক ঝিল্লি) পর্যন্ত পৌঁছায়। এই নামেই উক্ত আঘাতের নামকরণ করা হয়েছে।
আর এই পাঁচ প্রকারে কোনো কিসাস অথবা দিয়াত নেই। বরং এক্ষেত্রে হুকুমাহ বা সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর হুকুমার পদ্ধতি: অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দাস গণ্য করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বাবস্থা অনুযায়ী তার একটি মূল্য নির্ধারণ করা, অতঃপর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের অবস্থানুযায়ী একটি মূল্য নির্ধারণ করা। এরপর মূল্য হ্রাসের অনুপাত অনুযায়ী তার উপর একটি দিয়াত ধার্য করতে হবে।
৬. الْمُوضِحَةُ তথা এমন আঘাত যা অস্থি আবরক ঝিল্লিকে বিদীর্ণ করে হাড়কে বের করে দেয়। এর ক্ষতিপূরণ পাঁচটি উট অর্থাৎ দিয়াতের দশভাগের এক ভাগের অর্ধেক।
৭. الْهَاشِمَةٌ তথা এমন আঘাত যার ফলে হাড় বের হয়ে যায় এবং ভেঙে যায়। এর ক্ষতিপূরণ দশটি উট।
৮. الدّّامَّةُ। তথা এমন আঘাত যার ফলে হাড় একটি স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়। চাই হাড় ভেঙে যাক বা বের হয়ে যাক অথবা কোনোটিই না হয়। এর ক্ষতিপূরণ ১৫টি উট।
৯. المَأْمُوْمَةٌ। তথা এমন আঘাত যা সরাসরি মাথার মগজকে বিদীর্ণ করে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের পর্দায় আঘাত করে। এটাকে ২৩১৯ বলা হয়। এ অপরাধের ক্ষতিপূরণ হলো পূর্ণ দিয়াতের এক- তৃতীয়াংশ।
১০. الدَّامِغَة তথা এমন আঘাত যা মগজের পর্দা বিদীর্ণ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এর ক্ষতিপূরণ পূর্ণ দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ।
এর সাথে আরও একটি প্রকার সম্পৃক্ত করা যায়, الجائفة তথা এমন আঘাত যা পেটের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়। যা সাধারণত দেখা যায় না। যেমন পেটের, পিঠের, বুকের, কণ্ঠনালীতে, মূত্রথলির ভিতরে আঘাতসমূহ। তবে এধরনের আঘাতকে الشجاج বলা হবে না, কেননা তা চেহারা বা মাথায় আঘাত নয়। তারা (ফকীহগণ) এই প্রকারকে এখানে উল্লেখ করেছেন উল্লিখিত প্রকারসমূহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়। এতে ক্ষতিপূরণ হলো, (বৈধ ব্যক্তি হত্যার পূর্ণ) দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ।
এসকল আঘাতের দলীলসমূহ: ১. আবু বকর বিন মোহাম্মদ বিন আমর বিন হাযম, তিনি তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন। রসূল ইয়ামানবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেন, যাতে উল্লেখ ছিল- وَفِي الْجَائِفَةِ ثُلُثُ الدِّيَةِ، وَفِي الْمُنَقَلَةِ خَمْسَ عَشْرَةَ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي كُلِّ أَصْبُعِ مِنْ أَصَابِعِ الْيَدِ وَالرِّجْلِ عَشْرٌ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي السِّنَّ خَمْسٌ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي الْمُوضِحَةِ خَمْسٌ مِنَ الْإِبِلِ
"যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে দেয় তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। আর যে জখমে হাড় স্থানচ্যুত হয় তাতে ১৫ টি উট। হাত পায়ের আঙুলে দশটি করে উট। এক দাঁতে পাঁচ উট। আর যে জখমে হাড় দেখা যায় তাতে পাঁচটি উট। "
২. যে জখমে হাড় স্থানচ্যুত হয় তাতে ১৫ টি উট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন।
৩. যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন। আমর বিন হাসান এর হাদীসে উল্লিখিত রয়েছে:
وَفِي الْجَائِفَةِ ثُلُثُ الدِّيَةِ
“যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায় তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ দিয়াত।
৪. যায়েদ বিন সাবিত আছারে এসেছে,
أنه قضى فِي الْهَاشِمَةِ عَشْرٌ مِنَ الْإِبِلِ، ولم يُعرف له مخالف “যে জখমে হাড় ভেঙে যায় তাতে তিনি ১০ টি উট দিয়াত হিসেবে ফয়সালা করেছেন। " কিন্তু কেউ তার বিরোধিতা করেছেন বলে জানা যায়নি।
৫. উপর্যুক্ত আমর বিন হাযমের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে الْمَأْمُومَةُ। তে এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। আর الدامغة বা মস্তিস্কের পর্দায় আঘাত হলো এমন জখম যা الْمَأْمُومَةٌ। বা মাথায় আঘাতের থেকে বেশি ক্ষত। তাহলে সেটার দিয়াত হবে الْمَأْمُومَةٌ এর থেকে অধিক তাহলে الدامغة এর দিয়াত হলো এক-তৃতীয়াংশ।
উল্লিখিত আঘাতসমূহের ক্ষেত্র শুধুমাত্র الموضحة আঘাত ছাড়া অন্য কোনো প্রকার আঘাতে কিসাস আবশ্যক হবে না। কারণ এই আঘাতের ধরন এবং অনুরূপ বদলা গ্রহণ সহজ হয় বলে। আর এ ছাড়া অন্য আঘাতসমূহের ক্ষেত্রে আঘাত কম বা বেশি নির্ণয় করা এবং এক্ষেত্রে অনুরূপ বদলা নেওয়া কঠিন।
দ্বিতীয় ভাগ: সম্পূর্ণ শরীরে আঘাত: এধরনের আঘাত বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। মাথা কিংবা চেহারার যে সকল আঘাতে কিসাস নেই, ঠিক একইভাবে শরীরেও একই ধরনের আঘাতে কিসাস নেই। তবে الموضحة তথা যে আঘাতে শরীরের কোনো অংশ কেটে যায়; যেমন বুক অথবা ঘাড়, এসবের ক্ষেত্রে কিসাস প্রযোজ্য হবে।
দ্বিতীয় প্রকার: অঙ্গহানি করা: এ ধরনের অপরাধ তিনভাগে বিভক্ত: ১. ইচ্ছাকৃত ২. ইচ্ছা সাদৃশ্য ৩. ভুলবশত।
ইচ্ছা সাদৃশ্য এবং ভুলবশত অপরাধের ক্ষেত্রে কিসাস আবশ্যক হবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ করলে (যেমন হত্যা করা) তাহলে তিনটি শর্তে কিসাস আবশ্যক হবে:
১. কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি ব্যতীত বদলা নেওয়া সম্ভব হওয়া। শরীরের কোনো জোড়ায় কেটে যাওয়া অথবা এমনভাবে কেটে যাওয়া যার সীমা জোড়া পর্যন্ত পৌঁছায়; যেমন আংগুল, কজ্বির হাড়, কনুই ইত্যাদি। সুতরাং এমন আঘাত সমূহের কিসাস নেই যার কোনো শেষ সীমা নেই। যেমন الجائفة তথা পেটে আঘাত এবং দাঁত ছাড়া কোনো হাড় (যেমন, উরু, বাহু, পায়ের নলা) ভেঙ্গে যাওয়াতে কিসাস নেই।
২. নাম এবং স্থানের দিক দিয়ে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার উভয়ের অঙ্গের মাঝে সমতা হওয়া। সুতরাং ডান হাতের বদলায় বাম হাত, কনিষ্ঠার বদলায় অনামিকা গ্রহণ করা হবে না এবং মূল অঙ্গের বদলায় বর্ধিত অঙ্গও কিসাস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
৩. পূর্ণতা এবং সুস্থতার দিক দিয়ে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার উভয়ের অঙ্গ সমান হওয়া। সুস্থ অঙ্গের বদলায় অবশ বা অসাড় এবং অর্ধেক আঙ্গুলের বদলায় পূর্ণ আঙ্গুল কিসাস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তৃতীয় প্রকার: কোনো অঙ্গ অকেজো করে দেওয়া
ঘাতক যদি কোনো অঙ্গকে অবশ করে দেয় তাহলে আঘাতের উপর কিসাস আবশ্যক হবে না। এর কারণ হলো যুলমের সম্ভাবনা ছাড়া তার উপর বদলা নেওয়া অসম্ভব। এক্ষেত্রে ঘাতকের উপর পূর্ণ দিয়াত আবশ্যক। আর যদি আঘাতের ফলে অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে যায় (পুরোপুরি নষ্ট না হয়ে) এবং যদি ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় তবে যতটুকু কার্যক্ষমতা হারিয়েছে ততটুকু দিয়াত ওয়াজিব; যেমন নষ্টের পরিমাণ যদি অর্ধেক কিংবা এক-চতুর্থাংশ হয় তবে অর্ধ দিয়াত অথবা পূর্ণ দিয়াতের এক-চতুর্থাংশ দিতে হবে। এভাবেই হিসাব করা হবে। তবে যদি কার্যক্ষমতা হ্রাসের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব না হয়, তখন সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে শাসক ইজতিহাদ করে দিয়াত নির্ধারণ করবেন, এটাই ওয়াজিব।
মানবদেহের কার্যক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিম্নরূপ: বুদ্ধি লোপ পাওয়া, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়া, ঘ্রাণশক্তি চলে যাওয়া, বাকশক্তি, কণ্ঠস্বর ও মুখের স্বাদ হারিয়ে যাওয়া, চর্বণশক্তি ও বীর্যপাতের হ্রাস ঘটা, প্রজনন ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়া ইত্যাদি।
টিকাঃ
৮৮১ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৯৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৭৫।
৮৮২ সুনান নাসাঈ ২/২৫২ হা. ৪৮৫৩; হাকিম ৩৯৭; বায়হাকী ৮/৭৩ এবং এটা সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৭/৩২৬।
৮৮৩ সুনান নাসাঈ ২/২৫২ হা. ৪৮৫৩; হাকিম ৩৯৭; বায়হাকী ৮/৭৩ এবং এটা সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৭/৩২৬।
৮৮৪ আব্দুর রাজ্জাক তার কিতাবের: ৯/৩১৪; বায়হাকী: ৮/৭২।