📄 الجناية বা অপরাধ পরিচিতি ও প্রকারভেদ
১. الجناية -এর পরিচয়: الجناية এর বহুবচন হলো: جنايات
আভিধানিক অর্থ: কোনো ব্যক্তির দেহ, মাল অথবা সম্মানের উপর অত্যাচার করা। ফকীহগণ অপরাধবিধির অধ্যায়কে শুধুমাত্র ব্যক্তির দেহের উপর অত্যাচার করার সাথেই নির্দিষ্ট করেছেন। দণ্ডবিধির অধ্যায়কে সম্মান, মালের ক্ষেত্রে যুলুম করার সাথে নির্দিষ্ট করেছেন।
পরিভাষায় الجناية বা অপরাধবিধি: التعدي على البدن بما يوجب قصاصاً، أو مالاً، أو كفارة. “কোনো ব্যক্তির দেহের উপর জুলুম করা যার কারণে কিসাস বা সম্পদ প্রদান অথবা কাফফারা আবশ্যক হয়।”
২. অপরাধ এর প্রকারভেদ: ক. الجناية على النفس তথা কোনো ব্যক্তির উপর নির্যাতন করা। খ. الجناية على ما دون النفس তথা কোনো ব্যক্তি ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্যাতন করা।
📄 ব্যক্তির উপর আঘাত করা
এমন কাজ যা মানুষের প্রাণনাশ ঘটায় অর্থাৎ, হত্যা। মুসলিমগণ একমত হয়েছেন অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা অবৈধ। আল্লাহ তা'আলা বাণী:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ) "তোমরা উপযুক্ত কারণ ছাড়া এমন ব্যক্তিকে হত্যা করো না যা আল্লাহ তা'আলা অবৈধ ঘোষণা করেছেন।" [সূরা ইসরা : ৩৩]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm: لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلاثٍ: وَالتَّيْبُ الزَّانِي النَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ "আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম বলেছেন: ওই মুসলিম ব্যক্তির রক্ত বৈধ নয় যে সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল, তবে তিনটি কারণ ব্যতীত। বিবাহিত জিনাকারী, হত্যার বদলা হত্যা, ধর্মান্তরিত হওয়া।"
সুতরাং অন্যায়ভাবে হত্যা করা অবৈধ তা কুরআন এবং সুন্নাহ ও সকলের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারীর বিধান: যখন কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করবে, তার হুকুম হলো সে ফাসেক। কারণ সে কাবীরা গুনাহসমূহের একটি কাবীরা গুনাহতে জড়িত। আল্লাহ তা'আলা হত্যাকারীর বিষয়টি কুরআনে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলার বাণী:
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا) "যে ব্যক্তি অন্যায় ভাবে অথবা জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে হত্যা করবে সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল।" [সূরা মায়িদাহ : ৩২]
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ، مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا
"মুমিন ব্যক্তি যেন সর্বক্ষণ তার দ্বীনের মধ্যে প্রশস্ততায় অবস্থান করে, যতক্ষণ অবৈধ রক্ত প্রবাহিত না করে।”
আল্লাহ তা'আলা হত্যাকারীকে কঠিন হুঁশিয়ার করে বলছেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا) "কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” [সূরা নিসা: ৯৩]
হত্যাকারীর বিষয়টি আল্লাহর নিকট। তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। তবে তিনি চাইলে যাকে ইচ্ছা অন্য কোনো অপরাধের কারণে ক্ষমা করতে পারেন।"[সূরা নিসা ৪৮]
সুতরাং সে ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে রয়েছে, কারণ তার অপরাধটা শিরকের তুলনায় নিম্ন। এই বিধানটি তখন প্রযোজ্য হবে যখন সে তাওবা করবে না। আর যদি সে তোওবা করে নেয় তাহলে তার তাওবা গ্রহণীয় হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ)
"তুমি বলো হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছো তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।" [সূরা যুমার: ৫৩]
তবে হত্যাকারীর তাওবার কারণে আখিরাতে নিহিত ব্যক্তির হক রহিত হবে না।
টিকাঃ
৮৬৫ সহীহুল বুখারী, হা, ৩৩৩৫, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৬৭৭।
৮৬৬ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৬২।
📄 হত্যার প্রকারভেদ
হত্যা তিন প্রকার: ইচ্ছাকৃত হত্যা, ইচ্ছা সাদৃশ্য হত্যা, ভুলবশত হত্যা।
ভুলবশত হত্যা এবং ইচ্ছাকৃত হত্যা: উভয়ের আলোচনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأً وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَنْ يَصَّدَّقُوا "কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। তবে ভুলবশত করলে সেটা স্বতন্ত্র; কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে একটি দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা কর্তব্য, যদি না তারা ক্ষমা করে।" [সুরা নিসা ৯২]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا) "কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” [সূরা নিসা ৯৩]
ইচ্ছাকৃত হত্যার সাদৃশ্য: সহীহ সুন্নাহ হতে প্রমাণিত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: عَقْلُ شِبْهِ الْعَمْدِ مُغَلَّظٌ مِثْلُ عَقْلِ الْعَمْدِ "ইচ্ছাকৃত হত্যা সদৃশ হত্যার দিয়াত ইচ্ছাকৃত হত্যার মতো কঠোর হবে। "
এই তিন প্রকারের বিধির বিস্তারিত আলোচনা:
প্রথম প্রকার: ইচ্ছাকৃত হত্যা: এর প্রকৃতি: নিষ্পাপ ব্যক্তিকে হত্যাকারী এমন যন্ত্র ব্যবহার করে আঘাত করবে যা দিয়ে সাধারণত নিহত হয়।
ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী শাস্তির যোগ্য হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূর্ণ হওয়া আবশ্যক: ১. হত্যাকারীর পূর্ণ ইচ্ছা (হত্যা করার ইচ্ছা) বিদ্যমান থাকা। ২. এটা জানতে হবে যে, হত্যাকারী যাকে হত্যা করেছে তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। ৩. যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা এমন হাতিয়ার হতে হবে যা দ্বারা হত্যা স্বাভাবিক নিয়মে হয়ে থাকে। চাই তা ধারালো হোক বা না হোক। উপরে উল্লিখিত কোনো একটি শর্ত পূর্ণ না হলে তা ইচ্ছাকৃত হত্যা হিসেবে গণ্য হবে না।
ইচ্ছাকৃত হত্যার ধরণ:
১. এমন ধারালো হাতিয়ার দিয়ে হত্যা করা যা শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে এবং কেটে ফেলে। যেমন তলোয়ার, ছুরি, বর্ষা অথবা এজাতীয় কিছু।
২. বড়ো ভারী বস্তু দ্বারা হত্যা করা। যেমন বড়ো ধরনের পাথর হাতুড়ি এবং এ জাতীয় আরও কিছু। আনাস থেকে বর্ণিত হাদীস।
أَنَّ جَارِيَةً وُجِدَ رَأْسُهَا قَدْ رُضٌ بَيْنَ حَجَرَيْنِ، فَسَأَلُوهَا مَنْ صَنَعَ هَذَا بِكِ؟ فُلَانٌ؟ فُلَانٌ؟ حَتَّى ذَكَرُوا يَهُودِيًّا، فَأَوْمَتْ بِرَأْسِهَا، فَأُخِذَ الْيَهُودِيُّ فَأَقَرَ، فَأَمَرَ بِهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُرَضَّ رَأْسُهُ بِالْحِجَارَةِ
"এক দাসীকে পাওয়া গেল তার মাথা দুটি পাথরের মাঝখানে রেখে পিষে দিয়েছিল। অতঃপর তারা তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করল: কে তোমাকে এরূপ করেছে? অমুক ব্যক্তি, অমুক ব্যক্তি, অতঃপর যখন তারা ইহুদির নাম উল্লেখ করল। তখন দাসী তার মাথা দিয়ে হাঁ সুচক ইশারা করল। ইহুদিকে ধরে আনা হলো। অতঃপর সে অপরাধ স্বীকার করলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পর্কে আদেশ দিলেন যে তার মাথা দুটি পাথরের মাঝখানে রেখে পিষে দেওয়ার জন্য। "
৩. শ্বাস আটকে রাখা। যেমন রশি বা রশি জাতীয় কিছু দিয়ে তার শ্বাসরুদ্ধ করা অথবা তার নাক অথবা মুখ বন্ধ করে দেওয়া।
৪. অজান্তে তাকে বিষ পান করানো। অথবা প্রাণনাশকারী কোনোকিছু খাওয়ানো যার ফলে সে মারা যাবে।
৫. এমন জায়গায় ফেলে আসা যেখানে হিংস্র প্রাণির আধিক্য রয়েছে অথবা যেখানে বিন্দুমাত্র পানি নেই।
৬. এমন পানিতে ফেলে দেওয়া যেখানে সে ডুবে যাবে অথবা এমন আগুনে নিক্ষেপ করা যেখানে সে পুড়ে যাবে, যা থেকে নিহত ব্যক্তির মুক্তির সম্ভাবনা নেই।
৭. আটকে রাখা এবং দীর্ঘ সময় খাবার পানীয় থেকে বঞ্চিত রাখা যার ফলে অধিকাংশ সময় মানুষ মারা যায়, অতঃপর যাতে করে সে ক্ষুদা এবং পিপাসায় মৃত্যুবরণ করে।
৮. হিংস্র প্রাণির সামনে ফেলে দেওয়া; যেমন সিংহ অথবা বিষাক্ত সাপ, যার কারণে সে মারা যাবে।
তা রদ্ব: চূর্ণ-বিচূর্ণ করা।
৯. হত্যা করার জন্য এমন কারণ তৈরি করা যার ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। যেমন তাঁর সম্পর্কে এমন সাক্ষ্য দেওয়া যার ফলে হত্যা করা আবশ্যক হয় (যিনা, ধর্মত্যাগ, অন্যায়ভাবে হত্যা) ফলে তাকে হত্যা করা হয়। অতঃপর নিহত ব্যক্তির বিপক্ষে সাক্ষ্যদাতারা তাদের সাক্ষ্য থেকে ফিরে এসে বলে: আমরা তার মৃত্যুর ইচ্ছা করেছিলাম ফলে তাকে তাঁরা সবাই মিলে হত্যা করল।
ইচ্ছাকৃত হত্যার বিধান:
ইচ্ছাকৃত হত্যার দুটি বিধান:
১. পরকালীন বিধান: হত্যা করা হারাম। আর এটা মারাত্মক অপরাধ। যদি তাওবা না চায় এবং আল্লাহ ক্ষমা না করেন, তাহলে হত্যাকারীর উপর রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ তাআলার বাণী: وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا “কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নام؛ সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” [সূরা নিসা: ৯৩]
২. ইহকালীন বিধান: যদি নিহত ব্যক্তির অভিভাবক ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীকে ক্ষমা না করেন তাহলে তার (ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী) থেকে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। আল্লাহ তাআলার বাণী: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ “হে মুমিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাসের বিধান লিখে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস, নারীর বদলে নারী। তবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় আদায় করা কর্তব্য। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে শিথিলতা ও অনুগ্রহ। সুতরাং এরপরও যে সীমালঙ্ঘন করে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা বাক্বারাহ: ১৭৮]
আবু হুরায়রা রা. এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ বরেছেন: مَنْ قُتِلَ لَهُ قَتِيلٌ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ : إِمَّا أَنْ يَقْتُلَ ، وَإِمَّا أَنْ يُفْدَى. وفي رواية: إِمَّا أَنْ يُقَادَ وَإِمَّا أَنْ يُفْدَى “যার কোনো আত্মীয় নিহত হয়েছে তার দুটি ব্যবস্থার যে-কোনো একটি গ্রহণের অধিকার রয়েছে। হয় রক্তপণ গ্রহণ করবে নতুবা কিসাস স্বরূপ হত্যাকারী কে হত্যা করতে হবে।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে: হয় রক্তপণ নিবে নতুবা ক্ষমা করে দিবে।"
সুতরাং রক্তের মালিক ইচ্ছাধীনের মধ্যে রয়েছে; হয়তো কিসাস গ্রহণ করবে অথবা বিনিময় ছাড়াই ক্ষমা করে দিবে। অথবা কিসাস গ্রহণের পরিবর্তে দিয়াত গ্রহণ করবে। দিয়াতের পরও তার জন্য সন্ধি করার সুযোগ রয়েছে।
আল্লামা আল-মৃওয়াফাক বলেন, উভয়ের মাঝে সন্ধি করে নেওয়ার বিষয়ে কোনো মতানৈক্য আছে কিনা আমার জানা নেই। হাদীসে এসেছে আমার বিন শুয়াইব তিনি তাঁর পিতা তার পিতা তার দাদা হতে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন: مَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا دُفِعَ إِلَى أَوْلِيَاءِ المَقْتُولِ، فَإِنْ شَاءُوا قَتَلُوا، وَإِنْ شَاءُوا أَخَذُوا الدِّيَةَ، وَهِيَ ثَلَاثُونَ حِقَّةً، وَثَلَاثُونَ جَذَعَةٌ، وَأَرْبَعُونَ خَلِفَةٌ، وَمَا صَالِحُوا عَلَيْهِ فَهُوَ لَهُمْ، وَذَلِكَ لِتَشْدِيدِ العَقْلِ
"যে ব্যক্তি কাউকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করবে তাকে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকের নিকট সোপর্দ করা হবে। যদি তারা চায় তাহলে তাকে হত্যা করবে আর যদি চায় তাহলে দিয়াত নিবে। আর দিয়াত হলো ৩০ টি চার বছরের উট (হিক্কা), ৩০ টি পাঁচ বছরের উট (জাযআ), ৪০ টি গর্ভধারী উট (খলিফাহ) এবং তারা যদি হত্যাকারীর সাথে সন্ধি চুক্তি করে তাহলে এটা তাদের জন্য বৈধ রয়েছে। আর এটাই হচ্ছে কঠোর দিয়াত।"
কোনো কিছু গ্রহণ না করে ক্ষমা করে দেওয়া হচ্ছে অধিক উত্তম। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: وَأَنْ تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى) "ক্ষমা করাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৭]
ব্যক্তির উপর কিসাস গ্রহণের শর্ত:
নিহত ব্যক্তির অভিভাবক চারটি শর্তে কিসাস গ্রহণ করতে পারে: ১. নিহত ব্যক্তি শারঈ দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে: আর তা হলো নিহত ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিবেকবান হওয়া। কেননা ছোটো বাচ্চা, পাগল, জ্ঞানহীন, ঘুমন্তদের থেকে কিসাস গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةِ، عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيَّ حَتَّى يَبْلُغَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يُفِيقَ)
“তিন প্রকার লোকের উপর থেকে কলম তুলে রাখা হয়েছে। ১. নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়; ২. নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয়; ৩. নির্বোধ পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়।” কেননা তাদের কোনো সুস্থ বুঝ নেই অথবা তাদের মধ্যে সুস্থ বুঝ না পাওয়া।
২. নিহত ব্যক্তির রক্ত নিষ্পাপ হওয়া: কিসাসকে শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে অন্যায়ভাবে রক্তপাতের বদলাস্বরূপ। আর যার রক্ত নিরর্থক (বৈধ) করা হয়েছে সে মাজলুম (অন্যায় রক্তের) অন্তর্ভুক্ত হবে না। সুতরাং কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো কাফের সৈনিক বা তাওবা করার আগে কোনো মুরতাদ অথবা বিবাহিত জিনাকারীকে হত্যা করে তাহলে ঐ মুসলিমের উপর কিসাস, দিয়াত গ্রহণ করা হবে না। তবে শাসকের উপর কর্তব্য হলো হত্যাকারী কে তিরস্কার করা।
৩. হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তির মধ্যে সমতা থাকা: তাঁরা উভয়েই স্বাধীন, দ্বীন, দাসত্ব এর ক্ষেত্রে সমান হবে। কেননা কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে কাফেরের বদলা স্বরূপ হত্যা করা যাবে না। যদিও মুসলিম ব্যক্তি দাস আর কাফের স্বাধীন হোক না কেন। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: لَا يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ
"কাফের বদলা স্বরূপ কোনো মুসলিমকে হত্যা করা হবে না।” আর কোনো দাসের বদলায় স্বাধীনকে হত্যা করা যাবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন: الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ “স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি এবং দাসের বদলে দাস।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৭৮] এটা ব্যতীত অন্যক্ষেত্রে কমবেশি হলে কিসাস গ্রহণে কোনো প্রভাব পড়বে না। কেননা সম্মানিত ব্যক্তিকেও নিম্নমানের ব্যক্তির বদলায় হত্যা করা হবে, নারীর বদলায় পুরুষকেও হত্যা করা হবে এবং পাগল কিংবা নির্বোধের বদলায় সুস্থ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ
"আমি তাদের উপর তাতে প্রাণের বদলে প্রাণ অত্যাবশ্যক করে দিয়েছিলাম।" [সুরা মায়িদাহ: ৪৫] ৪. জন্মসূত্র না হওয়া: নিহত ব্যক্তি যেন হত্যাকারীর সন্তান কিংবা তার নিম্নস্তরের কেউ না হয়। সুতরাং এই কারণে পিতা-মাতার কাউকে হত্যা করা হবে না। যদিও তারা জন্মদানের কারণে উপরের স্তরের হোক বা নিচের স্তরের হোক। কারণ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম বলেছেন: لَا يُقْتَلُ وَالِدٌ بِوَلَدِهِ
"সন্তানের বদলায় পিতাকে হত্যা করা হবে না।
তবে সন্তানকে পিতা-মাতার বদলা স্বরূপ হত্যা করা হবে। সার্বজনীনভাবে মহান আল্লাহ বলেন: كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى
"নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের উপর কিসাসের বিধিবদ্ধ করা হলো।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৭৮]
ইসলামী শরীয়তে কিসাস গ্রহণের হিকমাহ: আল্লাহ তাআলা কিসাসকে শরীয়ত সম্মত করেছেন, জনসাধারণের প্রতি রহমত স্বরূপ; জনগণের রক্তের নিরাপত্তা প্রদান; পরস্পর শত্রুতার ধমকস্বরূপ; অন্য ব্যক্তির প্রতি যুলম করার বিনিময়ে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া, যার ফলে মাজলুমের অভিভাবকদের অন্তর থেকে রাগ দমন হয় অন্যের প্রাণ রক্ষা পায়; আর মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ)
“হে জ্ঞানবান ব্যক্তিরা! কিসাসের বিধানে তোমাদের হায়াত (জীবন) নিশ্চিত হয়েছে।"[সূরা বাক্বারাহ : ১৭৯]
কিসাস গ্রহণের শর্তসমূহ: কিসাস প্রয়োগের উপযুক্ত হওয়ার শর্তসমূহ যদি পূরণ হয় তবে তিনটি শর্তসাপেক্ষে অপরাধীর উপর তা প্রয়োগ করা যাবে:
১. কিসাস গ্রহণকারী (যিনি দাবিদার) দায়িত্ববান হওয়া (প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিবেকবান)। কারণ যদি কিসাসের দাবিদার (অথবা তাদের কেউ) ছোটো অথবা পাগল হয়ে থাকে এবং কিসাস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের স্থলাভিষিক্ত কেউ না হয়, তাহলে অপরাধীকে শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এবং পাগলের জ্ঞান ফিরে আসা পর্যন্ত আটকে রাখা হবে। মুয়াবিয়া এটাই করেছেন এবং সম্মানিত সাহাবীগণ তার প্রতি সম্মতি দিয়েছেন। সুতরাং এটা যেন তাদের পক্ষ থেকে সকলের ঐকমত্য।
২. কিসাস দাবিদারের অভিভাবকগণ সকলের কিসাস গ্রহণের উপর একমত হতে হবে। কেউ যেন এই ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ না করে। ফলে যেন অধিকারীর অনুমতি ছাড়াই অধিকার দাবি করা না হয়। বরং কেউ অনুপস্থিত থাকলে তাঁর আগমনের অপেক্ষা করতে হবে, শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, পাগলের জ্ঞান ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর কিসাস দাবিকারীর কেউ মারা গেলে, তাঁর উত্তরাধিকারী তাঁর দায়িত্ব পালন করবে। যদি কিসাস দাবিদারের কেউ ক্ষমা করে দেয় তাহলে কিসাস বাদ হয়ে যাবে।
৩. অপরাধী ব্যতীত অন্যের প্রতি সীমালঙ্ঘন করা হতে নিরাপদ হতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ "অতঃপর প্রতিশোধের ক্ষেত্রে যেন বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়।" [সূরা ইসরা : ৩৩]
সুতরাং যদি কখনো গর্ভবতী মহিলার উপর কিসাস প্রয়োজন হয়, তাহলে তার প্রসবের আগ পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হবে না। কেননা তাকে হত্যা করার ফলে তার ভ্রূণের উপর সীমালঙ্ঘন করা হবে। তবে যদি তিনি প্রসব করেন এবং সন্তান পালনের দায়িত্ব অন্য কেউ নেন, তাহলে সেই মহিলার ওপর হদ্দ কায়েম করা হবে। আর যদি এমন কেউ না পাওয়া যায় তাহলে দুই বছর দুধ পান করানো পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া হবে। কারণ নাবী গামিদি নামক এক মহিলার ক্ষেত্রে বলেন: ﴿إِذًا لَا نَرْجُمُهَا وَنَدَعُ وَلَدَهَا صَغِيرًا لَيْسَ لَهُ مَنْ يُرْضِعُهُ ، فَقَامَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ: إِلَيَّ رَضَاعُهُ يَا نَبِيَّ اللَّه، قَالَ: فَرَجَمَهَا
"এমন অবস্থায় তার শিশু সন্তানকে রেখে আমি তাকে 'রজম' করতে পারি না। কেননা তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করানোর মতো কেউ নেই। তখন এক আনসারী সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন: হে আল্লাহর রসূল! আমি তার দুধ পান করানোর দায়িত্ব নিলাম। তখন ওই মহিলাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার আদেশ করলেন।
কিসাসের বিধিমালা: ১. শাসক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে কিসাসের বিধান বাস্তবায়ন করা: বিশৃঙ্খলা, নাশকতা, ফিতনা-ফাসাদ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে শাসক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে কিসাসের বিধান বাস্তবায়ন করা হবে। স্বয়ং তিনিই এটি বাস্তবায়ন করবেন এবং অনুমতি দিবেন যাতে করে (কিসাস গ্রহণের ক্ষেত্রে) বাড়াবাড়ি বা নিপীড়ন না হয়ে যায় এবং যাতে করে বিধানটি ইসলামী শরীয়া ভিত্তিক বাস্তবায়ন হয়।
২. মূল বিষয় অপরাধীদের সাথে অপরাধের শিকার ব্যক্তির সমআচরণ করা: কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوْا بِمِثْلِ مَا عُوْقِبْتُمْ بِ “যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তাহলে ঠিক ততটুকু করবে যতটুকু অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে।” [সূরা নাহল: ১২৬]
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ইহুদি ব্যক্তির মাথাকে থেতলিয়ে দিয়েছিলেন যে ইহুদি এক দাসীর মাথাকে দুই পাথরের মাঝখানে রেখে হত্যা করেছিল। যেমনটা দাসীর সাথে করা হয়েছে। অনুরূপভাবে যদি কেউ কোনো ব্যক্তির দুই হাত কেটে হত্যা করে অনুরূপভাবে হত্যাকারীর সাথে তেমনই আচরণ করা হবে।
৩. ধারালো অস্ত্র দ্বারা কিসাস বাস্তবায়ন করা: যেমন ছুরি বা তরবারি এবং এই জাতীয় কিছু। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ
"যদি তোমরা কাউকে হত্যা করো তাহলে উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করো।”
৪. নিহত ব্যক্তির অভিভাবক যদি শারঈ পদ্ধতি অনুসারে উত্তমভাবে কিসাস গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন তাহলে শাসক এক্ষেত্রে তাকে দায়িত্ব দিবেন: আর তা না হলে শাসক তাকে এমন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতে আদেশ করবেন যিনি উত্তমভাবে কিসাস গ্রহণের সক্ষমতা রাখেন।
দ্বিতীয় প্রকার: ইচ্ছাকৃত হত্যার সাদৃশ্য হত্যা
এমন অস্ত্র দিয়ে কোনো ব্যক্তির উপর আক্রমণ করার ইচ্ছা করা যা দিয়ে অধিকাংশ সময় মানুষ নিহত হয় না, কিন্তু এক্ষেত্রে কেউ মারা গেল। এ ধরনের হত্যাকে আখ্যায়িত করা হয় ইচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে। কারণ এ ধরনের হত্যা প্রহার বা আহত করার দিক দিয়ে ইচ্ছাকৃত হত্যার সাথে সাদৃশ্য রাখে এবং আহত করার দিক দিয়ে তা ভুলের সাথেও সাদৃশ্য রাখে। একারণেই ইচ্ছা সাদৃশ্য হত্যার হুকুমটি ইচ্ছা এবং ভুলবশত এর মাঝামাঝি। যদিও এক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তিকে শিক্ষা দেওয়া অথবা তাকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।
ইচ্ছা সাদৃশ্য হত্যার ধরন এবং উদাহরণ:
১. (নিহত ব্যক্তিকে) সাধারণত মারা যায় না এমন চাবুক বা সামন্য ছোটো পাথর অথবা ছোটো লাঠি দিয়ে আঘাত করা। অথবা তাকে ঘুষি মারা বা কিল দেওয়া, যাতে সাধারণত মারা যায় না কিন্তু এক্ষেত্রে সে মারা গেল।
اللكم তথা হাতের আঙ্গুল একত্র করে আঘাত করা।
اللكز তথা হাতের আঙ্গুল একত্র করে বুকে আঘাত করা।
২. তাকে পানির এমন দিকে বেঁধে ফেলে দেওয়া যেখানে পানি কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে হঠাৎ পানি বেশি হওয়ায় সে তাতে মারা যায়। অনুরূপভাবে যদি তাকে এমন কম পানি ফেলে দিল যেখানে সাধারণত কেউ ডুবে যায় না কিন্তু সে ডুবে িেগয়ে মারা গেল।
৩. বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তির পাশে তাঁর অন্যমস্কতা অবস্থায় হঠাৎ চিৎকার করার ফলে সে মারা গেল। অথবা বাড়ির ছাদের উপর কোনো শিশু বা জ্ঞানহীন ব্যক্তির কাছে হঠাৎ চিৎকার করার কারণে সে ছাদের উপর থেকে পড়ে মারা গেল।
ইচ্ছা সাদৃশ্য হত্যার বিধান:
১. পরকালীন বিধান: পরকালে হত্যাকারীর জন্য রয়েছে বঞ্চনা, লাঞ্চনা ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। কারণ সে তার কৃতকর্মের দ্বারা নিষ্পাপ ব্যক্তির নিহতের কারণ হয়েছে। তবে তাঁর শাস্তি ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তির তুলনায় কম।
২. ইহকালীন বিধান: হত্যা করার শাস্তিস্বরূপ তাঁর উপর কঠোর রক্তপণের বিধান বাস্তবায়ন করা হবে। ইচ্ছাকৃত হত্যার বদলাস্বরূপ তার উপর কিসাস বাস্তবায়ন হবে না। যদিও নিহত ব্যক্তির অভিভাবক তার কিসাস দাবি করে। অপরাধীর সম্পত্তি থেকে কাফফারা আবশ্যক হবে। আর তা হলো একটি গোলাম আজাদ করা। আর যদি তার সক্ষমতা না থাকে তাহলে সে ধারাবাহিক দুই মাস সিয়াম পালন করবে। পরিশোধযোগ্য তিন বছর সময়ে হত্যাকারীর উত্তরাধিকারীর উপর নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের জন্য দিয়াত প্রদান নিশ্চিত করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রযিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রয়েছে, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: عَقْلُ شِبْهِ الْعَمْدِ مُغَلَّظٌ مِثْلُ عَقْلِ الْعَمْدِ، وَلَا يُقْتَلُ صَاحِبُهُ
"ইচ্ছা সাদৃশ্য হত্যার ক্ষতিপুরণ যেন ইচ্ছাকৃত হত্যার দিয়াতের মতোই কঠোর। কিন্তু এখানে ঘাতককে হত্যা করা যাবে না।
মুগীরা বিন শু'বাহ এর হাদীস। তিনি বলেন, ضَرَبَتِ امْرَأَةٌ ضَرَّتَهَا بِعَمُودِ فُسْطَاطٍ وَهِيَ حُبْلَى، فَقَتَلَتْهَا ، فَجَعَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دِيَةَ الْمَقْتُولَةِ عَلَى عَصَبَةِ الْقَاتِلَةِ
“এক মহিলা তার সতীনকে ঘরের খুঁটি দ্বারা আঘাত করল। সে ছিল গর্ভবতী মহিলা। (আঘাতকারী মহিলা আঘাত দিয়ে) তাকে মেরে ফেলল। আল্লাহর রসূল হত্যাকারী মহিলার ওয়ারিশদের উপর নিহত মহিলার হত্যার (দিয়াত) ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ করলেন।”
তৃতীয় প্রকার: ভুলবশত হত্যা: এমন কাজ করা যা সম্পাদন করা জায়েয, কিন্তু কাজটি করার ফলে কোনো নিষ্পাপ ব্যক্তি মারা গেল, অথচ ভুলবশত হত্যাকারী ব্যক্তির সেরকম কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
ভুলবশত হত্যার প্রকারভেদ: ১. কাজের মাঝে ভুল করা: ঘাতকের জন্য বৈধ এমন কিছু করা ফলে যা নিষ্পাপ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেটা তার (ঘাতকের) ইচ্ছা ছিল না। যেমন ঘাতক কোনো শিকারিকে উদ্দেশ্য করে কিছু নিক্ষেপ করল, কিন্তু তা কোনো ব্যক্তিকে আঘাত করল, ফলে সে মারা গেল। অথবা ঘাতক ঘুমন্ত অবস্থায় পার্শ্ব পরিবর্তন করতে গিয়ে অন্য মানুষের উপর পড়ে গেল, ফলে সে মারা গেল।
২. উদ্দেশ্যর ক্ষেত্রে ভুল করা: ধারণা করে বৈধ কিছুকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করা পরবর্তীতে স্পষ্ট হলো যে এটা মানুষ। যেমন যদি সে কোনো কিছুকে নিক্ষেপ করে শিকারি বস্তু মনে করে, কিন্তু পরবর্তীতে স্পষ্ট হলো যে এটা নিষ্পাপ মানুষ।
৩. হত্যাকারী ছোটো বা পাগল হিসেবে বিবেচিত হওয়া: আর ছোটো বা পাগলের ইচ্ছাটা ভুল হিসেবেই গণ্য হবে। কেননা তাদের কোনো উদ্দেশ্য নেই।
ভুলবশত হত্যার ধরণ হতে পারে: কারণজড়িত মৃত্যু; যেমন কূপ খনন বা রাস্তায় গর্ত করা, যার কারণে একজন ব্যক্তির প্রাণনাশ হলো।
ভুলবশত হত্যার বিধান:
১. পরকালীন বিধান: (ঘাতকের উপর) কোনো প্রকার শাস্তি বা গুনাহ নেই। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأً، وَالنَّسْيَانَ، وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও বলপূর্বক যা করে নেওয়া হয়, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।"
২. দুনিয়ার বিধান: তিন বছরের মেয়াদে ঘাতকের উত্তরাধিকার এর উপর (দিয়াত) ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক এবং উটের প্রতি শ্রেণি হতে ৫ টি উট কম দেওয়া।
২. সক্ষম হলে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস সিয়াম পালন করবে: আল্লাহ তাআলার বাণী: فَمَنْ لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةٌ مِّنَ اللَّهِ "যদি সে (দাস) না পায়, তাহলে ধারাবাহিক ভাবে দুই মাস সিয়াম পালন করবে, যা আল্লাহর পক্ষ হতে তাওবা হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে...।” [সূরা নিসা: ৯২]
অসুস্থ বা বার্ধক্যজনিত কারণে সিয়াম পালন করতে অক্ষম হলে তার জিম্মায় কাফফারা অবশিষ্ট থাকবে। এর পরিবর্তে খাবার খাওয়ানো বৈধ হবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা তা উল্লেখ করেননি। কাফফারা সংক্রান্ত বিষয়দ দলীলের উপর নির্ভরশীল, কিয়াস এর উপর নয়।
টিকাঃ
৮৬৭ 'সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৫৬৫; আহমাদ ২/১৮৩।
৮৬৯ সহীহুল বুখারী, হা. ২৪১৩, সহীহ মুসলিম, হা. ১৬৭২।
৮৭০ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৪২৯৫ ও সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৩৫৪।
৮৭১ ইবনু মাজাহ, হা. ২৬২৬ এবং অন্যান্যরা হাসান সানাদে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৭/২৫৯ এবং সহীহ ইবনে মাজাহ, হা. ২১২৫।
৮৭২ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৪০১; ইবনু মাজাহ, হা. ২০৪১।
৮৭৩ সহীহুল বুখারী, হা, ৬৯১৫।
৮৭৪ সুনানুত তিরমিযি, হা. ১৪৩৩, ১৪৩৪; ইবনু মাজাহ, হা. ২৬৬১, ২৬৬২; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবনে মাজাহ, হা. ২১৫৬।
৮৭৫ সহীহ মুসলিম, হা. ১৬৯৫।
৮৭৬ ** সহীহ মুসলিম, হা. ৪৯৪৯, ফুআ. ১৯৫৫।
৮৭৭ সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৫৬৫; আহমাদ ২/১৮৩।
৮৭৯ সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৮৫, ফুআ. ১৬৮২।
৮৮০ 'ইবনু মাজাহ, হা, ২০৪৩; বায়হাকী এবং তিনি সহীহ বলেছেন। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া, নং ৮২।
📄 কোনো ব্যক্তি প্রাণনাশ ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্যাতন করা
তা হলো, ব্যক্তির উপর এমন প্রত্যক আঘাত করা যার ফলে ব্যক্তির প্রাণনাশ হয় না। যেমন যেকোনো ধরনের আঘাত, অঙ্গহানি ইত্যাদি। এই ধরনের অপরাধে কিসাস বাস্তবায়ন করতে হলে কুরআন, হাদীস, ইজমার দলীল আবশ্যক।
কুরআন থেকে দলীল: আল্লাহ তাআলার বাণী: وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ "নিশ্চয়ই আর আমি তাদের প্রতি রাতে ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময় চোখ, নাকের বিনিময় নাক, কানের বিনিময় কান, দাঁতের বিনিময় দাত, (তদ্রুপ অন্যান্য) বিশেষ জখমেরও বিনিময় রয়েছে।” [সূরা মায়িদাহ: ৪৫]
হাদীস থেকে দলীল: রুবাইয়্যা কর্তৃক এক দাসীর "সানিয়া" দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় আল্লাহর রসূল বলেন: كِتابُ اللهِ القِصَاصُ "কুরআনের বিধান হলো কিসাস।”
যদি সম্ভব হয় তাহলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটনা ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে আলেমগণ কিসাস আবশ্যক এর উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
এর তিন প্রকার: ১. আঘাতজনিত অপরাধ।
২. অঙ্গহানি জনিত অপরাধ।
৩. কোনো অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া।
প্রথম প্রকার: আঘাতজনিত অপরাধ: এটা দুইভাগে বিভক্ত:
প্রথম: মাথা বা চেহারায় আঘাত করা। যেটাকে বলা হয় الشجاج তথা ফাটল বা ক্ষত, شَجَّةٌ এর বহুবচন। মাথায় এক প্রকার ক্ষত।
দ্বিতীয়: সম্পূর্ণ শরীরে আঘাত যেটাকে বলা হয় الجرح তথা জখম; যা شَجَّةٌ নয়।
প্রথম ভাগ: মাথা বা চেহারায় আঘাতসমূহ। এটা দশ প্রকার:
১. الحارصة তথা এমন আঘাত যা চামড়াকে ঝলসে দেয়। অর্থাৎ যে আঘাত সামান্য বিদীর্ণ করে, রক্তাক্ত করে না। যেমন আঁচড় বা খামচির দাগ। যাকে বলা হয়: القاشرة এবং الملبطاء তথা আঁচড় কাটা।
২. الدامية তথা এমন আঘাত যার ফলে আক্রান্ত জায়গাটা রক্তাক্ত হয়। ফলে সেখান থেকে হালকা রক্ত বের হয়। তাকে বলা হয় البازلة এবং الدَامِعَةٌ । এটা চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩. الباضعة তথা এমন আঘাত যা চামড়ার নীচের মাংসকে বিদীর্ণ করে কিন্তু তা হাড় পর্যন্ত পৌঁছায় না। অর্থাৎ অত্যন্ত সূক্ষ্ম আঘাত।
৪. المتلاحمة তথা এমন আঘাত যা মাংসকে বিদীর্ণ করে, কিন্তু মাংস এবং হাড়ের মাঝখানে যে চামড়া আছে সে পর্যন্ত পৌঁছায় না।
৫. السمحاق তথা এমন আঘাত যেটা মাথার গোশত ও হাড়ের মাঝের পাতলা চামড়া (অস্থি আবরক ঝিল্লি) পর্যন্ত পৌঁছায়। এই নামেই উক্ত আঘাতের নামকরণ করা হয়েছে।
আর এই পাঁচ প্রকারে কোনো কিসাস অথবা দিয়াত নেই। বরং এক্ষেত্রে হুকুমাহ বা সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর হুকুমার পদ্ধতি: অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দাস গণ্য করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বাবস্থা অনুযায়ী তার একটি মূল্য নির্ধারণ করা, অতঃপর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের অবস্থানুযায়ী একটি মূল্য নির্ধারণ করা। এরপর মূল্য হ্রাসের অনুপাত অনুযায়ী তার উপর একটি দিয়াত ধার্য করতে হবে।
৬. الْمُوضِحَةُ তথা এমন আঘাত যা অস্থি আবরক ঝিল্লিকে বিদীর্ণ করে হাড়কে বের করে দেয়। এর ক্ষতিপূরণ পাঁচটি উট অর্থাৎ দিয়াতের দশভাগের এক ভাগের অর্ধেক।
৭. الْهَاشِمَةٌ তথা এমন আঘাত যার ফলে হাড় বের হয়ে যায় এবং ভেঙে যায়। এর ক্ষতিপূরণ দশটি উট।
৮. الدّّامَّةُ। তথা এমন আঘাত যার ফলে হাড় একটি স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়। চাই হাড় ভেঙে যাক বা বের হয়ে যাক অথবা কোনোটিই না হয়। এর ক্ষতিপূরণ ১৫টি উট।
৯. المَأْمُوْمَةٌ। তথা এমন আঘাত যা সরাসরি মাথার মগজকে বিদীর্ণ করে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের পর্দায় আঘাত করে। এটাকে ২৩১৯ বলা হয়। এ অপরাধের ক্ষতিপূরণ হলো পূর্ণ দিয়াতের এক- তৃতীয়াংশ।
১০. الدَّامِغَة তথা এমন আঘাত যা মগজের পর্দা বিদীর্ণ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এর ক্ষতিপূরণ পূর্ণ দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ।
এর সাথে আরও একটি প্রকার সম্পৃক্ত করা যায়, الجائفة তথা এমন আঘাত যা পেটের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়। যা সাধারণত দেখা যায় না। যেমন পেটের, পিঠের, বুকের, কণ্ঠনালীতে, মূত্রথলির ভিতরে আঘাতসমূহ। তবে এধরনের আঘাতকে الشجاج বলা হবে না, কেননা তা চেহারা বা মাথায় আঘাত নয়। তারা (ফকীহগণ) এই প্রকারকে এখানে উল্লেখ করেছেন উল্লিখিত প্রকারসমূহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়। এতে ক্ষতিপূরণ হলো, (বৈধ ব্যক্তি হত্যার পূর্ণ) দিয়াতের এক-তৃতীয়াংশ।
এসকল আঘাতের দলীলসমূহ: ১. আবু বকর বিন মোহাম্মদ বিন আমর বিন হাযম, তিনি তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন। রসূল ইয়ামানবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেন, যাতে উল্লেখ ছিল- وَفِي الْجَائِفَةِ ثُلُثُ الدِّيَةِ، وَفِي الْمُنَقَلَةِ خَمْسَ عَشْرَةَ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي كُلِّ أَصْبُعِ مِنْ أَصَابِعِ الْيَدِ وَالرِّجْلِ عَشْرٌ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي السِّنَّ خَمْسٌ مِنَ الْإِبِلِ، وَفِي الْمُوضِحَةِ خَمْسٌ مِنَ الْإِبِلِ
"যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে দেয় তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। আর যে জখমে হাড় স্থানচ্যুত হয় তাতে ১৫ টি উট। হাত পায়ের আঙুলে দশটি করে উট। এক দাঁতে পাঁচ উট। আর যে জখমে হাড় দেখা যায় তাতে পাঁচটি উট। "
২. যে জখমে হাড় স্থানচ্যুত হয় তাতে ১৫ টি উট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন।
৩. যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন। আমর বিন হাসান এর হাদীসে উল্লিখিত রয়েছে:
وَفِي الْجَائِفَةِ ثُلُثُ الدِّيَةِ
“যে জখম পেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায় তাতে রয়েছে এক তৃতীয়াংশ দিয়াত।
৪. যায়েদ বিন সাবিত আছারে এসেছে,
أنه قضى فِي الْهَاشِمَةِ عَشْرٌ مِنَ الْإِبِلِ، ولم يُعرف له مخالف “যে জখমে হাড় ভেঙে যায় তাতে তিনি ১০ টি উট দিয়াত হিসেবে ফয়সালা করেছেন। " কিন্তু কেউ তার বিরোধিতা করেছেন বলে জানা যায়নি।
৫. উপর্যুক্ত আমর বিন হাযমের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে الْمَأْمُومَةُ। তে এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিপূরণ। আর الدامغة বা মস্তিস্কের পর্দায় আঘাত হলো এমন জখম যা الْمَأْمُومَةٌ। বা মাথায় আঘাতের থেকে বেশি ক্ষত। তাহলে সেটার দিয়াত হবে الْمَأْمُومَةٌ এর থেকে অধিক তাহলে الدامغة এর দিয়াত হলো এক-তৃতীয়াংশ।
উল্লিখিত আঘাতসমূহের ক্ষেত্র শুধুমাত্র الموضحة আঘাত ছাড়া অন্য কোনো প্রকার আঘাতে কিসাস আবশ্যক হবে না। কারণ এই আঘাতের ধরন এবং অনুরূপ বদলা গ্রহণ সহজ হয় বলে। আর এ ছাড়া অন্য আঘাতসমূহের ক্ষেত্রে আঘাত কম বা বেশি নির্ণয় করা এবং এক্ষেত্রে অনুরূপ বদলা নেওয়া কঠিন।
দ্বিতীয় ভাগ: সম্পূর্ণ শরীরে আঘাত: এধরনের আঘাত বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। মাথা কিংবা চেহারার যে সকল আঘাতে কিসাস নেই, ঠিক একইভাবে শরীরেও একই ধরনের আঘাতে কিসাস নেই। তবে الموضحة তথা যে আঘাতে শরীরের কোনো অংশ কেটে যায়; যেমন বুক অথবা ঘাড়, এসবের ক্ষেত্রে কিসাস প্রযোজ্য হবে।
দ্বিতীয় প্রকার: অঙ্গহানি করা: এ ধরনের অপরাধ তিনভাগে বিভক্ত: ১. ইচ্ছাকৃত ২. ইচ্ছা সাদৃশ্য ৩. ভুলবশত।
ইচ্ছা সাদৃশ্য এবং ভুলবশত অপরাধের ক্ষেত্রে কিসাস আবশ্যক হবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ করলে (যেমন হত্যা করা) তাহলে তিনটি শর্তে কিসাস আবশ্যক হবে:
১. কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি ব্যতীত বদলা নেওয়া সম্ভব হওয়া। শরীরের কোনো জোড়ায় কেটে যাওয়া অথবা এমনভাবে কেটে যাওয়া যার সীমা জোড়া পর্যন্ত পৌঁছায়; যেমন আংগুল, কজ্বির হাড়, কনুই ইত্যাদি। সুতরাং এমন আঘাত সমূহের কিসাস নেই যার কোনো শেষ সীমা নেই। যেমন الجائفة তথা পেটে আঘাত এবং দাঁত ছাড়া কোনো হাড় (যেমন, উরু, বাহু, পায়ের নলা) ভেঙ্গে যাওয়াতে কিসাস নেই।
২. নাম এবং স্থানের দিক দিয়ে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার উভয়ের অঙ্গের মাঝে সমতা হওয়া। সুতরাং ডান হাতের বদলায় বাম হাত, কনিষ্ঠার বদলায় অনামিকা গ্রহণ করা হবে না এবং মূল অঙ্গের বদলায় বর্ধিত অঙ্গও কিসাস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
৩. পূর্ণতা এবং সুস্থতার দিক দিয়ে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার উভয়ের অঙ্গ সমান হওয়া। সুস্থ অঙ্গের বদলায় অবশ বা অসাড় এবং অর্ধেক আঙ্গুলের বদলায় পূর্ণ আঙ্গুল কিসাস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তৃতীয় প্রকার: কোনো অঙ্গ অকেজো করে দেওয়া
ঘাতক যদি কোনো অঙ্গকে অবশ করে দেয় তাহলে আঘাতের উপর কিসাস আবশ্যক হবে না। এর কারণ হলো যুলমের সম্ভাবনা ছাড়া তার উপর বদলা নেওয়া অসম্ভব। এক্ষেত্রে ঘাতকের উপর পূর্ণ দিয়াত আবশ্যক। আর যদি আঘাতের ফলে অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে যায় (পুরোপুরি নষ্ট না হয়ে) এবং যদি ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় তবে যতটুকু কার্যক্ষমতা হারিয়েছে ততটুকু দিয়াত ওয়াজিব; যেমন নষ্টের পরিমাণ যদি অর্ধেক কিংবা এক-চতুর্থাংশ হয় তবে অর্ধ দিয়াত অথবা পূর্ণ দিয়াতের এক-চতুর্থাংশ দিতে হবে। এভাবেই হিসাব করা হবে। তবে যদি কার্যক্ষমতা হ্রাসের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব না হয়, তখন সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে শাসক ইজতিহাদ করে দিয়াত নির্ধারণ করবেন, এটাই ওয়াজিব।
মানবদেহের কার্যক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিম্নরূপ: বুদ্ধি লোপ পাওয়া, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়া, ঘ্রাণশক্তি চলে যাওয়া, বাকশক্তি, কণ্ঠস্বর ও মুখের স্বাদ হারিয়ে যাওয়া, চর্বণশক্তি ও বীর্যপাতের হ্রাস ঘটা, প্রজনন ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়া ইত্যাদি।
টিকাঃ
৮৮১ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৮৯৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৭৫।
৮৮২ সুনান নাসাঈ ২/২৫২ হা. ৪৮৫৩; হাকিম ৩৯৭; বায়হাকী ৮/৭৩ এবং এটা সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৭/৩২৬।
৮৮৩ সুনান নাসাঈ ২/২৫২ হা. ৪৮৫৩; হাকিম ৩৯৭; বায়হাকী ৮/৭৩ এবং এটা সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৭/৩২৬।
৮৮৪ আব্দুর রাজ্জাক তার কিতাবের: ৯/৩১৪; বায়হাকী: ৮/৭২।