📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 স্তন্যপানের পরিচয়, শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল এবং বিধান

📄 স্তন্যপানের পরিচয়, শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল এবং বিধান


১. رضاع বা রিযা'- এর পরিচয়:
رضاع -এর শাব্দিক অর্থ : رضاع শব্দের র হরফে যবর দিয়ে, যের দিয়ে পড়াও বৈধ রয়েছে। অর্থ স্তন থেকে দুধ চোষা বা পান করা।
شرعاً: هو مص طفل دون الحولين لبناً ثاب عن حمل، أو شربه أو نحوه.
পরিভাষিক অর্থ: সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করা ২ বছরের কম শিশুর দুধ চোষা অথবা পান করা অথবা অনুরূপ।
২. স্তন্যপান শরীয়ত সম্মত হওয়ার প্রমাণ: স্তন্যপান শরীয়ত সম্মত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ تَعَاسَرْتُمْ فَسَتُرْضِعُ لَهُ أُخْرَى)
"তোমরা যদি নিজ নিজ দাবিতে অনমনীয় হও তাহলে অন্য নারী তাকে দুধপান করাবে।” সূরা তালাক : ৬
মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ أَرَدْتُمْ أَنْ تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ
"আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের কোনো ধাত্রীর দুধপান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোনো দোষ নেই।” [সুরা বাক্বারাহ: ২৩৩]
৩. স্তন্যপান-এর হুকুম: বিবাহ হারাম হওয়া, মাহরাম সাব্যস্ত হওয়া, নির্জনে সাক্ষাতের বৈধতা ও তাকানোর ক্ষেত্রে বংশীয় সম্পর্কের যে হুকুম, রেযা‘ এর ক্ষেত্রে একই হুকুম। সুতরাং এটি আত্মীয়তা আবশ্যক করে এবং বিবাহ হারাম সাব্যস্ত করে।
রেযা‘ এর কারণে হারাম সাব্যস্ত হওয়ার দলীল হলো কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা। কুরআনের দলীল: মহান আল্লাহ বলেন:
وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخْوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ
“তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের সেই মা যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন এবং তোমাদের দুধ বোন।” [সুরা নিসা: ২৩]
এই আয়াত নারীদের মধ্য থেকে বিবাহ নিষিদ্ধ সম্পর্কে। সুন্নাহ থেকে দলীল: আয়িশাহ (রাঃ) এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সঃ) বলেছেন:
إِنَّ الرَّضَاعَةَ تُحَرِّمُ مَا تُحَرِّمُ الْوِلَادَةُ
"জন্মসূত্রে যা হারাম, দুধপান সূত্রও তাকে হারাম করে।" ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামযাহ (রাঃ) এর মেয়ের ব্যাপারে বলেন:
إِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِي، إِنَّهَا ابْنَةُ أَخِي مِنَ الرَّضَاعَةِ، وَيَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ بِمَا يَحْرُمُ مِنَ الرَّحِيمِ
“সে আমার জন্য (বিবাহর জন্য) বৈধ নয়। কেননা সে আমার দুধ সম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ে। দুধ সম্পর্কের কারণে তাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ, রক্ত সম্পর্কের কারণেও যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ।”
ইজমা থেকে দলীল: দুধপান করার মাধ্যমে বিবাহ হারাম সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়ে উম্মতের আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

টিকাঃ
৮৪৫ মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ২৬৪৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪৪৪।
৮৪৬ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১০০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪৪৭ শব্দ ইমাম মুসলিমের।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 হারামকারী দুধপান-এর শর্ত এবং দুধপানের কারণে তৈরি আত্মীয়তার বন্ধন

📄 হারামকারী দুধপান-এর শর্ত এবং দুধপানের কারণে তৈরি আত্মীয়তার বন্ধন


১. হারামকারী দুধপান-এর শর্তসমূহ: দুধপান করাকে আত্মীয়তার হিসেবে গণ্য করা এবং হারাম সাব্যস্তকারী হবে ২টি শর্ত সাপেক্ষে। সে দুটি হলো:
১. দুধপান করাটা শিশুর প্রথম ২ বছরের মধ্যে হতে হবে। ২ বছরের পর হলে তা গণ্য করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ “যে ব্যক্তি দুধপানের সময় পূর্ণ করতে চায়, তার জন্য মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৩]
এর সাথেই মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ﴿ "দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।" [সুরা লুকমান: ১৪]
উম্মু সালামাহ এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لَا يُحَرِّمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ إِلَّا مَا فَتَقَ الأَمْعَاءَ فِي الثَّدْيِ، وَكَانَ قَبْلَ القِطَامِ "দুধ ছাড়ানোর সময়ের (বয়সের) পূর্বে স্তনের বোটা হতে শিশুর পাকস্থলীতে দুধ না গেলে দুধপানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় না (দুধপানের ফলে নিষিদ্ধ বিষয় কার্যকর হয় না)।"
فَتَقَ الْأَمْعَاءَএর অর্থ হচ্ছে পেটে পৌঁছেছে এবং শরীর বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং দুধপানের ফলে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ছোটো বেলায় দুধ পান করতে হবে; যে সময় তা শিশুর খাদ্যের পরিপুরক হয় এবং শারীরিক গঠন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
২. তৃপ্তিভরে পাঁচ চোষণ বা তার বেশি খাওয়াতে হবে। আয়িশাহ এর হাদীস। তিনি বলেন, كَانَ فِيمَا نَزَلَ مِنَ الْقُرْآنِ: عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ، بِخَمْسٍ مَعلو صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهُنَّ فِيهَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ সূলুল্লাহ
“কুরআনে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ‘দশবার দুধপানে হারাম সাব্যস্ত হয়’ অতঃপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ﴿ এর দ্বারা ‘পাঁচবার পান করলে হারাম সাব্যস্ত হয়’। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করেন অধ্য ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসেবে তিলাওয়াত করা হতো।”
এর তিলাওয়াত মানসুখ হয়েছে কিন্তু তার বিধান রয়ে গেছে।
যদি চোষণ দিয়ে দুধপান করা ব্যতীত শিশুর পেটে দুধ পৌঁছে; যেমন-বাচ্চার মুখে দুধের ফোঁটা পড়া অথবা পাত্র ইত্যাদির মাধ্যমে খাওয়ানো; তাহলেও তা দুধপান করার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে এটা কমপক্ষে ৫ বার হতে হবে।
২. দুধপানের কারণে আত্মীয়তার ক্ষেত্রে সাব্যস্ত বিষয়াবলি: এই ব্যাপারে ২টি বিধান সাব্যস্ত হয়- ১. এমন বিধান যা হারামের সাথে সম্পৃক্ত; ২. এমন বিধান যা সম্পর্ক হালাল হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত।
হারামের সাথে সম্পৃক্ত: বংশগত আত্মীয়তার মাধ্যমে যেভাবে বিবাহ হারাম হয়, তেমনিভাবে দুধপান করানোর মাধ্যমেও বিবাহ হারাম হয়। যেমন- দুধ মা, নানী এবং তারও উপরে, মেয়ে অথবা তারও নীচে, আপন বোন অথবা বৈমাত্রেয় কিংবা বৈপিত্রেয় বোন; তারা দুধপানের সম্পর্কের জন্য হারাম সাব্যস্ত হবে।
যা হালালের সাথে সম্পৃক্ত: এমন কিছু বিষয় যা আপনি এবং আপনার আত্মীয়তার মাঝে বংশগতভাবে হালাল সাব্যস্ত হয়. ঠিক দুধপানের কারণেও হালাল সাব্যস্ত হয়। যেমন- মা-মেয়ে। এই দুধপান করা পরস্পরের দিকে তাকানো এবং নির্জনে গমনের বৈধতা দেয়। আয়িশাহ এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِنَّ الرَّضَاعَةَ تُحَرِّمُ مَا تُحَرِّمُ الْوِلَادَةُ
“জন্মসূত্রে যা হারাম, দুধপান সূত্রও তাকে হারাম করে।”

টিকাঃ
৮৪৭ তিরমিযী, হা. ২১৩১ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া, নং ২১৫০।
৮৪৮ সহীহ মুসলিম, হা, ফুআ, ১৪৫২।
৮৪৯ মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৬৪৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪৪৪।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 দুধপান সাব্যস্তকরণ

📄 দুধপান সাব্যস্তকরণ


সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত একজন দুধপানকারিনী মহিলার সাক্ষ্য দানের মাধ্যমে দুধপান করা সাব্যস্ত হবে। সে নিজের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিক অথবা অন্যের ব্যাপারে। সে এভাবে সাক্ষ্য দিবে যে, সে কোনো শিশুকে ২ বছরের মধ্যে পাঁচ চোষণ দুধপান করিয়েছে। উকবাহ ইবনুল হারিস এর হাদীস। তিনি বলেন, تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً، فَجَاءَتِ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ: إِنِّي قَدْ أَرْضَعْتُكُمَا ، فَأَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «وَكَيْفَ وَقَدْ قِيلَ، دَعْهَا عَنْكَ أَوْ نَحْوَهُ
"এক নারীকে আমি বিয়ে করলাম। কিন্তু আরেক নারী এসে বলল, আমি তো তোমাদের দুই জনকে দুধপান করিয়েছি। তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, এমন কথা বলা হয়েছে তখন বিয়ে কীভাবে সম্ভব? তাকে তুমি ত্যাগ করো। অথবা তিনি সে রকম কিছু বললেন।”
যেহেতু এটি লজ্জাস্থান বিষয়ক সাক্ষ্য, সেহেতু এতে নারীর সাক্ষ্যকে পুরুষের সাক্ষ্য ব্যতীতই গ্রহণ করা হবে প্রসবের সাক্ষ্যর মতো।

টিকাঃ
৮৫০ 'সহীহুল বুখারী, হা. ২৬৬০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00