📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 ইদ্দতের সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যকীয় বিষয়াবলী এবং ইদ্দত পরবর্তী ফলাফল

📄 ইদ্দতের সাথে সংশ্লিষ্ট আবশ্যকীয় বিষয়াবলী এবং ইদ্দত পরবর্তী ফলাফল


১. তালাকের ইদ্দত: মহিলা যখন তালাকের ইদ্দত গণনা করবে তখন তার দুই অবস্থা:
ক. যে রাজঈ তালাক প্রাপ্তা; খ. বা বাঈন তালাক প্রাপ্তা
প্রথমত: রাজঈ তালাক প্রাপ্ত মহিলার জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো ধার্য করা হবে:
১. অবশ্যই তার জন্য স্বামীর সাথে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে; যদি সেখানে কোনো শারঈ প্রতিবন্ধকতা না থাকে।
২. অবশ্যই তার জন্য খাবার, পোশাক এবং অন্যান্য ভরণ-পোষনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. আবশ্যই তাকে সেই বাড়িতে বসবাস করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যাবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ “তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে স্থানে বাস করো, তাদেরকেও সে স্থানে বাস করতে দাও।” [সূরা তালাক: ৬]
আরও বলেছেন:
لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ
"তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করো না এবং তারা নিজেরাও যেন বের না হয়; যদি না তারা স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।” [সূরা তালাক : ১]
৪. কোনো পুরুষের বিবাহ প্রস্তাব গ্রহণ করা তার জন্য হারাম। কারণ সে এখনো স্বামীর বিবাহে আছে এবং স্ত্রীর হুকুমে আছে। কেনন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا
"যদি তারা সংশোধন চায় তবে তাদের স্বামীগণ এই ক্ষেত্রে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অধিক হকদার।” [সূরা বাক্বারাহ: ২২৮]
দ্বিতীয়ত: বাঈন তালাকের ইদ্দত পালনকারিণী মহিলা: -হয়তো সে গর্ভবতী হবে। -অথবা গর্ভবতী হবে না।
প্রথম: যদি গর্ভবতী হয় তাহলে নিম্নবর্তী বিষয়গুলো আবশ্যক হবে:
১. অবশ্যই স্বামীর পক্ষ হতে তাকে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ
"হে নাবী! (তোমার উম্মতকে বল) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা করো তখন তাদেরকে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও, ইদ্দতের হিসাব রেখো এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করো না এবং তারা নিজেরাও যেন বের না হয়; যদি না তারা স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।" [সূরা তালাক : ১]
২. ভরণপোষণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنْفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ)
"তারা গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করো।" [সূরা তালাক: ৬]
৩. যে বাড়িতে ইদ্দত পালন করছে সে বাড়িতেই তাকে থাকতে হবে। কোনো প্রয়োজন ব্যতীত সেই বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
(لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ) "তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করো না এবং তারা নিজেরাও যেন বের না হয়।" [সূরা তালাক : ১]
আর প্রয়োজনে বের হওয়ার দলীল জাবির এর হাদীস।
طلقَتْ خَالَتِي، فَأَرَادَتْ أَنْ تَجُدَّ نَخْلَهَا ، فَزَجَرَهَا رَجُلٌ أَنْ تَخْرُجَ، فَأَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: بَلَى اخرجي ، فَجُدِّي نَخْلَكِ، فَإِنَّكِ عَسَى أَنْ تَصَدَّقِي، أَوْ تَفْعَلِي مَعْرُوفًا "আমার খালা তালাকপ্রাপ্তা হন। এরপর তিনি তাঁর (খেজুর বাগানের) খেজুর পাড়ার ইচ্ছা করলেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে বাইরে যেতে বাঁধা দিলেন। তখন তিনি নাবী এর কাছে এলেন। নাবী বললেন: হ্যাঁ, তুমি তোমার বাগানের খেজুর পাড়ার জন্য বাইরে যেতে পারো। কারণ সম্ভবত তা থেকে অন্যদের সাদকা করবে অথবা অন্য কোনো ভালো কাজ করবে।”
দ্বিতীয়: মহিলা যদি গর্ভধারিণী না হয়: তাহলে সে গর্ভবতী মহিলার মতো সবই পাবে। শুধু ভরণপোষণ জাতীয় জিনিস ছাড়া; যেমন কাপড়। এর দলীল ফাতিমা বিনতে কায়েস এর হাদীস; তাকে যখন তার স্বামী অবশিষ্ট একটি তালাক দিয়ে দিলো, তখন নাবী বললেন: لَا نَفَقَةَ لَكِ إِلَّا أَنْ تَكُونِي حَامِلًا "সে গর্ভবতী না হলে, তার জন্য কোনো খোরপোষ নেই। "
খ. স্বামী মারা যাওয়ার ইদ্দত পালন:
মৃত স্বামীর ইদ্দত পালনকালে যে বিষয়গুলো মহিলার জন্য আবশ্যক হবে, সেগুলো হলো: ১. তার উপস্থিতিতে স্বামী যেই বাড়িতে মারা গেছে সেই বাড়িতেই তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। সেটা ভাড়া বাড়ি হোক অথবা ঋন হিসেবে অন্যের থেকে পাওয়া বাড়ি হোক। দলীল امْكُنِي فِي بَيْتِكِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ “ইদ্দত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার পূর্ব গৃহেই অবস্থান করবে।” অন্য বর্ণনায় ..... امْكُنِي فِي بَيْتِكِ الَّذِي جَاءَ فِيهِ نَعْيُ زَوْجِكِ।
"তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ যেখানে পেয়েছ, ইদ্দত পূর্ণ হওয়া তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান করো।” কোনো ওজর ব্যতীত সেই বাড়ি পরিবর্তন করতে পারবে না। যেমন সেখানে তার জীবনের ঝুঁকি আছে অথবা তাকে বাধ্য করা হয়েছে বা এ জাতীয় অন্য কোনো সমস্যার কারণে সে তার মন মতো স্থান পরিবর্তন করতে পারে।
২. যে বাড়িতে সে ইদ্দত পালন করবে সেই বাড়িতেই তাকে থাকতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে বের হতে পারবে না। যদি প্রয়োজনে বের হয় তবে দিনে বের হওয়া তার জন্য বৈধ আছে। কারণ রাতে ফাসাদের সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং অধিক প্রয়োজন ব্যতীত রাতে বের হবে না। কেননা দিনই প্রয়োজন পূরণের সময়।
৩. তাকে ইদ্দত পালনকালে সাজসজ্জা এবং সুগন্ধী ত্যাগ করতে হবে অর্থাৎ স্বামীর জন্য শোক পালন করতে হবে। শোক পালনের হুকুম আহকামের বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।
৪. তার জন্য কোনো ভরণপোষণ নেই। কেননা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে তার বৈবাহিক জীবনের ইতি ঘটেছে।

টিকাঃ
৮৩৯ সহীহ মুসলিম, হা. ৩৬১৩, ফুআ, ১৪৮৩।
৮৪০ সুনান আবু দাউদ, হা. ২২৮৬; নাসাঈ ৬/২১০; অর্থগতভাবে সহীহ মুসলিম, হা. ৩৫৮৯, ফুআ. ১৪৮০; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুন নাসাঈ, হা. ৩৩২৪।
৮৪১ তিরমিযী, হা. ১২২৪ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; ইবনু মাজাহ, হা. ২০৩১; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবনে মাজাহ, হা. ১৬৫১

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 শোক পালন

📄 শোক পালন


إحداد এর পরিচয় এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল:
১. إحداد এর পরিচয়:
إحداد এর শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা। কোনো মহিলা যখন সাজসজ্জা এবং সুগন্ধী ছেড়ে দেয় তখন সেই মহিলাকে আরবী ভাষায় مُحِدٌ ،حاد বলা হয়ে থাকে।
পরিভাষায়: إحداد বলা হয়, কোনো মহিলার সাজ সজ্জা, সুগন্ধি ছেড়ে দেওয়া। মহিলার প্রতি আগ্রহ এবং মিলনের চাহিদা তৈরি করে, এমন বিষয়কে ত্যাগ করা।
২. إحداد শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল:
إحداد বা যে মহিলার স্বামী মারা যায় তার উপর শোক পালন ওয়াজিব। উম্মে হাবিবা এর হাদীস। لَا تَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
"আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ হবে না। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুতে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।" এবং উম্মে আতীয়া আনছারী এর বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, كُنَّا نُهَى أَنْ نُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا، وَلَا نَكْتَحِلَ وَلَا نَتَطَيِّبَ وَلَا نَلْبَسَ ثَوْبًا مَصْبُوعًا، إِلَّا ثَوْبَ عَصْبٍ....
"কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হতো। তবে স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে হবে এবং আমরা যেন সুরমা, সুগন্ধি ব্যবহার না করি, রঙিন কাপড় না পরি; তবে হালকা রঙের হলে পরা যাবে।" শোক পালনকারী মহিলার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হলো- ১. সে সুগন্ধিও ব্যবহার ও সাজ-সজ্জা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। তাই সে উজ্জ্বল রংয়ের কাপড় পরবে না, সুরমা ব্যবহার করবে না, স্বর্ণ রূপা বা অন্য কিছুর অলংকার ব্যবহার করবে না। সে কোনো ধরনের রং ও ব্যবহার করবে না। উম্মে সালামা থেকে মারফু হাদীস। الْمُتَوَفَّى عَنْهَا زَوْجُهَا لَا تَلْبَسُ المُعَصْفَرَ مِنَ الثِّيَابِ، وَلَا المُمَشَّقَةَ، وَلَا تَخْتَضِبُ، وَلَا تَكْتَحِلُ
"কোনো মহিলার স্বামী মারা গেলে সে রঙ্গিন পোশাক, কারুকাজ করা জামা ও অলংকার পরবে না। মেহেদী লাগাবে না ও সুরমা ব্যবহার করবে না।" এবং উম্মে আতীয়া এর পূর্ববর্তী হাদীস। যা অতিবাহিত হয়েছে। ২. যে বাড়িতে সে ইদ্দত পালন করবে সে বাড়িতেই থাকবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বের হবে না। যেমন- ফুরাইয়া বিনতে মালেক এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
৮৪২ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৩৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪৮৬।
৮৪৩ 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩৪১; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৯৩৮।
৮৪৪ 'সুনান আবু দাউদ, হা. ২৩০৪; নাসাঈ, হা. ৩৫৩৫; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া, নং ২১২৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية