📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 লিআনের পরিচয় এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল ও হিকমাহ

📄 লিআনের পরিচয় এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল ও হিকমাহ


১. লিআনের পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: এটা لاعن এর মাসদার। যা اللعن থেকে নেওয়া। অর্থ: তাড়িয়ে দেওয়া, দূরে সরিয়ে রাখা।
شرعاً: شهادات مؤكدات بالأيمان، مقرونة باللعن من جهة الزوج وبالغضب من جهة الزوجة، قائمة مقام حد القذف في حق الزوج، ومقام حد الزنى في حق الزوجة.
পরিভাষায়: কসম বিশিষ্ট একাধিক সাক্ষ্য, যা স্বামীর পক্ষ থেকে অভিশাপযুক্ত আকারে আর স্ত্রীর পক্ষ থেকে ক্রোধ আকারে এসে থাকে। যা হবে স্বামীর উপর অপবাদের শাস্তি এবং স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের শাস্তি স্বরূপ।
আর এটাকে لعان বা লিআন নামে নামকরণ করার কারণ হলো- স্বামী পঞ্চমবার একথা বলে যে, নিশ্চই আমার উপর আল্লাহর অভিশাপ, যদি আমি মিথ্যাবাদী হই। তাদের দুজনের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী হবে। অতঃপর অভিশপ্ত হবে।
২. লিআন শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: লিআন শরীয়ত সম্মত হওয়ার উপর আল্লাহ তা'আলার এই বাণী প্রমাণ করে। তা হলো- وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ ٦)
"আর যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের কোনো সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে এই যে, সে আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী।" (সুরা নূর: ৬) [বিস্তারিত সূরা নূর ৬ থেকে ১০ আয়াত।]
সাহল ইবনু সা'দ এর হাদীস।
أَنَّ رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَرَأَيْتَ رَجُلًا وَجَدَ مَعَ امْرَأَتِهِ رَجُلًا، أَيَقْتُلُهُ أَمْ كَيْفَ يَفْعَلُ؟ فَأَنْزَلَ اللهُ فِي شَأْنِهِ مَا ذَكَرَ فِي القُرْآنِ مِنْ أَمْرِ الْمُتَلَاعِنَيْنِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَدْ قَضَى اللهُ فِيكَ وَفِي امْرَأَتِكَ قَالَ : فَتَلَاعَنَا فِي الْمَسْجِدِ وَأَنَا شَاهِدٌ، وفي رواية : فَتَلَاعَنَا وَأَنَا مَعَ النَّاسِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
"আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কী বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় অন্য কোনো লোককে দেখতে পায়, তবে কি সে তাকে হত্যা করবে? অথবা কী করবে? এরপর আল্লাহ তা'আলা তার ব্যাপারে কুরআনে উল্লিখিত লিআনের বিধান অবতীর্ণ করেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ফয়সালা দিয়েছেন। রাবী বলেন, তারা উভয়ে মসজিদে লিআন করল আর আমি উপস্থিত ছিলাম।”
অন্য বর্ণনায় রয়েছে: তারা উভয়ে লিআন করল আর আমি মানুষের সাথে আল্লাহর রসূল এর কাছেই ছিলাম। ৮৩৫
৩. লিআনকে শরীয়ত সম্মত করার হিকমাহ:
লিআনকে স্বামীর জন্য শরীয়ত সম্মত করার হিকমাহ: স্ত্রীর জিনার কারণে যেন তাকে লজ্জিত না হতে হয়, তার বিছানাকে কেউ নষ্ট না করে এবং অন্যের সন্তানকে যেন তার দিকে সম্পৃক্ত না করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে তার স্ত্রীর উপর প্রমাণ স্থাপন করতে পারে না এবং তার অপরাধ স্বীকার করে না। কেননা তার উপর তার কথা গ্রহনযোগ্য হয় না। কারণ দুজনের মাঝে শক্তিশালী শপথ ছাড়া আর কিছু প্রমাণ অবশিষ্ট থাকে না। সমস্যা সমাধান ও সংকীর্ণতা দূর করা এবং তার থেকে অপবাদের শাস্তি দূর করার জন্যই লিআনের বৈধতা। যখন সে নিজে ব্যতীত তার কোনো সাক্ষী থাকবে না এবং মহিলা তার শপথের বিপরীতে তার মতকেই পুনরাবৃত্তি করবে। তখন মহিলা থেকে শাস্তি রহিত হয়ে যাবে। অন্যথায় তার উপর শাস্তি আবশ্যক হবে।
যদি স্বামী শপথ করা থেকে সরে আসে, তাহলে তার উপর অপবাদের শস্তি বাস্তবায়ন হবে। যদি স্ত্রী তার স্বামীর শপথের পর শপথ থেকে সরে আসে, তাহলে তার স্বামীর শপথ ও তার শপথ থেকে সরে আসা, এ দুটি স্ত্রীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হবে। যা থেকে আর ফিরে আসা যাবে না এবং তার উপর তখন ব্যভিচারের শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে।

টিকাঃ
৮৩৫. মুত্তালাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩০৮, মুসলিম ১৪৯২।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 লিআনের শর্ত ও পদ্ধতি

📄 লিআনের শর্ত ও পদ্ধতি


১. লিআনের শর্ত সমূহ: ক. স্বামী-স্ত্রীর উভয়েই মুকাল্লাফ হওয়া (প্রাপ্ত বয়ষ্ক, জ্ঞানবান হওয়া)। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ
"আর যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে।” [সূরা নূর: ৬]
খ. স্বামী তার স্ত্রীকে একথা বলে অপবাদ দেওয়া যে, হে ব্যভিচারিনী, অথবা আমি দেখেছি তুমি ব্যভিচার করছো, অথবা তুমি ব্যভিচার করেছো।
গ. স্ত্রী তার স্বামীর অপবাদকে মিথ্যারোপ করবে এবং তার উপর অটল থাকবে লিআন শেষ হওয়া পর্যন্ত।
ঘ. বিচারকের বিচারের মাধ্যমে লিআন বাস্তবায়িত হবে।
২. লিআনের পদ্ধতি ও ধরন: লিআনের পদ্ধতি: স্বামী বিচারকের নিকট একদল মানুষের উপস্থিতিতে চারবার বলবে: আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিয়ে বলছি যে, আমি আমার অমুক স্ত্রীর উপর যে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেছি (স্ত্রী উপস্থিত থাকলে ইশারা করবে, অনুপস্থিত থাকলে নাম উল্লেখ করবে যাতে চিনা যায়) এবং এই ব্যাপারে আমি সত্যবাদী। অতঃপর পঞ্চমবার বাড়িয়ে বলবে: আমি যদি মিথ্যাবাদী হই তাহলে আমার উপর আল্লাহর অভিশাপ। অতঃপর স্ত্রী চারবার বলবে, আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিয়ে বলছি যে, আমার স্বামী আমার উপর যে অপবাদ দিয়েছে এ ব্যাপারে সে মিথ্যাবাদী। পঞ্চমবার বাড়িয়ে বলবে, যদি সে সত্যবাদী হয় তাহলে আমার উপর আল্লাহর গযব। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ ٦ وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ ٧ وَيَدْرَؤُا عَنْهَا الْعَذَابَ أَن تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ ٨ وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِن كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ ٩
"যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের কোনো সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে আল্লাহর নামে চার বার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। আর পঞ্চম বারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা'নত। আর স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে যদি সে চার বার আল্লাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামীই মিথ্যাবাদী। আর পঞ্চমবারে বলবে যে, তার স্বামী সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর নেমে আসবে আল্লাহর গযব।” [সূরা নূর: ৬-৯]

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 লিআনের সাথে সম্পৃক্ত হুকুমসমূহ

📄 লিআনের সাথে সম্পৃক্ত হুকুমসমূহ


যদি লিআন সম্পন্ন হয় তাহলে নিম্নের বিষয়গুলো প্রযোজ্য হবে: ১. স্বামীর উপর থেকে অপবাদের শাস্তি রহিত হয়ে যাবে। ২. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সাব্যস্ত হবে এবং একে অপরের জন্য চিরস্থায়ী হারাম হিসেবে গণ্য হবে। যদিও তাদের বিচারক পৃথক না করে। ৩. স্বামীর থেকে সন্তানের বংশের সম্পর্ক বাদ দেওয়া হবে আর স্বামী লিআনের সময় স্পষ্টভাবে সন্তানকে অস্বীকার করবে এই বলে যে, أشهد بالله إني لمن الصادقين فيما رميتها به من الزنى، وما هذا بولدي "আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, আমি সত্যবাদী। আমি তাকে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেছি এবং এটা আমার সন্তান না।” ইবনু উমার এর হাদীস। أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَاعَنَ بَيْنَ رَجُلٍ وَامْرَأَتِهِ ، فَفَرِّقَ بَيْنَهُمَا، وَأَلْحَقَ الوَلَدَ بِالْمُرْأَةِ "নিশ্চয়ই নাবী এক লোক ও তার স্ত্রীর মাঝে লিআন করালেন। তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন এবং সন্তান মহিলাকে দিয়ে দিলেন। "৮৩৬ ৪. যদি স্ত্রী লিআন না করে তাহলে তার উপর ব্যভিচারের শাস্তি ওয়াজিব হবে। কারণ তার স্বামীর শপথ সত্ত্বেও শপথ থেকে তার সরে আসাটা একটি শক্তিশালী প্রমাণ। যেটা তার উপর ব্যভিচারের শাস্তি আবশ্যক করে।

টিকাঃ
৮৩৬. 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৩১৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪৯৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00