📄 সুন্নাত তালাক এবং তার বিধান
ক. সুন্নত তালাক: সুন্নত তালাক দ্বারা উদ্দেশ্য- সুন্নত তালাক হলো ঐ তালাক, শরীয়তপ্রণেতা যার অনুমোদন দিয়েছেন, ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা অনুযায়ী যা স্তর অনুযায়ী কার্যকর হয়। আর উহা দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্যকরী হবে। ১. তালাকের সংখ্যা ২. তালাক কার্যকরী হওয়ার অবস্থা।
সুন্নাহ হলো স্বামীর যদি তালাকের প্রয়োজন হয় তবে পবিত্রতাকালীন অবস্থায় তালাক দিবে, যে পবিত্রতায় সে তার সাথে সহবাস করেনি। অতঃপর সে তাকে ছেড়ে দিবে এবং তার ইদ্দত অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় তালাক দিবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ)
"হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১]
অর্থাৎ, ঐসময়ের মধ্যে যখন নারীরা ইদ্দত পালন শুরু করবে। আর ইদ্দত হলো তাদের পবিত্রতাকালীন সময়। যেহেতু হায়েযের সময়কে ইদ্দত বলে গণনা করা হয় না।
ইবনু উমার ইবনু আব্বাস এবং সাহাবীদের একটি জামাআত এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন যে, الطير বা পবিত্র অর্থ হচ্ছে এমন পবিত্রতাকালীন সময় যে সময়ে সহবাস করা হয়নি।
খ. সুন্নাত তালাকের হুকুম: আলেমগণ সুন্নাত তালাক কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১] অর্থাৎ পবিত্র অবস্থায়।
📄 বিদআতী তালাক এবং তার বিধান
ক. তালাকে বিদয়ী হলো এমন তালাক যা স্বামী নিষিদ্ধ পন্থায় কার্যকর করে। যা শরীয়ত প্রণেতা নিষেধ করেছেন। আর তা কার্যকর হয় দুটি বিষয়ের একটির মাধ্যমে:
১. তালাকের সংখ্যা; ২. তা কার্যকর করার অবস্থা।
যদি এক শব্দের মাধ্যমে তিন তালাক দেয় অথবা একই পবিত্রতায় ভিন্ন ভিন্নভাবে তালাক দেয়, অথবা তাকে নেফাস বা হায়েয অবস্থায় তালাক দেয় অথবা এমন পবিত্রতা অবস্থায় তালাক দেয়, যে পবিত্র অবস্থায় তার সাথে সহবাস করেছে, কিন্তু তার গর্ভ ধারণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়নি তবে এসব তালাক হলো তালাকে বিদয়ী, যা হারাম এবং শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ এবং তা কার্যকরকারী গুনাহগার হবে।
সংখ্যার দিক থেকে তালাকে বিদয়ী স্ত্রীকে তার স্বামীর উপর হারাম করে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সে অন্য কাউকে বিবাহ না করে। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে (চূড়ান্ত) তালাক দেয়, তবে এরপর তার জন্য সে (স্ত্রী হিসেবে) হালাল নয়। যে পর্যন্ত না সে (স্ত্রী) অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩০]
আর সময়ের দিক থেকে তালাকে বিদয়ীর ক্ষেত্রে স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা মুস্তাহাব। তার প্রমাণ হলো ইবনু উমার এর হাদীস।
أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضُ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمُراجَعَتها
📄 ফিরিয়ে আনা
ক. رجعة বা ফিরিয়ে আনার পরিচয়:
শব্দগতভাবে رجعة শব্দটি رجع থেকে নেওয়া হয়েছে। অর্থ ফিরে আসা।
পরিভাষায়: স্ত্রীকে পূর্ববর্তী বিবাহের উপর ফিরিয়ে আনা, কোনো চুক্তির নবায়ন করা ছাড়াই।
খ. رجعة বা ফিরিয়ে আনার বৈধতা:
কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা رجعة বা ফিরিয়ে আনার বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে।
কুরআনের দলীল: আল্লাহ তা'আলা বানী: ﴿وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا﴾ "যদি তারা সংশোধন চায় তবে তাদের স্বামীগণ এই ক্ষেত্রে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অধিক হকদার।” [সূরা বাক্বারাহ: ২২৮]
আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ﴾ "যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও অতঃপর তারা তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তোমরা তাদেরকে ন্যায়ভাবে রেখে দাও।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩১] ( رجعة এর মাধ্যমে)।"
সুন্নাহ থেকে দলীল: ইবনু উমার এর হাদীস যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহর রসূল এর বাণী مره فليراجعها অর্থাৎ তাকে আদেশ করো সে যেন তাকে ফিরিয়ে আনে।
আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, তিন তালাকের কম তালাকদাতার জন্য ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে আনার অনুমোদন রয়েছে।
গ. رجعة বা ফিরিয়ে আনার হিকমাহ: رجعة বা ফিরিয়ে আনার তাৎপর্য হলো স্বামীকে সুযোগ দান করা; যখন সে তালাক পতিত হওয়ার উপর লজ্জিত হয় এবং নূতন করে দাম্পত্য জীবনের ইচ্ছা করে তখন সে তার সামনে একটি উপায় খুজে পায়। আর এটি হলো বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত এবং করুণা।
ঘ. رجعة এর শর্তসমূহ: কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে رجعة ছহীহ হবে, তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো- ১. তালাক ঐ সংখ্যার চেয়ে কম হওয়া, স্বামী যে সংখ্যার মালিক: স্বাধীন পুরুষ তিন তালাকের মালিক এবং গোলাম দুই তালাকের মালিক। তালাকের সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেলে অন্য কারো সাথে স্ত্রীর বিবাহ ব্যতীত স্বামীর জন্য স্ত্রী আর বৈধ থাকবে না।
২. তালাকপ্রাপ্তা মহিলার সাথে সহবাস হওয়া: কেননা رجعة বা ফিরিয়ে আনা কেবলমাত্র ইদ্দতের মধ্যেই সাব্যস্ত হবে। আর যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয়নি তার উপর কোনো ইদ্দত নেই। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا﴾
“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করো অতঃপর তাদের সাথে সহবাস করার পূর্বেই তালাক দাও, তাহলে তোমাদের জন্য তাদের উপর কোনো ইদ্দত নেই যা তোমরা পালন করবে।” [সূরা আহযাব: ৪৯]
৩. বিনিময় ছাড়া তালাক হওয়া: তালাকের ক্ষেত্রে বিনিময়টা স্ত্রীর নিজের জন্য স্বামীর থেকে মুক্তিপণ স্বরূপ। আর ফিরানোর ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য তা সম্ভব নয়। স্ত্রীর সন্তুষ্টির মাধ্যমে নূতনভাবে বিবাহ বন্ধন ব্যতীত হালাল হবে না।
৪. বিবাহ বিশুদ্ধ হওয়া: বাতিল বিবাহের ক্ষেত্রে তালাকের পর পুনরায় গ্রহণ করা বৈধ হবে না। কারণ বিবাহ সঠিক না হলে তার তালাকও শুদ্ধ হবে না। কেননা তালাক হলো বিবাহের শাখা। আর যখন তালাক সঠিক হবে না, তখন পুনরায় গ্রহণ করাও শুদ্ধ হবে না।
৫. পুনরায় গ্রহণ করা ইদ্দতের মধ্যে হওয়া: আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَبِّهِنَّ فِي ذَلِكَ
"তাদের স্বামীদের অধিকার হলো ইদ্দতের মধ্যে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা।" [সুরা বাক্বারাহ: ২২৮]
৬. رجعة বা পুনরায় গ্রহণ করা সম্পূর্ণভাবে হওয়া: সুতরাং ঝুলন্তভাবে ফিরিয়ে নিলে শুদ্ধ হবে না। যেমন: স্বামী বলল- যখন এমনটি হবে তখন আমি তোমাকে গ্রহণ করব।
ঙ. কি দ্বারা رجعة رجعة বা পুনরায় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হবে? ১. رجعة সম্পূর্ণ হবে শব্দের মাধ্যমে। যেমন স্বামী বলল, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনলাম, আমি তাকে রেখে দিলাম, আমি তাকে ফিরালাম। ২. যদি সহবাসের মাধ্যমে رجعة এর নিয়ত করে তবে স্ত্রীর সাথে সহবাসের মাধ্যমে رجعة হবে।
চ. তালাকে রাজয়ীর হুকুমসমূহ: ১. তালাকে রাজয়ীপ্রাপ্তা মহিলা স্ত্রী হিসেবে থাকবে, যতক্ষণ ইদ্দতের সময় বাকি থাকবে। অন্যান্য স্ত্রীদের মতোই সে ভরণপোষণ, বস্ত্র এবং বাসস্থানের অধিকারী হবে। অন্যান্য স্ত্রীদের মতোই তার জন্য স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করা আবশ্যক। স্বামীর জন্য তার সজ্জা গ্রহণ করা বৈধ এবং স্বামী তার সাথে নির্জন সময় কাটাবে ও তার সাথে সহবাস করবে। একজন আরেকজনের উত্তরাধিকারী বলে গণ্য হবে।
২. رجعة বা তালাকে রাজয়ীর ক্ষেত্রে স্ত্রী বা তার অলীর সন্তুষ্টি শর্ত নয়। তার প্রমাণ আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَبِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا
"যদি তারা সংশোধন চায় তবে তাদের স্বামীগণ এই ক্ষেত্রে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অধিক হকদার।” [সূরা বাক্বারাহ: ২২৮]
৩. রাজয়ীর সময় শেষ হয় ইদ্দতের সময় শেষ হওয়ার মাধ্যমে। সে তিন হায়েয ইদ্দত পালন করবে। যদি তালাকে রাজয়ীপ্রাপ্তা মহিলা তৃতীয় হায়েয থেকে পবিত্র হয় এবং তার স্বামী তাকে রাজয়ী বা পুনরায় গ্রহণ না করে, তাহলে ছোটো তালাকে বায়েন হয়ে যাবে। একজন অভিভাবক এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর মাধ্যমে নূতনভাবে বিবাহের চুক্তি ব্যতীত সে তার স্বামীর জন্য হালাল হবে না।
৪. তালাকে রাজয়ী প্রাপ্তা মহিলা ফিরে আসবে এবং ঐ তালাকে বায়েন প্রাপ্তা মহিলা ফিরে আসবে, স্বামী যাকে পুনরায় বিবাহ করেছে। তবে তালাকে বায়েন প্রাপ্ত মহিলা ফিরে আসবে, তার অবশিষ্ট তালাকের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে।
৫. যখন স্বামীর মালিকনাধীন তিন তালাক পূর্ণ হয়ে যাবে, তখন স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে এবং বড়ো তালাকে বায়েন হয়ে যাবে। অন্য কারো সাথে সহীহ বিবাহের মাধ্যমে সহবাস করা ব্যতীত সেই স্ত্রী পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল হবে না।