📄 তালাকের হুকুম এবং কার মাধ্যমে তালাক সংঘটিত হবে?
প্রয়োজনের সময় তালাক দেওয়া বৈধ। এটাই মূল। যেমন মহিলার খারাপ চরিত্র এবং খারাপ মেলামেশার কারণে। অপ্রয়োজনে তালাক দেওয়া মাকরূহ। কারণ তালাকের মাধ্যমে অনেক কল্যাণের বিবাহ বন্ধনকে দূর করা হয়, যে কল্যাণগুলো মহিলার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। যেমন স্বামীর পবিত্রতা রক্ষা করা, সন্তান-সন্ততি লাভ করা ইত্যাদি।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে তালাক দেওয়া হারাম। যার বর্ণনা অবশ্যই তালাকে বিদআত এর আলোচনায় আসবে। আবার কখনো কখনো স্বামীর উপর তালাক দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমন স্বামী যখন স্ত্রীর পাপাচার সম্পর্কে জানতে পারবে এবং স্ত্রীর জিনা প্রকাশ হয়ে যাবে। যাতে করে নিজেকে দাইয়ুস হতে না হয় এবং অবৈধ সন্তান তাকে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। অনুরূপভাবে যদি স্ত্রী তার ধর্মের ব্যাপারে অটল না থাকে। যেমন সলাত পরিত্যাগ করা; সলাত পড়ার উপর অটল না থাকা।
📄 তালাকের শব্দ
তালাকের শব্দসমূহ দুই প্রকার:
১. স্পষ্ট শব্দসমূহ: তা হলো এমন শব্দসমূহ যা শুধু তালাকের অর্থেই গঠন করা হয়েছে। অন্য অর্থ গ্রহণ করে না। শব্দটি হচ্ছে طلاق এবং এ শব্দ থেকে রূপান্তরিত শব্দগুলো। যেমন: অতীতকাল বুঝায় এমন শব্দ طلقتك )আমি তোমাকে তালাক দিয়েছি) অথবা কর্ম বাচক নাম হবে। যেমন- انت طالق )তুমি তালাক) অথবা অকর্মবাচক নাম হবে انت مطلقة )তুমি তালাক প্রাপ্তা)। সুতরাং এ শব্দগুলোর দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার অর্থ বোঝায় কিন্তু ভবিষ্যত অর্থবোধক ক্রিয়া বা আদেশ সূচক ক্রিয়া দ্বারা তালাক কার্যকর হবে না। যেমন- تطلقين )তুমি তালাক দিবে( طلقي। (তুমি তালাক দাও) ইত্যাদি।
২. ইঙ্গিতসূচক শব্দ: সেগুলো এমন শব্দ যা তালাক ছাড়া অন্য অর্থও গ্রহণ করে। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বলল- তুমি খালি, তুমি মুক্ত, তুমি পৃথক, তোমার রশি তোমার কাঁধে, অথবা তুমি তোমার পরিবারের সাথে যুক্ত হও ইত্যাদি।
তালাকের ক্ষেত্রে ইঙ্গিত সূচক শব্দ এবং স্পষ্ট শব্দের মাঝে পার্থক্য: স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হবে, যদিও সে তালাকের নিয়ত না করে। চাই সে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বলুক বা মজা কিংবা ঠাট্টা করে। তার প্রমাণ হলো নাবী এর হাদীস।
ثَلَاثُ جَدُّهُنَّ جَدْ النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
"তিনটি বিষয় এমন যেগুলো উদ্দেশ্য মূলকভাবে বললেও মূল অর্থ গ্রহণ করা হবে এবং ঠাট্টা করে বললেও মূল অর্থ গ্রহণ করা হবে। তা হচ্ছে: বিবাহ, তালাক এবং স্ত্রীকে পূনরায় ফিরিয়ে আনার বিষয়।"৮৩১
পক্ষান্তরে ইঙ্গিতসূচক শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হবে না, তবে যদি না সে এমন নিয়ত করে যেটা তার উচ্চারিত শব্দের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এ শব্দগুলো তালাক ছাড়া অন্য অর্থও গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং নিয়ত ছাড়া তালাক কার্যকর হবেনা, তবে যদি স্বামীর নিয়তের কোনো আলামত পাওয়া যায় তবে স্বামীর কথা গ্রহণযোগ্য হবে না।
টিকাঃ
৮৩১. সুনান আবু দাউদ, হা. ২১৯৪; তিরমিযী, হা. ১১৮৪; ইবনু মাজাহ, হা. ২০৩৯; শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ, হা. ১৬৭১।
📄 সুন্নাত তালাক এবং তার বিধান
ক. সুন্নত তালাক: সুন্নত তালাক দ্বারা উদ্দেশ্য- সুন্নত তালাক হলো ঐ তালাক, শরীয়তপ্রণেতা যার অনুমোদন দিয়েছেন, ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা অনুযায়ী যা স্তর অনুযায়ী কার্যকর হয়। আর উহা দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্যকরী হবে। ১. তালাকের সংখ্যা ২. তালাক কার্যকরী হওয়ার অবস্থা।
সুন্নাহ হলো স্বামীর যদি তালাকের প্রয়োজন হয় তবে পবিত্রতাকালীন অবস্থায় তালাক দিবে, যে পবিত্রতায় সে তার সাথে সহবাস করেনি। অতঃপর সে তাকে ছেড়ে দিবে এবং তার ইদ্দত অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় তালাক দিবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ)
"হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১]
অর্থাৎ, ঐসময়ের মধ্যে যখন নারীরা ইদ্দত পালন শুরু করবে। আর ইদ্দত হলো তাদের পবিত্রতাকালীন সময়। যেহেতু হায়েযের সময়কে ইদ্দত বলে গণনা করা হয় না।
ইবনু উমার ইবনু আব্বাস এবং সাহাবীদের একটি জামাআত এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন যে, الطير বা পবিত্র অর্থ হচ্ছে এমন পবিত্রতাকালীন সময় যে সময়ে সহবাস করা হয়নি।
খ. সুন্নাত তালাকের হুকুম: আলেমগণ সুন্নাত তালাক কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১] অর্থাৎ পবিত্র অবস্থায়।
📄 বিদআতী তালাক এবং তার বিধান
ক. তালাকে বিদয়ী হলো এমন তালাক যা স্বামী নিষিদ্ধ পন্থায় কার্যকর করে। যা শরীয়ত প্রণেতা নিষেধ করেছেন। আর তা কার্যকর হয় দুটি বিষয়ের একটির মাধ্যমে:
১. তালাকের সংখ্যা; ২. তা কার্যকর করার অবস্থা।
যদি এক শব্দের মাধ্যমে তিন তালাক দেয় অথবা একই পবিত্রতায় ভিন্ন ভিন্নভাবে তালাক দেয়, অথবা তাকে নেফাস বা হায়েয অবস্থায় তালাক দেয় অথবা এমন পবিত্রতা অবস্থায় তালাক দেয়, যে পবিত্র অবস্থায় তার সাথে সহবাস করেছে, কিন্তু তার গর্ভ ধারণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়নি তবে এসব তালাক হলো তালাকে বিদয়ী, যা হারাম এবং শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ এবং তা কার্যকরকারী গুনাহগার হবে।
সংখ্যার দিক থেকে তালাকে বিদয়ী স্ত্রীকে তার স্বামীর উপর হারাম করে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সে অন্য কাউকে বিবাহ না করে। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে (চূড়ান্ত) তালাক দেয়, তবে এরপর তার জন্য সে (স্ত্রী হিসেবে) হালাল নয়। যে পর্যন্ত না সে (স্ত্রী) অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩০]
আর সময়ের দিক থেকে তালাকে বিদয়ীর ক্ষেত্রে স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা মুস্তাহাব। তার প্রমাণ হলো ইবনু উমার এর হাদীস।
أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضُ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمُراجَعَتها