📄 তালাকের অর্থ, শরীয়তসম্মত হওয়ার প্রমাণসমূহ এবং তালাকের হিকমাহ
ক. তালাকের পরিচয়:
الطلاق বা তালাকের শাব্দিক অর্থ - التخلية বা মুক্ত হওয়া। বলা হয় طلقت الناقة إذا سرحت حيث شاءت অর্থাৎ উটনিটি মুক্ত হয়েছে যখন সে চলে গিয়েছে তার ইচ্ছামতো।
পারিভাষিক অর্থ: বিবাহ বা তার কিছু অংশের বন্ধনকে মুক্ত করা।
شرعاً: حل قيد النكاح أو بعضه.
খ. যার তালাক বৈধ হবে: বোধসম্পন্ন, ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী, জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর তালাক বৈধ হবে। অথবা তালাকের উকিল এর পক্ষ থেকে তালাক বৈধ হবে। সুতরাং স্বামী ছাড়া অন্য কারো তালাক বৈধ হবে না, নাবালেগ এর তালাক বৈধ নয়। পাগল, মাতাল, নেশাগ্রস্ত এবং বাধ্যকৃত ব্যক্তির তালাক বৈধ নয় এবং এমন প্রচণ্ড রাগান্বিত ব্যক্তির তালাক বৈধ নয় যে রাগের সাথে কি বলছে সে নিজেও জানে না।
গ. তালাক শরীয়ত সম্মত হওয়া সম্পর্কে: বিবাহের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দম্পত্যজীবন সচল রাখাই মূল উদ্দেশ্য। আর অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা বিবাহের ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবন সচল রাখার জন্য অনেক আহকাম এবং পরিপূর্ণ শিষ্টাচার প্রণয়ন করেছেন। এবং তা বাকি রাখার আহকাম চালু রেছেন। তবে এই নিয়ম কানুনগুলো কখনো কখনো স্বামী-স্ত্রী বা কোনো একজনের পক্ষ থেকে যখন রক্ষা করা হয় না তখন তাদের উভয়ের মাঝে বৈপরীত্ব সৃষ্টি হয়। এমনকি এক পর্যায়ে তা সংশোধনের কোনো উপায় বাকি থাকে না। সুতরাং এমন কিছু আহকাম প্রণয়ন করা আবশ্যক যার মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনকে মুক্ত করা যায়। তা এমনভাবে যে, যাতে স্বামী-স্ত্রী কারো অধিকার নষ্ট না হয়। এটা তখনই হবে যখন উভয়ের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনুপস্থিত থাকবে। তালাক শরীয়তে কুরআন সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা অনুমোদিত।
কুরআন থেকে প্রমাণ: আল্লাহ তা'আলা বলেন: الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ "তালাক দুই বার। অতঃপর উত্তমভাবে রেখে দিবে অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দিবে।" [সুরা বাক্বারাহ : ২২৯] يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ “হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১]
সুন্নাহ থেকে প্রমাণ: ইবনু উমার এর হাদীস। أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضٌ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُمَرَ : لِيُرَاجِعْهَا ، فَإِذَا طَهُرَتْ فَإِنْ شَاءَ فَلْيُطَلِّقُهَا "তিনি তার স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিলেন। তখন নাবী উমারকে বললেন: সে যেন তাকে ফিরিয়ে আনে। হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার পর সে যদি ইচ্ছা করে তাহলে সে তাকে তালাক দিতে পারবে।"৮৩০
উম্মতের আলেমগণ তালাক বৈধ ও শরীয়তসম্মত হওয়ার উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
গ. তালাক শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য: তালাককে শরীয়তসম্মত করা হয়েছে। কারণ তাতে দাম্পত্য জীবনের অনেক বিপদ এবং কলহ দূরীকরণের সমাধান রয়েছে। বিশেষ করে উভয়ের মধ্যে অমিল এবং পরস্পর বিদ্বেষ দেখা দিলে, যেগুলোর কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা এবং দাম্পত্য জীবন সচল রাখা সম্ভব হয় না। আর এই কারণে তালাকের বিধান ইসলাম ধর্মের একটি সৌন্দর্যও বটে।
টিকাঃ
৮৩০. মুত্তালাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫২৫২, মুসলিম ১৪৭১-১০।
📄 তালাকের হুকুম এবং কার মাধ্যমে তালাক সংঘটিত হবে?
প্রয়োজনের সময় তালাক দেওয়া বৈধ। এটাই মূল। যেমন মহিলার খারাপ চরিত্র এবং খারাপ মেলামেশার কারণে। অপ্রয়োজনে তালাক দেওয়া মাকরূহ। কারণ তালাকের মাধ্যমে অনেক কল্যাণের বিবাহ বন্ধনকে দূর করা হয়, যে কল্যাণগুলো মহিলার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। যেমন স্বামীর পবিত্রতা রক্ষা করা, সন্তান-সন্ততি লাভ করা ইত্যাদি।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে তালাক দেওয়া হারাম। যার বর্ণনা অবশ্যই তালাকে বিদআত এর আলোচনায় আসবে। আবার কখনো কখনো স্বামীর উপর তালাক দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমন স্বামী যখন স্ত্রীর পাপাচার সম্পর্কে জানতে পারবে এবং স্ত্রীর জিনা প্রকাশ হয়ে যাবে। যাতে করে নিজেকে দাইয়ুস হতে না হয় এবং অবৈধ সন্তান তাকে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। অনুরূপভাবে যদি স্ত্রী তার ধর্মের ব্যাপারে অটল না থাকে। যেমন সলাত পরিত্যাগ করা; সলাত পড়ার উপর অটল না থাকা।
📄 তালাকের শব্দ
তালাকের শব্দসমূহ দুই প্রকার:
১. স্পষ্ট শব্দসমূহ: তা হলো এমন শব্দসমূহ যা শুধু তালাকের অর্থেই গঠন করা হয়েছে। অন্য অর্থ গ্রহণ করে না। শব্দটি হচ্ছে طلاق এবং এ শব্দ থেকে রূপান্তরিত শব্দগুলো। যেমন: অতীতকাল বুঝায় এমন শব্দ طلقتك )আমি তোমাকে তালাক দিয়েছি) অথবা কর্ম বাচক নাম হবে। যেমন- انت طالق )তুমি তালাক) অথবা অকর্মবাচক নাম হবে انت مطلقة )তুমি তালাক প্রাপ্তা)। সুতরাং এ শব্দগুলোর দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার অর্থ বোঝায় কিন্তু ভবিষ্যত অর্থবোধক ক্রিয়া বা আদেশ সূচক ক্রিয়া দ্বারা তালাক কার্যকর হবে না। যেমন- تطلقين )তুমি তালাক দিবে( طلقي। (তুমি তালাক দাও) ইত্যাদি।
২. ইঙ্গিতসূচক শব্দ: সেগুলো এমন শব্দ যা তালাক ছাড়া অন্য অর্থও গ্রহণ করে। যেমন স্বামী তার স্ত্রীকে বলল- তুমি খালি, তুমি মুক্ত, তুমি পৃথক, তোমার রশি তোমার কাঁধে, অথবা তুমি তোমার পরিবারের সাথে যুক্ত হও ইত্যাদি।
তালাকের ক্ষেত্রে ইঙ্গিত সূচক শব্দ এবং স্পষ্ট শব্দের মাঝে পার্থক্য: স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হবে, যদিও সে তালাকের নিয়ত না করে। চাই সে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বলুক বা মজা কিংবা ঠাট্টা করে। তার প্রমাণ হলো নাবী এর হাদীস।
ثَلَاثُ جَدُّهُنَّ جَدْ النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
"তিনটি বিষয় এমন যেগুলো উদ্দেশ্য মূলকভাবে বললেও মূল অর্থ গ্রহণ করা হবে এবং ঠাট্টা করে বললেও মূল অর্থ গ্রহণ করা হবে। তা হচ্ছে: বিবাহ, তালাক এবং স্ত্রীকে পূনরায় ফিরিয়ে আনার বিষয়।"৮৩১
পক্ষান্তরে ইঙ্গিতসূচক শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হবে না, তবে যদি না সে এমন নিয়ত করে যেটা তার উচ্চারিত শব্দের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এ শব্দগুলো তালাক ছাড়া অন্য অর্থও গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং নিয়ত ছাড়া তালাক কার্যকর হবেনা, তবে যদি স্বামীর নিয়তের কোনো আলামত পাওয়া যায় তবে স্বামীর কথা গ্রহণযোগ্য হবে না।
টিকাঃ
৮৩১. সুনান আবু দাউদ, হা. ২১৯৪; তিরমিযী, হা. ১১৮৪; ইবনু মাজাহ, হা. ২০৩৯; শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ, হা. ১৬৭১।
📄 সুন্নাত তালাক এবং তার বিধান
ক. সুন্নত তালাক: সুন্নত তালাক দ্বারা উদ্দেশ্য- সুন্নত তালাক হলো ঐ তালাক, শরীয়তপ্রণেতা যার অনুমোদন দিয়েছেন, ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা অনুযায়ী যা স্তর অনুযায়ী কার্যকর হয়। আর উহা দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্যকরী হবে। ১. তালাকের সংখ্যা ২. তালাক কার্যকরী হওয়ার অবস্থা।
সুন্নাহ হলো স্বামীর যদি তালাকের প্রয়োজন হয় তবে পবিত্রতাকালীন অবস্থায় তালাক দিবে, যে পবিত্রতায় সে তার সাথে সহবাস করেনি। অতঃপর সে তাকে ছেড়ে দিবে এবং তার ইদ্দত অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় তালাক দিবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ)
"হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১]
অর্থাৎ, ঐসময়ের মধ্যে যখন নারীরা ইদ্দত পালন শুরু করবে। আর ইদ্দত হলো তাদের পবিত্রতাকালীন সময়। যেহেতু হায়েযের সময়কে ইদ্দত বলে গণনা করা হয় না।
ইবনু উমার ইবনু আব্বাস এবং সাহাবীদের একটি জামাআত এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন যে, الطير বা পবিত্র অর্থ হচ্ছে এমন পবিত্রতাকালীন সময় যে সময়ে সহবাস করা হয়নি।
খ. সুন্নাত তালাকের হুকুম: আলেমগণ সুন্নাত তালাক কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নাবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে।” [সূরা তালাক: ১] অর্থাৎ পবিত্র অবস্থায়।