📄 মোহরের পরিচয়, মোহরের বৈধতা এবং তার বিধান সম্পর্কে আলোচনা
ক. মোহরের (الصداق) পরিচয়:
الصداق শব্দটি الكذب বা মিথ্যার বিপরীত শব্দ الصدق থেকে নেওয়া হয়েছে।
شرعاً: هو المال الذي وجب على الزوج دفعه لزوجته؛ بسبب عقد النكاح.
পরিভ . এ সম্পদ যা বিবাহ চুক্তির কারণে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেওয়া ওয়াজিব।
মোহকে الصداق বলে নামকরণ করা হয়েছে বিবাহের প্রতি মোহর প্রদানকারীর আগ্রহের সত্যতা প্রকাশ স্বরূপ। এটাকে আরবীতে المهر ، النخلة ، العفر ও বলা হয়।
খ. মোহরের বৈধতা: কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা মোহর বৈধ হওয়ার মূল দলীল। এর ব্যাখ্যা মোহরের হুকুমের আলোচনায় আসবে।
গ. মোহরের হুকুম: শুধুমাত্র বিবাহ চুক্তি সম্পন্ন হলেই সম্পদ দিয়ে দেওয়া স্বামীর জন্য ওয়াজিব। এটিকে রহিত করা বৈধ নয়। এই বিধানের স্বপক্ষে মহান আল্লাহ বলেন:
وآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "তোমরা সন্তুষ্ট চিত্তে নারীদেরকে তাদের মোহরারা প্রদান করো।"[সুরা নিসা: ৪]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً) "অতঃপর তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান করো।" [সূরা নিসা: ২৪]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: لا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً) "যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ না করে থাক অথবা তাদের মোহর নির্ধারণ করার পূর্বে তালাক প্রদান করো, তাহলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৬]
সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ: أَنَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: إِنَّهَا وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ، نَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا لِي فِي النِّسَاءِ مِنْ حَاجَةٍ. فَقَالَ رَجُلٌ : زَوَّجْنِيهَا، فَقَالَ : أَعْطِهَا ثَوْبًا ...
"সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা নাবী-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, সে নিজেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য নিবেদন করছে। এ কথা শুনে নাবী বললেন: আমার কোনো মহিলার প্রয়োজন নেই। জনৈক ব্যক্তি বলল, একে আমার সঙ্গে বিবাহ করিয়ে দিন। নাবী তাকে বললেন: তাকে একটি কাপড় দাও।... হাদীস।”৮০৩
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত হাদীস:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى علي عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ أثر زعفران، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَهْيَمْ؟ يعني: ما شأنك وما أمرك ؟ فَقَالَ : يَا رَسُولَ الله، تَزَوَّجْتُ امْرَأَةٌ، قَالَ: مَا أَصْدَقْتَهَا؟ قَالَ: وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ.
"নাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ কে জাফরানের চিহ্নে দেখলেন। নাবী বললেন: এটা কি? অর্থাৎ তোমার ব্যাপারটি কী বা তোমার বিষয়টি কী? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি। তিনি বললেন: তাকে কি মাহর প্রদান করেছ? তিনি বলেন, খেজুরের আঁটির সমপরিমাণ ওজনের স্বর্ণ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: অলীমার আয়োজন করো, যদিও তা একটি বকরী দিয়েও হয়।
বিবাহের মোহর বৈধ হওয়ার ব্যাপারে সকল মুসলিম একমত হয়েছেন।
টিকাঃ
৮০৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫০২৯, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪২৫।
৮০৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৭৮১, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪২৭।
ক. মোহরের (الصداق) পরিচয়:
الصداق শব্দটি الكذب বা মিথ্যার বিপরীত শব্দ الصدق থেকে নেওয়া হয়েছে।
شرعاً: هو المال الذي وجب على الزوج دفعه لزوجته؛ بسبب عقد النكاح.
পরিভ . এ সম্পদ যা বিবাহ চুক্তির কারণে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেওয়া ওয়াজিব।
মোহকে الصداق বলে নামকরণ করা হয়েছে বিবাহের প্রতি মোহর প্রদানকারীর আগ্রহের সত্যতা প্রকাশ স্বরূপ। এটাকে আরবীতে المهر ، النخلة ، العفر ও বলা হয়।
খ. মোহরের বৈধতা: কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা মোহর বৈধ হওয়ার মূল দলীল। এর ব্যাখ্যা মোহরের হুকুমের আলোচনায় আসবে।
গ. মোহরের হুকুম: শুধুমাত্র বিবাহ চুক্তি সম্পন্ন হলেই সম্পদ দিয়ে দেওয়া স্বামীর জন্য ওয়াজিব। এটিকে রহিত করা বৈধ নয়। এই বিধানের স্বপক্ষে মহান আল্লাহ বলেন:
وآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "তোমরা সন্তুষ্ট চিত্তে নারীদেরকে তাদের মোহরারা প্রদান করো।"[সুরা নিসা: ৪]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: فَمَا اسْتَمْتَعْتُمْ بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً) "অতঃপর তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান করো।" [সূরা নিসা: ২৪]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: لا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً) "যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ না করে থাক অথবা তাদের মোহর নির্ধারণ করার পূর্বে তালাক প্রদান করো, তাহলে তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৬]
সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ: أَنَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: إِنَّهَا وَهَبَتْ نَفْسَهَا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ، نَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا لِي فِي النِّسَاءِ مِنْ حَاجَةٍ. فَقَالَ رَجُلٌ : زَوَّجْنِيهَا، فَقَالَ : أَعْطِهَا ثَوْبًا ...
"সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা নাবী-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, সে নিজেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য নিবেদন করছে। এ কথা শুনে নাবী বললেন: আমার কোনো মহিলার প্রয়োজন নেই। জনৈক ব্যক্তি বলল, একে আমার সঙ্গে বিবাহ করিয়ে দিন। নাবী তাকে বললেন: তাকে একটি কাপড় দাও।... হাদীস।”৮০৩
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত হাদীস:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى علي عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ أثر زعفران، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَهْيَمْ؟ يعني: ما شأنك وما أمرك ؟ فَقَالَ : يَا رَسُولَ الله، تَزَوَّجْتُ امْرَأَةٌ، قَالَ: مَا أَصْدَقْتَهَا؟ قَالَ: وَزْنَ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ.
"নাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ কে জাফরানের চিহ্নে দেখলেন। নাবী বললেন: এটা কি? অর্থাৎ তোমার ব্যাপারটি কী বা তোমার বিষয়টি কী? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি। তিনি বললেন: তাকে কি মাহর প্রদান করেছ? তিনি বলেন, খেজুরের আঁটির সমপরিমাণ ওজনের স্বর্ণ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: অলীমার আয়োজন করো, যদিও তা একটি বকরী দিয়েও হয়। ৮০৪
বিবাহের মোহর বৈধ হওয়ার ব্যাপারে সকল মুসলিম একমত হয়েছেন।
টিকাঃ
৮০৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫০২৯, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪২৫।
৮০৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৭৮১, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪২৭।
📄 মোহরের নির্ধারিত পরিমাণ, তার তাৎপর্য এবং তা নির্ধারণ
ক. মোহরের নির্ধারিত পরিমাণ: মোহরের সর্বোচ্চ অথবা সর্বনিম্ন বির্ধারিত কোনো পরিমাণ নেই। চলমান বাজারে যেটা মূল্য বা পারিশ্রমিক হতে পারে, সেটাই বিবাহের মোহর হতে পারে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَأُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ﴾ "উল্লিখিত নারীগণ ছাড়া অন্য নারীকে মোহর নির্ধারণ করে বিয়ে করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো।"[সূরা নিসা: ২৪]
আয়াতটিতে মাল বা সম্পদের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। সাহল ইবনে সা'দ এর বর্ণিত হাদীসে নাবী এক মহিলা সম্পর্কে বলেছিলেন, যিনি নিজেকে হেবা বা নিবেদিত করে দিয়েছিলেন।
أَعْطِهَا وَلَوْ خَاتَمَا مِنْ حَدِيدٍ "তাকে লোহার একটি আংটি হলেও মোহর দাও।”৮০৫
এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, সম্পদ বলা যায় এমন বস্তুর সর্বনিম্ন পরিমাণও মোহর হওয়া বৈধ। মোহর যত বেশিই হোক সেটা বৈধ হওয়ার দলীল রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا
"আর তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থানে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে স্থির করো এবং তাদের একজনকে অঢেল অর্থও দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।” [সূরা নিসা: ২০] আর )القنطار( আল-কিনতার অর্থ প্রচুর সম্পদ।
খ. মোহরকে শরীয়ত সম্মত করার তাৎপর্য:
মোহরের মাধ্যমে স্ত্রীর সাথে স্বামীর উন্নত সম্পর্ক ও সম্মানজনক বৈবাহিক জীবন গঠনের নিশ্চয়তা প্রকাশ পায়। এছাড়াও মোহরের মাধ্যমে স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয় এবং তাকে বিবাহের প্রস্তুতি গ্রহণের (পরিধেয় বস্ত্র বা ইত্যাদি খরচ) সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
গ. মোহরকে পুরুষের উপর নির্ধারণ করার হিকমাহ বা তাৎপর্য:
ইসলাম পুরুষের উপর মোহর ধার্য করেছে; এই আকাঙ্ক্ষায় যে, পুরুষকে যৌতুক হিসেবে দেওয়ার জন্য নারী যে সম্পদ জমা করে, তার অবমাননা থেকে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে। আর এটা শারঈ মূলনীতির সাথেও সামাঞ্জস্যপূর্ণ যে, ভরণপোষণের অপরিহার্য দায়িত্ব পুরুষের উপর, নারীর নয়।
ঘ. মোহরের মালিকানা:
মোহর স্ত্রীর একক সম্পত্তি। এতে তার অভিভাবকের কারো কোনো হক নেই। তাদের শুধু মোহর উসুল করে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে তারা সেটা কনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا
"অতঃপর তারা যদি তা থেকে সন্তুষ্ট হয়ে তোমাদেরকে কিছু দেয়, তবে তা তৃপ্তির সাথে খাও।" [সূরা নিসা: ৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
"তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহ দিয়ে তা গ্রহণ করবে?” [সূরা নিসা: ২০]
ঙ. আকদে নিকাহের সময় মোহরের কথা উল্লেখ করা: আকদে নিকাহ বা বিবাহের চুক্তির সময় মোহর এবং তার পরিমাণের কথা উল্লেখ করা সুন্নাত। কারণ আল্লাহর রসূল সকল বিবাহের ক্ষেত্রেই মোহরের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সাথে মোহর উল্লেখ করার মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ দূর হয়।
চ. মোহরের শর্তসমূহ এবং কোন জিনিস মোহর হবে আর কোন জিনিস হবে না: ১. মোহর হতে হবে এমন সম্পদ যা মূল্যমান রয়েছে এবং বৈধ। যার মালিক হওয়া, বিক্রি করা এবং যার দ্বারা উপকার লাভ করা বৈধ। সুতরাং মদ-শুকর এবং উভয় পক্ষের জ্ঞাতসারে ছিনতাই করা সম্পদ মোহর হতে পারবে না।
২. এমন সম্পদ যা ধোঁকামুক্ত। সুতরাং তা নির্দিষ্ট এবং নির্ধারিত হতে হবে। অতএব অনির্দিষ্ট সম্পদকে মোহর বানানো সঠিক হবে না। যেমন অনির্দিষ্ট বাড়ি অথবা মুক্তভাবে কোনো বাহন অথবা অনির্দিষ্ট কোনো বাহন অথবা অনির্দিষ্টভাবে গাছ যে ফল দিবে কিংবা এবছর যতগুলো ফল দিবে অথবা এরকম কিছু।
এখান থেকে বুঝা যায় যে, যা কোনো কিছু মূল্য অথবা পারিশ্রমিক হতে পারে তা মোহর হতে পারে। হোক তা নগদ সম্পদ বা ঋণের সম্পদ। অথবা নির্দিষ্ট কোনো সুবিধা।
ছ. মোহর নগদ আদায় করা এবং বাকিতে আদায় করা: মোহরের পুরো অংশ অথবা কিছু অংশ নগদ বা বাকিতে প্রদান করা জায়েয আছে। এটা সামাজিক প্রচলন এবং আচার-আচরণের উপর নির্ভর করে। তবে শর্ত হলো বাকিতে আদায় করার সময়টা একেবারে অজানা হতে পারবে না। এবং সময়টা বেশি দীর্ঘও হতে পারবে না। কেননা এতে মোহর হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টিকাঃ
৮০৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১৪৯, সহীহ মুসলিম, হা, ফুআ. ১৪২৫।
ক. মোহরের নির্ধারিত পরিমাণ: মোহরের সর্বোচ্চ অথবা সর্বনিম্ন বির্ধারিত কোনো পরিমাণ নেই। চলমান বাজারে যেটা মূল্য বা পারিশ্রমিক হতে পারে, সেটাই বিবাহের মোহর হতে পারে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَأُحِلَّ لَكُمْ مَا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَنْ تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ﴾ "উল্লিখিত নারীগণ ছাড়া অন্য নারীকে মোহর নির্ধারণ করে বিয়ে করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো।"[সূরা নিসা: ২৪]
আয়াতটিতে মাল বা সম্পদের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। সাহল ইবনে সা'দ এর বর্ণিত হাদীসে নাবী এক মহিলা সম্পর্কে বলেছিলেন, যিনি নিজেকে হেবা বা নিবেদিত করে দিয়েছিলেন।
أَعْطِهَا وَلَوْ خَاتَمَا مِنْ حَدِيدٍ "তাকে লোহার একটি আংটি হলেও মোহর দাও।”৮০৫
এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, সম্পদ বলা যায় এমন বস্তুর সর্বনিম্ন পরিমাণও মোহর হওয়া বৈধ। মোহর যত বেশিই হোক সেটা বৈধ হওয়ার দলীল রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا
"আর তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থানে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে স্থির করো এবং তাদের একজনকে অঢেল অর্থও দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।” [সূরা নিসা: ২০] আর )القنطار( আল-কিনতার অর্থ প্রচুর সম্পদ।
খ. মোহরকে শরীয়ত সম্মত করার তাৎপর্য:
মোহরের মাধ্যমে স্ত্রীর সাথে স্বামীর উন্নত সম্পর্ক ও সম্মানজনক বৈবাহিক জীবন গঠনের নিশ্চয়তা প্রকাশ পায়। এছাড়াও মোহরের মাধ্যমে স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয় এবং তাকে বিবাহের প্রস্তুতি গ্রহণের (পরিধেয় বস্ত্র বা ইত্যাদি খরচ) সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
গ. মোহরকে পুরুষের উপর নির্ধারণ করার হিকমাহ বা তাৎপর্য:
ইসলাম পুরুষের উপর মোহর ধার্য করেছে; এই আকাঙ্ক্ষায় যে, পুরুষকে যৌতুক হিসেবে দেওয়ার জন্য নারী যে সম্পদ জমা করে, তার অবমাননা থেকে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে। আর এটা শারঈ মূলনীতির সাথেও সামাঞ্জস্যপূর্ণ যে, ভরণপোষণের অপরিহার্য দায়িত্ব পুরুষের উপর, নারীর নয়।
ঘ. মোহরের মালিকানা:
মোহর স্ত্রীর একক সম্পত্তি। এতে তার অভিভাবকের কারো কোনো হক নেই। তাদের শুধু মোহর উসুল করে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে তারা সেটা কনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا
"অতঃপর তারা যদি তা থেকে সন্তুষ্ট হয়ে তোমাদেরকে কিছু দেয়, তবে তা তৃপ্তির সাথে খাও।" [সূরা নিসা: ৪]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
"তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহ দিয়ে তা গ্রহণ করবে?” [সূরা নিসা: ২০]
ঙ. আকদে নিকাহের সময় মোহরের কথা উল্লেখ করা: আকদে নিকাহ বা বিবাহের চুক্তির সময় মোহর এবং তার পরিমাণের কথা উল্লেখ করা সুন্নাত। কারণ আল্লাহর রসূল সকল বিবাহের ক্ষেত্রেই মোহরের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সাথে মোহর উল্লেখ করার মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ দূর হয়।
চ. মোহরের শর্তসমূহ এবং কোন জিনিস মোহর হবে আর কোন জিনিস হবে না: ১. মোহর হতে হবে এমন সম্পদ যা মূল্যমান রয়েছে এবং বৈধ। যার মালিক হওয়া, বিক্রি করা এবং যার দ্বারা উপকার লাভ করা বৈধ। সুতরাং মদ-শুকর এবং উভয় পক্ষের জ্ঞাতসারে ছিনতাই করা সম্পদ মোহর হতে পারবে না।
২. এমন সম্পদ যা ধোঁকামুক্ত। সুতরাং তা নির্দিষ্ট এবং নির্ধারিত হতে হবে। অতএব অনির্দিষ্ট সম্পদকে মোহর বানানো সঠিক হবে না। যেমন অনির্দিষ্ট বাড়ি অথবা মুক্তভাবে কোনো বাহন অথবা অনির্দিষ্ট কোনো বাহন অথবা অনির্দিষ্টভাবে গাছ যে ফল দিবে কিংবা এবছর যতগুলো ফল দিবে অথবা এরকম কিছু।
এখান থেকে বুঝা যায় যে, যা কোনো কিছু মূল্য অথবা পারিশ্রমিক হতে পারে তা মোহর হতে পারে। হোক তা নগদ সম্পদ বা ঋণের সম্পদ। অথবা নির্দিষ্ট কোনো সুবিধা।
ছ. মোহর নগদ আদায় করা এবং বাকিতে আদায় করা: মোহরের পুরো অংশ অথবা কিছু অংশ নগদ বা বাকিতে প্রদান করা জায়েয আছে। এটা সামাজিক প্রচলন এবং আচার-আচরণের উপর নির্ভর করে। তবে শর্ত হলো বাকিতে আদায় করার সময়টা একেবারে অজানা হতে পারবে না। এবং সময়টা বেশি দীর্ঘও হতে পারবে না। কেননা এতে মোহর হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টিকাঃ
৮০৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১৪৯, সহীহ মুসলিম, হা, ফুআ. ১৪২৫।
📄 মোহর নিয়ে বাড়াবাড়ির হুকুম
কিছু হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায় মোহর নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা মুস্তাহাব:
১. আয়িশাহ সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীস। নিশ্চয়ই তিনি বলেন: مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَسْهِيلُ أَمْرِهَا وَقِلَّةٌ صَدَاقِهَا
"ঐ মহিলা বরকতময় যে তার বিষয়গুলো সহজ করেন এবং মোহরানা কম করেন। ৮০৬
২. উমার থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, أَلَا لَا تُغَالُوا بِصُدُقِ النِّسَاءِ، فَإِنَّهُ لَوْ كَانَ مَكْرُمَةٌ فِي الدُّنْيَا أَوْ تَقْوَى عِنْدَ الله، كَانَ أَوْلَاكُمْ بِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا أَصْدَقَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ امْرَأَةَ مِنْ نِسَائِهِ، وَلَا أُصْدِقَتْ امْرَأَةٌ مِنْ بَنَاتِهِ أَكْثَرَ مِنْ ثُنْتَيْ عَشْرَةَ أُوقِيَّةً، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُغْلِي بِصَدُقَةِ امْرَأَتِهِ حَتَّى يَكُونَ لَهَا عَدَاوَةٌ فِي قَلْبِهِ، وَحَتَّى يَقُولَ كَلِّفْتُ فِيْكِ عَلَى الْقَرْيَةِ ...
“সাবধান! তোমরা নারীদের মোহর নির্ধারণে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ যদি তা দুনিয়ার মর্যাদার বিষয় হতো এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার প্রতীক হতো, তবে তোমাদের চেয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য ছিলেন। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো মোহর এবং তাঁর কন্যাদের কারো মোহর বারো উকিয়ার অধিক ধার্য করেননি। কখনও স্ত্রীর অধিক মোহর স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মনে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এমনকি সে বলতে থাকে, আমি তোমার জন্য পানির মশক বহনে বাধ্য হয়েছি।”৮০৭
৩. আবু সালামা থেকে বর্ণিত। হাদীস: عَنْ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ: سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا : عَنْ صَدَاقِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتِ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أُوقِيَّةٌ، وَنَشَّا، قَالَتْ : أَتَدْرِي مَا النَّشْ ؟ قَالَ : قُلْتُ: لَا ، قَالَتْ: نِصْفُ أُوقِيَّةٍ
“আবু সালামা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিবাহে মোহর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মোহরের পরিমাণ ছিল বারো উকিয়্যাহ্ ও এক নাশ। তিনি বললেন, তুমি কি জানো নাশ এর পরিমাণ কতটুকু? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, এক নাশ এর পরিমাণ আধা উকিয়্যাহ।”৮০৮
টিকাঃ
৮০৬. ইবনে হিব্বান, হা. ৪০৯৫; হাকিম ২/১৮১ এবং তিনি ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। ইমাম আলবানী হাসান বলেছেন, যঈফাহ, ৩/২৪৪।
৮০৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ২১০৬, আহমাদ ১/৪০; তিরমিযী, হা. ১১১৪; ইবনু মাজাহ, হা. ১৮৮৭। শাইখ আলবানী বলেন, হাসান সহীহ, সহীহুত তিরমিযী, হা. ১৫৩২।: তার দড়ি তাকে ঝুলিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য: তোমার জন্য সবকিছুই বহন করছি এমনকি মটকা বহন করেছি। ১৫ এর বদলে বর্ণিত আছে।
৮০৮. সহীহ মুসলিম, হা. ৩৩৮০, ফুআ, ১৪২৬।
📄 বিবাহিত জীবনের অধিকারসমূহ
কোনো বিবাহ যখন সহীহভাবে সম্পন্ন হয় তখন তার উপর ভিত্তি করে স্বামী-স্ত্রীর অনেক অধিকার সাব্যস্ত হয়।
প্রথম: স্ত্রীর অধিকার
স্বামীর উপর স্ত্রীর কিছু আর্থিক অধিকার থাকে। যেমন: মোহর ও ভরণপোষণের ব্যায়। আর্থিক অধিকারের পর কিছু আভ্যন্তরীণ অধিকারও সাব্যস্ত হয়ে থাকে। যেমন স্ত্রীর প্রতি ন্যায় বিচার করা, সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করা। এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে আসছে।
১. মোহর: এটি স্বামীর উপর স্ত্রীর একটি অধিকার। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً﴾ "তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে নারীদেরকে তাদের মোহরারা প্রদান করো।” [সূরা নিসা: ৪] অন্যান্য আরও দলীল পিছনে গত হয়েছে।
২. ভরণপোষণ, পোশাক-আশাক এবং বসবাসের ব্যবস্থা: স্ত্রীর জন্য এগুলোর ব্যবস্থা করে দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾ "যে ব্যক্তি দুধপানের সময় পূর্ণ করতে চায়, তার জন্য মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে। পিতার কর্তব্য ভালোভাবে তাদের ভরণপোষণ করা।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৩] এবং অন্যত্র বলেছেন: ﴿الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ﴾ "পুরুষরা নারীদের অভিভাবক। কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং এজন্য যে, পুরুষ তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে।" [সূরা নিসা: ৩৪]
পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করা হাকীম ইবনে মুয়াবিয়া আল-কুশাইরী এর হাদীস। قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا حَقُّ زَوْجَةِ؟ قَالَ: أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ، وَأَنْ تَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ، "তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল। স্ত্রীর প্রতি কী হক রয়েছে? তিনি ﷺ বললেন: তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে। তুমি পোশাক পরিধান করলে তাকেও পোশাক দিবে।" ৮০৯
আল্লাহর রসূল এর খুতবা থেকে জাবির এর বর্ণিত হাদীস। তাতে রয়েছে وَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তাদের জন্য ন্যায়সঙ্গত খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা তোমাদের কর্তব্য। "৮১০
৩. মিলনের মাধ্যমে স্ত্রীকে নিষ্পাপ রাখা: বিবাহে তার যে অধিকার এবং উপকার রয়েছে সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং ফিতনাকে তার থেকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে। আয়াতের ব্যাপকতা থেকে এটা প্রমাণিত হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ
"তারপর তারা যখন পরিশুদ্ধ হবে তখন তাদের সহবাস করো, যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন।" [সূরা বাক্বারাহ: ২২২]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ
"তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছে গমন করতে পারো।" [সূরা বাক্বারাহ: ২২৩]
আল্লাহর রসূল বলেছেন: وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَ "আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদকা।"৮১১ অর্থাৎ মিলন।
৪. স্ত্রীর সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সুন্দর আচরণ করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে।" [সুরা নিসা: ১৯]
সুতরাং স্ত্রীর সাথে উত্তম সম্পর্কের মাধ্যমে তার অন্তরঙ্গ হয়ে যাবে, তার থেকে যে কষ্টদায়ক আচরণ প্রকাশ পায় সেগুলোর উপর ধৈর্য ধারণ করবে এবং তার প্রতি ভালো ধারনা রাখবে। আল্লাহর রসূল বলেছেন: خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই যে তার পরিবারের নিকটে উত্তম। "৮১২
৫. স্ত্রীদের মাঝে ভরণপোষণ এবং রাত্রীযাপনে নিরপেক্ষ থাকা: এটা সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে যার একাধিক স্ত্রী রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا "যদি তোমরা ইনসাফ করতে না পারার ভয় করো।" [সূরা নিসা: ৩]
আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِسْعُ نِسْوَةٍ، فَكَانَ إِذَا قَسَمَ بَيْنَهُنَّ، لَا يَنتَهِي إِلَى الْمَرْأَةِ الْأُولَى إِلَّا فِي يَسْعِ "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নয়জন সহধর্মিণী ছিলেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাঝে পালাবণ্টনে নয় দিনের আগে (পালার) প্রথম স্ত্রীর কাছে পুনরায় পৌঁছাতেন না।"৮১৩
দ্বিতীয়: স্বামীর অধিকার স্ত্রীর থেকে প্রাপ্য স্বামীর অধিকারগুলো স্বামী থেকে পাওয়া স্ত্রী অধিকারের থেকে বড়ো। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾لِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ "পুরুষদেরকে তাদের উপর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।” [সূরা বাক্বারাহ: ২২৮]
রসূল বলেছেন: لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ المَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَلَا تُؤَدِّي الْمُرْأَةُ حَقَّ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهَا كُلَّهُ، حَتَّى تُؤَدِّيَ حَقَّ زَوْجِهَا عَلَيْهَا كُلَّهُ "আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে অপর কাউকে সাজদা করার আদেশ করতাম, তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীকে সাজদা করতে নির্দেশ দিতাম। কোনো মহিলা তার উপর অর্পিত আল্লাহর হক সম্পূর্ণ আদায় করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করবে।”৮১৪
স্ত্রীর কাছে স্বামীর প্রাপ্য অধিকার:
১. স্বামীর গোপন বিষয়কে হেফাজত করা, কারো কাছে প্রকাশ না করা: কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ "যে সকল নারী পুণ্যবতী তারা আনুগত্য করে, লোকচক্ষুর আড়ালে আল্লাহর সংরক্ষিত বিষয় সংরক্ষণ করে।" [সূরা নিসা: ৩৪]
২. সৎ কাজে স্বামীর অনুগত থাকা ওয়াজিব: আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ "পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক।” [সূরা নিসা: ৩৪]
৩. স্বামী যখন বিছানায় ডাকবে তখন নিজেকে তার কাছে অর্পণ করা: যখন শারঈ কোনো বাধা থাকবে না। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ أَنْ تَجِيء، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ "যদি পুরুষ তার স্ত্রীকে তার সঙ্গে বিছানায় শোয়ার জন্য ডাকে, আর সে আসতে অস্বীকার করে, অতঃপর স্বামী স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতাগণ ঐ মহিলার ওপর লা'নত বর্ষণ করতে থাকেন। "৮১৫
৪. স্বামীর অর্থ-সম্পদ, ঘরবাড়ি এবং সন্তান-সন্ততিকে রক্ষনাবেক্ষণ ও উত্তমভাবে লালন-পালন করা: আল্লাহর রসূল বলেছেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ... وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَهِيَ مسؤوله عَن رَعِيَّتِهَا "তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনদের (দায়িত্ব) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে। ইমাম দায়িত্বশীল; তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।... নারী তার স্বামী- গৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।”৮১৬
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন:
وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ "তাদের উপরে তোমাদের অধিকার হলো, তারা যেন তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে স্থান না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ করো। "৮১৭
৫. আন্তরিকতার সাথে স্বামীর সঙ্গী হওয়া। স্বামীর সাথে উত্তম আচরণ করা। তাকে কষ্ট না দেওয়া: আল্লাহর রসূল বলেছেন:
لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا، إِلَّا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الحُورِ العِينِ: لَا تُؤْذِيهِ، قَاتَلَكِ اللَّهُ، فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ يُوشِكُ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا
“যখন স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতে তার আয়তালোচনা হুর স্ত্রীগণ বলতে থাকেন, ওহে! আল্লাহ্ তোমার ধ্বংস করুন। তুমি তাকে কষ্ট দিও না। সে তোমার নিকট অল্প দিনের মেহমান। অচিরেই সে তোমাকে ত্যাগ করে আমাদের নিকট চলে আসবে।”৮১৮
الدخيل বা আদ দাখিল অর্থ হলো- মেহমান, কুটুম।
তৃতীয়: স্বামী-স্ত্রীর যৌথ অধিকার পূর্বে উল্লিখিত অধিকারগুলোর অধিকাংশই স্বামী-স্ত্রীর যৌথ অধিকার। এগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপভোগ এবং এর সাথে সম্পৃক্ত অধিকারগুলো। সেই সাথে স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেই অপরের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। অপরের দেওয়া কষ্ট বা আচার-আচরনকে মেনে নিতে হবে। অপরের অধিকারকে ঝুলিয়ে রাখতে পারবে না। একে অন্যকে অপছন্দ করতে পারবে না এবং অন্যকে কষ্ট ও খোঁটা দিতে পারবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴿
“তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে।” [সুরা নিসা: ১৯] আরও বলেছেন: وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴿
“নারীদের ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে তাদের উপর পুরুষদের অধিকারের মতোই।” [সূরা বাক্বারাহ: ২২৮] আল্লাহর রসুল বলেছেন: خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই যে তার পরিবারের নিকটে উত্তম।”৮১৯ সেই সাথে স্বামীর কাছে স্ত্রী অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও তাকে রেখে দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
“তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করো; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করেও থাকো, তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ অগণিত কল্যাণ রেখেছেন।” [সূরা নিসা: ১৯]
টিকাঃ
৮০৯. সুনান আবু দাউদ, হা. ২১৪২, আহমাদ ৪/৪৪৭; হাকিম ২/১৮৭ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া, হা, ২০৩৩।
৮১০. সহীহ মুসলিম, হা. ২৮৪০, ফুআ. ১২১৮।
৮১১. সহীহ মুসলিম, হা, ২২১৯, ফুআ. ১০০৬।
৮১২. আহমাদ ৪/৪৭২; সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৬৮৬। শাইখ আলবানী যঈফ বলেছেন, যঈফাহ ২/২৪২।
৮১৩. সহীহ মুসলিম, হা. ৩৫২০, ফুআ. ১৪৬২।
৮১৪. 'ইবনু মাজাহ, হা. ১৮৫২; বায়হাকী ৭/২৯২। শাইখ আলবানী ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন, সহীহাহ ৩/২০২।
৮১৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪৩৬-১২২।
৮১৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৮৯৩, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৮২৯।
৮১৭. সহীহ মুসলিম, হা. ২৮৪০, ফুআ, ১২১৮।
৮১৮. মুসনাদে আহমাদ ৫/২৪২; ইবনু মাজাহ, হা. ২০১৪; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহাহ, হা. ১৭৩।
৮১৯. 'আহমাদ ৪/৪৭২; সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৬৮৬; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, যঈফাহ ২/২৪২।