📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ

📄 বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ


বিবাহ-নিষিদ্ধ নারী প্রধানত দুই প্রকার। প্রথম প্রকার চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় প্রকার সাময়িক সময়ের জন্য নিষিদ্ধ।
প্রথম প্রকার: চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ নারীগণ: চিরস্থায়ী বিবাহ নিষিদ্ধ এমন নারী ১৪ জন। সাত জন বংশগতভাবে এবং সাত জন অন্য কারণে। تأبيد দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পরিস্থিতি যাই হোক যাদেরকে চিরস্থায়ী বিবাহ করার বৈধতা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এই নিষিদ্ধতার তিনটি কারণ রয়েছে:
ক. আত্মীয়তার সম্পর্ক; খ. বৈবাহিক সম্পর্ক; গ. দুগ্ধগত সম্পর্ক।
প্রথম: আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. মা, মায়ের মা, বাবার মা। কারণ তাদেরকে (أصول الإنسان) মানুষের মূল বলা হয়ে থাকে।
২. মেয়ে, মেয়ের মেয়ে, ছেলের মেয়ে। কারণ তাদেরকে (فروع الإنسان) মানুষের (নিজের) শাখা প্রশাখা বলা হয়ে থাকে।
৩. আপন বোন, সৎ বোন, পিতার দিক থেকে হোক অথবা মায়ের দিক থেকে হোক। কারণ তাদেরকে فروع الابوين বা বাবা-মার শাখা-প্রশাখা বলে।
৪. আপন ভাইয়ের মেয়ে, বাবার দিক থেকে অথবা মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইয়ের বা বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে।
৫. আপন বোনের মেয়ে, বাবা অথবা মায়ের দিক থেকে সৎ বোনের মেয়ে।
৬. ফুফু, যিনি বাবার বোন, অনুরূপভাবে বাবার ফুফু এবং মায়ের ফুফু। কারণ তাদেরকে فروع (الجدين من جهة الإب) বা দাদাদাদির শাখা বলা হয়ে থাকে।
৭. খালা, তিনি হলেন মায়ের বোন। অনুরূপভাবে মায়ের খালা এবং বাবার খালা। কারণ তাদেরকে (فروع الجدين من جهة الإم) নানা-নানীর শাখা-প্রশাখা বলা হয়ে থাকে। সুতরাং এই সকল নারীদের কাউকে কোনো অবস্থাতেই বিবাহ করা বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ)
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে।" [সূরা নিসা: ২৩]
দ্বিতীয়: বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে নিম্নে বর্ণিত নারীগণকে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১. পিতার স্ত্রী (সৎ মা)। অনুরূপভাবে দাদার স্ত্রী (সৎ দাদী); নানার স্ত্রী (সৎ নানী)। কারণ তাদেরকে (زوجات الأصول) পূর্ব পুরুষদের স্ত্রী বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا)
"নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছেন, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না, তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (সেটা ক্ষমা করা হলো)। নিশ্চয়ই তা ছিল অশ্লীল, মারাত্মক ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা।" [সূরা নিসা: ২২]
২. পুত্রবধূ, ছেলের পুত্রবধু (নাতবৌ), মেয়ের পুত্রবধূ (নাতবৌ): অনুরূপভাবে শাখা প্রশাখার যত বধু আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَحَلَا بِلُ أَبْنَابِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ "আর তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের ঔরসজাত ছেলের স্ত্রী।"[সূরা নিসা: ২৩]
৩. স্ত্রীর মা অর্থাৎ শাশুড়ী। অনুরূপভাবে স্ত্রীর যত "মহিলা মূল” আছে। যেমন স্ত্রীর নানী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَأُمَّهَاتُ نِسَابِكُمْ﴿ "আর তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের শাশুড়ীকে।" [সুরা নিসা: ২৩]
বিবাহ চুক্তি হলেই এই তিন প্রকার নারী বিবাহ নিষিদ্ধ হবেন। নিষেধমূলক অন্য কোনো কারণ তাদের থাকুক বা না থাকুক, তাতে কোনো সমস্যা নেই।
৪. স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর কন্যা। তাকে ربيبة অর্থাৎ সৎ মেয়ে বলা হয়। সে মায়ের স্বামীর জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَرَبَا بِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَابِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ) "তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সঙ্গত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত মেয়ে যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে।" [সূরা নিসা: ২৩]
সৎ মেয়ে মায়ের স্বামীর কাছে লালিত পালিত হওয়াটা হারাম হওয়ার জন্য শর্ত নয়। তবে কুরআনে )فِي حُجُورِكُمْ( বা নিজ গৃহে পালিত উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য। এই মেয়েটি কোনো লোকের জন্য নিষিদ্ধ হবে তখন যখন সেই লোক তার মায়ের সাথে বাসর করবে। লোকটি যদি তার মায়ের সাথে বাসর করতে না পারে। যেমন মিলিত হওয়ার আগে মহিলাটি মারা গেল অথবা লোকটি মহিলাকে তালাক দিয়ে দিল। তখন মহিলার মেয়েটিকে বিবাহ করা এই লোকের জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ) "তবে যদি তাদের সাথে তোমরা সহবাস না করে থাকো, তবে (তাদের বদলে তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করলে) তোমাদের গুনাহ নেই।" [সূরা নিসা: ২৩]
৫. নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মায়ের যে-কোনো স্বামীকে এবং তার মেয়ের স্বামীকে, স্বামীর ছেলেকে এবং স্বামীর বাবাকে।
তৃতীয়: رضاع দুগ্ধগত সম্পর্কের কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ: সাতজন নারীকে দুগ্ধগত সম্পর্কের কারণে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। কুরআন দুই জনের কথা উল্লেখ করেছে। বাকি পাঁচজনের কথা হাদীসে উল্লেখ রয়েছে।
ক. কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. দুধ মাতা। সে হলো ঐ নারী যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার সাথে তার মা, তার মায়ের মা এবং তার বাবার মা-ও একই হুকুমের হবে।
২. দুধ বোন। সে হলো ঐ মেয়ে যে আপনার মায়ের দুধ পান করেছে। অথবা আপনি তার মায়ের দুধ পান করেছেন। অথবা আপনি এবং সেই মেয়ে একই নারীর দুধ পান করেছেন। অথবা আপনি তার বাবার স্ত্রীর দুধ পান করেছেন। অথবা সে আপনার বাবার স্ত্রীর দুধ পান করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ
"তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের সেই মা যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন এবং তোমাদের দুধ বোন।” [সূরা নিসা: ২৩]
খ. হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহে নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. দুধ ভাইয়ের মেয়ে;
২. দুধ বোনের মেয়ে;
৩. দুধ ফুফু। ঐ নারী যিনি আপনার পিতার সাথে (একই নারী থেকে) দুধ পান করেছেন।
৪. দুধ খালা। ঐ নারী যিনি আপনার মায়ের সাথে (একই নারী থেকে) দুধ পান করেছেন।
৫. দুধ মেয়ে। ঐ মেয়ে যে আপনার স্ত্রীর দুধ পান করেছে। এ অবস্থায় সে লোক মেয়েটির দুধ পিতা হয়ে যায়।
এই নারীগণ বিবাহে নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল হলো আয়িশাহ এর বর্ণিত হাদীস।
إِنَّ الرَّضَاعَةَ تُحَرِّمُ مَا تُحَرِّمُ الوِلَادَةُ
"নিশ্চয়ই দুধের সম্পর্ক তাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ করে, জন্মসূত্রে যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ।"৭৯৮
ইবনু আব্বাস এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামযাহ এর মেয়ের ব্যাপারে বলেন:
إِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِي ، إِنَّهَا ابْنَةُ أَخِي مِنَ الرَّضَاعَةِ، وَيَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ الرَّحِمِ
“সে আমার জন্য (বিবাহর জন্য) বৈধ নয়। কেননা সে আমার দুধ সম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ে। রক্ত সম্পর্কের কারণে যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ, দুধ সম্পর্কের কারণেও তাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ।৭৯৯
দ্বিতীয় প্রকার: সাময়িকভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ: যে সকল নারী সাময়িকভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ, তারা দুই ভাগে বিভক্ত: প্রথম ভাগ: একত্রিত (সহবাস) হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ; দ্বিতীয় ভাগ: অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে নিষিদ্ধ।
প্রথম ভাগ: একত্রিত (সহবাস) হওয়ার কারণে যারা নিষিদ্ধ: ১. দুই বোন একত্র হওয়া; আপন বোন হোক অথবা দুধ বোন। দুই জনের আকদে নিকাহ একত্রে হোক অথবা ভিন্ন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ "তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ একত্রে দুই বোনকে (বিবাহ বন্ধনে) রাখা।" [সুরা নিসা: ২৩]
২. কোনো মহিলা এবং তার ফুফু অথবা খালাকে একত্র করা। কোনো মহিলা আর তার ভাই অথবা বোনের মেয়ে অথবা ছেলের বা মেয়ের মেয়েকে একত্র করা।
القاعدة هنا أن الجمع يحرم بين كل امرأتين لو فرضت إحداهما ذكراً لما جاز له أن يتزوج الأخرى. মূলনীতি: এমন দুইজন নারী একত্র হওয়া নিষিদ্ধ, যাদের একজনকে পুরুষ ও অন্যজনকে নারী ধরা হলে একজন আরেকজনকে বিবাহ করা বৈধ হবে না।
এর দলীল আবু হুরায়রা হাদীস। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসুল বলেন:
لا يُجْمَعُ بَيْنَ المَرْأَةِ وَعَمَّتِهَا، وَلَا بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَخَالَتِهَا "কেউ যেন ফুফু ও তার ভাতিজিকে এবং খালা ও তার ভাগনিকে একত্রে বিয়ে না করে।"৮০০ আবু হুরায়রা আরেকটি হাদীস:
أَنَّ رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم نَهَى أن تُنْكَحُ المُرْأَةُ عَلَى عَمَّتِهَا ، وَلَا الْعَمَّةُ عَلَى بِنْتِ أَخِيهَا، وَلَا الْمُرْأَةُ عَلَى خَالَتِهَا، وَلَا الْحَالَةُ عَلَى بِنْتِ أُخْتِهَا، وَلَا تُنْكَحُ الْكُبْرَى عَلَى الصُّغْرَى، وَلَا الصُّغْرَى عَلَى الْكُبْرَى
"নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো নারীকে তার ফুফুর সাথে; কোনো ফুফুকে তার ভাতিজির সাথে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো নারীকে ও তার খালা এবং কোনো খালা ও তার ভাগনিকে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপ বড়ো (বোন)-কে ছোটোর (বোন) সাথে এবং ছোটোকে বড়োর (বোন) সাথে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন।" ৮০১
আলেমগণও এই নিষিদ্ধ হওয়ার উপর একমত হয়েছেন।
দ্বিতীয় ভাগ: অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা বিবাহে নিষিদ্ধ হয়েছেন।
১. অন্যের ইদ্দত পালন করছে এমন নারীকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ
"ইদ্দত (নির্ধারিত সময়) পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করো না।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৫]
২. যে নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে তার জন্য এই স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম। যতক্ষণ না নিকাহে সহীর মাধ্যমে অন্য কোনো স্বামী এই মহিলার সাথে মিলন করবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে (চূড়ান্ত) তালাক দেয়, তবে এরপর তার জন্য সে (স্ত্রী হিসেবে) হালাল নয়। যে পর্যন্ত না সে (স্ত্রী) অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৩০]
৩. ইহরাম বাধা নারীকে বিবাহ করা হারাম। যতক্ষণ না সে তার ইহরাম থেকে হালাল হচ্ছে। উসমান থেকে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল বলেন: لَا يَنْكِحُ الْمُحْرِمُ، وَلَا يُنْكَحُ، وَلَا يَخْطُبُ
"মুহরিম ব্যক্তি বিবাহ করবে না, অন্যকে বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাব দিবে না।" ৮০২
৪. কাফেরের জন্য মুসলিম নারীকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا)
"তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” [সুরা বাক্বারাহ: ২২১]
৫. মুসলিম পুরুষের জন্য কাফের মহিলাকে বিবাহ করা হারাম। কিন্তু সে কিতাবী মহিলাকে বিবাহ করতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ
"তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।"[সূরা বাক্বারাহ: ২২১) আরও বলেছেন:
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ
“তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীদেরকে (বিবাহ করা) বৈধ।” (সুরা মায়িদাহ: ৫) অর্থাৎ কিতাবীরা তোমাদের জন্য হালাল।
৬. কোনো মুসলিম স্বাধীন পুরুষের মুসলিম দাসীকে বিবাহ করা হারাম। তবে অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে জিনায় জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা করছে অপর দিকে কোনো স্বাধীন মহিলার মোহর অথবা দাসী কেনার টাকা তার কাছে নেই। সেই অবস্থায় মুসলিম দাসীকে বিবাহ করা তার জন্য বৈধ আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُمْ بَعْضُكُم مِّنْ بَعْضٍ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَءَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنكُمْ
"তোমাদের যে ব্যক্তির স্বাধীনা মুমিন নারী বিবাহের ক্ষমতা না থাকে, সে যেন তোমাদের অধীন মুমিনা দাসী বিবাহ করে এবং আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে জানেন। তোমাদের একজন অন্যজন থেকে উদ্ভুত। কাজেই তাদেরকে বিয়ে করো তাদের মালিকের অনুমতি নিয়ে, ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের মোহরানা তাদেরকে দিয়ে দাও, তারা হবে সচ্চরিত্রা, ব্যভিচারিণী নয়, উপপতি গ্রহণকারিণীও নয়। বিবাহ করে সুরক্ষিত হওয়ার পর তারা যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীদের অর্ধেক; এ ব্যবস্থা তার জন্য তোমাদের যে ব্যক্তি (অবিবাহিত থাকার কারণে) ব্যভিচারের ভয় করে।" [সুরা নিসা: ২৫]
৭. মুসলিম ক্রীতদাসের জন্য তার মহিলা মনিবকে বিবাহ করা হারাম। কারণ এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন। আরেকটি কারণ হলো, স্ত্রী মনিব আর স্বামী গোলাম হলে তাদের মাঝে অনেক বিরোধিতা দেখা দিবে।
৮. মালিকের নিজের দাসীকে বিবাহ করা হারাম। কারণ মালিকানা চুক্তি বিবাহ চুক্তি থেকে বেশি শক্তিশালী।

টিকাঃ
৭৯৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৫০৯৯, সহীহ মুসলিম ১৪৪৪।
৭৯৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১০০, সহীহ মুসলিম ১৪৪৭।
৮০০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১০৯, সহীহ মুসলিম ১৪০৮।
৮০১. সুনান আবু দাউদ, হা. ২০৬৫; নাসাঈ ৬/৯৬; তিরমিযী, হা. ১১২৬ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া ৬/২৯০।
৮০২. সহীহ মুসলিম ১৪০৯।

বিবাহ-নিষিদ্ধ নারী প্রধানত দুই প্রকার। প্রথম প্রকার চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় প্রকার সাময়িক সময়ের জন্য নিষিদ্ধ।
প্রথম প্রকার: চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ নারীগণ: চিরস্থায়ী বিবাহ নিষিদ্ধ এমন নারী ১৪ জন। সাত জন বংশগতভাবে এবং সাত জন অন্য কারণে। تأبيد দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পরিস্থিতি যাই হোক যাদেরকে চিরস্থায়ী বিবাহ করার বৈধতা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এই নিষিদ্ধতার তিনটি কারণ রয়েছে:
ক. আত্মীয়তার সম্পর্ক; খ. বৈবাহিক সম্পর্ক; গ. দুগ্ধগত সম্পর্ক।
প্রথম: আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. মা, মায়ের মা, বাবার মা। কারণ তাদেরকে (أصول الإنسان) মানুষের মূল বলা হয়ে থাকে।
২. মেয়ে, মেয়ের মেয়ে, ছেলের মেয়ে। কারণ তাদেরকে (فروع الإنسان) মানুষের (নিজের) শাখা প্রশাখা বলা হয়ে থাকে।
৩. আপন বোন, সৎ বোন, পিতার দিক থেকে হোক অথবা মায়ের দিক থেকে হোক। কারণ তাদেরকে فروع الابوين বা বাবা-মার শাখা-প্রশাখা বলে।
৪. আপন ভাইয়ের মেয়ে, বাবার দিক থেকে অথবা মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইয়ের বা বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে।
৫. আপন বোনের মেয়ে, বাবা অথবা মায়ের দিক থেকে সৎ বোনের মেয়ে।
৬. ফুফু, যিনি বাবার বোন, অনুরূপভাবে বাবার ফুফু এবং মায়ের ফুফু। কারণ তাদেরকে فروع (الجدين من جهة الإب) বা দাদাদাদির শাখা বলা হয়ে থাকে।
৭. খালা, তিনি হলেন মায়ের বোন। অনুরূপভাবে মায়ের খালা এবং বাবার খালা। কারণ তাদেরকে (فروع الجدين من جهة الإم) নানা-নানীর শাখা-প্রশাখা বলা হয়ে থাকে। সুতরাং এই সকল নারীদের কাউকে কোনো অবস্থাতেই বিবাহ করা বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ)
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে।" [সূরা নিসা: ২৩]
দ্বিতীয়: বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে নিম্নে বর্ণিত নারীগণকে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১. পিতার স্ত্রী (সৎ মা)। অনুরূপভাবে দাদার স্ত্রী (সৎ দাদী); নানার স্ত্রী (সৎ নানী)। কারণ তাদেরকে (زوجات الأصول) পূর্ব পুরুষদের স্ত্রী বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا)
"নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছেন, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না, তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (সেটা ক্ষমা করা হলো)। নিশ্চয়ই তা ছিল অশ্লীল, মারাত্মক ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা।" [সূরা নিসা: ২২]
২. পুত্রবধূ, ছেলের পুত্রবধু (নাতবৌ), মেয়ের পুত্রবধূ (নাতবৌ): অনুরূপভাবে শাখা প্রশাখার যত বধু আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَحَلَا بِلُ أَبْنَابِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ "আর তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের ঔরসজাত ছেলের স্ত্রী।"[সূরা নিসা: ২৩]
৩. স্ত্রীর মা অর্থাৎ শাশুড়ী। অনুরূপভাবে স্ত্রীর যত "মহিলা মূল” আছে। যেমন স্ত্রীর নানী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَأُمَّهَاتُ نِسَابِكُمْ﴿ "আর তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের শাশুড়ীকে।" [সুরা নিসা: ২৩]
বিবাহ চুক্তি হলেই এই তিন প্রকার নারী বিবাহ নিষিদ্ধ হবেন। নিষেধমূলক অন্য কোনো কারণ তাদের থাকুক বা না থাকুক, তাতে কোনো সমস্যা নেই।
৪. স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর কন্যা। তাকে ربيبة অর্থাৎ সৎ মেয়ে বলা হয়। সে মায়ের স্বামীর জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَرَبَا بِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَابِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ) "তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সঙ্গত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত মেয়ে যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে।" [সূরা নিসা: ২৩]
সৎ মেয়ে মায়ের স্বামীর কাছে লালিত পালিত হওয়াটা হারাম হওয়ার জন্য শর্ত নয়। তবে কুরআনে )فِي حُجُورِكُمْ( বা নিজ গৃহে পালিত উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য। এই মেয়েটি কোনো লোকের জন্য নিষিদ্ধ হবে তখন যখন সেই লোক তার মায়ের সাথে বাসর করবে। লোকটি যদি তার মায়ের সাথে বাসর করতে না পারে। যেমন মিলিত হওয়ার আগে মহিলাটি মারা গেল অথবা লোকটি মহিলাকে তালাক দিয়ে দিল। তখন মহিলার মেয়েটিকে বিবাহ করা এই লোকের জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ) "তবে যদি তাদের সাথে তোমরা সহবাস না করে থাকো, তবে (তাদের বদলে তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করলে) তোমাদের গুনাহ নেই।" [সূরা নিসা: ২৩]
৫. নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মায়ের যে-কোনো স্বামীকে এবং তার মেয়ের স্বামীকে, স্বামীর ছেলেকে এবং স্বামীর বাবাকে।
তৃতীয়: رضاع দুগ্ধগত সম্পর্কের কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ: সাতজন নারীকে দুগ্ধগত সম্পর্কের কারণে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। কুরআন দুই জনের কথা উল্লেখ করেছে। বাকি পাঁচজনের কথা হাদীসে উল্লেখ রয়েছে।
ক. কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. দুধ মাতা। সে হলো ঐ নারী যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার সাথে তার মা, তার মায়ের মা এবং তার বাবার মা-ও একই হুকুমের হবে।
২. দুধ বোন। সে হলো ঐ মেয়ে যে আপনার মায়ের দুধ পান করেছে। অথবা আপনি তার মায়ের দুধ পান করেছেন। অথবা আপনি এবং সেই মেয়ে একই নারীর দুধ পান করেছেন। অথবা আপনি তার বাবার স্ত্রীর দুধ পান করেছেন। অথবা সে আপনার বাবার স্ত্রীর দুধ পান করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ
"তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ তোমাদের সেই মা যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন এবং তোমাদের দুধ বোন।” [সূরা নিসা: ২৩]
খ. হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহে নিষিদ্ধ নারীগণ:
১. দুধ ভাইয়ের মেয়ে;
২. দুধ বোনের মেয়ে;
৩. দুধ ফুফু। ঐ নারী যিনি আপনার পিতার সাথে (একই নারী থেকে) দুধ পান করেছেন।
৪. দুধ খালা। ঐ নারী যিনি আপনার মায়ের সাথে (একই নারী থেকে) দুধ পান করেছেন।
৫. দুধ মেয়ে। ঐ মেয়ে যে আপনার স্ত্রীর দুধ পান করেছে। এ অবস্থায় সে লোক মেয়েটির দুধ পিতা হয়ে যায়।
এই নারীগণ বিবাহে নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল হলো আয়িশাহ এর বর্ণিত হাদীস।
إِنَّ الرَّضَاعَةَ تُحَرِّمُ مَا تُحَرِّمُ الوِلَادَةُ
"নিশ্চয়ই দুধের সম্পর্ক তাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ করে, জন্মসূত্রে যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ।"৭৯৮
ইবনু আব্বাস এর হাদীস। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামযাহ এর মেয়ের ব্যাপারে বলেন:
إِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِي ، إِنَّهَا ابْنَةُ أَخِي مِنَ الرَّضَاعَةِ، وَيَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ الرَّحِمِ
“সে আমার জন্য (বিবাহর জন্য) বৈধ নয়। কেননা সে আমার দুধ সম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ে। রক্ত সম্পর্কের কারণে যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ, দুধ সম্পর্কের কারণেও তাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ।৭৯৯
দ্বিতীয় প্রকার: সাময়িকভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ নারীগণ: যে সকল নারী সাময়িকভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ, তারা দুই ভাগে বিভক্ত: প্রথম ভাগ: একত্রিত (সহবাস) হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ; দ্বিতীয় ভাগ: অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে নিষিদ্ধ।
প্রথম ভাগ: একত্রিত (সহবাস) হওয়ার কারণে যারা নিষিদ্ধ: ১. দুই বোন একত্র হওয়া; আপন বোন হোক অথবা দুধ বোন। দুই জনের আকদে নিকাহ একত্রে হোক অথবা ভিন্ন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ "তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ একত্রে দুই বোনকে (বিবাহ বন্ধনে) রাখা।" [সুরা নিসা: ২৩]
২. কোনো মহিলা এবং তার ফুফু অথবা খালাকে একত্র করা। কোনো মহিলা আর তার ভাই অথবা বোনের মেয়ে অথবা ছেলের বা মেয়ের মেয়েকে একত্র করা।
القاعدة هنا أن الجمع يحرم بين كل امرأتين لو فرضت إحداهما ذكراً لما جاز له أن يتزوج الأخرى. মূলনীতি: এমন দুইজন নারী একত্র হওয়া নিষিদ্ধ, যাদের একজনকে পুরুষ ও অন্যজনকে নারী ধরা হলে একজন আরেকজনকে বিবাহ করা বৈধ হবে না।
এর দলীল আবু হুরায়রা হাদীস। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসুল বলেন:
لا يُجْمَعُ بَيْنَ المَرْأَةِ وَعَمَّتِهَا، وَلَا بَيْنَ الْمَرْأَةِ وَخَالَتِهَا "কেউ যেন ফুফু ও তার ভাতিজিকে এবং খালা ও তার ভাগনিকে একত্রে বিয়ে না করে।"৮০০ আবু হুরায়রা আরেকটি হাদীস:
أَنَّ رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم نَهَى أن تُنْكَحُ المُرْأَةُ عَلَى عَمَّتِهَا ، وَلَا الْعَمَّةُ عَلَى بِنْتِ أَخِيهَا، وَلَا الْمُرْأَةُ عَلَى خَالَتِهَا، وَلَا الْحَالَةُ عَلَى بِنْتِ أُخْتِهَا، وَلَا تُنْكَحُ الْكُبْرَى عَلَى الصُّغْرَى، وَلَا الصُّغْرَى عَلَى الْكُبْرَى
"নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো নারীকে তার ফুফুর সাথে; কোনো ফুফুকে তার ভাতিজির সাথে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো নারীকে ও তার খালা এবং কোনো খালা ও তার ভাগনিকে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপ বড়ো (বোন)-কে ছোটোর (বোন) সাথে এবং ছোটোকে বড়োর (বোন) সাথে একত্রে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন।" ৮০১
আলেমগণও এই নিষিদ্ধ হওয়ার উপর একমত হয়েছেন।
দ্বিতীয় ভাগ: অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা বিবাহে নিষিদ্ধ হয়েছেন।
১. অন্যের ইদ্দত পালন করছে এমন নারীকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ
"ইদ্দত (নির্ধারিত সময়) পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করো না।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৫]
২. যে নিজের স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে তার জন্য এই স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম। যতক্ষণ না নিকাহে সহীর মাধ্যমে অন্য কোনো স্বামী এই মহিলার সাথে মিলন করবে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে (চূড়ান্ত) তালাক দেয়, তবে এরপর তার জন্য সে (স্ত্রী হিসেবে) হালাল নয়। যে পর্যন্ত না সে (স্ত্রী) অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৩০]
৩. ইহরাম বাধা নারীকে বিবাহ করা হারাম। যতক্ষণ না সে তার ইহরাম থেকে হালাল হচ্ছে। উসমান থেকে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল বলেন: لَا يَنْكِحُ الْمُحْرِمُ، وَلَا يُنْكَحُ، وَلَا يَخْطُبُ
"মুহরিম ব্যক্তি বিবাহ করবে না, অন্যকে বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাব দিবে না।" ৮০২
৪. কাফেরের জন্য মুসলিম নারীকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا)
"তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।” [সুরা বাক্বারাহ: ২২১]
৫. মুসলিম পুরুষের জন্য কাফের মহিলাকে বিবাহ করা হারাম। কিন্তু সে কিতাবী মহিলাকে বিবাহ করতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ
"তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে।"[সূরা বাক্বারাহ: ২২১) আরও বলেছেন:
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ
“তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীদেরকে (বিবাহ করা) বৈধ।” (সুরা মায়িদাহ: ৫) অর্থাৎ কিতাবীরা তোমাদের জন্য হালাল।
৬. কোনো মুসলিম স্বাধীন পুরুষের মুসলিম দাসীকে বিবাহ করা হারাম। তবে অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে জিনায় জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা করছে অপর দিকে কোনো স্বাধীন মহিলার মোহর অথবা দাসী কেনার টাকা তার কাছে নেই। সেই অবস্থায় মুসলিম দাসীকে বিবাহ করা তার জন্য বৈধ আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُمْ بَعْضُكُم مِّنْ بَعْضٍ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَءَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنكُمْ
"তোমাদের যে ব্যক্তির স্বাধীনা মুমিন নারী বিবাহের ক্ষমতা না থাকে, সে যেন তোমাদের অধীন মুমিনা দাসী বিবাহ করে এবং আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে জানেন। তোমাদের একজন অন্যজন থেকে উদ্ভুত। কাজেই তাদেরকে বিয়ে করো তাদের মালিকের অনুমতি নিয়ে, ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের মোহরানা তাদেরকে দিয়ে দাও, তারা হবে সচ্চরিত্রা, ব্যভিচারিণী নয়, উপপতি গ্রহণকারিণীও নয়। বিবাহ করে সুরক্ষিত হওয়ার পর তারা যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীদের অর্ধেক; এ ব্যবস্থা তার জন্য তোমাদের যে ব্যক্তি (অবিবাহিত থাকার কারণে) ব্যভিচারের ভয় করে।" [সুরা নিসা: ২৫]
৭. মুসলিম ক্রীতদাসের জন্য তার মহিলা মনিবকে বিবাহ করা হারাম। কারণ এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন। আরেকটি কারণ হলো, স্ত্রী মনিব আর স্বামী গোলাম হলে তাদের মাঝে অনেক বিরোধিতা দেখা দিবে।
৮. মালিকের নিজের দাসীকে বিবাহ করা হারাম। কারণ মালিকানা চুক্তি বিবাহ চুক্তি থেকে বেশি শক্তিশালী।

টিকাঃ
৭৯৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৫০৯৯, সহীহ মুসলিম ১৪৪৪।
৭৯৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১০০, সহীহ মুসলিম ১৪৪৭।
৮০০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫১০৯, সহীহ মুসলিম ১৪০৮।
৮০১. সুনান আবু দাউদ, হা. ২০৬৫; নাসাঈ ৬/৯৬; তিরমিযী, হা. ১১২৬ এবং তিনি হাসান সহীহ বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া ৬/২৯০।
৮০২. সহীহ মুসলিম ১৪০৯।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কিতাবী নারীকে বিবাহের বিধান

📄 কিতাবী নারীকে বিবাহের বিধান


ইসলাম স্বাধীন আহলে কিতাবী নারীকে বিবাহ করা বৈধ করেছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ
"আজ তোমাদের জন্য যাবতীয় ভালো ও পবিত্র বস্তু হালাল করা হলো ও যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল। আর তোমাদের খাদ্যও তাদের জন্য হালাল। সচ্চরিত্রা মুমিন নারী এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারী তোমাদের জন্য হালাল করা হলো যখন তোমরা তাদেরকে (বিয়ের জন্য) মোহরানা প্রদান করো।" [সূরা মায়িদাহ: ৫]
আহলে কিতাবী নারীকে বিবাহ করা জায়েয। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। আহলে কিতাবদের মাঝে যেসকল নারীদেরকে বিবাহ করা বৈধ, তারা হলো যারা তাওরাত ও ইঞ্জিল ধারণ করে আছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَنْ تَقُولُوا إِنَّمَا أُنْزِلَ الْكِتَابُ عَلَى طَائِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا
"যেন তোমরা না বলতে পারো যে, কিতাব তো শুধু আমাদের পূর্বে দুই (ইহুদি ও নাসারা) সম্প্রদায়ের প্রতিই নাযিল হয়েছিল।" [সূরা আনআম : ১৫৬]

ইসলাম স্বাধীন আহলে কিতাবী নারীকে বিবাহ করা বৈধ করেছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ
"আজ তোমাদের জন্য যাবতীয় ভালো ও পবিত্র বস্তু হালাল করা হলো ও যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল। আর তোমাদের খাদ্যও তাদের জন্য হালাল। সচ্চরিত্রা মুমিন নারী এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারী তোমাদের জন্য হালাল করা হলো যখন তোমরা তাদেরকে (বিয়ের জন্য) মোহরানা প্রদান করো।" [সূরা মায়িদাহ: ৫]
আহলে কিতাবী নারীকে বিবাহ করা জায়েয। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। আহলে কিতাবদের মাঝে যেসকল নারীদেরকে বিবাহ করা বৈধ, তারা হলো যারা তাওরাত ও ইঞ্জিল ধারণ করে আছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَنْ تَقُولُوا إِنَّمَا أُنْزِلَ الْكِتَابُ عَلَى طَائِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا
"যেন তোমরা না বলতে পারো যে, কিতাব তো শুধু আমাদের পূর্বে দুই (ইহুদি ও নাসারা) সম্প্রদায়ের প্রতিই নাযিল হয়েছিল।" [সূরা আনআম : ১৫৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00