📄 বিবাহের পরিচয় এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীলসমূহ
ক. বিবাহের পরিচয়:
النكاح বা নিকাহ-এর শাব্দিক অর্থ: الضم، والجمع، والتداخل জমা করা, একত্রিত করা, ভিতরে প্রবেশ করা। বলা হয়ে থাকে تناكحت الأشجار( বাক্য থেকে শব্দটি নেওয়া হয়েছে। কারণ গাছ একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত থাকে। অথবা )نكح المطر الأرض( বাক্য থেকে নেওয়া হয়েছে। কারণ বৃষ্টি জমির ভেজা মাটির সাথে মিশে যায়।
شرعاً: عقد يتضمن إباحة استمتاع كل من الزوجين بالآخر، على الوجه المشروع পারিভাষিক অর্থ: বিবাহ এমন একটি চুক্তি যার দ্বারা শরীয়তের অনুমতিতে স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে উপভোগ করার বৈধতা লাভ করে।
খ. বিবাহ শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীলসমূহ:
বিবাহ শরীয়ত সম্মত হওয়ার মূল হচ্ছে: কুরআন-সুন্নাহ এবং ইজমা।
কুরআনুল কারীমের অনেক আয়াত বিবাহ শরীয়ত সম্মত হওয়ার পক্ষে দলীল: তন্মধ্যে হচ্ছে মহান আল্লাহ বলেন:
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ)
“তোমাদের ভালো লাগে এমন নারীদের মধ্যে থেকে বিয়ে করবে দুই, তিন বা চারটি; আর যদি আশংকা করো যে সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকেই বিয়ে করবে বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে গ্রহণ করো।” [সূরা নিসা: ৩]
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى ৭৮৪ مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَا بِكُمْ
"তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও।” [সূরা নূর: ৩২]
বিবাহ বৈধ হওয়ার পক্ষে অনেক হাদীস রয়েছে: তার মধ্যে একটি হাদীস ইবনু মাসউদ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءُ
“হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার কামনাকে দমন করবে।”৭৮৬
আরেকটি হাদীস মা'কিল ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল বলেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمُ الْأُمَمَ
"এমন নারীকে বিয়ে করো যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। নিশ্চয়ই আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যার আধিক্যের কারণে গর্ব করব।"৭৮৭
আর সকল মুসলিম বিবাহ বৈধ হওয়ার ব্যপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
টিকাঃ
৭৮৪. আইয়ামা : এটি أیم শব্দের বহুবচন। অর্থ যার পুরুষের মধ্য থেকে স্বামী নেই। যার মহিলার মধ্য থেকে বউ নেই।
৭৮৫. الباءة অর্থ বিবাহ ও বিবাহ করা। এখানে উদ্দেশ্য বিয়ের সামর্থ্য ও ব্যয়ভার।
৭৮৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহু বুখারী, হা. ৫০৬৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৪০০।
৭৮৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ২০৫০; নাসাঈ, হা. ৬৫১৬; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুন নাসাঈ, হা. ৩০২৬।
📄 বিবাহ শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্যসমূহ
আল্লাহ তা'আলা কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিকমতের কারণে বিবাহকে শরীয়ত সম্মত করেছেন। নিম্নে এগুলোর সার-সংক্ষেপ আলোচনা করা হলো।
১. মানুষের যৌনাঙ্গগুকে নিষ্পাপ রাখা। কারণ আল্লাহ তা'আলা নিজে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টির সময়ই মানুষের প্রকৃতিতে যৌন বাসনা স্থাপন করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বিবাহকে শরীয়ত সম্মত করেছেন এই বাসনাকে তৃপ্ত করার জন্য এবং এই বাসনা নিয়ে খেলতামাশা দূর করার জন্য।
২. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া। সেই সাথে উভয়ের মাঝে আনন্দ, ভালবাসা, শান্তি ও প্রশান্তি অর্জিত হওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
(وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً) "আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা রুম: ২১]
৩. বংশ সুরক্ষিত থাকা, একে অন্যের মাধ্যমে পরস্পরিক আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং রক্তের বন্ধন তৈরি হওয়া।
৪. মানব বংশকে টিকিয়ে রাখা এবং মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা; যাতে করে মুসলিমদের মাধ্যমে কাফেরদেরকে দমন করা যায় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা যায়।
৫. অবৈধ সম্পর্ক আর জিনার মাধ্যমে ধ্বংস ও বিনাশ হওয়া থেকে মানুষের চরিত্রকে রক্ষা করা।
📄 বিবাহের হুকুম এবং স্ত্রী নির্বাচন
১. বিবাহের হুকুম: ব্যক্তির অবস্থার ভিন্নতার কারণে বিবাহের হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে।
প্রথমত: বিবাহ করা ওয়াজিব: কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহের দায়িত্ব ও খরচ বহনে সক্ষম হয়, জিনায় জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা করে, তবে তার উপর ওয়াজিব। কারণ বিবাহই একমাত্র পথ যা তাকে নিষ্পাপ রাখবে এবং হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে হেফাজত করবে। আর যদি বিবাহের দায়িত্ব ও খরচ বহন করতে সক্ষম না হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে সচ্ছল বানিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তার জন্য রোজা রাখা আবশ্যক।
দ্বিতীয়ত: সুন্নত ও উত্তম কাজ: কোনো ব্যক্তি এমন অবস্থার মাঝে আছে যে, তার যৌন চাহিদাও আছে, বিবাহ করার মতো অর্থও তার আছে। তবে সে নিজের ব্যপারে জিনার জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা করে না। তবুও তার জন্য বিবাহ করা সুন্নত। কারণ মানুষকে বিবাহের প্রতি আগ্রহী ও উদ্বুদ্ধ করে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।
তৃতীয়ত: মাকরূহ তথা অপছন্দনীয়: যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহের প্রয়োজন অনুভব না করে, হতে পারে সে এমন বৃদ্ধ বা অসুস্থ যার কোনো যৌন চাহিদা নেই অথবা হতে পারে সে (عنين) অর্থাৎ তার স্ত্রী মিলনের সক্ষমতা নেই অথবা নারীর প্রতি তার কোনো আগ্রহ জাগে না।
২. স্ত্রী নির্বাচনে যা করণীয়:
বিবাহের পাত্রী দেখার ব্যাপারে কিছু মূলনীতিকে সুন্নাত করা হয়েছে। যেমন: পাত্রীর দ্বীনদারিতা, তার চারিত্রিক পবিত্রতা, তার মৌলিক ভালোগুণ, তার বংশ মর্যাদা এবং সৌন্দর্য। যে হাদীসটির কারণে নারীর এই গুণাবলিকে সুন্নত করা হয়েছে সেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা । তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعِ : لَمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَدَاكَ
"নারীদেরকে চারটি গুণ দেখে বিবাহ করা হতো: তার ধন-সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, রূপ-লাবন্য এবং দ্বীনদারিতা। তবে দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিবে। আর তা না করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”৭৮৮
সুতরাং ব্যক্তি সর্বাগ্রে দ্বীনকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং এটাকেই পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মূল মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করবে। অনুরূপভাবে অধিক সন্তান জন্মদানকারিণী নারীকে স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করাও সুন্নাত। হাদীসটি আনাস আল্লাহর রসূল থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمُ الْأُمَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"তোমরা অধিক মমতাময়ী ও অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারী বিবাহ করো। আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যার আধিক্য নিয়ে গর্ব করব।"৭৮৯
এছাড়াও কুমারী নির্বাচন করা সুন্নাত। আল্লাহর রসূল জাবির কে বলেছিলেন:
فَهَلًا بِكْرًا تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ “তুমি কি কুমারী নারী খুঁজে পেলে না! সে তোমাকে আনন্দ দিত এবং তুমিও তাকে সোহাগ দিতে!”৭৯০
তবে যদি পূর্বে বিবাহিত নারীকে বিবাহ করার মাঝে কোনো কল্যাণ থাকে, তাহলে বিবাহিত নারীই নির্বাচন করবে ও কুমারী নারীর উপর বিবাহিত নারীকে প্রাধান্য দিবে। তবে সুদর্শনা নারী নির্বাচন করবে। তাহলে সেই নারী তার চিত্তকে প্রশান্ত রাখবে। তার চোখকে অন্য নারী থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং তার ভালোবাসাকে বারবার জাগিয়ে তুলবে।
টিকাঃ
৭৮৮. 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহ বুখারী, হা. ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪৬৬।
৭৮৯. 'সুনান আবু দাউদ, হা. ২০৫০; নাসাঈ, হা. ৬৫১৬; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহন নাসাঈ, হা. ৩০২৬।
৭৯০. 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহ বুখারী, হা. ৫০৭৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৭১৫।
📄 বিবাহ প্রস্তাবের নিয়মনীতি এবং তার শিষ্টাচার
الخطبة এর অর্থ হলো নির্দিষ্ট এক নারীকে বিবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করা। সেই ইচ্ছার কথা তার অভিভাবককে জানিয়ে দেওয়া।
বাগদান এর নিয়ম-নীতি এবং শিষ্টাচার: ১. কন্যাপক্ষকে কেউ প্রস্তাব দিয়েছে এবং কন্যাপক্ষ সেই প্রস্তাবে সম্মতিও প্রকাশ করেছে। এই সম্মতি প্রকাশ যদি ইশারা ইঙ্গিতেও হয়ে থাকে, এ অবস্থায় প্রথম প্রস্তাবের সম্মতির কথা জানার পর অন্য কোনো মুসলিমের সেখানে বিবাহ প্রস্তাব প্রদান করা হারাম। আল্লাহর রসূল বলেছেন: لَا يَخْطُبُ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ حَتَّى يَنْكِحَ أَوْ يَتْرُكَ “কোনো লোক তার মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব পেশ করতে পারবে না; যতক্ষণ না প্রথম ব্যক্তি বিবাহ করে অথবা তা ছেড়ে দেয়।”৭৯১ কারণ দ্বিতীয় প্রস্তাব প্রথম প্রস্তাবকে নষ্ট করে দিবে এবং পরস্পরের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করবে।
২. المعتدة البائن বা তালাকে বায়েনাহ (চূড়ান্ত তালাকপ্রাপ্তা) প্রাপ্তা নারী। যে ইদ্দত পালন করছে, তাকে স্পষ্টভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া হারাম। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ولَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ "আর যদি তোমরা ইশারায় নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দাও বা তোমাদের অন্তরে গোপন রাখো, তবে তোমাদের কোনো পাপ নেই।"[সুরা বাক্বারাহ: ২৩৫]
তবে তাকে ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রস্তাব দেওয়া যাবে। যেমন: কেউ বলল, আমি চাচ্ছি যে, কোনো সৎ নারীকে আল্লাহ যেন আমার জন্য সহজ করে দেন। অথবা বলল, আমি বিবাহ করতে চাই। সুতরাং ইশারার মাধ্যমে প্রস্তাব দেওয়া বৈধ আছে। এ কথাটি প্রমাণ করে যে, স্পষ্টভাবে প্রস্তাব দেওয়া জায়েয নেই। কেননা এ অবস্থাতে কোনো নারীকে স্পষ্টভাবে প্রস্তাব দিলে সে ইদ্দত শেষ না করেই বিবাহ বসার জন্য আগ্রহী হয়ে যেতে পারে।
আর المعتدة الرجعية বা যে নারী রাজঈ তালাক নিয়ে ইদ্দত পালন করছে, তাকে কোনোভাবেই প্রস্তাব দেওয়া যাবে না; স্পষ্টভাবেও না, ইশারা ইঙ্গিতেও না। কেননা সে এখনো স্ত্রীর হুকুমে আছে।
৩. পাত্র এবং পাত্রীর ব্যাপারে যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হবে তার জন্য আবশ্যকীয় হলো, সে দোষ-গুণ সবই উল্লেখ করবে। এটা গীবত হবে না; বরং এটা সৎ পরামর্শ। এ ব্যপারে শরীয়ত উৎসাহ দিয়ে থাকে।
৪. 'বাগদান' ওই মেয়ের প্রতি বিবাহের প্রতিশ্রুত ও আগ্রহ প্রকাশ মাত্র। 'বাগদান' কখনোই বিয়ে নয়। তাই ছেলে এবং মেয়ে প্রত্যেকেই অন্যের কাছে গাইরে মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে।
টিকাঃ
৭৯১. সহীহ বুখারী, হা. ৫১৪৪।