📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 আসাবা বানানো

📄 আসাবা বানানো


আসাবা (العصبة) তারা হলো ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা নির্ধারিত অংশ ছাড়াই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে। কারণ আসেব (العاصب) যখন একাকী থাকে, তখন সে একাই সমস্ত সম্পদের উত্তরাধীকারী হয়। আর যখন তার সাথে অন্য কোনো নির্ধারিত অংশের হকদার থাকে, তখন তারা তাদের সম্পদ নিয়ে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা সে গ্রহণ করে। কারণ নাবী বলেছেন: أَلْحِقُوا الفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا، فَمَا بَقِيَ فَلِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
"তোমরা নির্ধারিত অংশের হকদারদের হক দিয়ে দাও, অতঃপর যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে তা নিকটবর্তী পুরুষদের জন্য।”৭৮০
আসাবা তিন প্রকার: ১. العصبة بالنفس বা যে সকল ব্যক্তি নিজে নিজেই আসাবা হয়। ২. العصبة بالغير বা যে সকল ব্যক্তি অন্যের মাধ্যমে আসাবা হয়। ৩. العصبة مع الغير বা যে সকল ব্যক্তি অন্যের সাথে আসাবা হয়।
১. যে ব্যক্তিরা নিজে নিজেই আসাবা হয়: তারা হলো: ছেলে, ছেলের ছেলে বা আরও নিচের পর্যায়ে যারা থাকবে তারা। পিতা, দাদা, পরদাদা বা তার উপর পর্যায়ে যারা থাকবে তারা। সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই ও তাদের উভয়ের সন্তান, যদিও তা আরও উঁচু স্তরের হয়। সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই, ও তাদের উভয়ের সন্তান, যদিও তা আরও নিচ পর্যায়ের হয়। আপান চাচা, বৈমাত্রেয় চাচা, বা আরও যারা উপর পর্যায়ের রয়েছে এবং তাদের উভয়ের সন্তানগণ, যদিও তারা নিচ পর্যায়ের হয়। দাস-দাসী আজাদকারী পুরুষ ও নারী।
তাদের মধ্যে যে উত্তরাধীকারী হওয়ার ক্ষেত্রে একাই থাকবে, সে একাই সমস্ত সম্পদ গ্রহণ করবে। আর যখন নির্ধারিত অংশের উত্তরাধিকারীদের সাথে থাকবে, তখন তারা তাদের নির্ধারিত অংশ নিয়ে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা তারা পাবে। আর যদি কিছুই অবশিষ্ট না থাকে, তবে তারা কিছুই পাবে না।
২. যারা অন্যের মাধ্যমে আসাবা হয়: তারা হলো: কন্যা, ছেলের কন্যা বা নাতনী, সহোদর বোন, বৈমাত্রেয় বোন। এরা সকলে তাদের ভাইদের সাথে আসাবা হয়। আর নাতনী তার স্তরে যারা নাতি থাকে, চাই সে নাতনীর আপন ভাই হোক বা চাচাত ভাই হোক, তার মাধ্যমে বা প্রয়োজন তার চেয়ে আরও নিছু স্তরের কেউ যদি থাকে, তাবে তার মাধ্যমেও সে আসাবা হতে পারে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য যে পুরুষরা রয়েছে, তারা তাদের বোনদের ওয়ারিস বানাবে না। যেমন- ভাইদের সন্তানগণ ভাতিজারা, চাচা এবং চাচার সন্তনেরা।
৩. যারা অন্যের সাথে আসাবা হয়: তারা হলো: সহোদর বোনেরা (মৃত ব্যক্তির) কন্যাদের সাথে বা নাতনীদের সাথে আসাবা হয়। আর যদি দুই বা ততোধিক আসাবা একত্রিত হয়, আর তারা যদি আত্মীয়তা সম্পর্কে সুদৃঢ় বন্ধন ও স্থরের দিক দিয়ে সমান হয়, তবে তারা উভয়েই সম্পদের অংশীদার হবে। যেমন- ছেলেরা ও ভায়েরা।
আর আত্মীয়তা সম্পর্কের দিক যদি ভিন্ন হয়, তবে শক্তিশালী দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- ছেলে ও পিতা।
আর যদি সম্পর্কের দিক যদি একই রকম হয়, কিন্তু স্থরের দিকে ভিন্নতা থাকে, তবে নিকটবর্তী স্তরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেমন- নাতির উপর ছেলেকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
আর যদি আত্মীয়তা সম্পর্কের দিক ও স্তর সমান হয়, কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী হওয়ার দিক থেকে ভিন্নতা থাকে, তবে অধিক শক্তিশালী দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- সহোদর ভাইকে বৈমাত্রেয় ভায়ের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে।

টিকাঃ
৭৮০. সহীহুল বুখারী ৬৭৩২, সহীহ মুসলিম ২/১৬১৫।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 বাঁধা দেওয়া (উত্তরাধীকারীকে তার উত্তরাধিকার থেকে বাঁধা দেওয়া)

📄 বাঁধা দেওয়া (উত্তরাধীকারীকে তার উত্তরাধিকার থেকে বাঁধা দেওয়া)


الحجب তথা বাঁধা দেওয়া হলো: সমস্ত সম্পদ হতে বা কিছু সম্পদ হতে উত্তরাধিকারীকে তার উত্তরাধিকার হতে বাঁধা দেওয়া, এমন ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে যে ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক বেশি হকদার। এটা দুই প্রকার:
১. حجب الأوصاف তথা কর্ম বা বিশেষণের কারণে সম্পদ হতে বঞ্চিত হওয়া: যে ব্যক্তি সম্পদ হতে বঞ্চিত হওয়ার তিনটি কারণ: দাস হওয়া বা হত্যা করা, বা মুরতাদ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যে কোনো একটির সাথে সম্পৃক্ত হবে, সে সম্পদ হতে বঞ্চিত হবে। তার থাকাকে না থাকা বলে গণ্য করা হবে। এটা সকল উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে হতে পারে।
২. حجب الأشخاص তথা ব্যক্তির কারণে সম্পদ হতে বঞ্চিত হওয়া: স্বাভাবিকভাবে সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া বলতে এটাকেই বুঝায়। এটা দুই প্রকার:
প্রথমতঃ حجب الحرمان তথা পরিপূর্ণভাবে (সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়া থেকে) বঞ্চিত হওয়া: তা হলো, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি সামগ্রিকভাবে সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া। এটা সমস্ত ওয়ারিসদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, শুধুমাত্র ছয় প্রকার ব্যক্তি ব্যতীত। তারা হলো: বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে।
দ্বিতীয়ত: )حجب النقصان( তথা অধিক সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া: তা হলো, অধিক সম্পদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে কম সম্পদ পাওয়া। এ পদ্ধতিতে সম্পদ হতে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হলো: সে ব্যক্তির চেয়ে বেশি হকদার ব্যক্তি থাকা। এজন্য এটার নামকরণ করা হয়েছে حجب الأشخاص তথা ব্যক্তির কারণে সম্পদ হতে বঞ্চিত হওয়া। এটা আবার সাত প্রকার: [নোট: আসাবা-অনির্ধারিত অংশ অর্থাৎ যাদের জন্য উত্তরাধিকার সম্পদে নির্ধারিত অংশ থাকে না]
১. অধিক অংশ হতে কম অংশে স্থানান্তরিত হওয়া। এটা ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে যাদের নির্ধারিত দুটি অংশ রয়েছে। যেমন: স্বামী-স্ত্রী, মাতা, নাতনী এবং বৈমাত্রেয় বোন।
২. নির্ধারিত অংশ হতে আসাবাতে স্থানান্তরিত হওয়া। এটা হয়ে থাকে যারা অর্ধেক ও দুই তৃতীয়াংশের উত্তরাধীকারী হয়। যখন তাদের সাথে আসাবাকারী থাকে।
৩. আসাবা থেকে নির্ধারিত অংশের দিকে ফিরে যাওয়া, যা আসাবা থেকে কম। এটা পিতা ও দাদার ক্ষেত্রে হওয়ে থাকে, যখন তারা আসাবা থেকে নির্ধারিত অংশের দিকে আসে।
৪. এক আসাবা হতে আরেক আসাবায় যাওয়া, যা তুলনামূলক কম। এটা সহোদর বোন ও বৈমাত্রেয় বোনের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কারণ তারা মেয়ে ও নাতনীর সাথে থাকলে যতটুকু সম্পদ পেতো, তারা তাদের ভায়ের সাথে আসাবা হলে, তার চেয়ে কম পেয়ে থাকে।
৫. নির্ধারিত অংশ বণ্টনের ক্ষেত্রে অনেক লোকের সমাগম হওয়া। যেমন এক চতুর্থাংশ সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে দুজন স্ত্রীর একত্রিত হওয়া অথবা এক ষষ্ঠাংশ সম্পদ বণ্টনে একাধিক দাদী থাকা।
৬. আসাবার ক্ষেত্রে অনেক লোকের সমাগম হওয়া। যেমন সম্পূর্ণ সম্পদ বা অবশিষ্ট সম্পদের ক্ষেত্রে অনেক আসাবা হওয়া।
৭. নির্ধারিত অংশের অধিকারীদের আউলে )عول( ৭৮১ সমাগম ঘটা। যে সমস্ত আসলের ক্ষেত্রে আউল )عول( সংঘটিত হয়ে থাকে।
এরই উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি: যে ব্যক্তি কারো মাধ্যমে সম্পর্কযুক্ত হয়, ৭৮২ ঐ সম্পর্ক মাধ্যমই ব্যক্তি তাকে বঞ্চিত করে। আর মৃতব্যক্তির আসলকে (পিতা, দাদা, বা পরদাদাকে) আসলই বঞ্চিত করে (অর্থাৎ পিতা থাকলে দাদাকে বঞ্চিত করবে, আবার যদি পিতা না থাকে, কিন্তু দাদা ও পরদাদা থাকে তবে দাদা পরদাদাকে বঞ্চিত করে)। আর ফুরু فروع কে তার উচু স্তরের فروع ই বঞ্চিত করবে (অর্থাৎ ছেলে, নাতি, নাতির ছেলে এগুলো فروع। যদি ছেলে থাকে, তবে নাতিকে বঞ্চিত করবে, আর যদি ছেলে না থাকে, কিন্তু নাতি ও নাতির ছেলে থাকে, তবে নাতি নাতির ছেলেকে বঞ্চিত করবে।)। আর حواشی )মৃতব্যক্তির ভাই-বোন) কে أصول বা আসল (বাপ-দাদা) ও فروع বা ফুরু (ছেলে-নাতনী) ও حواشی )নিকটবর্তী ভাই-বোন দূরবর্তী ভাইবোনকে) বঞ্চিত করে থাকে।

টিকাঃ
৭৮১. আউল: উত্তরাধিকারের সামষ্টিক নির্ধারিত ভাগের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তাদের প্রত্যেকের নির্ধারিত অংশকে হ্রাস করা।
৭৮২. বা আল ইদলা: মৃতের সাথে সম্পর্ক। সেটা হবে সরাসরি রক্তের সাথে। যেমন- পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা। অথবা কারো মাধ্যমে সম্পর্কযুক্ত হবে। যেমন- পুত্রের পুত্র বা নাতির সম্পর্ক ছেলের মাধ্যমে অথবা নাতনির সম্পর্ক ছেলের মাধ্যমে।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কে

📄 নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কে


ذوی الارحام হলো: প্রত্যেক ঐ নিকটাত্মীয়, যাদের কোনো নির্ধারিত অংশ নেই এবং যারা আসাবাও হয় না। তারা চারভাগে বিভক্ত:
১. যাদেরকে মৃত ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। তারা হলো: কন্যাদের সন্তানগণ, নাতনীদের সন্তান বা আরও নিচের স্তরে যারা থাকবে তারা।
২. মৃত ব্যক্তিকে যাদের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। তারা হলো: সম্পদ হতে বাদ পড়ে যাওয়া দাদা-নানা ও দাদী-নানী ও উঁচু স্তরের।
৩. যাদেরকে মৃত ব্যক্তির পিতা-মা তার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। তারা হলো: বোনদের সন্তানগণ, ভায়ের কন্যাগণ, বৈপিত্রেয় ভায়ের সন্তানগণ এবং তাদের নিকটাত্মীয় থাকবে যারা, যদিও তারা নিচের স্তরের হয়।
৪. যাদেরকে মৃত ব্যক্তির দাদা-নানা ও দাদী-নানীদের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। তারা হলো: মায়ের চাচা ও ফুফুগণ, চাচার কণ্যাগণ বা চাচাত বোনেরা, মামাগণ ও তাদের সন্তানগণ, যদিও তারা দূরের হয় এবং নিচের স্তরের হয়। তাদের ওয়ারিস হওয়ার ক্ষেত্রে দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ “আর নিকটাত্মীয়গণ, আল্লাহর বিধানে তাদের কতক কতকের চেয়ে বেশি নিকটবর্তী।” [সূরা আনফাল: ৭৫]
আর আল্লাহর রসূল বলেছেন: “যার কোনো ওয়ারিস নেই, মামা তার ওয়ারিস হবে।”৭৮৩
তাদের ওয়ারিস হওয়ার পদ্ধতি হলো- তারা প্রত্যেকে যার মাধ্যমে সম্পর্কযুক্ত হবে, তারা প্রত্যেক সে সম্পৃক্তকারী ব্যক্তির অনুযায়ী সম্পদ লাভ করবে।
আল্লাহ তা'আলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
৭৮৩. আহমাদ ১/২৮; সুনান আবু দাউদ, হা, ২৮৯৯; তিরমিযী, হা. ২১০৩ এবং তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান ও সহীহ; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনানুত তিরমিযী, হা. ১৭০৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00