📄 উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অধিকার, উত্তরাধিকারের কারণ ও তার প্রতিবন্ধকতাসমূহ
১. উত্তরাধিকার সম্পত্তি-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব: মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া নগদ অর্থ, জিনিসপত্র কিংবা হকসমূহকে পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বলা হয়। [আরবী ভাষায় যাকে التركة বলা হয়। অনুবাদক] মৃতব্যক্তির পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে চারটি হক জড়িত:
ক. প্রথমত, মৃতব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা গ্রহনপূর্বক তৎসংশ্লিষ্ট খরচ বহন করতে হবে। যেমন- কাফনের কাপড়, সুগন্ধী, দাফনের পারিশ্রমিক, গোসল ইত্যাদি।
খ. অতঃপর ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যাকাত, সাদাকাতুল ফিতর, কাফফারা, মানত এবং এজাতীয় যা কিছু আল্লাহর ঋণের সাথে সম্পৃক্ত সেগুলো সর্বপ্রথম পরিশোধ করতে হবে। অতঃপর মানুষের ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
গ. অতঃপর অসীয়ত পূরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে অসীয়তের পরিমাণ মোট সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি না হয়।
ঘ. অতঃপর উত্তরাধিকারীদেরকে তাদের প্রাপ্য বন্টন করে দিতে হবে। رث বা উত্তরাধিকার: কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে মৃতের সম্পত্তি জীবিতদের মালিকানায় চলে যাওয়াকে رث বলা হয়।
কখনও কখনও মৃতব্যক্তির সম্পদের সাথে অন্যের অধিকারও জড়িয়ে পড়ে। এগুলোকে বস্তুগত হক বলা হয়। যেমন- মৃত ব্যক্তি যদি বিক্রেতা হয়ে থাকে তবে তাকে ক্রেতার কাছে পণ্য হস্তান্তর করতে হবে। অথবা সে যদি বন্ধকদাতা হয়ে থাকে তবে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু এই সম্পদগুলো 'উত্তরাধিকারে' পরিণত হওয়ার আগে ব্যক্তির মূল সম্পদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেহেতু এক্ষেত্রে উল্লিখিত হকগুলো মৃতের দাফন-কাফনের পূর্বেই আদায় করতে হবে।
২. উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার কারণসমূহ: উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার তিনটি কারণ রয়েছে: প্রথম কারণ: বিবাহ: দুইজন সাক্ষী ও একজন ওলীর মাধ্যমে বৈধ বিবাহ হতে হবে। এক্ষেত্রে সহবাস কিংবা নির্জনবাস সাব্যস্ত হওয়া শর্ত নয়। সার্বজনীনভাবে মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ)
"তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক তোমাদের জন্য।" [সূরা নিসা: ১২] দ্বিতীয় কারণ: বংশীয় সম্পর্ক: মৃতের নিকটাত্মীয়। সেটা হলো: মানুষের একে অপরের সাথে জৈবিক সম্পর্ক। সেটা নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী হতে পারে। ব্যক্তির পূর্বপুরুষ, উত্তরপুরুষ, হওয়াশী (আত্মীয়তার বা ভাই ও চাচা) বংশীয় সম্পর্কের আওতাভুক্ত।
পূর্বপুরুষ: বাবা, দাদা এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ।
উত্তরপুরুষ: ছেলে, ছেলের ছেলে এবং তাদের অধঃস্তন পুরুষ।
তৃতীয় কারণ: আল-ওয়ালা: এটি এমন একটি বন্ধন যা মনিব কর্তৃক তার দাসকে মুক্ত করার মাধ্যমে তৈরি হয়। সকলের ঐকমত্যে, আজাদকৃত দাস কখনও মনিবের ওয়ারিস হতে পারে না। সুতরাং, ওয়ারিস সাব্যস্ত হওয়ার দুটি কারণ পাওয়া গেল: ১. বংশীয় সম্পর্ক ২. বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক
উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রতিবন্ধকতাসমূহ: উত্তরাধিকারী না হওয়ার তিনটি প্রতিবন্ধকতা: ক. হত্যা: সকল আলেম এব্যাপারে একমত যে, 'ইচ্ছাকৃত হত্যা' উত্তরাধিকার সাব্যস্ত হওয়ার জন্য অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং, কেউ যদি অন্যায়ভাবে তার পূর্বসূরীকে হত্যা করে তবে সে তার উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। রসূল বলেছেন:
لَيْسَ لِلْقَاتِلِ مِنَ الْمِيرَاثِ شَيْءٌ “হত্যাকারীর জন্য মীরাসের কোনো অংশ নেই।”
খ. দাসত্বঃ একজন দাস তার নিকট আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। কারণ, উত্তরাধিকারী সূত্রে দাস কোনো সম্পত্তির মালিক হলে সেটা মূলত তার মনিবের মালিকানায় চলে যায়। অনুরূপভাবে, একজন দাসও কাউকে উত্তরাধিকারী বানাতে পারে না; কারণ সে কোনো সম্পদের মালিক নয়।
গ. পূর্বসূরী বা উত্তরাধীকারী রেখে যাওয়া ব্যক্তি ও উত্তরাধীকারির মধ্যে দ্বীনের পার্থক্য: এটা উত্তরাধিকারের প্রতিবন্ধকতা। নাবী বলেন:
لَا يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ، وَلَا يَرِثُ الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ “কোনো কাফের কোনো মুসলিমের উত্তরাধিকারী হবে না এবং কোনো মুসলিম কোনো কাফেরের উত্তরাধিকারী হবে না।”
📄 উত্তরাধিকারের প্রকার
উত্তরাধিকার দুই প্রকার: পুরুষ ও মহিলা।
পুরুষদের মধ্য থেকে উত্তরাধিকার ১০ প্রকার: ১ ও ২. ছেলে ও তার ছেলে এবং অধঃস্তন পুরুষ: মহান আল্লাহর বাণীর ভিত্তিতে।
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক পুত্রের জন্য দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ।”[সুরা নিসা: ১১]
৩ ও ৪. বাবা ও তার বাবা এবং ঊর্ধ্বতন পুরুষ: মহান আল্লাহ বলেন: وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ "আর যদি তার সন্তান থাকে তবে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে তার পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ।" [সুরা নিসা: ১১]
আয়াতাংশে উল্লিখিত 'পিতা'র মাঝে 'দাদা'ও অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রসূল দাদার জন্য এক-ষষ্ঠমাংশ নির্ধারণ করেছেন।
৫. যে-কোনো দিক থেকে ভাই (সহোদর, বৈমাত্রেয়, বৈপিত্রেয়): إِنِ امْرُوا هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَهُ أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ وَهُوَ يَرِثُهَا إِن لَّمْ يَكُن لَّهَا وَلَدٌ “কোনো ব্যক্তি যদি নিঃসন্তান হয়ে মারা যায় এবং তার এক বোন থাকে, তবে তার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক। আর সে (মহিলা) যদি নিঃসন্তান হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে।" [সূরা নিসা: ১৭৬]
মহান আল্লাহ আরও বলেন: وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَالَةً أَوِ امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتُ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ “যদি কোনো পুরুষ অথবা নারী 'কালালাহ (পিতা-মাতা ও সন্তানহীন) উত্তরাধিকারী হয়, আর তার এক ভাই অথবা বোন থাকে, তবে প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ।"[সূরা নিসা: ১২]
৬. বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলে ওয়ারিস হলেও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের ছেলে ওয়ারিস হবে না; কেননা সে 'যুল আরহামে'র অন্তর্ভুক্ত।
৭ ও ৮. চাচা ও চাচার ছেলে; সে বাবার আপন ভাই হতে পারে অথবা তার বৈমাত্রেয় ভাইও হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে 'যুল আরহাম' হওয়ার কারণে বৈপিত্রেয় ভাই ওয়ারিস হতে পারবে না।
৯. স্বামী: মহান আল্লাহ বলেন: ﴾وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ "তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক তোমাদের জন্য।"[সুরা নিসা: ১২]
১০. দাস আজাদকারী অথবা তার সমপর্যায়ের ব্যক্তি: আল্লাহর রসূল বলেন: الْوَلَاءُ لُحْمَةٌ كَلُحْمَةِ النَّسَبِ "ওয়ালা একটা শক্তিশালী সম্পর্ক যেমন রক্তের সম্পর্ক। ৭৭৬
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন : إِنَّمَا الْوَلَاءَ لِمَنْ أَعْتَقَ "দাসের রেখে যাওয়া সম্পদ মুক্তকারীর জন্যই সাব্যস্ত হবে।” ৭৭৭
মহিলাদের মধ্য থেকে উত্তরাধিকার ৭ প্রকার: ১ ও ২. কন্যা, ছেলের কন্যা বা নাতনী এবং তার অধঃস্তন ছেলের কন্যা: মহান আল্লাহ বলেন: يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক পুত্রের জন্য দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ। কিন্তু শুধু কন্যা দুইয়ের বেশি থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ। আর এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধেক।” [সূরা নিসা: ১১]
৩. মা: মহান আল্লাহ বলেন: وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثلث فَإِن كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ "আর যদি তার সন্তান থাকে তবে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে তার পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার উত্তরাধিকার হয় তার পিতামাতা তখন তার মায়ের জন্য তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ।” [সূরা নিসা: ১১]
৪. দাদী: নাবী তার জন্য এক-ষষ্ঠমাংশ ধার্য করেছেন। এ ব্যাপারে বুরাইদা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে- أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَعَلَ لِلْجَدَّةِ السُّدُسَ، إِذَا لَمْ يَكُنْ دُونَهَا أُمُّ "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃতের মাতা না থাকার অবস্থায় সম্পত্তি থেকে দাদীর জন্য এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। ৭৭৮
সুতরাং, এক্ষেত্রে দাদীর জন্য এক-ষষ্ঠমাংশ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য মায়ের অনুপস্থিতি শর্ত।
৫. বোন: এক্ষেত্রে সে আপন কিংবা বৈমাত্রেয় কিংবা বৈপিত্রেয় হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন: وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَالَةً أَوِ امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتُ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ
“যদি কোনো পুরুষ অথবা নারী 'কালালাহ (পিতা-মাতা ও সন্তানহীন) উত্তরাধিকারী হয়, আর তার এক ভাই অথবা বোন থাকে, তবে প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ।" [সূরা নিসা: ১২]
إِنِ امْرُوا هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَهُ أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ
"কোনো ব্যক্তি যদি নিঃসন্তান হয়ে মারা যায় এবং তার এক বোন থাকে, তবে তার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক।" [সূরা নিসা: ১৭৬]
فَإِن كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ
"অতঃপর যদি দুই বোন থাকে তবে তাদের জন্য তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ।” [সুরা নিসা: ১৭৬)
৬. স্ত্রী: মহান আল্লাহন বাণীর ভিত্তিতে। ﴾وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ
"তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ।" [সূরা নিসা: ১২]
৭. দাস মুক্তিকারিণী: নাবী বলেন: إِنَّمَا الوَلَاء لِمَنْ أَعْتَقَ
"দাসের রেখে যাওয়া সম্পদ মুক্তকারীর জন্যই সাব্যস্ত হবে।” ৭৭৯
টিকাঃ
৭৭৬. ইমাম শাফেঈ তার কিতাবুল উম, হা. ১২৩২; ইমাম হকিম তা মুসতাদরাকে ৪/৩৪১ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; ইমাম বায়হাকী ১০/২৯২, সহীহ বলেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুল জামে' হা. ৭১৫৭ এবং ইরওয়া ৬/১০৯।
৭৭৭. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহ বুখারী, হা. ১৪৯৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫০৫।
৭৭৮. সুনান আবু দাউদ, হা. ২৮৯৪; ইবনু মাজাহ, হা. ২৭২৪; তিরমিযী, হা, ২১০১। হাফেয ইবনু হাজার বলেন, ইবনু খুযায়মাহ ও ইবনু জারুদ সহীহ বলেছেন এবং ইবনু আদী শক্তিশালী করেছেন, বুলুগুল মারাম নং ৮৯৬।
৭৭৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহু বুখারী, হা. ১৪৯৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৫০৫।
📄 উত্তরাধিকার অনুসারে উত্তরাধিকারীদের প্রকার
প্রথম প্রকার: যে সমস্ত ব্যক্তি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অংশ সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। এ জাতীয় সাত প্রকার ব্যক্তি রয়েছে। তারা হলো: স্বামী-স্ত্রী, দাদী-নানী, মা, মায়ের পক্ষের ছেলে-মেয়ে।
দ্বিতীয় প্রকার: যে সমস্ত ব্যক্তি শুধুমাত্র আসাবা (তথা যাদের জন্য নির্ধারিত কোনো সম্পদ নেই, বরং নির্দিষ্ট অংশের অধীকারীদের হক দিয়ে দেওয়ার পর যা বাকি থাকে তারা সেটার মালিক হয়।-সম্পাদক) হিসেবে সম্পদ পেয়ে থাকেন। এ জাতীয় ব্যক্তি রয়েছে বারোজন। তারা হলো: ১. ছেলে, ২. ছেলের ছেলে/নাতি, ৩. সহোদর ভাই ৪. সহোদর ভায়ের ছেলে, ৫-৬. বৈমাত্রিক ভাই ও তার ছেলে, ৭-৮. আপান চাচা ও তার ছেলে, ৯-১০. বৈমাত্রেয় চাচা ও তার ছেলে, ১১-১২. দাসদাসী আজাদকারী পুরুষ ও নারী।
তৃতীয় প্রকার: যে সমস্ত ব্যক্তি কখনো আসাবা হিসেবে উত্তরাধিকারী হয় আবার কখনো নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারী হয়। আবার কখনো একইসাথে আসাবা ও নির্দিষ্ট অংশ উভয়টির মাধ্যমে উত্তরাধিকারী হয়। তারা হলো: পিতা ও দাদা।
চতুর্থ প্রকার: যে সমস্ত ব্যক্তি কখনো নির্দিষ্ট অংশের মাধ্যমে আবার কখনো আসাবার মাধ্যমে সম্পদের উত্তরাধীকারী হয়। তবে তারা একইসাথে আসাবা ও নির্দিষ্ট অংশের মাধ্যমে উত্তরাধিকারী হয় না। তারা হলো: স্বামী ব্যতীত অন্যান্য যারা অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকে এবং যারা দুই তৃতীয়াংশ পেয়ে থাকে।
সামষ্টিকভাবে নির্দিষ্ট অংশ পেয়ে থাকে এমন ব্যক্তি রয়েছে একুশজন: যারা নির্দিষ্ট অংশ পেয়ে থাকে তাদের নির্দিষ্ট অংশ ছয়টি। সেগুলো হলো, অর্ধেক; একচতুর্থাংশ; এক অষ্টমাংশ; দুই তৃতীয়াংশ; এক তৃতীয়াংশ এবং এক ষষ্ঠাংশ।
প্রথমত: যারা অর্ধেক অংশের উত্তরাধিকারী হয় তারা পাঁচ প্রকার: ১. স্বামী: যখন স্বামীর পক্ষ হতে অথবা অন্যপক্ষ থেকে ছেলে-মেয়ে ওয়ারিস থাকবে না। ২. কন্যা: যখন তার সাথে বোনের মধ্য থেকে কোনো শরীকানা থাকবে না এবং তাকে আসাবা করে দেয় এমন কোনো ভাই থাকবে না। ৩. ছেলের মেয়ে/নাতনী: যখন তার কোনো অংশীদার এবং তাকে আসাবা করে দেয় এমন কেউ এবং মৃতব্যক্তির কোনো সন্তান থাকবে না। ৪. সহোদর বোন: যখন তার সাথে তাকে আসাবা করে দেয় এমন কেউ, অংশীদার এবং ফারয়ে ওয়ারিস (সন্তান) ও আসলে ওয়ারিস (পিতা, দাদা) থাকবে না। ৫. বৈমাত্রেয় বোন: যখন তার সাথে তাকে আসাবা করে দেয় এমন কেউ অংশীদার, মৃতব্যক্তির কোনো সন্তান, মৃতব্যক্তির পিতা, সহোদর ভাই এবং সহোদর বোন থাকবে না।
দ্বিতীয়ত: যারা এক চতুর্থাংশ অংশ পেয়ে থাকে এ ধরনের ব্যক্তি দুইজন: ১. স্বামী: যখন মৃতব্যক্তির সন্তান থাকবে তখন এ সে অংশের অধিকারী হবে। ২. স্ত্রী: যখন (মৃত ব্যক্তির) মৃতব্যক্তির কোনো সন্তান থাকবে না, তখন সে এ অংশের মালিক হবে।
তৃতীয়: যারা এক অষ্টমাংশ অংশের উত্তরাধিকারী: তারা হলো, স্ত্রীগণ, চাই একজন হোক বা একাধিক। এটা তখন হবে যখন মৃত ব্যক্তির ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে।
চতুর্থত: যারা দুই তৃতীয়াংশ অংশের উত্তরাধিকারী: ১. কন্যা: যখন তাদেরকে আসাবা করে দেয় এমন কেউ না থাকে আর আসাবা করে দেয় এমন ব্যক্তি হলো মৃত ব্যক্তির আপন সন্তান। কণ্যাগণ এ অংশের অধিকারী তখন হবে যখন কণ্যাগণ দুই বা ততোধিক হবে। ২. ছেলের কন্যা/নাতনী: যখন তাদের সাথে তাদেরকে আসাবা করে দেয় এমন কেউ থাকবে না, আর আসাবাকারী হলো: ছেলের ছেলে/নাতি। এবং যখন ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে না। আর ফারয়ে ওয়ারিস হলো: (মৃত ব্যক্তির) ছেলে। এক্ষেত্রে তাদেরকে দুই বা ততোধিক হতে হবে।
৩. সহোদর বোন: যখন তারা দুই বা ততোধিক হয় এবং তাদেরকে আসাবাকারী না থাকে। তাদেরকে আসাবাকারী হলো: সহোদর ভাই। আর যখন তাদের ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে না। ফারয়ে ওয়ারিস হলো: (মৃত ব্যক্তির) সন্তানগণ এবং (মৃত ব্যক্তির) ছেলের সন্তানগণ।
৪. বৈমাত্রিক বোন: যখন তারা দুইজন বা ততোধিক হবে। যখন আসাবাকারী থাকবে না। ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে না এবং কোনো সহোদর ভাই বোন থাকবে না।
পঞ্চমত: যারা একতৃতীয়াংশের উত্তরাধিকারী হন। এ জাতীয় ব্যক্তি দুইজন:
১. মা: যখন মৃতব্যক্তির কোনো সন্তান এবং একাধিক ভাইবোন থাকবে না তখন সে এ অংশের অধিকারী হবে।
২. বৈপিত্রেয় ভাই: যখন তারা দুই বা ততোধিক হবে, ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে না অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির সন্তান ও ছেলের সন্তানগণ থাকবে না এবং পুরুষ আছলে ওয়ারিস থাকবে না অর্থাৎ মৃতব্যক্তির পিতা ও দাদা থাকবে না।
ষষ্ঠত: যারা এক ষষ্ঠাংশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়। এ জাতীয় ব্যক্তি হলো সাতজন।
১. পিতা: যখন ফারয়ে ওয়ারিস বা মৃত ব্যক্তির সন্তানগণ বা মৃত ব্যক্তির ছেলের সন্তানগণ না থাকবে।
২. দাদা: যখন ফারয়ে ওয়ারিস বা মৃতব্যক্তির সন্তান বা মৃত ব্যক্তির ছেলেদের সন্তান থাকবে।
৩. মা: যখন ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে অথবা (মৃত ব্যক্তির) একাধিক ভাই থাকবে।
৪. নানী: যখন মা না থাকবে।
৫. ছেলের কন্যা/নাতনী: যখন কোনো আসাবাকারী থাকবে না এবং তার উপরের স্থরের কোনো ফারয়ে ওয়ারিস থাকবে না। তবে যে অর্ধেক অংশের উত্তরাধিকারী হবে সে ব্যতীত। কেননা তার অর্ধেক অংশের মাঝেই সে এক ষষ্ঠাংশ সম্পদ গ্রহণ করেছে।
৬. বৈমাত্রেয় বোন: যখন তাকে কোনো আসাবাকারী থাকবে না। আসাবাকারী হলো তার ভাই। তার সাথে থাকবে মৃত ব্যক্তির সহোদর/আপন বোন, যে অর্ধেক অংশের উত্তরাধিকালী হবে।
৭. বৈপিত্রেয় ভাই-বোন: যখন ফারয়ে ওয়ারিস ও আসলে ওয়ারিস থাকবে না এবং যখন সে একাাকী থাকবে।
📄 আসাবা বানানো
আসাবা (العصبة) তারা হলো ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা নির্ধারিত অংশ ছাড়াই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে। কারণ আসেব (العاصب) যখন একাকী থাকে, তখন সে একাই সমস্ত সম্পদের উত্তরাধীকারী হয়। আর যখন তার সাথে অন্য কোনো নির্ধারিত অংশের হকদার থাকে, তখন তারা তাদের সম্পদ নিয়ে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা সে গ্রহণ করে। কারণ নাবী বলেছেন: أَلْحِقُوا الفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا، فَمَا بَقِيَ فَلِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
"তোমরা নির্ধারিত অংশের হকদারদের হক দিয়ে দাও, অতঃপর যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে তা নিকটবর্তী পুরুষদের জন্য।”৭৮০
আসাবা তিন প্রকার: ১. العصبة بالنفس বা যে সকল ব্যক্তি নিজে নিজেই আসাবা হয়। ২. العصبة بالغير বা যে সকল ব্যক্তি অন্যের মাধ্যমে আসাবা হয়। ৩. العصبة مع الغير বা যে সকল ব্যক্তি অন্যের সাথে আসাবা হয়।
১. যে ব্যক্তিরা নিজে নিজেই আসাবা হয়: তারা হলো: ছেলে, ছেলের ছেলে বা আরও নিচের পর্যায়ে যারা থাকবে তারা। পিতা, দাদা, পরদাদা বা তার উপর পর্যায়ে যারা থাকবে তারা। সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই ও তাদের উভয়ের সন্তান, যদিও তা আরও উঁচু স্তরের হয়। সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই, ও তাদের উভয়ের সন্তান, যদিও তা আরও নিচ পর্যায়ের হয়। আপান চাচা, বৈমাত্রেয় চাচা, বা আরও যারা উপর পর্যায়ের রয়েছে এবং তাদের উভয়ের সন্তানগণ, যদিও তারা নিচ পর্যায়ের হয়। দাস-দাসী আজাদকারী পুরুষ ও নারী।
তাদের মধ্যে যে উত্তরাধীকারী হওয়ার ক্ষেত্রে একাই থাকবে, সে একাই সমস্ত সম্পদ গ্রহণ করবে। আর যখন নির্ধারিত অংশের উত্তরাধিকারীদের সাথে থাকবে, তখন তারা তাদের নির্ধারিত অংশ নিয়ে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা তারা পাবে। আর যদি কিছুই অবশিষ্ট না থাকে, তবে তারা কিছুই পাবে না।
২. যারা অন্যের মাধ্যমে আসাবা হয়: তারা হলো: কন্যা, ছেলের কন্যা বা নাতনী, সহোদর বোন, বৈমাত্রেয় বোন। এরা সকলে তাদের ভাইদের সাথে আসাবা হয়। আর নাতনী তার স্তরে যারা নাতি থাকে, চাই সে নাতনীর আপন ভাই হোক বা চাচাত ভাই হোক, তার মাধ্যমে বা প্রয়োজন তার চেয়ে আরও নিছু স্তরের কেউ যদি থাকে, তাবে তার মাধ্যমেও সে আসাবা হতে পারে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য যে পুরুষরা রয়েছে, তারা তাদের বোনদের ওয়ারিস বানাবে না। যেমন- ভাইদের সন্তানগণ ভাতিজারা, চাচা এবং চাচার সন্তনেরা।
৩. যারা অন্যের সাথে আসাবা হয়: তারা হলো: সহোদর বোনেরা (মৃত ব্যক্তির) কন্যাদের সাথে বা নাতনীদের সাথে আসাবা হয়। আর যদি দুই বা ততোধিক আসাবা একত্রিত হয়, আর তারা যদি আত্মীয়তা সম্পর্কে সুদৃঢ় বন্ধন ও স্থরের দিক দিয়ে সমান হয়, তবে তারা উভয়েই সম্পদের অংশীদার হবে। যেমন- ছেলেরা ও ভায়েরা।
আর আত্মীয়তা সম্পর্কের দিক যদি ভিন্ন হয়, তবে শক্তিশালী দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- ছেলে ও পিতা।
আর যদি সম্পর্কের দিক যদি একই রকম হয়, কিন্তু স্থরের দিকে ভিন্নতা থাকে, তবে নিকটবর্তী স্তরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেমন- নাতির উপর ছেলেকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
আর যদি আত্মীয়তা সম্পর্কের দিক ও স্তর সমান হয়, কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী হওয়ার দিক থেকে ভিন্নতা থাকে, তবে অধিক শক্তিশালী দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। যেমন- সহোদর ভাইকে বৈমাত্রেয় ভায়ের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে।
টিকাঃ
৭৮০. সহীহুল বুখারী ৬৭৩২, সহীহ মুসলিম ২/১৬১৫।