📄 অসীয়ত সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান
নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অসীয়তের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত: ১. পূর্বে উল্লিখিত ইবনু উমার-এর হাদীসের নির্দেশনা মোতাবেক প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার সমস্ত দেনা-পাওনা একটি অসীয়তনামায় স্পষ্ট করে লিখে যাওয়া আবশ্যক।
২. সমস্ত সম্পদের কিছু অংশ অসীয়ত করা করা মুস্তাহাব, যেটি বিভিন্ন কল্যাণকর, মঙ্গলজনক ও পরোপকারী খাতে ব্যয় করা হবে। যাতে এর সওয়াবটা মৃত্যুর পর তার নিকট পৌঁছে যায়। আবু দারদা থেকে বর্ণিত। যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَصَدَّقَ عَلَيْكُمْ ، عِنْدَ وَفَاتِكُمْ، بِثُلُثِ أَمْوَالِكُمْ، زِيَادَةً لَكُمْ فِي أَعْمَالِكُمْ
"তোমাদের মৃত্যুর সময়ও তোমাদের সম্পদ থেকে আল্লাহ তা'আলা এক-তৃতীয়াংশ অসীয়ত করার অধিকার প্রদান করে, তোমাদের নেক আমলের পরিমাণ আরও বৃদ্ধির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ৭৫২
৩. সম্পূর্ণ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে কম অসীয়ত করা বৈধ। দলীল: سَعْدُ بْنُ أَبِي وَقَاصٍ رضي الله عنه حين سأل النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ في مرض موته : أَتَصَدَّقُ بِثُلُثَيْ مَالِي؟ قَالَ: لَا ، وَقَالَ : قُلْتُ : فَالشَّطْرُ قَالَ لَا ، قُلْتُ : فَالثُّلُثُ قَالَ : الثُّلُثُ وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ “সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস তার মরণব্যাধির সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ দান করব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশের মাধ্যমে? তিনি বললেন, এক-তৃতীয়াংশ চলে, এক-তৃতীয়াংশই অনেক।” সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের কমে দান মুস্তাহাব হওয়ার দলীল ইবনু আব্বাস-এর হাদীস। لَوْ أَنَّ النَّاسَ غَضُوا مِنَ الثُّلُثِ إِلَى الرُّبُعِ ، فَإِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ "মানুষেরা যদি অসীয়তকে এক-তৃতীয়াংশ থেকে কমিয়ে এক-চতুর্থাংশে নিয়ে আসত! কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: এক-তৃতীয়াংশ চলে, তবে এটি অনেক।”৭৫৩
৪. পূর্বে উল্লিখিত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস এর হাদীসের নির্দেশনা অনুযায়ী যে ব্যক্তির উত্তরসূরী রয়েছে, তার উত্তরসূরিদের অনুমতি ছাড়া সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসীয়ত করা বৈধ নয়। আর যখন তার কোনো উত্তরসূরী না থাকবে তখন সমস্ত সম্পদ অসীয়ত করা বিশুদ্ধ।
৫. উত্তরসূরিদের মধ্য হতে কারো জন্য অসীয়ত করা বৈধ না। আবু উমামা সূত্রে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ "নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারের অংশ নির্দিষ্ট করেছেন। সুতরাং কোনো উত্তরাধিকারের জন্য অসীয়ত করা যাবে না। ”৭৫৪
৬. পাপের বিষয়ে অসীয়ত করা হারাম। কারণ অসীয়ত শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে অসীয়তকারী ব্যক্তির সওয়াব বৃদ্ধি করার জন্য। যেমনটা আবু দারদা এর হাদীসে গত হয়েছে।
৭. ঋণ ও শরীয়তের আবশ্যকীয় বিষয় যেমন- যাকাত, হাজ্জ, কাফফারা এগুলো অসীয়ত এর উপর প্রাধান্য পাবে। মহান আল্লাহ বলেন:
مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ "এ সবই সে যা অসীয়ত করে তা দেওয়া এবং ঋণ পরিশোধের পর।”[সূরা নিসা: ১১]
আলী বলেন, قَضَى النَّبِيُّ اللَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالدِّيْنِ قَبْلَ الْوَصِيَّةِ "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসীয়তের পূর্বে ঋণ পরিশোধ করেছেন।"৭৫৫
৮. অসীয়তকারী ব্যক্তির জন্য শর্ত হচ্ছে তাকে তার সম্পদ থেকে ব্যয় করার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে। অর্থাৎ তাকে জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক, স্বাধীন এবং স্বেচ্ছাধীন হতে হবে।
৯. গুনাহ হয় এমন কোনো খাতে অসীয়ত করা হারাম। যেমন কোনো ব্যক্তি কাফেরদের উপাসনালয়ের স্বার্থে, বিনোদনের বিভিন্ন যন্ত্র কেনার জন্য অথবা এ ধরনের কোনো খাতে অসীয়ত করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
১০. ওই ব্যক্তির জন্য অসীয়ত করা মুস্তাহাব যার বিপুল সম্পত্তি রয়েছে এবং তার উত্তরাধিকারীরা সেই সম্পদের কাঙ্গাল নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ) "তোমাদের কারো মৃত্যু নিকটবর্তী বলে মনে হলে সে যদি রেখে যাওয়া ধন সম্পত্তি বৈধভাবে অসীয়ত করে, তাহলে তা তোমাদের জন্য বিধানসম্মত করা হলো।" [সুরা বাক্বারাহ: ১৮০]
আয়াতের মধ্যে খয়র বলতে বুঝানো হয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিকে। আর যে ব্যক্তির সম্পত্তি কম আর তার উত্তরাধিকারীরা সে সম্পদের মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে সে ব্যক্তির জন্য অসীয়ত করা মাকরূহ। রসুলুল্লাহ বলেছেন: إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةٌ يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ “তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে সম্পদশালী রেখে যাওয়া এর চেয়ে উত্তম যে, তাদেরকে নিঃস্ব রেখে যাবে ফলে তারা অন্যের নিকট ভিক্ষা করবে।"৭৫৬
তাছাড়া রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে অনেকেই অসীয়ত না করেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. অসীয়তকারী যখন উত্তরাধিকারীদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অসীয়ত করবে তখন সেটা হারাম বলে বিবেচ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন: غَيْرَ مُضَارِ "কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।” [সূরা নিসা : ১২]
১২. অসীয়তকারীর মৃত্যুর পূর্বে অসীয়ত কবুল করা বা নিয়ে নেওয়া অথবা তার মালিকানা গ্রহণ করা সঠিক নয়। কারণ মৃত্যুই হলো তার প্রাপ্য নির্ধারণ হওয়ার সঠিক সময়। আর এটা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য অসীয়ত হলে প্রযোজ্য হবে। আর যদি অসীয়ত নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য না হয়ে ফকির-মিসকিন, ছাত্র কল্যাণ, মসজিদ নির্মাণ অথবা ইয়াতীমদের জন্য হয়, সেক্ষেত্রে অসীয়ত কবুলের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অসীয়তকারীর মৃত্যুর মাধ্যমে অসীয়ত কার্যকর হয়ে যাবে।
১৩. অসীয়তকারীর জন্য তার অসীয়তকৃত পূর্ণ সম্পত্তি বা তার কিছু অংশ গ্রহণ করা অথবা পুরোপুরিভাবে অসীয়ত প্রত্যাহার করা বৈধ রয়েছে। উমার বলেন, يُغَيِّرُ الرَّجُلُ مَا شَاءَ مِنَ الْوَصِيَّةِ
"কোনো ব্যক্তি তার অসীয়তকে ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করতে পারবে।”৭৫৭
১৪. এমন প্রত্যেক ব্যক্তিরই অসীয়ত করা সঠিক হবে যারা অন্য কাউকে মালিক বানাতে পারে। চাই সে হোক মুসলিম কিংবা কাফের। মহান আল্লাহ বলেন: إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوا إِلَى أَوْلِيَا بِكُمْ مَعْرُوفًا
"তবে তোমরা তোমাদের বন্ধুবান্ধবদের প্রতি কল্যাণকর কিছু করতে চাইলে, সেটা ভিন্ন কথা।” [সুরা আহযাব: ৬]
টিকাঃ
৭৫২. ইবনু মাজাহ, হা. ২৭০৯; দারাকুনী ৪/৪৫০; বায়হাক্বী ৬/২৬৪ এবং হাদীসটি সহীহ; দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৬/৭৭।
৭৫৩. সহীহুল বুখারী, হা. ২৭৪৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৬২৮।
৭৫৪. 'সুনান আবু দাউদ, হা. ২৮৫৩; তিরমিযী, হা. ২২০৩; ইবনু মাজাহ, হা. ২৭১৩; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবনু মাজাহ, হা. ২১৯৩।
৭৫৫. তিরমিযী, হা. ২০৯৪; ইবনু মাজাহ, হা. ৭৭১৫।
৭৫৬. সহীহুল বুখারী, হা. ১২৯৫।
৭৫৭. সুনানুল বায়হাকী ৬/২৮১; ইমাম আবদুর রাযযাক তার মুসন্নাফে 'আতা; তুউস ও আবুশ শা'শা এর আসার থেকে বর্ণনা করেন ৯/৭১