📄 নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার অর্থ এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল ও তার প্রকারভেদ
১. الحجر এর আভিধানিক অর্থ- কাউকে বিরত রাখা। পরিভাষায়: الحجر হলো কোনো মানুষকে আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত রাখা।
২. শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُم﴿ "আর তোমরা ধন-সম্পত্তি কম বুদ্ধিসম্পন্নদেরকে প্রদান করো না।” [সূরা নিসা: ৫] এই আয়াতে اموالكم )তোমাদের সম্পদ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের ঐ সম্পদ যা তোমাদের অর্থাৎ অবিভাকদের কাছে থাকে। আর তোমরা তা পরিচালনা করে থাকো।
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: وَابْتَلُوا الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْكُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ "আর ইয়াতীমরা বিয়ের যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পরীক্ষা করে নাও। অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেচনাবোধ লক্ষ্য করো, তাহলে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ করো।" [সূরা নিসা: ৬]
তিনি আরও বলেন: فَإِنْ كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهَا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ
"অতঃপর যার উপর ঋণ আছে সে যদি নির্বোধ, দুর্বল অথবা বলে দিতে অসমর্থ হয়, তাহলে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে বলে দিবে। আর তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে দুইজন সাক্ষীকে সাক্ষী রাখবে।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৮২]
৩. নিষেধাজ্ঞার প্রকারভেদ: নিষেধাজ্ঞা দুই প্রকার- প্রথম প্রকার: সাধারণ নিষেধাজ্ঞা: নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকলের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। যেমন দেউলিয়া ব্যক্তির উপর তার সম্পদ লেনদেন করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। যেন অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
দ্বিতীয় প্রকার: বিশেষ নিষেধাজ্ঞা: নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। যেমন- শিশু, পাগল এবং নির্বোধ ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। যেন তাদের কোনো ক্ষতি না হয়।
📄 প্রথম প্রকার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বিধিবিধান; নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ব্যক্তির কল্যাণের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ
প্রথম বিষয়: সাধারণ নিষেধাজ্ঞা: সকল মানুষের জন্য সাধারণ নিষেধাজ্ঞা হলো, কোনো মুসলিমের উপর তার সম্পদ লেনদেন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। যেমন- কোনো মুরতাদ ব্যক্তিকে তার সম্পদ লেনদেন করা থেকে বাধা দেওয়া। যখন সে ধর্মত্যাগ করবে তখন বিচারকের উপর আবশ্যক হলো তাকে তাওবা করতে বলা। যদি সে তাওবা করে, তাহলে তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি তাওবা না করে এবং ধর্ম ত্যাগের কারণে তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে তার সম্পদ মালে গনীমত হিসেবে গণ্য হবে এবং মুসলিমদের বায়তুল মালে (কোষাগারে) জমা হবে।
দ্বিতীয় বিষয়: বিশেষ নিষেধাজ্ঞা: এটি হলো, এমন ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, যার কল্যাণের জন্য এমনটি করা হয়।
ক. শিশুর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এখানে শিশু বলতে বালেগ হয়নি এমন। সুতরাং তার জন্য বৈধ নয় যে সে তার সম্পদ কোনো প্রকার লেনদেন করবে। বরং তার লেনদেনের বিষয়টি তার অভিভাবক দেখাশোনা করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَابْتَلُوا الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
"ইয়াতীমরা বিয়ের যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পরীক্ষা করে নাও। অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেচনাবোধ লক্ষ্য করো, তাহলে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ করো।"[সূরা নিসা: ৬]
খ. পাগল। যার সুস্থ জ্ঞান লোপ পেয়েছে, তার উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সে যেন তার কোনো সম্পদ লেনদেন না করে। এই বিষয়ে সকলেই একমত।
গ. السفيه বা নির্বোধ: যে নিজের সম্পদ নিজের ইচ্ছামত যেখানে সেখানে ব্যয় করে থাকে এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে না, সে নির্বোধ। তার উপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যেন সে তার সম্পদ লেনদেন না করে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُم﴿ "আর তোমরা ধন-সম্পত্তি কম বুদ্ধিসম্পন্নদেরকে প্রদান করো না।” [সূরা নিসা: ৫]
২. কখন নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাবে? নিম্নবর্ণিত কারণগুলোর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাবে। ১. যে শিশু ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে পারে তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাবে। তবে যখন সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয় এবং ভালো-মন্দ পার্থক্য করার ক্ষেত্রে বিচক্ষণ হয়। যখন এই দুটি বিষয় পাওয়া যাবে, তখন তাকে তার সম্পদ হস্তান্তর করা ওয়াজিব।
প্রথম বিষয়: যখন শিশু বালেগ হয়। আর এটি বুঝা যায় বিভিন্ন আলামতের মাধ্যমে। সেগুলো হলো- মনি বের হওয়া, লজ্জাস্থানের চারপাশে শক্ত চুল গজানো অথবা পনেরো বছর বয়সে উপনীত হওয়া। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বুঝা যাবে তাদের ঋতুমতী হওয়ার মাধ্যমে।
দ্বিতীয় বিষয়: বিচক্ষণতা। তা হলো আর্থিক লেনদেনে যোগ্য হওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَابْتَلُوا الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ "ইয়াতীমরা বিয়ের যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পরীক্ষা করে নাও। অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেচনাবোধ লক্ষ্য করো, তাহলে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ করো।"[সূরা নিসা: ৬]
এই বিচক্ষণতাটা বুঝা যাবে তাকে পরীক্ষা করার মাধ্যমে। যেমন লেনদেন করার জন্য তাকে কিছু সম্পদ দেওয়া হবে। তারপর সে কয়েকবার সম্পদ লেনদেন করবে। এই ক্ষেত্রে যদি সে বড়ো ধরনের কোনো ধোকা না খায় কিংবা হারাম কাজে ব্যয় না করে অথবা এমন কাজে খরচ না করে যাতে কোনো উপকার নেই, তখন বুঝা যাবে যে, সে বিচক্ষণ হয়েছে।
৩. পাগল ব্যক্তি থেকে দুটি বিষয়ের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাবে।
প্রথম বিষয়: পাগলামী চলে যাওয়া এবং জ্ঞান ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে।
দ্বিতীয় বিষয়: নির্বোধ। নির্বোধ ব্যক্তি থেকে যখন নির্বুদ্ধিতা এবং বোকামী চলে যাবে এবং আর্থিক লেনদেনের যোগ্য হবে, তখন তাকে বিচক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৪. যাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে তাদের অভিভাবক হবেন তাদের পিতা। যদি তিনি ন্যায় পরায়ন ও বিচক্ষণ হয়। তিনি যদি না হতে পারেন তাহলে অভিভাবক হবেন এমন ব্যক্তি যার ব্যাপারে অসীয়ত করা হয়। যে ব্যক্তি তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে তার উপর অবশ্যক হলো সে যেন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ব্যক্তির সম্পদ এমন ক্ষেত্রে লেনদেন করে যাতে লাভ হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে সবচেয়ে বেশি। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ) "আর সদুদ্দেশ্য ব্যতীত ইয়াতীমদের ধন-সম্পত্তির কাছেও যেও না।" [সূরা আনআম: ১৫২] যদিও এই আয়াতটি শুধু ইয়াতিমের বিষয়ে দলীল হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু যারাই এই শ্রেণির হবে তারাই এই আয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৫. ইয়াতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারীর জন্য আবশ্যক হলো সে যেন তার সম্পদের প্রতি যত্নবান হয়। তার সম্পদ যেন অন্যায় ভাবে অপবাদ দিয়ে বা কোনো প্রকার জুলুম করে ভক্ষণ না করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا)
"যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয়ই তারা তাদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করে এবং সত্বরই তারা অগ্নি শিখায় প্রবেশ করবে।" [সূরা নিসা: ১০]
📄 দ্বিতীয় প্রকারের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিধিবিধান; অন্যের কল্যানের জন্য কারো উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা
১. কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উপর তার ঋণের কারণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হয়ে যায়। কেননা ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হওয়ার আগে সে তার ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য নয়। কিন্তু যদি কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এমন দীর্ঘ সফরের ইচছা করে। যেখান থেকে ফিরে আসার আগেই ঋণ পরিশোধের সময় হয়ে যাবে, তাহলে ঋণদাতা তাকে সফর থেকে বিরত রাখতে পারবে। যেন সে তার কাছে কোনো কিছু বন্ধক হিসেবে রেখে যায় অথবা স্বচ্ছল কোনো ব্যক্তিকে তার জিম্মাদার বানিয়ে যায়।
২. নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ব্যক্তির সম্পদ যদি তার ঋণের থেকে বেশি হয়, তাহলে সম্পদের বিষয়ে তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না। বরং ঋণ ফেরত চাওয়ার সময় তাকে ঋণ পরিশোধ করতে আদেশ করা হবে। যদি সে তা পরিশোধ না করে তাহলে তাকে আটকে রাখা হবে এবং বিচারের সম্মুখীন করা হবে। তারপরেও যদি সে না দেয়, তাহলে ঋণ পরিশোধ করার জন্য তার থেকে জোরপূর্বক সেই ঋণের পরিমাণ সম্পদ নেওয়া হবে। কিন্তু যদি তার সম্পদ ঋণের চেয়ে কম হয় তাহলে ঋণ চাওয়ার সময় থেকে তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। যাতে ঋণদাতা ব্যক্তিরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন না হয় এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিও যেন তার সম্পদের মাঝে কোনো লেনদেন করতে না পারে। যেমন কাউকে সে দান করল অথবা এমনিতেই সম্পদ ব্যয় করল। যদি সে এসব করে তাহলে ঋণদাতা ব্যক্তিরা আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
৩. যার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তাকে যদি কেউ ঋণ প্রদান করে অথবা তার কাছে কোনো কিছু বিক্রি করে, তাহলে তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার কাছ থেকে তা দাবি করতে পারবে না।
৪. কারো উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার ব্যাপারে বিচারকের আধিকার আছে যে, তিনি তার সম্পদ বিক্রি করে দিবেন এবং তা ঋণদাতাদের মাঝে পরিমাণ অনুযায়ী বণ্টন করে দিবেন। বরং এটিই তাকে করতে হবে। এক্ষেত্রে বিলম্ব করাটা হবে তাদের প্রতি যুলুম ও অন্যায়। তবে বিচারক তার জন্য সেই পরিমাণ রেখে দিবেন, যা দিয়ে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি সাধারণ খরচা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।