📄 ঋণ এর পরিচয় এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল
القرض বা ঋণ বলা হয়: উপকার লাভ করার জন্য কাউকে কোনো সম্পদ দেওয়া, যা সে পরে পরিশোধ করবে।
এটি শরীয়ত সম্মত। কারণ কুরআনের অনেক আয়াত ও ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, পরস্পরের সহযোগিতা করা, মুসলমানের প্রয়োজন মিটানো, তার বিপদ ও অভাব দূর করতে অবদান রাখে। আর এজন্যই তা বৈধ হওয়ার বিষয়ে মুসলমানগণ একমত হয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَسْلَفَ مِنْ رَجُلٍ بَكْرًا، فَقَدِمَتْ عَلَيْهِ إِبِلٌ مِنْ إِبِلِ الصَّدَقَةِ، فَأَمَرَ أَبَا رَافِعِ أَنْ يَقْضِيَ الرَّجُلَ بَكْرَهُ، فَرَجَعَ إِلَيْهِ أَبُو رَافِعٍ، فَقَالَ: لَمْ أَجِدْ فِيهَا إِلَّا خِيَارًا رَبَاعِيًا، فَقَالَ: «أَعْطِهِ إِيَّاهُ، إِنَّ خِيَارَ النَّاسِ أَحْسَنُهُمْ قَضَاءً»
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির থেকে একটি উটের বাচ্চা৬৯৮ ধার নেন। এরপর তার নিকট সদাকার উট আসে। তিনি আবু রাফিকে সে ব্যক্তির উটের ধার শোধ করার আদেশ দেন। আবু রাফি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ফিরে এসে জানালেন যে, সদাকার উটের মধ্যে আমি সেরূপ দেখছি না, তার চেয়ে উৎকৃষ্ট উট আছে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ওটাই তাকে দাও। নিশ্চয়ই মানুষের মাঝে সে ব্যক্তিই উত্তম যে ধার পরিশোধে উত্তম।”৬৯৯
ঋণ দেওয়ার ফযিলতের বিষয়ে দলীল রয়েছে: ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُقْرِضُ مُسْلِمًا قَرْضًا مَرَّتَيْنِ إِلَّا كَانَ كَصَدَقَتِهَا مَرَّةً
“কোনো মুসলিম অপর মুসলিমকে দুইবার ঋণ দিলে সে সেই পরিমাণ মাল একবার দান-খয়রাত করার সমান সওয়াব পায়।"৭০০
টিকাঃ
৬৯৮. - যুবক উট।
৬৯৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৩৯৩; সহীহ মুসলিম, হা. ৪০০০, ফুআ. ৭১৫।
৭০০. ইবনু মাজাহঃ ২৪৩০; হাসান সহীহ; দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৫/২২৬।
📄 ঋণের শর্ত এবং ঋণ সংশ্লিষ্ট কিছু বিধান
১. কোনো মুসলিম তার অপর ভাইকে এই শর্তে ঋণ দিতে পারবে না যে, ঋণ পরিশোধ করার পর ঋণগ্রহীতা তাকে আবার ঋণ দিবে। কারণ ঋণদাতা এক্ষেত্রে লাভের শর্ত করছে। আর যে সকল ঋণ লাভ নিয়ে আসে, তা সুদ। যেমন- কেউ ঋণ নেওয়ার শর্তে ঋণদাতাকে টাকা ছাড়াই তার বাড়িতে বসবাস করার সুযোগ দিলো অথবা সস্তায় তাকে বাড়িতে থাকতে দিলো কিংবা টাকা ছাড়া তাকে বাহন দিলো। ঋণ নেওয়ার বিনিময়ে এই ধরনের যে-কোনো উপকার করাটাই অবৈধ। কেননা সাহাবীদের জামাআত এটি (এই ধরনের অতিরিক্ত উপকার নেওয়াকে) অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে ফতুয়া দিয়েছেন এবং ফক্বীহগণও এই বিষয়ে একমত হয়েছেন।
২. ঋণতাদাকে অবশ্যই লেনদেনের উপযুক্ত ব্যক্তি হতে হবে। যেমন- তাকে হতে হবে প্রাপ্তবয়ষ্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। যেন সে ইচ্ছা করলে কাউকে স্বেচ্ছায় কোনো কিছু দানও করতে পারে।
৩. ঋণদাতা যে পরিমাণ সম্পদ ঋণ দিবে, তার থেকে বেশি সম্পদ ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারবে না। কেননা তা সুদ। অতএব, প্রথমে ঋণ গ্রহীতাকে যে পরিমাণ সম্পদ দিবে, পরিশোধের সময় সেই পরিমাণই গ্রহণ করতে হবে।
৪. ঋণগ্রহীতা ঋণ দাতার কাছ থেকে যে পরিমাণ সম্পদ নিয়েছে পরিশোধের সময় যদি তা থেকে পরিমাণে বেশি দেয় অথবা উত্তম কিছু দেয় কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই তাহলে তা ঠিক আছে। কারণ তখন ঋণ পরিশোধকারীর পক্ষ থেকে তা হবে স্বেচ্ছায় প্রদান এবং উত্তম ঋণ পরিশোধকারীর পরিচায়ক। যা প্রমাণ করছে আবু রাফে'র পূর্ববর্তী হাদীস।
৫. ঋণদাতা যে জিনিস ঋণ হিসাবে দিচ্ছে, অবশ্যই তাকে সে জিনিসের মালিক হতে হবে। সুতরাং যে জিনিসের সে মালিক নয়, সে জিনিস কাউকে ঋণ হিসেবে দিতে পারবে না।
৬. বর্তমানে অনেক ব্যাংক সুদযুক্ত হারাম লেনদেন করে থাকে। তারা ঋণ দেওয়ার সময় ঋণ গ্রহীতার সাথে চুক্তি করে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ দেয়। কিন্তু ঋণ ফেরত নেওয়ার সময় তার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশি নিয়ে থাকে। অথবা ঋণ গ্রহীতার সাথে ব্যাংক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার চুক্তি করে কিন্তু প্রদান করার সময় তার থেকে কম দেয়। আবার নেওয়ার সময় সেই নির্দিষ্ট পরিমাণই নিয়ে থাকে। যেমন কারো সাথে ব্যাংক চুক্তি করল এক লাখ টাকা দেওয়ার কিন্তু দেওয়ার সময় তাকে দিলো আশি হাজার। আবার নেওয়ার সময় সেই এক লাখই নিলো। এটিই হলো হারাম।