📄 সুদ হারাম করার রহস্য
সুদী কারবার মানুষদেরকে স্বার্থপরতা এবং অবৈধ পন্থায় কুকুরের আচরণের ন্যায় শুধু সম্পদ জমা করার প্রতি প্রবলভাবে লালায়িত করে তোলে। সুতরাং সুদ হারাম করা হয়েছে বান্দার জন্য রহমত স্বরূপ। এ ছাড়াও সুদের কারণে মানুষ কোনো বিনিময় ছাড়াই অন্যের সম্পদ দখল করে থাকে। সুদের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ নিয়ে থাকে অথচ এর বিনিময়ে লোকেরা কোনো উপকারই পায় না। এভাবেই তারা গরিবদের সম্পদ আত্মসাত করার মাধ্যমে নিজেদের মাল বাড়াতে থাকে। !
আর এদিকে সুদক্ষুর ব্যক্তি অলস ও অকর্ম ব্যক্তিতে পরিণত হয় এবং বৈধ ও উপকারী পন্থায় উপার্জন করা থেকে দূরে সরে পড়ে।
পাশাপাশি এই সুদ মানুষের মাঝের ভালো সম্পর্কগুলো নষ্ট করে দেয় আর বিশেষভাবে করজে হাসানার দরজা একেবারে বন্ধ করে দেয়। এর মাধ্যমে বিশেষ এক শ্রেণির সুদক্ষুর লোক পুরো জাতির সম্পদ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রন করে থাকে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো এটি মহান আল্লাহর কাছে বিরাট নাফরমানী কাজ। যদিও বাহ্যিকভাবে দেখা যায় যে, সুদের মাধ্যমে সুদখোরের সম্পদ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তার বরকত নষ্ট করে দেন। কখনোই তার সম্পদে বরকত দান করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
“আল্লাহ সুদকে বিলুপ্ত করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।" [সূরা বাক্বারা : ২৭৬]
📄 সুদের প্রকার
সুদ দুই প্রকার
১. ربا الْفَضْلِ তথা বেশি করার সুদ।
২. رِيَا النَّسِيِّئَةِ তথা বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় করার সুদ।
প্রথম প্রকার: رِيَا الْفَضْلِ হলো-সুদ হয় এমন একই জাতীয় দুটি জিনিসকে বিনিময় করার সময় কম-বেশি করা। যেমন- এক ব্যক্তি এক হাজার 'ছা' গম বিক্রি করল এক হাজার দুইশত 'ছা' গমের বিনিময়ে। উভয়ে এই গম গ্রহণ করল চুক্তি করার মজলিসেই। এখানে বিনিময় ছাড়াই অতিরিক্ত যে দুইশত 'ছা' গম গ্রহণ করল, সেটি হলো সুদ।
: ربا الفضل
ইসলামী শরীয়ত ছয় প্রকার জিনিসের মাঝে ربا الفضل বা অতিরিক্ত গ্রহণ করাকে হারাম হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। সে ছয়টি জিনিস হলো: স্বর্ণ, রূপা, গম, যব, খেজুর ও লবন। এই ছয়টি জিনিসের কোনো একটি যদি বিক্রয় করার সময় কম-বেশি করা হয়, তাহলেই তা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল বলেন:
الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرُّ بِالْبُرُ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ، وَالْمُلْحُ بِالْمُلْحِ، مِثلًا بِمِثلِ، يدا بِيَدِ، فَمَنْ زَادَ، أَوِ اسْتَزَادَ، فَقَدْ أَرْبَى الْآخِذُ وَالْمُعْطِي فِيهِ سَوَاءٌ
"স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর ও লবনের বিনিময়ে লবন সমান সমান ও নগদ নগদ হতে হবে। এরপর কেউ যদি বাড়তি কিছু প্রদান করে বা অতিরিক্ত গ্রহণ করে, তবে তা সুদ হবে। গ্রহণকারী ও প্রদানকারী এতে একই রকম হবে।"৬৯৫
এই ছয় প্রকার জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করার ক্ষেত্রে যেসব কারণে সুদ হয়ে থাকে, সেসব কারণ যদি অন্য জিনিসের মধ্যেও পাওয়া যায়, তাহলে তাও সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই ছয় প্রকার জিনিসের মাঝে সুদ হওয়ার কারণ হলো, পরিমাপ করা ও ওজন করা যায় এমন জিনিস লেনদেন করার সময় কম-বেশি করা হারাম। যদি তা একই জাতীয় জিনিস হয়।
দ্বিতীয় প্রকার: النسيئة হলো- একই জাতীয় দুটি জিনিস বিনিময় করার সময় বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার কারণে একটি জিনিস কিছু বেশি নেওয়া। অথবা একই জাতীয় দুটি জিনিস বিনিময় করার সময় উভয়টিই বাকি রাখা。
উদাহরণ: ক. এক ব্যক্তি এক হাজার 'সা' গম বিক্রি করল এক হাজার দুই শত 'সা' গমের বিনিময়ে। ক্রেতাকে এক বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে এখানে বিক্রেতা অতিরিক্ত দুইশত 'সা' গম গ্রহণ করল। খ. এক কেজি গমের বিনিময়ে এক কেজি যব বিক্রি করল। কিন্তু তারা তা তাদের হস্তগত করল না।
এ জাতীয় ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান হারাম। কেননা সুদ হারাম হওয়ার বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় যে দলীলসমূহ বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর আওতায় যেসব লেনদেন পরে, এগুলো তার অন্যতম। আর জাহেলী যুগে এ জাতীয় লেনদেন প্রচলিত ছিল। বর্তমানে সুদী ব্যাংকগুলো এই ধরনের লেনদেন করে থাকে। এ বিষয়ে আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী স্বর্ণ এবং রুপার কথা উল্লেখ করার পর বলেন:
وَلَا تَبِيعُوا مِنْهَا غَائِبًا بِنَاجِزِ وفي لفظ «مَا كَانَ يَدًا بِيَدِ فَلَا بَأْسَ بِهِ، وَمَا كَانَ نَسِيئَةٌ فَهُوَ رِبًا
"তোমরা বাকির বিনিময়ে নগদ বিক্রি করো না।" অন্য শব্দে: তবে উভয়টি (পণ্য ও মূল্য) নগদ হয়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আর যদি কোনোটি বাকিতে হয়, তাহলে তাই সুদ হয়ে যাবে।”৬৯৬
টিকাঃ
৬৯৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৭৫, ২১৭৬; সহীহ মুসলিম, হা. ৩৯৫৬, ফুআ. ১৫৮৪।
৬৯৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৭৫, ২১৭৬; সহীহ মুসলিম, হা. ৩৯৫৬, ফুআ. ১৫৮৪।
📄 সুদ সম্পর্কিত কতিপয় মাসআলার ধরন
নিম্নলিখিত নীতিমালা ও তার অন্তর্ভুক্ত বিষয় প্রয়োগ এর মাধ্যমে আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে, কোন বিষয়টি সুদ আর কোন বিষয়টি সুদ নয়। আর এই নীতিমালাটি হচ্ছে: যখন একই জাতীয় জিনিস বিক্রয় হবে, তাতে দুটি শর্ত থাকবে:
১. ক্রয়-বিক্রয়ের মজলিস থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পৃথক হওয়ার আগেই পণ্য ও মূল্য গ্রহণ করতে হবে।
২. বিনিময়ের উভয় পণ্যই শরীয়তী মাপের মাধ্যমে অর্থাৎ পরিমাপ বা ওজন করার মাধ্যমে সমান সমান হতে হবে।
তবে যদি সুদ হয় এমন দুটি ভিন্ন জাতীয় জিনিস একটি আরেকটির সাথে বিনিময় করা হয়, তাহলে উল্লিখিত দুটি শর্তের একটি প্রযোজ্য হবে। তা হচ্ছে মজলিস থেকে ওঠে যাওয়ার আগেই হস্তগত করা। আর যদি সমান সমান হয়, তাতে কোনো শর্ত নেই। আর যদি সুদ হয় এমন জাতীয় জিনিস, সুদ হয় না এমন জিনিসের সাথে বিনিময় করা হয়ে, তাহলে তাতে কম-বেশিও করা যায়, আবার ক্রয়-বিক্রয়ের মজলিস থেকে বস্তুটি গ্রহণ না করেও ওঠা যায়।
সুদ সংশ্লিষ্ট কিছু মাসআলা এবং তার হুকুম:
১. এক ব্যক্তি একশত গ্রাম স্বর্ণের বিনিময়ে একশত গ্রাম স্বর্ণ বিক্রি করল। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করল এক মাস পরে। এটিই হারাম। কারণ তারা উভয়ে ক্রয়-বিক্রয়ের মজলিসে তা গ্রহণ করেনি।
২. এক ব্যক্তি এক কেজি যব কিনলো এক কেজি গমের বিনিময়ে। তাহলে এটি বৈধ হবে। কারণ এখানে দুটি পণ্যই ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির। তবে শর্ত হলো, একই মজলিসে তা গ্রহণ করতে হবে।
৩. এক ব্যক্তি একটি ছাগলের বিনিময়ে পঞ্চাশ কেজি গম কিনলো। তাহলে এটি সব অবস্থায় বৈধ হবে। চাই একই মজলিসে গ্রহণ করুক বা না করুক।
৪. এক ব্যক্তি ১০০ ডলার বিক্রি করল ১১০ ডলারের বিনিময়ে। তাহলে এটি বৈধ হবে না।
৫. এক ব্যক্তি এক হাজার ডলার ঋণ হিসাবে নিলো এই শর্তে যে, সে একমাস বা তার বেশি সময় পরে বারোশত ডলার ফিরিয়ে দিবে তাহলে তা বৈধ হবে না।
৬. এক ব্যক্তি ১০০ রৌপ্য দিরহাম বিক্রি করল ১০টি স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে। যেই স্বর্ণ মুদ্রা পরিশোধ করবে এক বছর পর। তাহলে এটি বৈধ হবে না। যেহেতু এই জাতীয় ক্রয়-বিক্রয় নগদে করা শর্ত।
৭. সুদ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে কোনো ধরনের ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। কেননা এতে টাকার বিনিময়ে টাকা ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। অথচ তাতে সমতার ক্ষেত্রে পরিমাপ ঠিক রাখা হয় না এবং কখনো কখনো নগদও গ্রহণ করা হয় না।