📄 ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল করা
الإقالةُ বলা হয়: ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে তা বাতিল করে দেওয়া। এটা হতে পারে ক্রেতা-বিক্রেতার কোনো একজনের কোনো অসুবিধার কারণে। অথবা চুক্তি করার পর ক্রেতারা বুঝতে পারল যে, এখন তার সেই পণ্যটির প্রয়োজন নেই। কিংবা সে পণ্যটির মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম নয়। তারপর কোনো ধরনের সমস্যা না করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে কমবেশি না করে সেই চুক্তি থেকে ফিরে আসল। এটি একটি শরীয়ত সম্মত কাজ এবং এই বিষয়ে আল্লাহর রসূল উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন: مَنْ أَقَالَ مُسْلِمًا، أَقَالَهُ اللهُ عَشْرَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের (অনুরোধে তার) সাথে সম্পাদিত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।"৬৯১ [ইক্বালা- বিক্রিত বা ক্রীত বস্তু প্রত্যার্পণ করার সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছা গ্রহণ করা-অনুবাদক]
টিকাঃ
৬৯১. আহমাদ ২/২২৫; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৬০; ইবনু মাজাহ, হা. ২১৯৯; ইবনু হিব্বান ১১/৪০৫ ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ, হা. ১৮০০।
📄 লাভ করার চুক্তি সাপেক্ষে ক্রয়-বিক্রয় করা
লাভ করার চুক্তি সাপেক্ষে ক্রয়-বিক্রয় করাকে আরবিতে بَيْعُ الْمُرَابَحَةِ বলে। এটি হলো ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের মাঝে চুক্তি সাপেক্ষে নির্ধারিত পরিমাণ লাভ করার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ করে পণ্য বিক্রি করা।
যেমন পণ্যের মালিক ক্রেতাকে বলল, আমার পণ্যের মূল দাম হলো একশত টাকা। তোমার কাছে তা বিক্রি করব একশত দশ টাকায়। এখানে দশ টাকা থাকবে আমার লাভ।
এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করাটা সঠিক। যেহেতু ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ে মূল্যের পরিমাণ এবং লাভের পরিমাণ জানতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ﴿ "আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন।" [সূরা বাক্বারা: ২৭৫]
إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةٌ عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
"তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।"[সুরা নিসা: ২৯] بَيْعُ الْمُرَائِحَةِ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে সংঘটিত হয়ে থাকে। আর এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজনও রয়েছে। কেননা অনেক মানুষই প্রথম প্রথম ভালোভাবে জিনিস কিনতে পারে না। আর সেই সুযোগে অনেক বিক্রেতাই নির্দিষ্ট পরিমাণে বেশি লাভ করে থাকে। এতে ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সুতরাং যখন মূল মূল্য ও লাভ স্পষ্ট করে বিক্রি করবে তখন আর এই অতিরিক্ত বেশি নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
📄 কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করা
এটি হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাকিতে পন্য বিক্রি করা। আর সেই পণ্যের মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিস্তির মাধ্যমে কয়েক কিস্তিতে পরিশোধ করা। এক্ষেত্রে প্রতিটি কিস্তি পরিশোধ করার জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকবে।
উদাহরণ: বিক্রেতার কাছে একটি গাড়ি আছে। যার নগদ মূল্য চল্লিশ হাজার টাকা। কিন্তু কেউ বাকিতে নিতে চাইলে তাকে দিতে হবে ষাট হাজার টাকা। তারপর বিক্রেতা ক্রেতার সাথে এই চুক্তিতে উপনীত হলো যে, মোট বারো কিস্তিতে সে ষাট হাজার টাকা পরিশোধ করবে। প্রতি মাসের শেষে সে পাঁচ হাজার করে টাকা দিবে।
হুকুম: এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় করাটা বৈধ। আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত।
اشْتَرَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُودِيٌّ طَعَامًا بِنَسِيئَةٍ، وَرَهَنَهُ دِرْعًا لَهُ مِنْ حَدِيدٍ.
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ইহুদির নিকট হতে নির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্য পরিশোধের শর্তে খাদ্য ক্রয় করেন এবং তার নিকট নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রাখেন।" ৬৯২
তা ছাড়াও এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করার মাঝে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই লাভ রয়েছে। কারণ বাকি দেওয়ার সুবাদে বিক্রেতা বেশি লাভ নিতে পারছে। তার পণ্য বাজারজাত করার পথ ব্যাড়ছে। ফলে সে নগদ ও কিস্তি উভয় পদ্ধতিতে বিক্রি করতে পারছে। আর কিস্তিতে সময় বাড়িয়ে বেশি লাভ করতে পারছে। অপরদিকে ক্রেতার কাছে নগদ টাকা না থাকা সত্ত্বেও সে পণ্য ক্রয় করতে পারছে। যার মূল্য সে পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে কয়েক কিস্তিতে পরিশোধ করবে।
কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য শর্তসমূহ: ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য পূর্বে উল্লিখিত শর্তের সাথে কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য আরও কিছু শর্ত রয়েছে। নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. চুক্তির সময় পণ্যটা অবশ্যই বিক্রেতার হস্তগত ও নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এমন হতে পারবে না যে, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে কোনো জিনিস কিনার জন্য মূল্য নির্ধারণ করল এবং কত কিস্তিতে তা পরিশোধ করবে ও প্রতি কিস্তিতে কত টাকা দিবে তাও নির্ধারণ করল। তারপর বিক্রেতা উক্ত জিনিসটি কিনে এনে তা ক্রেতাকে দিবে। এমনটি হতে পারবে না। কেননা তা একটি হারাম কাজ। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেন: لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ "তুমি এমন জিনিস বিক্রি করো না, যা তোমার কাছে নেই।”৬৯৩
২. চুক্তি করার সময় যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে, কোনো কারণ বসত কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব করা হলেও তার থেকে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে ক্রেতাকে বাধ্য করতে পারবে না। কেননা তখন অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ করাটা হবে সুদ।
৩. নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করার ক্ষেত্রে ধনি ক্রেতার গড়িমসি (আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি বলে সময় ক্ষেপণ) করা হারাম।
৪. বিক্রি করার পর বিক্রেতার কোনো অধিকার নেই যে, সে বিক্রিত পণ্যের মালিকানা ধরে রাখবে। কিন্তু বাকি কিস্তি পরিশোধ করার জন্য জামানাত হিসাবে বিক্রেতা নিজের কাছে কোনো বস্তু বন্ধক রেখে রেখে দেওয়ার শর্ত করতে পারবে।
টিকাঃ
৬৯২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২০৬৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬০৩।
৬৯৩. আহমাদ: ৩/৪০২, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৫০৩, তিরমিযী, হা. ১২৩২।