📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়সমূহ

📄 নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়সমূহ


আল্লাহ তাআলা কয়েক ধরনের ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন। যেমন: কেউ ক্রয়-বিক্রয় করতে গিয়ে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে ক্ষতি করল। উদাহরণ স্বরূপ- ক্রয়-বিক্রয় করার কারণে ফরয ইবাদাত করা থেকে বিরত থাকলো। অথবা ক্রয়-বিক্রয় করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করে ফেলল। এগুলো হলো নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়। ধারাবাহিকভাবে নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১. জুমু'আর দিন দ্বিতীয় আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় করা সুতরাং যে ব্যক্তির উপর জুমুআর সলাত ফরয হয়েছে তার জন্য সঠিক হবে না (একটি মত অনুযায়ী দ্বিতীয়) আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ... “হে মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সলাতের জন্য আহবান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো।” [সূরা জুমুআহ : ৯]
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। মহান আল্লাহ এই সময়ে ক্রয়-বিক্রয় করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর নিষেধ করার পর সেই কাজ করা কোনোভাবেই সঠিক হবে না, বরং তা হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
২. এমন ব্যক্তির কাছে কোনো জিনিস বিক্রি করা যদ্দ্বারা সে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজে সাহায্য নিবে অথবা যা সে হারাম কাজে ব্যবহার করবে। অতএব, এমন ব্যক্তির কাছে জুস বিক্রি করা যাবে না যে তা দ্বারা মদ বানাবে। আরও এমন ব্যক্তির কাছে পাত্র বিক্রি করা যাবে না যা দ্বারা সে মদ পান করবে। অনুরূপভাবে মুসলমানদের মাঝে ফিতনার সময়ে কোনো অস্ত্র বিক্রি করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"সৎকাজ ও তাক্বওয়ার ব্যাপারে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।" [সূরা মায়িদাহ: ২]
৩. মুসলিম ভাইয়ের বিক্রয়ের উপর বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া।
যেমন কোনো বিক্রেতার কাছে কেউ দশ টাকা দিয়ে কোনো পণ্য কিনতে আসলো। এদুজনের মাঝে কথাবার্তা শেষ না হতেই আরেক বিক্রেতা উক্ত ক্রেতাকে বলল, আমি আপনার কাছে আরও সস্তায় বিক্রি করব। অথবা সে বলল, এই দামেই আমি এর থেকে আরও ভালো জিনিস দিবো। এভাবে ক্রয়-বিক্রয় করা নিষেধ। কেননা ইবনু উমার (রাঃ) এর হাদীসে রয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: )وَلَا يَبِعُ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعٍ بَعْضٍ(
"কোনো ব্যক্তি বিক্রির অবস্থায় যেন অন্য কেউ বিক্রি করার প্রস্তাব না দেয়।"৬৮৪
৪. এক ব্যক্তির ক্রয়ের উপর আরেক ব্যক্তির ক্রয় করা।
যেমন কোনো ব্যক্তি কারো কাছে কিছু বিক্রি করার জন্য কথা বলতে শুরু করল আর অপর এক ব্যক্তি বিক্রেতাকে বলল, আপনি বিক্রি করা বাতিল করুন। আমি আপনার কাছ থেকে তা আরও বেশি মূল্যে ক্রয় করব অথচ ইতঃপূর্বেই পূর্বের দুই ব্যক্তির মাঝে ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে কথা-বার্তা চূড়ান্ত হয়েছিল। এই অবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে তা বিক্রি করা হারাম। যা পূর্বের হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয়।
৫. বাকি ও নগদের সংমিশ্রণে ক্রয়-বিক্রয় করা।
যেমন একজন ব্যক্তি (বিক্রেতা) আরেক ব্যক্তির (ক্রেতা) কাছে কোনো পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত অর্থে বিক্রি করল। অতঃপর তখনই আবার বিক্রেতা (২য় ক্রেতা), ক্রেতার কাছ থেকে কম মূল্যে উক্ত পণ্যটি ক্রয় করে নেয়। মেয়াদ শেষে (১ম ক্রেতা) ক্রেতা প্রথম মূল্য পরিশোধ করল। যেমন একটি জমি ৫০,০০০ টাকার বিনিময়ে (১ম ক্রেতা) ক্রয় করল, যার মূল্য সে এক বছর পর পরিশোধ করবে। অতঃপর বিক্রেতা (সেই সময়ই) নগদ ৪০,০০০ টাকায় জমিটি (১ম ক্রেতার থেকে) ক্রয় করে নিলো। তাহলে বছর শেষে তার (১ম ক্রেতার) ৫০,০০০ টাকা পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
এই ক্রয়-বিক্রয়কে عينه বা ঈনা নামকরণ করা হয়: কারণ ক্রেতা পণ্যের স্থানে عيئة তথা নগদ অর্থ গ্রহণ করেছে।
তাই এটি হলো এক প্রকার সুদ, এজন্য এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করা নিষেধ করা হয়েছে। কেননা ইবনু উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেন: إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَتَرَكْتُمُ الجِهَادَ ، سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذُلَّا لَا يَرْفَعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ... "যখন তোমরা ঈনা পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে এবং জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দিবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি মুক্তি দিবেন না।”৬৮৫
৬. হস্তগত করার পূর্বেই কোনো পন্য বিক্রি করা। যেমন কোনো ব্যক্তি কারো কাছ থেকে পণ্য কিনলো। অতঃপর তা নিজের হস্তগত করা ও গুদামজাত করার আগেই অন্যের কাছে বিক্রি করে দিলো। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنِ ابْتَاعَ طَعَامًا فَلَا يَبِعْهُ حَتَّى يَقْبِضَهُ "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, খাদ্য ক্রয় করে নিজের অধিকারে না এনে কেউ যেন তা বিক্রি না করে। "৬৮৬ عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَن رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى أَنْ تُبَاعَ السَّلَعُ حَيْثُ تُبْتَاعُ، حَتَّى يَحُوزَهَا التَّجَّارُ إِلَى رِحَالِهِمْ. "যায়িদ ইবনু সাবিত হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল ব্যবসায়ীদেরকে পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের পর নিজের জায়গায় স্থানান্তরিত করার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। ”৬৮৭
অতএব, কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়, কোনো কিছু ক্রয় করার পর তা পূর্ণ হস্তগত করার পূর্বেই বিক্রি করা।
৭. ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই বিক্রি করা। ফল পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে তা বিক্রি করা জায়েয নয়। কারণ তাতে ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কিংবা তাতে ত্রুটি যুক্ত হওয়ার আশংকা থাকে। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَأَيْتَ إِنْ مَنَعَ اللَّهُ الثَّمَرَةَ، فَبِمَ يَأْخُذُ أَحَدُكُمْ مَالَ أَخِيهِ؟ "আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল বলেছেন: যদি আল্লাহ ফল ধরা বন্ধ করে দেন, তবে তোমরা কীসের বদলে তার ভাইয়ের মাল (ফলের মূল্য) নিবে?”৬৮৮ عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ : نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَنْ بَيْعِ الثَّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلَاحُهَا، هي البَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ "আবদুল্লাহ ইবনু উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন। "৬৮৯
আর ফল পরিপক্ক হওয়াটা বিভিন্নভাবে বুঝা যায়। যেমন: খেজুর লাল অথবা হলুদ হওয়ার মাধ্যমে, আঙ্গুর কালো হয়ে তার মাঝে মিষ্টতা আসার মাধ্যমে, বিভিন্ন দানাদার শস্য শুকনো হওয়া ও শক্ত হওয়ার মাধ্যমে। এভাবেই অন্যান্য ফল-ফলাদির ব্যাপারে বোঝতে হবে।
৮. দালালী করা: তা হলো বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত পণ্যের মূল্য কোনো ব্যক্তির বৃদ্ধি করে বলা। কিন্তু আসলে সেই পণ্যটি কেনার তার ইচ্ছা নেই। বরং তার ইচ্ছা হলো এর মাধ্যমে অন্য কাউকে ধোঁকায় ফেলা এবং সেই পণ্যটি কেনার প্রতি তাকে আগ্রহী করা ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা। হাদীসে এ জাতীয় কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। عَنِ ابْنِ عُمَرَ : أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ النَّجْشِ» "ইবনু উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দালালী (এক ক্রেতার উপর দিয়ে অন্য ক্রেতার দর কষাকষি) করতে নিষেধ করেছেন।”৬৯০

টিকাঃ
৬৮৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৬৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪১২।
৬৮৫. আহমাদ ২/২৮; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৬২; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সিলসিলাতুস সহীহাহ, হা. ১১।
৬৮৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫২৫।
৬৮৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৯৯।
৬৮৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৯৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৫৫৫।
৬৮৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৯৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৩৪।
৬৯০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯৬৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫১৬।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল করা

📄 ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল করা


الإقالةُ বলা হয়: ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে তা বাতিল করে দেওয়া। এটা হতে পারে ক্রেতা-বিক্রেতার কোনো একজনের কোনো অসুবিধার কারণে। অথবা চুক্তি করার পর ক্রেতারা বুঝতে পারল যে, এখন তার সেই পণ্যটির প্রয়োজন নেই। কিংবা সে পণ্যটির মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম নয়। তারপর কোনো ধরনের সমস্যা না করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে কমবেশি না করে সেই চুক্তি থেকে ফিরে আসল। এটি একটি শরীয়ত সম্মত কাজ এবং এই বিষয়ে আল্লাহর রসূল উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন: مَنْ أَقَالَ مُسْلِمًا، أَقَالَهُ اللهُ عَشْرَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের (অনুরোধে তার) সাথে সম্পাদিত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।"৬৯১ [ইক্বালা- বিক্রিত বা ক্রীত বস্তু প্রত্যার্পণ করার সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছা গ্রহণ করা-অনুবাদক]

টিকাঃ
৬৯১. আহমাদ ২/২২৫; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৬০; ইবনু মাজাহ, হা. ২১৯৯; ইবনু হিব্বান ১১/৪০৫ ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনান ইবনে মাজাহ, হা. ১৮০০।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 লাভ করার চুক্তি সাপেক্ষে ক্রয়-বিক্রয় করা

📄 লাভ করার চুক্তি সাপেক্ষে ক্রয়-বিক্রয় করা


লাভ করার চুক্তি সাপেক্ষে ক্রয়-বিক্রয় করাকে আরবিতে بَيْعُ الْمُرَابَحَةِ বলে। এটি হলো ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের মাঝে চুক্তি সাপেক্ষে নির্ধারিত পরিমাণ লাভ করার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ করে পণ্য বিক্রি করা।
যেমন পণ্যের মালিক ক্রেতাকে বলল, আমার পণ্যের মূল দাম হলো একশত টাকা। তোমার কাছে তা বিক্রি করব একশত দশ টাকায়। এখানে দশ টাকা থাকবে আমার লাভ।
এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করাটা সঠিক। যেহেতু ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ে মূল্যের পরিমাণ এবং লাভের পরিমাণ জানতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ﴿ "আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন।" [সূরা বাক্বারা: ২৭৫]
إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةٌ عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
"তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।"[সুরা নিসা: ২৯] بَيْعُ الْمُرَائِحَةِ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে সংঘটিত হয়ে থাকে। আর এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজনও রয়েছে। কেননা অনেক মানুষই প্রথম প্রথম ভালোভাবে জিনিস কিনতে পারে না। আর সেই সুযোগে অনেক বিক্রেতাই নির্দিষ্ট পরিমাণে বেশি লাভ করে থাকে। এতে ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সুতরাং যখন মূল মূল্য ও লাভ স্পষ্ট করে বিক্রি করবে তখন আর এই অতিরিক্ত বেশি নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করা

📄 কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করা


এটি হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাকিতে পন্য বিক্রি করা। আর সেই পণ্যের মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিস্তির মাধ্যমে কয়েক কিস্তিতে পরিশোধ করা। এক্ষেত্রে প্রতিটি কিস্তি পরিশোধ করার জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকবে।
উদাহরণ: বিক্রেতার কাছে একটি গাড়ি আছে। যার নগদ মূল্য চল্লিশ হাজার টাকা। কিন্তু কেউ বাকিতে নিতে চাইলে তাকে দিতে হবে ষাট হাজার টাকা। তারপর বিক্রেতা ক্রেতার সাথে এই চুক্তিতে উপনীত হলো যে, মোট বারো কিস্তিতে সে ষাট হাজার টাকা পরিশোধ করবে। প্রতি মাসের শেষে সে পাঁচ হাজার করে টাকা দিবে।
হুকুম: এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় করাটা বৈধ। আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত।
اشْتَرَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَهُودِيٌّ طَعَامًا بِنَسِيئَةٍ، وَرَهَنَهُ دِرْعًا لَهُ مِنْ حَدِيدٍ.
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ইহুদির নিকট হতে নির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্য পরিশোধের শর্তে খাদ্য ক্রয় করেন এবং তার নিকট নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রাখেন।" ৬৯২
তা ছাড়াও এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করার মাঝে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই লাভ রয়েছে। কারণ বাকি দেওয়ার সুবাদে বিক্রেতা বেশি লাভ নিতে পারছে। তার পণ্য বাজারজাত করার পথ ব্যাড়ছে। ফলে সে নগদ ও কিস্তি উভয় পদ্ধতিতে বিক্রি করতে পারছে। আর কিস্তিতে সময় বাড়িয়ে বেশি লাভ করতে পারছে। অপরদিকে ক্রেতার কাছে নগদ টাকা না থাকা সত্ত্বেও সে পণ্য ক্রয় করতে পারছে। যার মূল্য সে পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে কয়েক কিস্তিতে পরিশোধ করবে।
কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য শর্তসমূহ: ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য পূর্বে উল্লিখিত শর্তের সাথে কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য আরও কিছু শর্ত রয়েছে। নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. চুক্তির সময় পণ্যটা অবশ্যই বিক্রেতার হস্তগত ও নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এমন হতে পারবে না যে, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে কোনো জিনিস কিনার জন্য মূল্য নির্ধারণ করল এবং কত কিস্তিতে তা পরিশোধ করবে ও প্রতি কিস্তিতে কত টাকা দিবে তাও নির্ধারণ করল। তারপর বিক্রেতা উক্ত জিনিসটি কিনে এনে তা ক্রেতাকে দিবে। এমনটি হতে পারবে না। কেননা তা একটি হারাম কাজ। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেন: لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ "তুমি এমন জিনিস বিক্রি করো না, যা তোমার কাছে নেই।”৬৯৩
২. চুক্তি করার সময় যে মূল্য নির্ধারণ করা হবে, কোনো কারণ বসত কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব করা হলেও তার থেকে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে ক্রেতাকে বাধ্য করতে পারবে না। কেননা তখন অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ করাটা হবে সুদ।
৩. নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করার ক্ষেত্রে ধনি ক্রেতার গড়িমসি (আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি বলে সময় ক্ষেপণ) করা হারাম।
৪. বিক্রি করার পর বিক্রেতার কোনো অধিকার নেই যে, সে বিক্রিত পণ্যের মালিকানা ধরে রাখবে। কিন্তু বাকি কিস্তি পরিশোধ করার জন্য জামানাত হিসাবে বিক্রেতা নিজের কাছে কোনো বস্তু বন্ধক রেখে রেখে দেওয়ার শর্ত করতে পারবে।

টিকাঃ
৬৯২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২০৬৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬০৩।
৬৯৩. আহমাদ: ৩/৪০২, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৫০৩, তিরমিযী, হা. ১২৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00