📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা

📄 ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা


ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ "তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ে সাক্ষী রাখো।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৮২]
মহান আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষ্যর বিষয়ে মানুষদেরকে উৎসাহিত করতে এখানে সাক্ষী রাখার আদেশ করেছেন। আদেশ করা হলেও তা ওয়াজিব নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ "তোমাদের কেউ যদি একে অপরকে নিরাপদ মনে করে তাহলে সে তার কাছে রাখা আমানত অন্যকে দিতে পারে।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৮৩]
এর দ্বারা প্রমাণ করে, এই আদেশ নিরাপদ ও কল্যাণকর দিকনির্দেশনার জন্য।
উমারাহ বিন খুঝাইমা থেকে হাদীস বর্ণিত। তার চাচা হাদীস বর্ণনা করেছেন- যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবী।
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي، وَاسْتَتْبَعَهُ لِيَقْبِضَ ثَمَنَ فَرَسِهِ، فَأَسْرَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ، وَطَفِقَ الرِّجَالُ يَتَعَرَّضُونَ لِلْأَعْرَابِيِّ، فَيَسُومُونَهُ بِالْفَرَسِ، وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْتَاعَهُ ...
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বেদুঈন হতে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন। তারপর বেদুঈন ঘোড়ার মূল্য গ্রহণের জন্য তার পিছনে চলল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত চলছিলেন আর সে ধীরে। এ সময় লোকজন তার সামনে পড়লে তারা ঘোড়ার দরদাম করতে লাগল। তারা জানত না যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ক্রয় করেছেন। তাই তারা তার স্থিরীকৃত মূল্যের উপর আরও মূল্য বাড়িয়ে বলতে লাগল।...'৬৭৫
হাদীসে বর্ণিত يسومونه শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তারা তার থেকে তা ক্রয় করতে চাইল।
উক্ত হাদীস থেকে কয়েকটি বিষয় বুঝা যায়। সেগুলো হলো- ক. নাবী গ্রাম্য লোকের কাছ থেকে ঘোড়াটি কিনেছিলেন। কিন্তু তাদের মাঝে কোনো সাক্ষী ছিল না। সুতরাং ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যদি সাক্ষী রাখা ওয়াজিব হতো তাহলে তিনি সাক্ষী না রেখে তা ক্রয় করতেন না।
খ. নাবী এর যুগে সাহাবীরাও বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতেন তবে এটা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি সাহাবীদেরকে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখতে আদেশ করেছেন কিংবা তিনি নিজে তা করেছেন।
গ. দৈনন্দিন জীবনে মানুষের অনেক কিছুই ক্রয় করতে হয়। সব ধরনের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেই যদি সাক্ষী রাখা ওয়াজিব হতো, তাহলে তা মানুষদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেত।
ঘ. যদি বড়ো কোনো বস্তু ক্রয়-বিক্রয় করা হয় এবং তার কোনো মূল্য বাকি থাকে, তাহলে অবশ্যই তা লিখে রাখা ও সাক্ষী রাখা উচিত। যেন কোনো ধরনের সমস্যা হলে ঐ লেখা ও সাক্ষীর দিকে ফিরে যাওয়া যায়।

টিকাঃ
৬৭৫. আহমাদ ৫/২১৫; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৬০৭; নাসাঈ, হা. ৪৬৪৭; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুন নাসাঈ, হা. ৪৩৩২।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ক্রয়-বিক্রয়ে ইচ্ছাধিকার

📄 ক্রয়-বিক্রয়ে ইচ্ছাধিকার


خيار বা খিয়ার: ক্রেতা-বিক্রেতা প্রত্যেবের জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখা অথবা বাতিল করার অধিকার থাকা।
যদিও ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, যখন বেচা-কেনার রুকন ও শর্তসমূহ পূর্ণ হয়ে যাবে এবং ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হবে তখন তা থেকে ফিরে আসার কারো অধিকার থাকবে না।
কিন্তু ইসলাম ধর্ম হলো, সহজতা ও সহমর্মিতার ধর্ম। সুতরাং, প্রতিটি ব্যক্তির কল্যাণ ও অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখেছে। এজন্যই কোনো মুসলিম যখন কোনো কারণে কিছু কিনবে বা বিক্রি করবে, তারপর সে আবার ক্রয়-বিক্রয় থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছা করবে, ইসলামী শরীয়ত তার জন্য এই ইচ্ছাধিকারের বৈধতা দিয়েছে যেন সে তার বিষয়ে চিন্তা করতে পারে এবং নিজের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারে। সুতরাং সে চিন্তা-ভাবনা করে দেখতে পারবে যে, সে তার ক্রয়-বিক্রয় ঠিক রাখবে না বাতিল করবে।
الخيار বা ইচ্ছাধিকারের প্রকারভেদ: الخيار বা ইচ্ছাধিকারের বিভিন্ন প্রকার আছে। সেগুলোর মধ্য হতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
১. خيار المجلس তথা বৈঠকের ইচ্ছাধিকার। মজলিস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যেখানে ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। সুতরাং যতক্ষণ ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ে মজলিসে থাকবে ততক্ষণ ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার অধিকার থাকবে। যখন ক্রেতা এবং কিক্রেতার কেউ মজলিস ত্যাগ করবে তখন এই خیار বা স্বাধীনতা বাতিল হয়ে যাবে। ইবনু উমার বলেন, নাবী বলেন:
البَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا “ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হলে উভয়েরই (ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার) অধিকার থাকবে।”৬৭৬
২. خيار الشرط তথা শর্তসাপেক্ষে ইচ্ছাধিকার। আর তা হলো ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে কিংবা তাদের একজন ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখা বা না রাখার ব্যাপারে নির্ধারিত কিছু সময়ের শর্ত করা। তারপর যদি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল না করে তাহলে চুক্তি সংঘটিত হয়ে যাবে। পরে তা বাতিল করার ইচ্ছাধিকার থাকবে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি কারো থেকে গাড়ি ক্রয়ের সময় বিক্রেতাকে বলল, আমার জন্য পূর্ণ এক মাসের ইচ্ছাধিকার থাকবে। এই সময়ের মধ্যে আমি ক্রয়ের চুক্তি ঠিক রাখতে পারি আবার বাতিলও করতে পারে। কিন্তু ক্রেতা যদি নির্দিষ্ট এক মাসের মধ্যে সেই চুক্তি বাতিল না করে, তাহলে উল্লিখিত সময় শেষ হলেই চুক্তি পরিপূর্ণভাবে সংঘটিত হয়ে যাবে। তারপর আর চুক্তি বাতিল করার কোনো অধিকার থাকবে না।
৩. خيار العيب তথা ত্রুটি থাকার কারণে ইচ্ছাধিকার। এই ইচ্ছাধিকারটা থাকবে শুধু ক্রেতার জন্য। ক্রেতা যদি তার বস্তু ক্রয়ের পর এমন কোনো ত্রুটি সম্পর্কে অবগত হয়, যেই বিষয়ে বিক্রেতা তাকে পূর্বে জানায়নি অথবা বিক্রেতা নিজেও সেই ত্রুটি সম্পর্কে জানত না, আর ত্রুটি যদি পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেয়, তাহলে এই অধিকার থাকবে। তবে ত্রুটিকে ত্রুটি হিসাবে সাব্যস্ত করার জন্য অবশ্যই গ্রহণযোগ্য অভিজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। তারা যদি ত্রুটিকে ত্রুটি বলে বিবেচনা করে তাহলেই তা ত্রুটি বলে গণ্য হবে। অন্যথায় ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে না।
৪. خيار التدليس তথা কোনো বিষয় গোপন করা। আর তা হলো, ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বিক্রেতা ক্রেতার কাছে এমন কিছু গোপন করা যার কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। এটি অবশ্যই হারাম। নাবী বলেন: مَنْ غَشْنَا فَلَيْسَ مِنَّا
"যে ব্যক্তি ধোকা দেয় সে আমাদের দলভুক্ত না।”৬৭৭
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তির কাছে একটি গাড়ি আছে। আর সেই গাড়িটিতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু বিক্রেতা গাড়ির উপর সুন্দর রং দিয়ে ক্রেতার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করল যেন তা একটি ত্রুটিমুক্ত গাড়ি। ক্রেতা সেটি কিনে নিলো। এই অবস্থায় ক্রেতা পণ্য ফেরত দিয়ে তার মূল্য ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখবে।

টিকাঃ
৬৭৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১১০; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৩২।
৬৭৭. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১০১।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ক্রয়-বিক্রেয়ের শর্তসমূহ

📄 ক্রয়-বিক্রেয়ের শর্তসমূহ


ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। নীচে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
প্রথম: ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةٌ عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
"হে মুমিনগণ। তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পদ গ্রাস করো না; কেবল পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।”[সূরা নিসা: ২৯]
আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। নাবী বলেন: إِنَّمَا الْبَيْعُ عَنْ تَرَاضِ
"ক্রয়-বিক্রয় সন্তুষ্টির মাধ্যমেই কেবল হয়ে থাকে। "৬৭৮
সুতরাং অন্যায়ভাবে যদি কাউকে ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বাধ্য করা হয় তাহলে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হবে না। কিন্তু যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে কাউকে বাধ্য করা হয় তাহলে সঠিক হবে। যেমন বিচারক কোনো ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য তার জিনিস বিক্রি করতে বাধ্য করল।
দ্বিতীয়: চুক্তিকারীকে লেনদেনের যোগ্য হওয়া। যেমন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন, স্বাধীন ও সচেতন হওয়া।
তৃতীয়: বিক্রেতা বিক্রিত পণ্যের মালিক হওয়া অথবা মালিকের স্থলাভিষিক্ত হওয়া, যেমন অসীয়তকৃত ব্যক্তি হওয়া কিংবা অভিভাবক হওয়া অথবা কেয়ারটেকার হওয়া। সুতরাং কোনো ব্যক্তির এমন কিছু বিক্রি করা ঠিক হবে না যার সে মালিক নয়। যেমন- হাকীম ইবনে হিযাম কে আল্লাহর রসূল বলেন, لَا تَبِعُ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ "তোমার কাছে যা নেই তা তুমি বিক্রি করো না।”৬৭৯
চতুর্থ: বিক্রিত পণ্যের মাধ্যমে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া উপকার নেওয়াটা বৈধ হওয়া। যেমন খাদ্য পানীয়, পোশাক, বাহন স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি। সুতরাং এমন কিছু বিক্রি করা সঠিক হবে না যা দ্বারা উপকার নেওয়া হারাম। যেমন- মদ, শুকর, মৃত জানোয়ার, অনর্থক খেলা-ধুলার উপকরণ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।
জাবির বলেন, আল্লাহর রসূল বলেন: إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالْمُيْتَةِ، وَالْخِنْزِيرِ، وَالْأَصْنَامِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ মদ, মৃত জানোয়ার, শুকর এবং মূর্তি বিক্রি করাকে হারাম করেছেন। "৬৮০
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত আছে যে, নাবী বলেন: إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ عَلَى قَوْمٍ أَكُلَ شَيْءٍ حَرَّمَ ثَمَنَهُ "আল্লাহ মানুষদের জন্য যে জিনিস খাওয়া হারাম করেছেন তার মূল্যও হারাম করেছেন।”৬৮১
কুকুর বিক্রি করা বৈধ নয়। আবু মাসউদ এর হাদীসে রয়েছে, نَهَى رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ "আল্লাহর রসূল কুকুরের মূল্য গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন।” ৬৮২
পঞ্চম: চুক্তিকৃত বস্তুটি অর্পণ যোগ্য হওয়া। কেননা যে জিনিস অর্পণ করা যায় না, তা না থাকার মতোই। সুতরাং তা ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ হবে না। কারণ এটি হবে ধোঁকা যুক্ত ক্রয়-বিক্রয়। কেননা এই ধরনের অবস্থায় ক্রেতা কখনো কখনো মূল্য পরিশোধ করে থাকে কিন্তু ক্রয়কৃত বস্তু হাতে পায় না। যেমন কেউ পানিতে মাছ রেখেই বিক্রি করল। অথবা খেজুরের ভিতর থাকা অবস্থায় বিচি, শূণ্যে থাকা অবস্থায় পাখি, ওলানে থাকা অবস্থায় দুধ, গর্ভে থাকা অবস্থায় গর্ভস্থ পশু এবং পলাতক পশু বিক্রি করা বৈধ নয়। কেননা আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الغَرَرِ “আল্লাহর রসূল ধোঁকাযুক্ত ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন।”৬৮৩
ষষ্ঠ: চুক্তিকৃত বস্তু সম্পর্কে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জানা থাকতে হবে। হয়তো চুক্তি করার সময় তা দেখার মাধ্যমে কিংবা এমন গুণাগুণ জানার মাধ্যমে যা দ্বারা অন্য কোনো জিনিস থেকে তা আলাদা করা যায়। কেননা চুক্তিকৃত বস্তু সম্পর্কে না জেনে ক্রয়-বিক্রয় করাটা এক ধরনের ধোঁকা। যা থেকে ইসলামী শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে।
সুতরাং চুক্তির মজলিসে নেই এমন কোনো জিনিস না দেখে বা সেই জিনিস সম্পর্কে না জেনে, ক্রয়-বিক্রয়টা ক্রেতার জন্য সঠিক হবে না।
সপ্তম: বিক্রিত পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হতে হবে এবং তা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জানা থাকতে হবে।

টিকাঃ
৬৭৮. ইবনু মাজাহ: ২১৮৫, ইবনু হিব্বান: ১১/৩৪০, বাইহাকী: ৬/১৭, ইরওয়াউল গালিল: ৫/১২০।
৬৭৯. আহমাদ ৩/৪০২, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৫০৩, সুনান নাসাঈ ৭/২৭৯, তিরমিজী, হা. ১২৩২, ইবনু মাজাহ: ২১b৮৭, ইরওয়াউল গালীল: ৫/১৩২।
৬৮০. সহীহুল বুখারী, হা. ২২৩৬, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৮১
৬৮১. আহমাদ: ১/২৪৭, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৮৮।
৬৮২. সহীহুল বুখারী, হা. ২২৩৭; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৬৭।
৬৮৩. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৫১৩।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়সমূহ

📄 নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়সমূহ


আল্লাহ তাআলা কয়েক ধরনের ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন। যেমন: কেউ ক্রয়-বিক্রয় করতে গিয়ে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে ক্ষতি করল। উদাহরণ স্বরূপ- ক্রয়-বিক্রয় করার কারণে ফরয ইবাদাত করা থেকে বিরত থাকলো। অথবা ক্রয়-বিক্রয় করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করে ফেলল। এগুলো হলো নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়। ধারাবাহিকভাবে নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১. জুমু'আর দিন দ্বিতীয় আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় করা সুতরাং যে ব্যক্তির উপর জুমুআর সলাত ফরয হয়েছে তার জন্য সঠিক হবে না (একটি মত অনুযায়ী দ্বিতীয়) আযানের পর ক্রয়-বিক্রয় করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ... “হে মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সলাতের জন্য আহবান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো।” [সূরা জুমুআহ : ৯]
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। মহান আল্লাহ এই সময়ে ক্রয়-বিক্রয় করা থেকে নিষেধ করেছেন। আর নিষেধ করার পর সেই কাজ করা কোনোভাবেই সঠিক হবে না, বরং তা হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
২. এমন ব্যক্তির কাছে কোনো জিনিস বিক্রি করা যদ্দ্বারা সে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজে সাহায্য নিবে অথবা যা সে হারাম কাজে ব্যবহার করবে। অতএব, এমন ব্যক্তির কাছে জুস বিক্রি করা যাবে না যে তা দ্বারা মদ বানাবে। আরও এমন ব্যক্তির কাছে পাত্র বিক্রি করা যাবে না যা দ্বারা সে মদ পান করবে। অনুরূপভাবে মুসলমানদের মাঝে ফিতনার সময়ে কোনো অস্ত্র বিক্রি করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"সৎকাজ ও তাক্বওয়ার ব্যাপারে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।" [সূরা মায়িদাহ: ২]
৩. মুসলিম ভাইয়ের বিক্রয়ের উপর বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া।
যেমন কোনো বিক্রেতার কাছে কেউ দশ টাকা দিয়ে কোনো পণ্য কিনতে আসলো। এদুজনের মাঝে কথাবার্তা শেষ না হতেই আরেক বিক্রেতা উক্ত ক্রেতাকে বলল, আমি আপনার কাছে আরও সস্তায় বিক্রি করব। অথবা সে বলল, এই দামেই আমি এর থেকে আরও ভালো জিনিস দিবো। এভাবে ক্রয়-বিক্রয় করা নিষেধ। কেননা ইবনু উমার (রাঃ) এর হাদীসে রয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: )وَلَا يَبِعُ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعٍ بَعْضٍ(
"কোনো ব্যক্তি বিক্রির অবস্থায় যেন অন্য কেউ বিক্রি করার প্রস্তাব না দেয়।"৬৮৪
৪. এক ব্যক্তির ক্রয়ের উপর আরেক ব্যক্তির ক্রয় করা।
যেমন কোনো ব্যক্তি কারো কাছে কিছু বিক্রি করার জন্য কথা বলতে শুরু করল আর অপর এক ব্যক্তি বিক্রেতাকে বলল, আপনি বিক্রি করা বাতিল করুন। আমি আপনার কাছ থেকে তা আরও বেশি মূল্যে ক্রয় করব অথচ ইতঃপূর্বেই পূর্বের দুই ব্যক্তির মাঝে ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে কথা-বার্তা চূড়ান্ত হয়েছিল। এই অবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে তা বিক্রি করা হারাম। যা পূর্বের হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয়।
৫. বাকি ও নগদের সংমিশ্রণে ক্রয়-বিক্রয় করা।
যেমন একজন ব্যক্তি (বিক্রেতা) আরেক ব্যক্তির (ক্রেতা) কাছে কোনো পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত অর্থে বিক্রি করল। অতঃপর তখনই আবার বিক্রেতা (২য় ক্রেতা), ক্রেতার কাছ থেকে কম মূল্যে উক্ত পণ্যটি ক্রয় করে নেয়। মেয়াদ শেষে (১ম ক্রেতা) ক্রেতা প্রথম মূল্য পরিশোধ করল। যেমন একটি জমি ৫০,০০০ টাকার বিনিময়ে (১ম ক্রেতা) ক্রয় করল, যার মূল্য সে এক বছর পর পরিশোধ করবে। অতঃপর বিক্রেতা (সেই সময়ই) নগদ ৪০,০০০ টাকায় জমিটি (১ম ক্রেতার থেকে) ক্রয় করে নিলো। তাহলে বছর শেষে তার (১ম ক্রেতার) ৫০,০০০ টাকা পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
এই ক্রয়-বিক্রয়কে عينه বা ঈনা নামকরণ করা হয়: কারণ ক্রেতা পণ্যের স্থানে عيئة তথা নগদ অর্থ গ্রহণ করেছে।
তাই এটি হলো এক প্রকার সুদ, এজন্য এই পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করা নিষেধ করা হয়েছে। কেননা ইবনু উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেন: إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَتَرَكْتُمُ الجِهَادَ ، سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذُلَّا لَا يَرْفَعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ... "যখন তোমরা ঈনা পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে এবং জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দিবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি মুক্তি দিবেন না।”৬৮৫
৬. হস্তগত করার পূর্বেই কোনো পন্য বিক্রি করা। যেমন কোনো ব্যক্তি কারো কাছ থেকে পণ্য কিনলো। অতঃপর তা নিজের হস্তগত করা ও গুদামজাত করার আগেই অন্যের কাছে বিক্রি করে দিলো। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنِ ابْتَاعَ طَعَامًا فَلَا يَبِعْهُ حَتَّى يَقْبِضَهُ "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, খাদ্য ক্রয় করে নিজের অধিকারে না এনে কেউ যেন তা বিক্রি না করে। "৬৮৬ عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَن رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى أَنْ تُبَاعَ السَّلَعُ حَيْثُ تُبْتَاعُ، حَتَّى يَحُوزَهَا التَّجَّارُ إِلَى رِحَالِهِمْ. "যায়িদ ইবনু সাবিত হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল ব্যবসায়ীদেরকে পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের পর নিজের জায়গায় স্থানান্তরিত করার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। ”৬৮৭
অতএব, কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়, কোনো কিছু ক্রয় করার পর তা পূর্ণ হস্তগত করার পূর্বেই বিক্রি করা।
৭. ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই বিক্রি করা। ফল পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে তা বিক্রি করা জায়েয নয়। কারণ তাতে ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কিংবা তাতে ত্রুটি যুক্ত হওয়ার আশংকা থাকে। عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَأَيْتَ إِنْ مَنَعَ اللَّهُ الثَّمَرَةَ، فَبِمَ يَأْخُذُ أَحَدُكُمْ مَالَ أَخِيهِ؟ "আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল বলেছেন: যদি আল্লাহ ফল ধরা বন্ধ করে দেন, তবে তোমরা কীসের বদলে তার ভাইয়ের মাল (ফলের মূল্য) নিবে?”৬৮৮ عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ : نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَنْ بَيْعِ الثَّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلَاحُهَا، هي البَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ "আবদুল্লাহ ইবনু উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন। "৬৮৯
আর ফল পরিপক্ক হওয়াটা বিভিন্নভাবে বুঝা যায়। যেমন: খেজুর লাল অথবা হলুদ হওয়ার মাধ্যমে, আঙ্গুর কালো হয়ে তার মাঝে মিষ্টতা আসার মাধ্যমে, বিভিন্ন দানাদার শস্য শুকনো হওয়া ও শক্ত হওয়ার মাধ্যমে। এভাবেই অন্যান্য ফল-ফলাদির ব্যাপারে বোঝতে হবে।
৮. দালালী করা: তা হলো বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত পণ্যের মূল্য কোনো ব্যক্তির বৃদ্ধি করে বলা। কিন্তু আসলে সেই পণ্যটি কেনার তার ইচ্ছা নেই। বরং তার ইচ্ছা হলো এর মাধ্যমে অন্য কাউকে ধোঁকায় ফেলা এবং সেই পণ্যটি কেনার প্রতি তাকে আগ্রহী করা ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা। হাদীসে এ জাতীয় কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। عَنِ ابْنِ عُمَرَ : أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ النَّجْشِ» "ইবনু উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দালালী (এক ক্রেতার উপর দিয়ে অন্য ক্রেতার দর কষাকষি) করতে নিষেধ করেছেন।”৬৯০

টিকাঃ
৬৮৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৬৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৪১২।
৬৮৫. আহমাদ ২/২৮; সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৬২; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সিলসিলাতুস সহীহাহ, হা. ১১।
৬৮৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫২৫।
৬৮৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৪৯৯।
৬৮৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৯৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৫৫৫।
৬৮৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২১৯৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫৩৪।
৬৯০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯৬৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৫১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00