📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কাফেরদের সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি

📄 কাফেরদের সাথে যুদ্ধবিরতির চুক্তি


১. هدنة এর পরিচয়: هدنة এর আভিধানিক অর্থ: السكون বা স্থিরতা, নীরবতা। শারঈ সংজ্ঞা:
عقد الإمام أو نائبه لأهل الحرب على ترك القتال مدة معلومة بقدر الحاجة وإن طالت “প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতির উপরে আহলুল হারবের তথা যুদ্ধের প্রতিপক্ষের সাথে ইমাম কিংবা প্রতিনিধির চুক্তি করাকে هدنة বলা হয়।" একে مهادنة, موادعة এবং معاهدة বলা হয়।
২. هدنة শরীয়ত সম্মত হওয়ার কারণ এবং তার দলীল: প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতির জন্য কাফেরদের সাথে মুসলিম নেতার যুদ্ধবিরতির চুক্তি করা বৈধ রয়েছে, যখন সে চুক্তিটি মুসলিমদের কল্যাণর্থে হবে। যেমন: মুসলিমদের দুর্বলতার কারণে বা তাদের প্রস্তুতি না থাকার কারণে কিংবা অন্য কোনো কল্যানার্থে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا.
"যদি তারা (কাফেরেরা) সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে তুমিও সন্ধি করতে আগ্রহী হও।” [সূরা আনফাল : ৬১] আল্লাহর রসূল হুদায়বিয়ার সন্ধিতে কাফেরদের সাথে দশ বছর যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছিলেন এবং মদীনায় ইহুদিদের সাথে সন্ধি করেছিলেন।
৩. هدنة (যুদ্ধবিরতি) এর আবশ্যকতা:
ইমাম কিংবা প্রতিনিধি যুদ্ধবিরতির চুক্তি করলে তা আবশ্যক হয়ে যায়। সেটি অমান্য করা কিংবা বাতিল করা বৈধ নয়। যতক্ষন পর্যন্ত তারা (আহলুল হারব) সেটাকে অবিচল রাখবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না এবং বিশ্বাসঘাতকতার আশংকাও থাকবে না, ততক্ষণ তা অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ....
"তারা তোমাদের সঙ্গে চুক্তি ঠিক রাখলে, তোমরাও তাদের সাথে চুক্তিতে দৃঢ় থাক।" [সূরা তাওবা: ৭] আল্লাহ আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ...
"হে মু'মিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।” [সুরা মায়িদাহ: ১]
যদি তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে: যুদ্ধের মাধ্যমে, আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সহযোগিতা করে, কোনো মুসলিমকে হত্যা করা কিংবা কোনো মুসলিমের মাল ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে যদি তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তাহলে আমাদের এবং তাদের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙ্গে যাবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করাও বৈধ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَبِيَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ.
"তারা যদি চুক্তি করার পর তাদের শপথ ভঙ্গ করে আর তোমাদের দ্বীনের বিরুদ্ধে কটুক্তি করে, তাহলে কাফেরদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে লড়াই করো, (এই অবস্থায়) তাদের শপথ রইল না, হয়তো তারা বিরত থাকবে।” [সূরা তাওবা : ১২]
যদি কোনো আলামতের মাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে অঙ্গীকার ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাদের সাথে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা বৈধ হবে। তখন অঙ্গীকার টিকিয়ে রাখ আবশ্যক নয়। আল্লাহ বলেন:
وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِذْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ ...
“(হে নাবী!) তুমি যদি কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ভঙ্গের আশংকা করো তাহলে তোমার চুক্তিকেও প্রকাশ্যভাবে তাদের সামনে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।” (সূরা আনফাল : ৫৮)
অর্থাৎ, তাদের সাথে চুক্তিভঙ্গের কথা তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও, যাতে চুক্তিভঙ্গের বিষয়টি সম্পর্কে উভয় পক্ষ সমানভাবে অবগত হতে পারে। তাদেরকে চুক্তিভঙ্গের বিষয়টি জানানোর পূর্বে যুদ্ধ করা জায়েয নয়।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 জিম্মার চুক্তি এবং জিযিয়া প্রদান

📄 জিম্মার চুক্তি এবং জিযিয়া প্রদান


১. ذمة এর পরিচয়:
ذمة এর আবিধানিক অর্থ: العهد তথা অঙ্গীকার করা। তা হচ্ছে নিরাপত্তা এবং জামানত।
ذمة এর পারিভাষিক অর্থ: هو إقرار بعض الكفار على كفرهم، بشرط بذل الجزية، والتزام أحكام الملة التي حكمت بها الشريعة الإسلامية عليهم. "ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান মানার শর্তে এবং জিযিয়া প্রদানে শর্তে কিছু কাফেরের কুফরির উপরে অনুমোদন প্রদান করাকে জিম্মা বলা হয়।”
২. জিম্মার বৈধতা: জিম্মার চুক্তি শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
"যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং কিয়ামাত দিনের প্রতিও না, আর ঐ বস্তুগুলিকে হারাম মনে করে না যেগুলিকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল হারাম বলেছেন, আর সত্য ধর্ম (অর্থাৎ ইসলাম) গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা স্বীকার করে প্রজারূপে স্বেচ্ছায় কর দেয়।" (সূরা তাওবা: ২৯)
বুরাইদা থেকে বর্ণিত। নাবী বলেছেন:
ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، فَإِنْ أَجَابُوكَ ، فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ... فَإِنْ هُمْ أَبَوْا فَسَلْهُمُ الْجِزْيَةَ.
"প্রথমে তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবে। যদি তারা তোমার এ আহবানে সাড়া দেয়, তবে তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নিবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে সরে দাঁড়াবে।..... আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তবে তাদের কাছে কর প্রদানের দাবী জানাবে। "৬৭০
৩. জিযিয়া কার নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে?
বালেগ, স্বাধীন, ধনী এবং আদায় করতে সক্ষম পুরুষদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা হবে। কোনো দাস থেকে তা নেওয়া হবে না; কেননা সে কোনো কিছুর মালিক নয়, সে ফকীরের স্তরে। আর মহিলা, শিশু এবং পাগলদের থেকেও নেওয়া হবে না; কেননা তারা যোদ্ধা নয়। যারা দীর্ঘস্থায়ী রোগী এবং অতিবৃদ্ধ তাদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা হবে না; কেননা তাদের রক্ত প্রবাহিত করা নিষিদ্ধ। সুতরাং, তারা নারীদের সাদৃশ্য রাখে।
৪. জিম্মা চুক্তির কারণে যা আবশ্যক হয়: কাফেরদের সাথে করা এই চুক্তির ফলে তাদেরকে হত্যা করা হারাম। তাদের মাল রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, তাদের সম্মান রক্ষা করতে হবে, তাদের স্বাধীনতা হেফাজত করতে হবে, তাদেরকে কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং তাদের সাথে কেউ অপরাধ করলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। নাবী বলেছেন: وَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ، فَادْعُهُمْ إِلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ - أَوْ خِلَالٍ - فَأَيَتُهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ ..
"যখন তুমি মুশরিক শত্রুর সম্মুখীন হবে, তখন তাকে তিনটি বিষয় বা আচরণের প্রতি আহ্বান জানাবে। তারা এগুলোর মধ্য থেকে যেটিই গ্রহণ করে, তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নিবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াবে।”৬৭১

টিকাঃ
৬৭০. সহীহ মুসলিম, হা. ৪৪১৪ ফুআ. ১৭৩১।
৬৭১. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৭৩১।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 (الأمان) নিরাপত্তার চুক্তি

📄 (الأمان) নিরাপত্তার চুক্তি


১. الأمان এর পরিচয়: আভিধানিক অর্থ: أمان তথা-নিরাপত্তা الخوف )ভয়) এর বিপরীত।
هو عبارة عن تأمين الكافر على ماله ودمه مدة محدودة : "নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাফেরদের জান ও মালের নিরাপত্তা দেওয়াকে أمان বলা হয়।"
২. শরীয়ত সম্মত হওয়ার কারণ এবং দলীল: أمان শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল: আল্লাহ তা'আলার বাণী:
إِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ.
"মুশরিকদের মধ্য হতে যদি কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে তুমি তাকে আশ্রয় দান করো। যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়; অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।” [সূরা তাওবাহ: ৬]
৩. নিরাপত্তা কার পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ হবে এবং তার জন্য কি কি শর্ত করা হয়েছে: প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষ থেকেই নিরাপত্তার চুক্তি করা বিশুদ্ধ হবে। তবে শর্ত হলো: ১. তাকে জ্ঞানবান বালেগ হতে হবে; সুতরাং, কোনো পাগল এবং শিশুর পক্ষ হতে বিশুদ্ধ হবে না। ২. স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী হতে হবে: সুতরাং, বাধ্য করা হয়েছে এমন ব্যক্তি, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি এবং অজ্ঞান ব্যক্তির নিরাপত্তা প্রদান বিশুদ্ধ হবে না। ৩. মহিলার নিরাপত্তা বিশুদ্ধ হবে। নাবী বলেছেন:
قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِي
"হে উম্মু হানী! তুমি যাকে নিরাপত্তা দান করেছ আমরাও তাকে নিরাপত্তা দান করেছি। ”৬৭২ দাসের নিরাপত্তা প্রদানও বিশুদ্ধ হবে। নাবী। বলেছেন:
ذِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ، يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ
"নিরাপত্তা দানের ক্ষেত্রে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একইভাবে দায়িত্বশীল। তাদের নিম্নস্তরের প্রদত্ত নিরাপত্তাও কার্যকরী।”৬৭৩ ইমামের পক্ষ হতে সকল মুশরিকের জন্য যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, সেটা সার্বজনীন নিরাপত্তা হবে। আর কোনো সাধারণ মুসলিম নিরাপত্তা দিলে তার একজন শত্রুর জন্যই নির্দিষ্ট হবে। মুসলিমদের নেতা সুরক্ষা প্রদান করলে, সেটি সাধারণ সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ তার রাষ্ট্র সকলের। তার অনুমোদন ব্যতীত অন্য কেউ এরূপ করতে পারে না। যে শব্দগুলো নিরাপত্তার উপর প্রমাণ করে সেগুলোর দ্বারা নিরাপত্তা সাব্যস্ত হবে।
যেমন: أنت أمن -তুমি আশঙ্কামুক্ত। أجرتك -আমি তোমাকে আশ্রয় দিলাম। لا بأس عليك -তোমার কোনো সমস্যা নেই। অথবা এমন কোনো ইঙ্গিতের মাধ্যমে।
المستأمن (নিরাপত্তা প্রার্থী): যে ব্যক্তি আল্লাহর কালাম শোনার জন্য এবং ইসলামী শরীয়ত জানার জন্য নিরাপত্তা চায়, পূর্বের আয়াতের কারণে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া আবশ্যক। অতঃপর সে তার সুরক্ষায় ফিরে আসবে।
৪. أمان বা নিরাপত্তার হুকুম এবং তার কারণে যা আবশ্যক হয়: أمان এর অঙ্গীকার পূর্ণ করা আবশ্যক। তাই কোনো নিরাপত্তা চাওয়া ব্যক্তিকে হত্যা করা, বন্দী কিংবা দাসে পরিণত করা হারাম। তেমনিভাবে নিরাপত্তা চুক্তির সকল বিষয় কার্যকর করতে হবে। যদি শত্রুদের মন্দ এবং বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি ভঙ্গ করা বৈধ রয়েছে।

টিকাঃ
মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৫৭; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৩৩৬।
মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩১৭২; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৩৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00