📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 জিহাদের শর্তসমূহ

📄 জিহাদের শর্তসমূহ


জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য সাতটি শর্তারোপ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: ১. মুসলিম হওয়া ২. বালেগ হওয়া ৩. জ্ঞানবান হওয়া ৪. পুরুষ হওয়া ৫. স্বাধীন হওয়া ৬. শারীরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা ও ৭. অসুস্থতা ও অসুবিধা থেকে মুক্ত থাকা।
সুতরাং কোনো কাফেরের উপর জিহাদ আবশ্যক নয়। কেননা তা একপ্রকার ইবাদত। আর ইবাদত কাফেরের উপর আবশ্যক নয়। সে ইবাদত করলে বিশুদ্ধও হবে না। কেননা তার মধ্যে ইখলাস, আমানত ও আনুগত্য নেই। তাই তার জন্য মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সাথে জিহাদে বের হওয়ার অনুমতি নেই। কেননা নাবী বদর যুদ্ধে এক মুশরিককে বলেছিলেন:
تُؤْمِنُ بِالله وَرَسُولِهِ ؟ قَالَ : لَا ، قَالَ : فَارْجِعْ، فَلَنْ أَسْتَعِينَ بِمُشْرِكِ
"তুমি কি আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান রাখো? সে বলল, না। তিনি বললেন: তাহলে তুমি ফিরে যাও, আমি কোনো মুশরিকের সাহায্য গ্রহণ করব না।"৬৫২
অনুরূপ অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের উপর জিহাদ আবশ্যক নয়। কেননা সে দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। ইবনু উমার এর হাদীস:
أنه عَرَضَ نفسه على رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعَ عَشْرَةَ سَنَةٌ، فَلَمْ يُجِزْهُ فِي المقاتلة
"তিনি নিজেকে উহুদের যুদ্ধের জন্য আল্লাহর রসল এর নিকটে উপস্থাপন করলেন। তখন তার বয়স ১৪ বছর। তাকে যুদ্ধের অনুমতি দেননি।”৬৫৩
পাগলের উপরে জিহাদ আবশ্যক নয়। কেননা তার থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। দাসের উপরে জিহাদ ফরয নয়, কেননা সে তার মনিবের মালিকনাভুক্ত। মহিলাদের উপরও জিহাদ ফরয নয়। আয়িশাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
يا رسول الله هل على النساء جهاد؟ فقال: جِهَادٌ، لَا قِتَالَ فِيهِ : الْحَجِّ وَالْعُمْرَةُ
“হে আল্লাহর রসূল! মহিলাদের উপরও জিহাদ আছে? তিনি বললেন: হ্যা, তবে সে জিহাদে লড়াই নেই। তা হচ্ছে হাজ্জ ও উমরাহ।"৬৫৪
نرى الجِهَادَ أَفْضَلَ العَمَلِ ، أَفَلَا نُجَاهِدُ؟ قَالَ: لَكِنَّ أَفْضَلَ الجِهَادِ حَجٌ مَبْرُورُ
"আমরা দেখছি জিহাদ হচ্ছে সর্বোত্তম আমল। আমরা কী জিহাদ করব না? তিনি বললেন: সর্বোত্তম জিহাদ হচ্ছে কবুল হাজ্জ।”৬৫৫
জিহাদে অক্ষম ব্যক্তি তাকেই বলা হয় যে ব্যক্তি দুর্বলতা কিংবা বয়স্ক হওয়ার কারণে অস্ত্র বহন করতে সক্ষম নয়, তার উপর জিহাদ আবশ্যক নয়। তেমনিভাবে এমন দরিদ্র ব্যক্তির উপরও জিহাদ ফরয নয় যে তার পরিবারের খরচ ও জিহাদের পথের খরচ বহন করতে সক্ষম না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنْفِقُونَ حَرَجٌ
"আর খরচ করার মতো কোনো সম্বল যাদের নেই তাদের কোনো পাপ নেই।" [সূরা তাওবা: ৯১]
তেমনিভাবে যার কোনো অসুস্থতা, ক্ষতি কিংবা এ ধরনের কোনো ওযর রয়েছে, তার উপরও জিহাদ ফরয নয়। কেননা অপারগতা ওয়জিব দূর করে দেয়। আল্লাহ বলেন:
لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ
"অন্ধের উপর কোনো দোষ নেই, খোঁড়ার উপর কোনো দোষ নেই, অসুস্থর উপর কোনো দোষ নেই।" [সূরা ফাতহ: ১৭]
আল্লাহ আরও বলেন: لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنْفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ "দুর্বল লোকদের উপর কোনো পাপ নেই এবং অসুস্থ ব্যক্তির উপর। আর খরচ করার মতো কোনো সম্বল যাদের নেই তাদেরও কোনো পাপ নেই। যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি নিষ্ঠা রাখে।” [সূরা তাওবা : ৯১]

টিকাঃ
৬৫২. সহীহ মুসলিম, হা. ৪৫৯৪, ফুআ. ১৮১৭।
৬৫৩. 'মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৬৬৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬৮৬।
৬৫৪. ইবনু মাজাহ, হা. ২৯০১; বায়হাক্বী ৪/৩৫০ ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া নং ১১৮৫।
৬৫৫. সহীহুল বুখারী, হা. ২৭৯৪।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 যাদের উপর জিহাদ ফরজ নয়

📄 যাদের উপর জিহাদ ফরজ নয়


কিছু ওযরের কারণে জিহাদ রহিত হয়ে যাবে; সেটি ফরযে আইন কিংবা ফরযে কেফায়া হোক। সেগুলো হলো: ১-২. পাগল ও শিশু: আল্লাহর রসূল বলেন: رُفِعَ عَنْ ثَلاثَةٍ : عَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يُفِيقَ، وَعَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيُّ حَتَّى يحتلم. "তিন শ্রেণির থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১. পাগল; যতক্ষণ না সুস্থ হয়, ২. ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, ৩. শিশু যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয়। ৬৫৬
৩. মহিলা: কোনো মহিলার উপর জিহাদ ওয়াজিব নয়। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
৪. দাস: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لِلْعَبْدِ المَمْلُوكِ الصَّالِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلا الجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَالحَجُّ وَبِرُّ أُمِّي، لَأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوتَ وَأَنَا مَمْلُوكُ .) "সৎ ক্রীতদাসের সওয়াব হবে দ্বিগুণ। যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, আল্লাহর পথে জিহাদ, হাজ্জ এবং আমার মায়ের সেবার মতো উত্তম কাজ যদি না থাকত, তাহলে ক্রীতদাসরূপে মৃত্যুবরণ করাই আমি পছন্দ করতাম।”৬৫৭
৫ ও ৬. শারিরিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অক্ষমতা, অসুস্থতা কিংবা শরীরের কোনো অঙ্গ ঠিক না থাকা। যেমন- অন্ধ হওয়া, নেংড়া হওয়া ইত্যাদি। এর আলোচনা গত হয়েছে।
৭. নফল বা ঐচ্ছিক জিহাদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা কিংবা দুইজনের একজনের অনুমতি না পাওয়া। ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ( جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الجِهَادِ، فَقَالَ : أَحَيُّ وَالِدَاكَ؟ قَالَ : نَعَمْ، قَالَ: فَفِيهِمَا فَجَاهِدٌ) "এক ব্যক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তখন তিনি বললেন: তোমার পিতামাতা জীবিত আছেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। নাবী বললেন: তাহলে তাঁদের খেদমতে নিয়োজিত থাকো।”৬৫৮
পিতা-মাতার খেদমত করা ফরযে আইন। আর এই অবস্থায় জিহাদ ফরযে কেফায়া। সুতরাং, ফরযে আইনকেই অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। তবে যখন জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যাবে তখন তারা বাঁধা প্রদান করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতিও লাগবে না।
৮. যার কাছে ঋণ পরিশোধ করার মতো অর্থ নেই এবং ঋণদাতার অনুমতিও নেই; যদি নফল জিহাদ হয়। নাবী বলেন: الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَيْءٍ، إِلَّا الدَّيْنَ "আল্লাহর পথে জিহাদ ঋণ ব্যতীত সকল বিষয়কে ক্ষমা করে দেয়। "৬৫৯
৯. ঐ আলেম যিনি ব্যতীত সে এলাকায় অন্য কোনো আলেম নেই; কেননা যদি সে নিহত হয় তাহলে অবশ্যই মানুষেরা তার প্রয়োজন অনুভব করবে। কারণ তার স্থলাভিষিক্ত কেউ হতে পারবে না। তাঁর চাইতে জ্ঞানী কাউকে না পাওয়া গেলে, মুসলিমদের প্রয়োজনের স্বার্থে তার থেকে জিহাদ রহিত হয়ে যাবে।

টিকাঃ
৬৫৬. সুনান আবু দাউদ, হা. ৪৪০১; নাসাঈ ৬/১৫৬; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া ২৯৭।
৬৫৭. সহীহুল বুখারী, হা. ২৫৪৮; তার কথা )وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ( সঠিক হচ্ছে এটা আবু হুরায়রা থেকে মুদরাজ।
৬৫৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩০০৪; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ২৫৪৯।
৬৫৯. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৮৮৬ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস এর হাদীস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00