📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ই'তিকাফের শর্তসমূহ

📄 ই'তিকাফের শর্তসমূহ


ই'তিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তার জন্য কতগুলো শর্ত রয়েছে। যেগুলো ছাড়া তা বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত হবে না। সেগুলো হলো-
১. ই'তিকাফকারীকে মুসলিম, ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী ও বোধশক্তি সমপন্ন হতে হবে: কাফের, পাগল এবং ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না এমন বালকের ই'তিকাফ বিশুদ্ধ বলে গণ্য হবে না। বালেগ হওয়া বা পুরুষ হওয়া ই'তিকাফের জন্য শর্ত নয়। সুতরাং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি, যদি ভালো-মন্দ পার্থক্যকারীর করতে পারে, তবে ই'তিকাফ বিশুদ্ধ বলে গণ্য হবে। অনুরূপ মেয়েদের ক্ষেত্রেও।
২. ই'তিকাফের নিয়ত করা: নাবী বলেছেন: )إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ( "প্রত্যেক কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী।"৫৮০
ই'তিকাফকারী আল্লাহর ইবাদত ও নৈকট্য লাভের আশায় একান্তে অবস্থানের নিয়ত করবে।
৩. মাসজিদের মধ্যে ই'তিকাফ হতে হবে: আল্লাহ তা'আলা বলেন: )وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ﴿ "তোমরা মসজিদে ই'তিকাফ করো।”[সূরা বাক্বারাহ : ১৮৭]
তাছাড়া আল্লাহর রসূল মসজিদের মধ্যেই ই'তিকাফ করেছেন। তিনি মসজিদ ছাড়া অন্যথায় ই'তিকাফ করেছেন এমন বর্ণনা পাওয়া যায় না।
৪. ই'তিকাফের মসজিদটি এমন হতে হবে যেখানে জামাআতের সাথে সলাত চালু রয়েছে: এর কারণ হলো, ই'তিকাফের সময়েও ফরয সলাত রয়েছে এবং ই'তিকাফকারীর জন্য জামাআত আবশ্যক। আর যে মসজিদে জামাআতের সাথে সলাত আদায় করা হয় না, সে মসজিদে ই'তিকাফ করা হলে জামাআতকে বর্জন করা হবে, অথচ সেটা তার উপর ওয়াজিব। কিংবা ই'তিকাফকারীকে বারবার বের হতে হবে, যা ই'তিকাফের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। আর মহিলাদের যে-কোনো মসজিদে ই'তিকাফ বিশুদ্ধ বলে গণ্য হবে। চাই তা জুমুআর মসজিদ হোক বা না হোক। এটা তখনই কার্যকর হবে যখন ফেতনার আশঙ্কা থাকবে না। ফেতনার আশঙ্কা থাকলে নিষিদ্ধ। তবে উত্তম হলো মসজিদটি জুমুআর মসজিদ হওয়া। কিন্তু তা ই'তিকাফের জন্য শর্ত নয়।
৫. বড়ো অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়া: অপবিত্র শরীরবিশিষ্ট, ঋতুবতী নারী বা নিফাস অবস্থায় আছে এমন স্ত্রীলোকের ই'তিকাফ বিশুদ্ধ হবে না। কারণ মসজিদে তাদের অবস্থান করা জায়েয নেই।
রোজা ই'তিকাফের জন্য শর্ত নয়। ইবনু উমার থেকে বর্ণিত, উমার বলেছেন: আল্লাহর রসূল! আমি জাহেলী যুগে মসজিদুল হারামে একরাত্রি ই'তিকাফ করার মানত করেছিলাম। অতঃপর আল্লাহর রসূল বললেন: (أؤفٍ بنذرِك) “তুমি তোমার মানত পূর্ণ করো।”৫৮১
যদি ই'তিকাফে রোজা শর্ত হতো, তাহলে রাতে ই'তিকাফ বিশুদ্ধ হতো না। কেননা রাত্রে কোনো রোজা নেই। যেহেতু উভয়টি পৃথক পৃথক ইবাদত। তাই একটির জন্য আরেকটি শর্ত নয়।

টিকাঃ
৫৮০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১; সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮২১, ফুআ. ১৯০৭।
৫৮১. মুত্তাফাকুন আলাইহিঃ সহীহুল বুখারী, হা. ২০৩২; সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮২১, ফুআ. ১৬৫৬

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ই'তিকাফের সময়, তার মুস্তাহাব ও ই'তিকাফকারীর জন্য যা বৈধ

📄 ই'তিকাফের সময়, তার মুস্তাহাব ও ই'তিকাফকারীর জন্য যা বৈধ


১. ই'তিকাফের সময়: ই'তিকাফের রুকন হচ্ছে মসজিদে নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করা। মসজিদে অবস্থান না করলে ই'তিকাফ সংঘটিত হবে না। বিদ্বানগণের নিকটে ই'তিকাফের সর্বনিম্ন পরিমাণ সময়ের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ইতকিাফের সর্বনিম্ন কোনো সময় নেই। তাই একটা সময়ে ই'তিকাফ করলেই বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত হবে, যদিও সময়টা স্বল্প পরিমাণ হয়। তবে উত্তম হলো ই'তিকাফ যেন একদিন বা এক রাতের কম পরিমাণ না হয়। কেননা নাবী এবং কোনো সাহাবী থেকেই এর কম সময় পরিমাণের ব্যাপারে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। আয়িশাহ এর হাদীসের ভিত্তিতে ই'তিকাফের সর্বোত্তম সময় রমাযানের শেষ দশক।
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَعْتَكِفُ العَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ
"নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমৃত্যু রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করতেন।"৫৮২
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্য সময়ে ই'তিকাফ করবে, তা বৈধ হবে। তবে সর্বোত্তম এর বিপরীত হবে। যে ব্যক্তি রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করতে চায়, সে যে মসজিদে ই'তিকাফ করার নিয়ত করেছে, সেই সমজিদে যেন একুশতম দিনে ফজরের সলাত আদায় করে। অতঃপর ই'তিকাফে প্রবেশ করবে। আর ই'তিকাফ শেষ করবে রমাযানের শেষ দিনে সূর্যাস্ত যাওয়ার পর।
২. ই'তিকাফের মুস্তাহাব: ই'তিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যেখানে বান্দা তার সৃষ্টিকর্তার সাথে একান্তে মিলিত হয়ে অন্যান্য সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। সুতরাং ই'তিকাফকারীর জন্য সুন্নত হলো, সে ইবাদতের জন্য পূর্ণ মনোযোগী হবে, বেশি বেশি সলাত, যিকর, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, তাওবা ইসতিগফার ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অন্যান্য ভালো কাজগুলো করতে থাকবে।
৩. ই'তিকাফকারীর জন্য যা বৈধ: যে কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া ছাড়া উপায় নেই, সে কাজগুলোর জন্য তার মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ। যেমন: তার খানা-পিনা উপস্থিত করার কেউ না থাকলে খাওয়া ও পান করার জন্য বের হওয়া, মল-মূত্র ত্যাগ করার জন্য বের হওয়া, অযু করার জন্য বের হওয়া এবং শারীরিক অপবিত্রতার গোসল করার জন্য বের হওয়া। তার জন্য মানুষের সাথে কোনো উপকারী কথা বলা বা মানুষদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করা বৈধ। কিন্তু যে আলোচনায় কোনো উপকার নেই কিংবা কোনো প্রয়োজন নেই, তা অবশ্যই ই'তিকাফের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এছাড়াও পরিবারের কোনো সদস্য এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে সাক্ষাত করা বৈধ এবং তাদের সাথে অল্প কিছুক্ষণ কথা বলা বৈধ এবং তাদেরকে বিদায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বের হওয়াও বৈধ। সাফিয়া থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُعْتَكِفًا فَأَتَيْتُهُ أَزُورُهُ لَيْلًا، فَحَدَّثْتُهُ ثُمَّ قُمْتُ فَانْقَلَبْتُ، فَقَامَ مَعِي لِيَقْلِبَنِي
"আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ই'তিকাফে ছিলেন। আমি রাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসলাম এবং কিছু কথা বললাম। অতঃপর আমি ফিরে আসার জন্য দাঁড়ালে তিনিও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমার সাথে দাঁড়ালেন।"৫৮৩ আর হাদীসে বর্ণিত لِيَقْلِبَنِي শব্দের অর্থ: যাতে তিনি আমাকে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দেন। ই'তিকাফকারী মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে মসজিদেই খাওয়া-দাওয়া করবে এবং ঘুমাবে।

টিকাঃ
৫৮২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২০২০; সহীহ মুসলিম, হা. ২৬৭২, ফুআ. ১১৭২
৫৮৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩২৮১; সহীহ মুসলিম, হা. ২৬৭২, ফুআ. ২১৭৫

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 ই'তিকাফ বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ

📄 ই'তিকাফ বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ


১. কোনো প্রয়োজন ছাড়াই ইচ্ছাকৃত মসজিদ থেকে বের হওয়া, যদিও অল্প সময়ের জন্য হয়। আয়িশাহ এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ( وَكَانَ لَا يَدْخُلُ البَيْتَ إِلَّا لِحَاجَةٍ إِذَا كَانَ مُعْتَكِفًا) "তিনি ই'তিকাফে থাকা অবস্থায় (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না।”৫৮৪ কেননা বের হওয়ার মাধ্যমে মসজিদে অবস্থান করার উদ্দেশ্যটা হারিয়ে যায়। অথচ মসজিদে অবস্থান করাটা ই'তিকাফের রুকন।
২. সহবাস করা; যদিও তা রাতে হয় বা মসজিদের বাইরেও হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ "তোমরা মাসজিদে ই'তিকাফ করার সময় (স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবে না।"[সূরা বাক্বারাহ: ১৮৭] সহবাস ছাড়াই যৌন উত্তেজনার সাথে তার বীর্য নির্গত হলেও এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন- হস্তমৈথুন করা, যোনিপথ ব্যতীত ভিন্ন রাস্তায় সহবাস করা।
৩. জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া; পাগলামি ও মাদকাসক্তের মাধ্যমে ই'তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। কেননা পাগল ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি ইবাদতের যোগ্য নয়।
৪. হায়েয ও নেফাস: কেননা ঋতুবতী ও নিফাস অবস্থায় আছে এমন স্ত্রীলোক মসজিদে অবস্থান করতে পারবে না।
৫. ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা: কারণ এটা ইবাদতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তা'আলা বলেন: (لينْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ ) "তুমি আল্লাহর শরীক স্থির করো, অবশ্যই তোমার কাজ নিষ্ফল হবে।”[সূরা যুমার : ৬৫]

টিকাঃ
৫৮৪. সহীহুল বুখারী, হা. ২০২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00