📄 রোজার মুস্তাহাব বিষয়সমূহ
রোজাদারের জন্য নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা মুস্তাহাব:
১. সাহরী খাওয়া: নাবী বলেছেন: )تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً( "তোমরা সাহারী খাও, সাহারীতে বরকত রয়েছে।”৫৪৩
খাবার কম হোক বা বেশি হোক উভয়ের মাধ্যমেই সাহারী খাওয়া সাব্যস্ত হয়। যদিও এক ঢোক পানি হয়। আর সাহারী খাওয়ার সময় মধ্যরাত্রি থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক এর পূর্ব পর্যন্ত।
২. সাহারী দেরিতে খাওয়া: যায়েদ ইবনে সাবিত থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, تَسَخَّرْنَا مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ قُمْنَا إِلَى الصَّلَاةِ. قُلْتُ : كَمْ كَانَ قَدْرُ مَا بَيْنَهُمَا؟ قَالَ: خَمْسِينَ آيَةٌ) "আমরা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাহারী খেয়ে সলাতে দাঁড়ালাম। (রাবী আনাস বলেন) আমি (যায়েদ ইবনু সাবিত কে) জিজ্ঞেস করলাম, সাহারী ও আযানের মধ্যে কত সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, পঞ্চাশ আয়াত পড়ার মতো সময়। "৫৪৪
৩. দ্রুত ইফতার করা: সূর্যাস্ত নিশ্চিত হলে রোজাদারের জন্য দ্রুত ইফতার করা মুস্তাহাব। সাহল ইবনু সা'দ থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় নাবী বলেন: (لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ) “মানুষ যতদিন দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।”৫৪৫
৪. পাকা খেজুরের মাধ্যমে ইফতার করা: যদি তা না পায় তাহলে শুকনো খেজুরের দ্বারা ইফতার করবে আর তা বেজোর হওয়া ভালো। যদি সেটাও না পায় তবে পানি দিয়ে ইফতার করবে। আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُفْطِرُ عَلَى رُطَبَاتٍ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّي، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ رُطَبَاتٌ، فَعَلَى تَمَرَاتٍ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ حَسَا حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ) “আল্লাহর রসূল (মাগরিবের) সলাতের পূর্বে কয়েকটি পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। পাকা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর দিয়ে, তাও না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন।”৫৪৬ যদি সে ইফতার করার মতো কোনো কিছুই না পায় তাহলে অন্তরে ইফতারের নিয়ত করবে এবং এটাই তার জন্য যথেষ্ট হবে।
৫. ইফতারের সময় ও রোজা অবস্থায় দুআ করা: নাবী বলেছেন: (ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالإِمَامُ العَادِلُ، وَالْمَظْلُومِ) "তিন ধরনের লোকের দুআ কখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. রোজাদার যতক্ষণ ইফতার না করে; ২. সুবিচারক শাসক; ৩. মযলুম।"৫৪৭
৬. বেশি বেশি সাদকা, কুরআন তিলাওয়াত করা, রোজাদারদের খাওয়ানো এবং অন্যান্য ভালো ভালো আমল করা: ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ ، وَكَانَ جِبْرِيلُ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ ، فَيُدَارِسُهُ القُرْآنَ ، فرسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ يَلْقَاهُ جبْرِيلُ أَجْوَدُ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ )
"আল্লাহর রসূল মানুষের মাঝে দানশীলতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিলেন। তবে রমাযান মাসে তিনি অধিক দানশীল হতেন যখন জিবরীল তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন। আর জিবরীল রমাযানের প্রতি রাতে তার সাথে দেখা করতেন। তারা পরস্পর পরস্পরকে কুরআন শুনাতেন। যখন জিবরীল তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি বাতাসের চাইতেও বেশি দানশীল হতেন।"৫৪৮
৭. রাতের সলাতে সচেষ্ট হওয়া: বিশেষ করে রমাযানের শেষ দশকে। আয়িশাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِنْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ)
"নাবী রমাযানের শেষ দশকে তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।"৫৪৯
নাবী বলেছেন: ( مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ) “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযানের রাত্রি জাগরণ করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।"৫৫০
৮. উমরাহ্ করা: নাবী বলেছেন: )عُمْرَةٌ فِي رَمَضَانَ، تَعْدِلُ حجَّةً( "রমাযান মাসের উমরাহ্ হাজ্জের সমপরিমাণ সওয়াব।”৫৫১
৯. কেউ গালি দিলে বলা إني صائم 'আমি রোজাদার': নাবী বলেছেন: وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ، فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
"তোমাদের কেউ যেন সওম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার। "৫৫২
টিকাঃ
৫৪৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯৫৭; সহীহ মুসলিম, হা, ২৪৪৪, ফুআ, ১০৯৮।
৫৪৬. সুনান আবু দাউদ, হা. ২৩৫৬, তিরমিযী, হা. ৬৯৬ এবং তিনি হাসান বলেছেন; ইমাম বাগবী তার শারহুস সুন্নাহতে হাসান বলেছেন, শারহুস সুন্নাহ ৬/২৬৬; আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুত তিরমিযী, হা. ৫৬০; আরনাউত শারহুস সুন্নাহর তা'লীকে এক শক্তিশালী সানাদ বলেছেন।
৫৪৭. তিরমিযী, হা. ৩৫৯৮ এবং তিনি হাসান বলেছেন; বায়হাক্বী ৩/৩৪৫; এবং অন্যান্যরা আনাস থেকে মারফু সূত্রে: ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ )لَا تُرَبُّ، دَعْوَةُ الْوَالِدِ، وَدَعْوَةُ الصَّائِمِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ "তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ১. পিতামাতার দুআ; ২. রোজাদারের দুআ; ৩. মুসাফিরের দুআ।" সুনানুল কুবরা, বায়হাক্বী, হা. ৬৩৯২। আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহাহ ১৭৯৭।
৫৪৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৬; সহীহ মুসলিম, হা. ২৩০৮।
৫৪৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২০২৪; সহীহ মুসলিম, হা. ২৬৭৫, ফুআ, ১১৭৩।
৫৫০. সহীহ মুসলিম, হা. ২৬৭৫, ফুআ, ৭৫৯।
৫৫১. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৭৮৬; সহীহ মুসলিম, হা. ২৯২৮, ফুআ. ১২৫৬।
৫৫২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হা. ২৫৯৩, ফুআ, ১১৫১; বুখারির শব্দে।
📄 রোজার জন্য মাকরূহ (অপছন্দনীয়) কাজসমূহ
রোজাদারের জন্য কিছু অপছন্দনীয় বিষয় রয়েছে, যেগুলো রোজাকে ত্রুটিযুক্ত করে এবং তার সওয়াব কমিয়ে দেয়। সেগুলো হলো-
১. কুলি করা ও নাকের মধ্যে পানি নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করা: কারণ এর ফলে পানি পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নাবী মুহাম্মাদ বলেছেন:
وَبَالِغ فِي الإِسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا “রোজা পালনকারী না হলে নাকের গভীরে পানি পৌঁছাও। ৫৫৩
২. যৌন উত্তেজনার সাথে চুম্বন করা: যে ব্যক্তি নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। তাই রোজাদারের জন্য স্ত্রী বা দাসীকে চুমু দেওয়া মাকরূহ। কেননা তা যৌন উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়। যার কারণে বীর্যপাত হয় কিংবা সহবাসে লিপ্ত হয়ে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি সে রোজা নষ্ট করা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আয়িশাহ আল্লাহর রসূল এর ক্ষেত্রে বলেছেন: )وَكَانَ أَمْلَكَكُمْ لِإِرْبِهِ( "তিনি তার প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রক ছিলেন। "৫৫৪
তেমনভাবে রোজাদার যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সকল বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে। যেমন স্ত্রী বা দাসীর দিকে বেশি বেশি তাকানো কিংবা তাদের সাথে সহবাসের চিন্তা করা। কারণ এগুলোর কারণে বীর্যপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা তাদের সাথে সহবাসে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. কফ গিলে ফেলা: কারণ এটা পেটে পৌঁছে যায় এবং এর দ্বারা শক্তি অর্জিত হয়। তাছাড়া কফ গিলে ফেলা এক প্রকার নোংরামি ও ক্ষতিকর কাজ।
৪. প্রয়োজন ছাড়াই কোনো খাবারের স্বাদ নেওয়া: যদি খাবারের স্বাদ দেখার প্রয়োজন মনে করে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। যেমন কোনো রাঁধুনী লবন দেখল। তবে এক্ষেত্রে তা গলায় যাতে না পৌঁছে, সে ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
টিকাঃ
৫৫৩. তিরমিযী, হা. ৭৮৮ এবং তিনি সহীহ বলেছেন; নাসাঈ ১/৬৬; জা, হা. ৪০৭; আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহুন নাসাঈ, হা. ৮৫।
৫৫৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯২৭; সহীহ মুসলিম, হা. ২৯২৮, ফুআ, ১১০৬।