📄 রোজাদারের রোজা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ
সেগুলো ঐ সকল বিষয় যেগুলো রোজাদারের রোজাকে নষ্ট ও ভঙ্গ করে দেয়। নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর কোনো একটির কারণে রোজাদারের রোজা ভেঙ্গে যাবে।
প্রথম: ইচ্ছাকৃত খাওয়া অথবা পান করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ... “প্রত্যুষে কালো সুতা হতে সাদা সুতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা খাবার খাও ও পান করো। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো।” [সুরা বাক্বারাহ: ১৮৭]
আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রোজাদারের জন্য সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানা-পিনা বৈধ নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি ভুলে পানাহার করবে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে। যখনই তার স্মরণে আসবে অথবা তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হবে, সে পানাহার বর্জন করবে। নাবী বলেন: ( مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ، فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ، فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ، فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ)
“সওম পালনকারী ভুলক্রমে যদি খাবার খায় বা পান করে ফেলে, তাহলে সে যেন তার সওম পুরা করে নেয়। কারণ আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন। ৫৩৮ আর নাকের ড্রপের মাধ্যমে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। আর যে জিনিসগুলো খাওয়া ও পান করার পরিপূরক; যেমন স্যালাইন, তা পেট পর্যন্ত পৌঁছালেই রোজা ভঙ্গ হবে, যদিও তা মুখ দিয়ে না পৌঁছে অর্থাৎ খাওয়া না হয়।
দ্বিতীয়: সহবাস: সহবাসের মাধ্যমে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই কোনো রোজাদার সঙ্গম করলেই রোজা ভেঙ্গে যাবে। তার উপর আবশ্যক তাওবা ও ইস্তিগফার করা এবং সহবাস করা রোজার দিনটির কাযা আদায় করা। আর সে এই কাযা আদায় করবে কাফফারার মাধ্যমে। সে একটি গোলাম আজাদ করবে। আর সক্ষম না হলে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখবে। আর সে এতেও সক্ষম না হলে ৬০ জন মিসকিনকে খাবার দিবে। আবু হুরায়রা এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,
بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلَكْتُ. قَالَ: مَا لَكَ؟ قَالَ: وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي وَأَنَا صَائِمٌ ، فَقَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : هَلْ تَجِدُ رَقَبَةٌ تُعْتِقُهَا؟ قَالَ: لا، قَالَ : هَلْ تَسْتَطِيعُ أَنْ تَصُومَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ، قَالَ : لا ، فَقَالَ: فَهَلْ تَجِدُ إِطْعَامَ سِتِّينَ مِسْكِينًا. قَالَ: لَا، قَالَ: فَمَكَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبَيْنَا نَحْنُ عَلَى ذَلِكَ أُتِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَقٍ فِيهَا تَمْرُ - وَالعَرَقُ المِكْتَلُ - قَالَ : أَيْنَ السَّائِلُ؟ فَقَالَ : أَنَا ، قَالَ : خُذْهَا ، فَتَصَدَّقُ بِهِ. فَقَالَ الرَّجُلُ : أَعَلَى أَفْقَرَ مِنِّي يَا رَسُولَ الله؟ فَوَاللَّهُ مَا بَيْنَ لَا بَيْهَا - يُرِيدُ الحَرَّتَيْنِ - أَهْلُ بَيْتٍ أَفْقَرُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ، ثُمَّ قَالَ : أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ.
“আমরা আল্লাহর রসূল-এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। আল্লাহর রসূল বললেন: তোমার কী হয়েছে? সে বলল, আমি রোজা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। আল্লাহর রসূল বললেন: কোনো ক্রীতদাস তুমি মুক্ত করতে পারবে কি? সে বলল, না। তিনি বললেন: তুমি কি একাধারে দুইমাস সওম পালন করতে পারবে? সে বলল, না। এরপর তিনি বললেন: ষাটজন মিসকিন খাওয়াতে পারবে কি? সে বলল, না। রাবী বলেন, তখন নাবী থেমে গেলেন, আমরাও এই অবস্থায় ছিলাম। এ সময় নাবী-এর কাছে এক 'আরাক পেশ করা হলো যাতে খেজুর ছিল। 'আরাক হলো ঝুড়ি। নাবী বললেন: প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল, আমি। তিনি বললেন: এগুলো নিয়ে সাদকা করে দাও। তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার চাইতেও বেশি অভাবগ্রস্তকে সাদকা করব? আল্লাহর শপথ, মদীনার উভয় প্রান্তের মধ্যে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রস্ত কেউ নেই। আল্লাহর রসূল হেসে ওঠলেন এবং তাঁর দাঁত (আনইয়াব) দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন: এগুলো তোমার পরিবারকে খাওয়াও।”৫৩৯
সহবাসের আওতাভুক্ত বিষয়: ইচ্ছাকৃত মনী বের করলে, সেটাও সহবাস এর আওতাভুক্ত হবে। যদি কোনো রোজাদার চুম্বন, স্পর্শকরণ কিংবা হস্তমৈথুন বা অন্য কোনো উপায়ে বীর্যপাত করে, তাহলে তার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ এগুলো কাম উত্তেজনার সাথে করা হয়ে থাকে, যা রোজা ভেঙ্গে দেয়। তার উপর কাফফারা ছাড়াই কাযা করা আবশ্যক। কারণ কাফফারা শুধুমাত্র সহবাসের সাথেই আবশ্যক এবং এব্যাপারে নির্দিষ্ট দলীল রয়েছে।
কিন্তু যদি কোনো ঘুমন্ত ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হয় বা অসুস্থতার কারণে কামভাব ছাড়াই বীর্যপাত হয়, তাহলে সিয়াম বতিল হবে না। কেননা এ ব্যাপারে বান্দার কোনো স্বাধীনতা নেই।
তৃতীয়: ইচ্ছাকৃত বমি করা: ইচ্ছাকৃত পেটে চাপ প্রয়োগ করে মুখ দিয়ে খাদ্য ও পানীয় বের করা। কিন্তু এমনিতেই যদি বমি হয় তাহলে তার রোজার মধ্যে কোনো প্রভাব পড়বে না। كَلَيْهِ قَضَاءُ، وَمَنْ اسْتَقَاءَ فَلْيَقْضِ : কেননা নাবী বলেছেন: مَنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ، فَلَيْسَ عَ
“যার (অনিচ্ছাকৃত) বমি হয়, তাকে কাযা করতে হবে না। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বমি করে, তাকে কাযা করতে হবে।” ৫৪০
চতুর্থ: শিঙা লাগানো: শিরার রক্ত ছাড়া চর্মের রক্ত রেব করা। তাই রোজাদার শিঙা লাগালে ر الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ) :রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। নাবী বলেছেন: أَفْطَ
"হিজামাকারী এবং যাকে হিজামা করানো হয়েছে, তাদের উভয়ের সওম ভঙ্গ হয়েছে।” ৫৪১
তেমনিভাবে যে শিঙা লাগায় তার রোজাও নষ্ট হয়ে যাবে। তবে যদি পৃথক যন্ত্রের সাহায্যে শিঙা লাগায় এবং তাতে রক্ত চোষার কোনো সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে না। আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞ।
হিজামার আওতাভুক্ত বিষয়: যদি শিরা কেটে বা সুস্থতার জন্য যে-কোনো মাধ্যমে রক্ত বের করা হয়, তাহলে তাও হিজামার অন্তর্ভুক্ত হবে।
কিন্তু যদি যখম বা কামড়ের কারণে কিংবা নাক দিয়ে রক্ত বের হয় তাহলে তা হিজামার আওতাভুক্ত হবে না।
মহিলাদের পঞ্চম: হায়েয ও নেফাসের রক্ত বের হওয়া; যখনই কোনো মহিলা হায়েয বা নেফাসের রক্ত দেখবে, সে রোজা ভেঙ্গে ফেলবে এবং তার উপর কাযা করা আবশ্যক। নাবী ক্ষেত্রে বলেছেন: )أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ(
"আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সলাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না?"৫৪২
ষষ্ঠ: রোজা ভঙ্গ করার নিয়ত করা: যে ইফতার করার সময়ের পূর্বেই রোজা ছেড়ে দেওয়ার নিয়ত করবে তার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে, যদিও সে খাবার না খায়। কেননা নিয়ত রোজার দুই রুকনের অন্যতম একটি রুকন। সুতরাং, রোজা ছেড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ ইচ্ছাকৃত নিয়ত ভঙ্গ করলে তার রোজা ভেঙ্গে যাবে।
সপ্তম: ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা: কারণ তা ইবাদতের জন্য অসঙ্গতিপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: لَينْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ ....
"যদি তুমি (আল্লাহর) অংশীদার স্থির করো, তাহলে তোমার কর্ম অবশ্যই নিষ্ফল হয়ে যাবে।” [সূরা যুমার: ৬৫]
টিকাঃ
৫৩৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯৩৩; সহীহ মুসলিম, হা. ফুয়াদ আব্দুল বাক্বী ১১৫৫।
৫৩৯. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯৩৬; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১১১১।
৫৪০. সুনান আবু দাউদ, হা. ২৩৭০; তিরমিযী, হা. ৭২০; ইবনু মাজাহ, হা. ১৬৭৬।
৫৪১. সুনান আবু দাউদ, হা. ২৩৬৭; ইবনু মাজাহ, হা. ১৯৮৩।
৫৪২. সহীহুল বুখারী, হা. ৩০৪।