📄 রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য
১. রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
"আবু হুরায়রা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরে রাত জেগে 'ইবাদত করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযানের সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে।”৫১৬
وَعَنْهُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ ، وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ.
"আবু হুরায়রা থেকেই বর্ণিত। নিশ্চয়ই নাবী বলেন: পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এক জুমুআহ থেকে অন্য জুমুআহ, এক রমাযান থেকে আরেক রমাযান এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের সকল গুনাহের জন্য কাফফারা স্বরূপ, যদি সে কাবীরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকে।"৫১৭
রমাযান মাসে সিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও রমাযানে সিয়ামের অনেক ফযীলত রয়েছে।
২. রমাযান মাসের সিয়াম শরীয়ত সম্মত হওয়ার হিকমাহ: আল্লাহ রমাযানের সিয়ামকে বহু হিকমাহ ও উপকারের কারণে শরীয়ত সম্মত করেছেন। তন্মধ্যে:
ক. নফসকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এবং তাকে খারাপ চরিত্র থেকে মুক্ত করা। সওম মানুষের শরীরের মধ্যকার শয়তানের চলার পথকে সংকীর্ণ করে দেয়।
খ. সওম দুনিয়া এবং তার লোভ-লালসা থেকে বিরত রাখে এবং পরকাল ও তার নেয়ামতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
গ. সওম মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায় এবং তাদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। কারণ রোজাদার ক্ষুধা ও পিপাসার স্বাদ আস্বাদন করে থাকে। এছাড়া আরও অনেক তাৎপর্য ও উপকারিতা রয়েছে।
টিকাঃ
৫১৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০১; সহীহ মুসলিম, হা. ৭৬০।
৫১৭. সহীহ মুসলিম, হা. ২৩৩।
📄 রমাযানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ
নিম্নের শর্তসমূহ বিদ্যমান থাকলে রমাযানের সিয়াম রাখা আবশ্যক:
১. ইসলাম গ্রহণ করা: সুতরাং কাফেরের উপর সিয়াম আবশ্যক নয় এবং তার পক্ষ থেকে সিয়াম বিশুদ্ধও হবে না। কেননা সিয়াম একটি ইবাদত। আর কোনো ইবাদত কাফেরের পক্ষ হতে বিশুদ্ধ হয় না। সুতরাং ঐ কাফের ইসলাম গ্রহণ করলে তার ছুটে যাওয়া রোজাগুলো তার উপর কাযা করা আবশ্যক নয়।
২. বালেগ হওয়া: সুতরাং যে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার সীমানায় পৌঁছেনি তার উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। নাবী বলেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةِ "তিন শ্রেণির ব্যক্তি থেকে কলম ওঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।"৫১৮ তাদের মধ্যে হতে এক শ্রেণি হচ্ছে বালক, যতক্ষণ না সে যুবক হয়। কিন্তু যদি কোনো বালক বালেগ হওয়ার পূর্বে রোজা রাখে তাহলে তার রোজাও বিশুদ্ধ হবে, যদি সে ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে। আর তার অভিভাবকের উপর তাকে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া আবশ্যক, যাতে সে এর প্রতি অভ্যস্ত হয়।
৩. জ্ঞানবান হওয়া: তাই পাগল ও নির্বোধের উপর রোজা আবশ্যক নয়। যেমন নাবী বলেছেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةِ "তিন শ্রেণির ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।"৫১৯ তাদের মধ্যে পাগলও রয়েছে, যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে পায়।
৪. সুস্থতা: সুতরাং যে ব্যক্তি এতটা অসুস্থ যে তার রোজা রাখার সক্ষমতা নেই, তার উপর রোজা আবশ্যক নয়। তবে যদি সে রোজা রাখে তাহলে তার রোজা বিশুদ্ধ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ.
"যে ব্যক্তি অসুস্থ অথবা মুসাফির, সে অপর কোনো দিন হতে গণনা করবে।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫] যদি তার অসুস্থতা দূর হয়ে যায় তাহলে যে সিয়ামগুলো ছুটেছে সেগুলো কাযা করা আবশ্যক।
৫. মুকীম হওয়া: সুতরাং মুসাফিরের উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ "যে অসুস্থ অথবা মুসাফির, তার জন্য অন্য কোনো দিন হতে গণনা করবে।" [সুরা বাক্বারাহ: ১৮৫] যদি মুসাফির রোজা রাখে, তাহলে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে। আর যে রোজাগুলো ছুটে যাবে, সেগুলো কাযা করা আবশ্যক।
৬. হায়েয (ঋতুস্রাব) ও নেফাস থেকে মুক্ত হওয়া: তাই যে হায়েয ও নেফাস অবস্থায় আছে এমন স্ত্রীলোকের উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। বরং তাদের উপরে রোজা রাখা হারাম। নাবী বলেছেন:
(أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلُّ وَلَمْ تَصُمْ، فَذَلِكَ نُقْصَانُ دِينِهَا .) "আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সলাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? এটাই হচ্ছে তাদের দ্বীনের কমতি।"৫২০
কিন্তু তাদের উপরে ছুটে যাওয়া রোজাগুলো কাযা করা আবশ্যক। যেমন আয়িশাহ বলেন,
كَانَ يُصِيبُنَا ذَلِكَ، فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ، وَلَا نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلَاةِ "আমাদের এরূপ হতো। তখন আমাদেরকে শুধু সওম কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো, সলাত কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো না।"৫২১
টিকাঃ
৫১৮. আহমাদ ৬/১০০; সুনান আবু দাউদ ৪/৫৫৮; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া হা. ২৯৭।
৫১৯. আহমাদ ৬/১০০; সুনান আবু দাউদ ৪/৫৫৮; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া হা. ২৯৭।
৫২০. সহীহুল বুখারী, হা. ৩০৪।
৫২১. সহীহ মুসলিম, হা. ৬৫০, ফুআ. ২৩৫।
📄 রমাযান মাসের শুরু ও শেষ যেভাবে সাব্যস্ত হবে
রমাযান মাসের সূচনা সাব্যস্ত হবে নিজে বা অন্যের মাধ্যমে কিংবা কোনো সংবাদের মাধ্যমে নূতন চাঁদ দেখার দ্বারা। যদি একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম নূতন চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তার এই সাক্ষ্যের মাধ্যমে রমাযান মাসের সূচনা সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
"অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন সিয়াম পালন করে।” [সুরা বাক্বারাহ: ১৮৫]
নাবী বলেছেন: إِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَصُومُوا "যখন তোমরা চাঁদ দেখবে, তখন সিয়াম রাখবে।”৫২২
ইবনু উমার এর বর্ণিত হাদীস: أخبرت النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ برؤية رمضان فَصَامَهُ، وَأَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِهِ
"আমি নাবী কে রমাযানের চাঁদ দেখার সংবাদ দিলাম। অতঃপর তিনি নিজে সওম রাখলেন এবং মানুষদের সওম রাখার নির্দেশ দিলেন। ”৫২৩
যদি নূতন চাঁদ দেখা না যায় বা কোনো ন্যায়পরায়ণ মুসলিম চাঁদ দেখার সাক্ষ্য না দেয়, তাহলে শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করা আবশ্যক। এ দুটি বিষয় ছাড়া মাসের মধ্যে প্রবেশ সাব্যস্ত হবে না। ১. নূতন চাঁদ দেখা বা ২. শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করা। নাবী বলেছেন: صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ، فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلَاثِينَ
"তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম শুরু করবে এবং চাঁদ দেখে সিয়াম ভাঙ্গবে। আকাশ যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে শাবানের গণনা ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।"৫২৫
শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে রমাযান মাসের সমাপ্তি সাব্যস্ত হবে। যদি দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম নূতন চাঁদ না দেখার সাক্ষ্য দেয়, তাহলে রমাযান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করা আবশ্যক।
টিকাঃ
৫২২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০০; সহীহ মুসলিম, হা. ১০৮০।
৫২৩. সুনান আবু দাউদ, হা. ২৩৪২; হাকিম তার মুসতাদরাকে সহীহ বলেছেন, ১/৪২৩।
৫২৪. কিছু বর্ণনায় غُمَّ عليكم আর কিছু বর্ণনায় غُبِّيَ عليكم রয়েছে। অর্থ গোপন হয়ে যাওয়, প্রকাশিত না হওয়া।
৫২৫. মুত্তাফাকুন আলাইহিঃ সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০৯; সহীহ মুসলিম, হা. ১০৮১।
📄 সওমের নিয়তের সময় এবং নিয়তের হুকুম
রোজাদারের উপর সিয়ামের নিয়ত করা আবশ্যক। এটি তার অন্যতম একটি রুকন। নাবী বলেছেন: إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "প্রত্যেক কাজ (প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।”৫২৬
ওয়াজিব (ফরয) সিয়ামের ক্ষেত্রে সে রাতেই নিয়ত করবে, যদিও ফজরের এক মিনিট পূর্বে হয়। যেমন: রমাযানের সিয়াম, কাফফারার রোজা, মানতের রোজা ইত্যাদি। নাবী বলেছেন:
مَنْ لَمْ يُبَيِّتِ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ، فَلَا صِيَامَ لَهُ
"যে ব্যক্তি রাত থাকতে ফরয সিয়ামের নিয়ত করল না, তার সিয়াম হবে না।”৫২৭
যে ব্যক্তি দিনের বেলায় রোজার নিয়ত করবে এবং যদি সে রাত্রে কোনো কিছু না খায়, তাহলে নফল রোজা ব্যতীত ফরয রোজা তার পক্ষ হতে যথেষ্ট হবে না। আর দিনের বেলায় নফল রোজার নিয়ত করলে রোজাটি বৈধ হবে, যদিও সে রাত্রে কোনো কিছু না খায় বা পান না করে। আয়িশাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
دَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ فَقَالَ : هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ؟ فَقُلْنَا : لَا ، قَالَ: «فَإِنِّي إِذَنْ صَائِمٌ»
"নাবী একদিন ঘরে আসলেন। অতঃপর তিনি বললেন: তোমাদের কাছে কি খাওয়ার মতো কিছু আছে? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন: তাহলে আমি সওম রাখলাম। ”৫২৮
আর ফরয রোজার বেলায় দিনে নিয়ত করলে তা ধর্তব্য হবে না, বরং রাতেই নিয়ত করা আবশ্যক। রমাযান মাসের শুরুতে পুরো মাসের জন্য একবার নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। তবে প্রত্যেক দিন নিয়ত করা মুস্তাহাব।
টিকাঃ
৫২৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১; সহীহ মুসলিম, হা. ১৯০৭।
৫২৭. তিরমিযী, হা, ৭৩০; নাসাঈ ২৩৩১; ইবনু মাজাহ, হা. ১৭০০; নাসাঈর শব্দে। ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, তিরমিযী, হা. ৫৮৩।
৫২৮. সহীহ মুসলিম, হা. ১১৫৪।