📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 রমাযানের সিয়ামের হুকুম ও তার দলীল

📄 রমাযানের সিয়ামের হুকুম ও তার দলীল


আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লা রমাযান মাসের সিয়াম ফরয করেছেন এবং তা ইসলামের পঞ্চ-স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।” [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৩]
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ "রমাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন সিয়াম পালন করে।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامُ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجَّ البَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا.
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত সত্য কোনো ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। ২. সলাত কায়েম করা। ৩. যাকাত দেওয়া। ৪. রমাযানের সিয়াম পালন করা। ৫. সম্ভব হলে হাজ্জ পালন করা।"৫১৪
أَنَّ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ ثَائِرُ الرَّأْسِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهُ، أَخْبِرْنِي مَاذَا فَرَضَ اللهُ عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ؟ قَالَ: «الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا فَقَالَ : أَخْبِرْنِي مَاذَا فَرَضَ اللَّهُ عَلَيَّ مِنَ الصِّيَامِ؟ قَالَ: «صِيَامُ رَمَضَانَ إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا»
"তালহা ইবনে ওবাইদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। এলোমেলো চুল বিশিষ্ট বেদুঈন একজন ব্যক্তি নাবী এর কাছে আসল। অতঃপর বলল: হে আল্লাহর রসূল! আমাকে সংবাদ দিন যে, কোন সিয়াম আল্লাহ আমার উপর ফরয করেছেন? তিনি বললেন: রমাযান মাসের সিয়াম। সে বলল: আমার উপরে অন্য কোনো সিয়াম কি ফরয করা হয়েছে? তিনি বললেন: না, তুমি নফল হিসেবে অন্যান্য রোজা রাখতে পারো।"৫১৫
এ ব্যাপারে ইজমাও সাব্যস্ত হয়েছে যে, রমাযানের সিয়াম ফরয। এটি ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞাতব্য রুকনসমূহের মধ্যকার একটি। আর এর অস্বীকারকারী কাফের ও মুরতাদ।
সুতরাং রমাযানের সিয়াম ফরয কুরআন, হাদীস ও ইজমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো। আর যে ব্যক্তি তা অস্বীকারকার করবে, সে মুসলমানদের ঐকমত্যে কাফের।

টিকাঃ
৫১৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬ ইবনু উমার এর হাদীস।
৫১৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৪৬; সহীহ মুসলিম, হা. ১১; অর্থগত বর্ণনা।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সিয়ামের প্রকারভেদ

📄 সিয়ামের প্রকারভেদ


সিয়াম প্রথমত দুই প্রকার: ওয়াজিব ও নফল।
ওয়াজিব সিয়াম তিন প্রকার:
১. রমাযানের সিয়াম; ২. কাফফারার সিয়াম; ৩. নযর বা মানতের সিয়াম।
এখানে রমাযানের সিয়াম ও নফল সিয়াম সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। আর অন্যান্য সিয়ামের আলোচনা যথাস্থানে আসবে, ইনশা-আল্লাহ।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য

📄 রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য


১. রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
"আবু হুরায়রা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরে রাত জেগে 'ইবাদত করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযানের সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে।”৫১৬
وَعَنْهُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ ، وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ.
"আবু হুরায়রা থেকেই বর্ণিত। নিশ্চয়ই নাবী বলেন: পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এক জুমুআহ থেকে অন্য জুমুআহ, এক রমাযান থেকে আরেক রমাযান এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের সকল গুনাহের জন্য কাফফারা স্বরূপ, যদি সে কাবীরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকে।"৫১৭
রমাযান মাসে সিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও রমাযানে সিয়ামের অনেক ফযীলত রয়েছে।
২. রমাযান মাসের সিয়াম শরীয়ত সম্মত হওয়ার হিকমাহ: আল্লাহ রমাযানের সিয়ামকে বহু হিকমাহ ও উপকারের কারণে শরীয়ত সম্মত করেছেন। তন্মধ্যে:
ক. নফসকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এবং তাকে খারাপ চরিত্র থেকে মুক্ত করা। সওম মানুষের শরীরের মধ্যকার শয়তানের চলার পথকে সংকীর্ণ করে দেয়।
খ. সওম দুনিয়া এবং তার লোভ-লালসা থেকে বিরত রাখে এবং পরকাল ও তার নেয়ামতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
গ. সওম মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায় এবং তাদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। কারণ রোজাদার ক্ষুধা ও পিপাসার স্বাদ আস্বাদন করে থাকে। এছাড়া আরও অনেক তাৎপর্য ও উপকারিতা রয়েছে।

টিকাঃ
৫১৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০১; সহীহ মুসলিম, হা. ৭৬০।
৫১৭. সহীহ মুসলিম, হা. ২৩৩।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 রমাযানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ

📄 রমাযানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ


নিম্নের শর্তসমূহ বিদ্যমান থাকলে রমাযানের সিয়াম রাখা আবশ্যক:
১. ইসলাম গ্রহণ করা: সুতরাং কাফেরের উপর সিয়াম আবশ্যক নয় এবং তার পক্ষ থেকে সিয়াম বিশুদ্ধও হবে না। কেননা সিয়াম একটি ইবাদত। আর কোনো ইবাদত কাফেরের পক্ষ হতে বিশুদ্ধ হয় না। সুতরাং ঐ কাফের ইসলাম গ্রহণ করলে তার ছুটে যাওয়া রোজাগুলো তার উপর কাযা করা আবশ্যক নয়।
২. বালেগ হওয়া: সুতরাং যে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার সীমানায় পৌঁছেনি তার উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। নাবী বলেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةِ "তিন শ্রেণির ব্যক্তি থেকে কলম ওঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।"৫১৮ তাদের মধ্যে হতে এক শ্রেণি হচ্ছে বালক, যতক্ষণ না সে যুবক হয়। কিন্তু যদি কোনো বালক বালেগ হওয়ার পূর্বে রোজা রাখে তাহলে তার রোজাও বিশুদ্ধ হবে, যদি সে ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে। আর তার অভিভাবকের উপর তাকে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া আবশ্যক, যাতে সে এর প্রতি অভ্যস্ত হয়।
৩. জ্ঞানবান হওয়া: তাই পাগল ও নির্বোধের উপর রোজা আবশ্যক নয়। যেমন নাবী বলেছেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةِ "তিন শ্রেণির ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।"৫১৯ তাদের মধ্যে পাগলও রয়েছে, যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে পায়।
৪. সুস্থতা: সুতরাং যে ব্যক্তি এতটা অসুস্থ যে তার রোজা রাখার সক্ষমতা নেই, তার উপর রোজা আবশ্যক নয়। তবে যদি সে রোজা রাখে তাহলে তার রোজা বিশুদ্ধ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ.
"যে ব্যক্তি অসুস্থ অথবা মুসাফির, সে অপর কোনো দিন হতে গণনা করবে।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫] যদি তার অসুস্থতা দূর হয়ে যায় তাহলে যে সিয়ামগুলো ছুটেছে সেগুলো কাযা করা আবশ্যক।
৫. মুকীম হওয়া: সুতরাং মুসাফিরের উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ "যে অসুস্থ অথবা মুসাফির, তার জন্য অন্য কোনো দিন হতে গণনা করবে।" [সুরা বাক্বারাহ: ১৮৫] যদি মুসাফির রোজা রাখে, তাহলে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে। আর যে রোজাগুলো ছুটে যাবে, সেগুলো কাযা করা আবশ্যক।
৬. হায়েয (ঋতুস্রাব) ও নেফাস থেকে মুক্ত হওয়া: তাই যে হায়েয ও নেফাস অবস্থায় আছে এমন স্ত্রীলোকের উপর সিয়াম আবশ্যক নয়। বরং তাদের উপরে রোজা রাখা হারাম। নাবী বলেছেন:
(أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلُّ وَلَمْ تَصُمْ، فَذَلِكَ نُقْصَانُ دِينِهَا .) "আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সলাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? এটাই হচ্ছে তাদের দ্বীনের কমতি।"৫২০
কিন্তু তাদের উপরে ছুটে যাওয়া রোজাগুলো কাযা করা আবশ্যক। যেমন আয়িশাহ বলেন,
كَانَ يُصِيبُنَا ذَلِكَ، فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ، وَلَا نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلَاةِ "আমাদের এরূপ হতো। তখন আমাদেরকে শুধু সওম কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো, সলাত কাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো না।"৫২১

টিকাঃ
৫১৮. আহমাদ ৬/১০০; সুনান আবু দাউদ ৪/৫৫৮; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া হা. ২৯৭।
৫১৯. আহমাদ ৬/১০০; সুনান আবু দাউদ ৪/৫৫৮; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া হা. ২৯৭।
৫২০. সহীহুল বুখারী, হা. ৩০৪।
৫২১. সহীহ মুসলিম, হা. ৬৫০, ফুআ. ২৩৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00