📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সিয়ামের পরিচয় ও তার রুকুনসমূহের বর্ণনা

📄 সিয়ামের পরিচয় ও তার রুকুনসমূহের বর্ণনা


১. সিয়ামের পরিচয়:
الصيام في اللغة: الإِمْسَاكُ عَنِ الشيء শাব্দিক অর্থ: কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা।
وفي الشرع : الإمساك عن الأكل والشرب، وسائر المفطرات مع النية، من طلوع الفجر الصادق إلى غروب الشمس. পরিভাষায়: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া এবং রোজাভঙ্গকারী সমস্ত বিষয় থেকে নিয়তের সাথে বিরত থাকাকে সিয়াম বলে।
২. সিয়ামের রুকন: পারিভাষিক অর্থ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, সিয়ামের দুটি মূল রুকন রয়েছে।
প্রথম: সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী জিনিসমূহ থেকে বিরত থাকা। এ রুকনের দলীল: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
"অতএব তোমরা (রমাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান করো এবং প্রত্যুষে কালো সুতা হতে সাদা সুতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান করো।” [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৭]
الخيط الأبيض দ্বারা উদ্দেশ্য: بياض النهار দিনের আলো( আর الخيط الأسود দ্বারা উদ্দেশ্য: سواد الليل )রাতের অন্ধকার(
দ্বিতীয়: নিয়ত করা: রোজাদার রোজা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতের নিয়ত করবে। ইবাদতের নিয়তের মাধ্যমে উদ্দিষ্ট আমল অন্যান্য আমলসমূহ থেকে পৃথক হয়ে যাবে। আর নিয়তের মাধ্যমেই একটি ইবাদত অন্য ইবাদত থেকে স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। তাই রোজাদার এ নিয়তের দ্বারা রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করবে। চাই তা রমাযানের হোক বা অন্য রোজা। এই রুকনের দলীল: আল্লাহর রসূল বলেন: إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى “প্রত্যেক কাজ নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।”৫১৩

টিকাঃ
৫১৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১; সহীহ মুসলিম, হা. ১৯০৭

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 রমাযানের সিয়ামের হুকুম ও তার দলীল

📄 রমাযানের সিয়ামের হুকুম ও তার দলীল


আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লা রমাযান মাসের সিয়াম ফরয করেছেন এবং তা ইসলামের পঞ্চ-স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।” [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৩]
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ "রমাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন সিয়াম পালন করে।" [সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامُ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجَّ البَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا.
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত সত্য কোনো ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। ২. সলাত কায়েম করা। ৩. যাকাত দেওয়া। ৪. রমাযানের সিয়াম পালন করা। ৫. সম্ভব হলে হাজ্জ পালন করা।"৫১৪
أَنَّ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ ثَائِرُ الرَّأْسِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهُ، أَخْبِرْنِي مَاذَا فَرَضَ اللهُ عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ؟ قَالَ: «الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا فَقَالَ : أَخْبِرْنِي مَاذَا فَرَضَ اللَّهُ عَلَيَّ مِنَ الصِّيَامِ؟ قَالَ: «صِيَامُ رَمَضَانَ إِلَّا أَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا»
"তালহা ইবনে ওবাইদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। এলোমেলো চুল বিশিষ্ট বেদুঈন একজন ব্যক্তি নাবী এর কাছে আসল। অতঃপর বলল: হে আল্লাহর রসূল! আমাকে সংবাদ দিন যে, কোন সিয়াম আল্লাহ আমার উপর ফরয করেছেন? তিনি বললেন: রমাযান মাসের সিয়াম। সে বলল: আমার উপরে অন্য কোনো সিয়াম কি ফরয করা হয়েছে? তিনি বললেন: না, তুমি নফল হিসেবে অন্যান্য রোজা রাখতে পারো।"৫১৫
এ ব্যাপারে ইজমাও সাব্যস্ত হয়েছে যে, রমাযানের সিয়াম ফরয। এটি ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞাতব্য রুকনসমূহের মধ্যকার একটি। আর এর অস্বীকারকারী কাফের ও মুরতাদ।
সুতরাং রমাযানের সিয়াম ফরয কুরআন, হাদীস ও ইজমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো। আর যে ব্যক্তি তা অস্বীকারকার করবে, সে মুসলমানদের ঐকমত্যে কাফের।

টিকাঃ
৫১৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৬ ইবনু উমার এর হাদীস।
৫১৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ৪৬; সহীহ মুসলিম, হা. ১১; অর্থগত বর্ণনা।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সিয়ামের প্রকারভেদ

📄 সিয়ামের প্রকারভেদ


সিয়াম প্রথমত দুই প্রকার: ওয়াজিব ও নফল।
ওয়াজিব সিয়াম তিন প্রকার:
১. রমাযানের সিয়াম; ২. কাফফারার সিয়াম; ৩. নযর বা মানতের সিয়াম।
এখানে রমাযানের সিয়াম ও নফল সিয়াম সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। আর অন্যান্য সিয়ামের আলোচনা যথাস্থানে আসবে, ইনশা-আল্লাহ।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য

📄 রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত এবং তা শরীয়ত সম্মত হওয়ার তাৎপর্য


১. রমাযান মাসের সিয়ামের ফযীলত: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
"আবু হুরায়রা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরে রাত জেগে 'ইবাদত করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযানের সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে।”৫১৬
وَعَنْهُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ ، وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ.
"আবু হুরায়রা থেকেই বর্ণিত। নিশ্চয়ই নাবী বলেন: পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এক জুমুআহ থেকে অন্য জুমুআহ, এক রমাযান থেকে আরেক রমাযান এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের সকল গুনাহের জন্য কাফফারা স্বরূপ, যদি সে কাবীরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকে।"৫১৭
রমাযান মাসে সিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও রমাযানে সিয়ামের অনেক ফযীলত রয়েছে।
২. রমাযান মাসের সিয়াম শরীয়ত সম্মত হওয়ার হিকমাহ: আল্লাহ রমাযানের সিয়ামকে বহু হিকমাহ ও উপকারের কারণে শরীয়ত সম্মত করেছেন। তন্মধ্যে:
ক. নফসকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা এবং তাকে খারাপ চরিত্র থেকে মুক্ত করা। সওম মানুষের শরীরের মধ্যকার শয়তানের চলার পথকে সংকীর্ণ করে দেয়।
খ. সওম দুনিয়া এবং তার লোভ-লালসা থেকে বিরত রাখে এবং পরকাল ও তার নেয়ামতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
গ. সওম মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায় এবং তাদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। কারণ রোজাদার ক্ষুধা ও পিপাসার স্বাদ আস্বাদন করে থাকে। এছাড়া আরও অনেক তাৎপর্য ও উপকারিতা রয়েছে।

টিকাঃ
৫১৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৯০১; সহীহ মুসলিম, হা. ৭৬০।
৫১৭. সহীহ মুসলিম, হা. ২৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00