📄 পরিমাণ
স্বর্ণ ও রৌপ্যের ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ উশরের রুবু' বা আড়াই শতাংশ ওয়াজিব। অর্থাৎ প্রত্যেক বিশ দিনার (স্বর্ণে) অর্ধ দিনার। এরপর যা বাড়বে, তাতে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী যাকাত দিতে হবে। কম হোক বা বেশি হোক। আর প্রত্যেক দুইশত দিরহামে (রৌপ্যে) পাঁচ দিরহাম। এর বেশি হলে, হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে। সদাকার অধ্যায়ে নাবী এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
وفي الرقة كل مائتي درهم رُبْعُ الْعُشْرِ "রূপার ক্ষেত্রে দুইশত দিরহামে এক দশমাংশ আদায় করতে হবে।"৪৭৬
আরেকটি হাদীস নিম্নরূপ:
وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَيْءٌ - يَعْنِي - فِي الذَّهَبِ حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ، فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارًا "আপনার উপর কিছুই নেই- অর্থাৎ স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দিনারের কম হলে কোনো যাকাত নেই। যদি আপনার নিকট বিশ দিনার থাকে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে অর্ধ রত্তি (দিনার) যাকাত দিতে হবে।"৪৭৭
নাবী থেকে এরূপ প্রমাণিত হয়েছে যে,
كَانَ يَأْخُذُ مِنْ كُلِّ عِشْرِينَ دِينَارًا نِصْفَ دِينَارٍ "তিনি প্রত্যেক বিশ রত্তিতে অর্ধ রত্তি যাকাত নিতেন। ৪৭৮
টিকাঃ
৪৭৬. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৫৪ আনাস এর হাদীস।
৪৭৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৫৭৩ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন আলী থেকে হাসান অথবা সহীহ সানাদে; ইমাম নাববী এমনটিই বলেছেন। [বইতে শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دِیرًا শব্দে রয়েছে।]
৪৭৮. ইবনু মাজাহ, হা. ১৭৯১; দারাকুলী, হা. ১৯৯ সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৩/২৮৯। [বইতে مثقالاً শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دينار শব্দে রয়েছে।
📄 যাকাতের শর্তসমূহ
স্বর্ণ ও রৌপ্যে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো প্রযোজ্য:
১. নিসাব পরিমাণ হওয়া। অর্থাৎ স্বর্ণ হলে বিশ রত্তি পরিমাণ হতে হবে। আলী হাদীস এর দলীল। তিনি বলেন,
وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَيْءٌ - يَعْنِي - فِي الذَّهَبِ حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ، فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارًا
"আপনার উপর কিছুই নেই- অর্থাৎ স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দিনারের কম হলে কোনো যাকাত নেই। যদি আপনার নিকট বিশ দিনার থাকে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে অর্ধ রত্তি (দিনার) যাকাত দিতে হবে।"৪৭৯
এটা মোটামুটি ৮৫ গ্রামের সমান। আর রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে দুইশত দিরহাম সমপরিমাণ। নাবী বলেছেন:
لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ
"পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো যাকাত নেই। ৪৮০
এক উকিয়া সমান চল্লিশ দিরহাম। তাহলে পাঁচ উকিয়া সমান দুইশত দিরহাম। নাবী বলেছেন:
وَفِي الرِّقَةِ رُبْعُ العُشْرِ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ إِلَّا تِسْعِينَ وَمِائَةٌ، فَلَيْسَ فِيهَا شَيْءٌ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبُّهَا
"রিক্কা বা রূপার ক্ষেত্রে দুইশত দিরহামে এক দশমাংশ আদায় করতে হবে। এক্ষণে যদি একশত নব্বই দিরহামও হয়, তথাপি তাতেও কোনো যাকাত নেই। তবে মালিক যদি স্বেচ্ছায় কিছু দেয় (তাহলে তা নিতে পারো)। "৪৮১
আলেমগণ সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে পাঁচ উকিয়ার সমপরিমাণ। আর স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে বিশ রত্তি বা দিনার সমপরিমাণ। ৪৮২
২. বাকি সাধারণ শর্তাবলি পূর্বে উল্লিখিত 'কাদের উপর যাকাত ওয়াজিব' এর অধ্যায়ের মতোই। তা হলো: মুসলিম হওয়া, স্বাধীন হওয়া, পূর্ণ মালিক হওয়া ও এক বছর অতিবাহিত হওয়া। এর আলোচনা পূর্বে চলে গেছে।
টিকাঃ
৪৭৯. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৫৭৩ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন আলী থেকে হাসান অথবা সহীহ সানাদে; ইমাম নাববী এমনটিই বলেছেন। [বইতে لفظ শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دينارا শব্দে রয়েছে।
৪৮০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৯৭৯।
৪৮১. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৫৪।
৪৮২. শারহু সহীহ মুসলিম ৭/৪৮।
📄 স্বর্ণ-রৌপ্য একটি আরেকটির সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা
বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, স্বর্ণ-রৌপ্য নিসাব পরিমাণ হলে একটা আরেকটার সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে না। কেননা দুইটা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। তাই এরূপ ক্ষেত্রে একটা আরেকটার সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে না। যেমন উট-গরু এবং যব-গম। যদিও উভয়টিতে উদ্দেশ্য একই হয়; অর্থাৎ উট ও গরুতে সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়া এবং যব ও গমে খাদ্যসামগ্রী হওয়া উদ্দেশ্য। নাবী এর বাণী- لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ “পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো যাকাত নেই।”৪৮৩ একটাকে আরেকটার সাথে মিলানোর কথা বললে, নিসাব পূর্ণ করতে গিয়ে পাঁচ উকিয়ার কম রৌপ্যতে যাকাত দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে, যখন নিসাব পূর্ণ করার মতো স্বর্ণ থাকবে। আর হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তার কাছে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ পূর্ণ পাঁচ উকিয়া হয় কিনা। এর উপর ভিত্তি করে, যদি কারো কাছে দশ দিনার এবংএকশত দিরহাম থাকে, তাহলে তার উপর কোনো যাকাত নেই। কেননা স্বর্ণ আলাদা যাকাত দিতে হবে এবং রৌপ্য আলাদা যাকাত দিতে হবে।
টিকাঃ
৪৮৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৯৭৯।
📄 গহনার যাকাত
বিদ্বানদের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো ইখতিলাফ নেই যে, সংরক্ষণ এবং ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকৃত গহনায় যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। হারামকৃত গহনার ক্ষেত্রে একই হুকুম। যেমন কোনো পুরুষ যদি স্বর্ণের আংটি বানায় কিংবা কোনো মহিলা যদি প্রাণির আকৃতিতে গহনা বানায় অথবা তাতে প্রাণির ছবি থাকে। বৈধ পন্থায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বা ধার দেওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত গহনার ক্ষেত্রে বিদ্বানদের বিশুদ্ধ মত হলো- এতে যাকাত দেওয়া ওয়াজিব। এর কারণ হলো:
১. স্বর্ণ-রৌপ্য যাকাত ওয়াজিবের ক্ষেত্রে বর্ণিত হাদীসগুলো আম। আর এই আম হাদীসগুলো গহনাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
২. হাদীস বিশারদগণ আমর বিন শুয়াইব থেকে, তিনি তার পিতা, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন:
أَنَّ امْرَأَةً أَتَتْ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهَا ابْنَةٌ لَهَا، وَفِي يَدِ ابْنَتِهَا مَسَكَتَانِ غَلِيظَتَانِ مِنْ ذَهَبٍ، فَقَالَ لَهَا: أَتُعْطِينَ زَكَاةَ هَذَا؟ قَالَتْ: لَا ، قَالَ : أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ الله بِهِمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ؟ قَالَ: فَخَلَعَتْهُمَا، فَأَلْقَتْهُمَا إِلَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،
"একজন মহিলা আল্লাহর রসূল এর কাছে আসল। সঙ্গে তার একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে পরিহিত স্বর্ণের দুইটি মোটা বালা। তখন তিনি বললেন: তুমি কি এর যাকাত আদায় করো? সে বলল, না। তিনি বললেন: তুমি কি এতে সন্তুষ্ট হবে যে, আল্লাহ তা'আলা এর বিনমিয়ে তোমাকে আগুনের বালা পরিয়ে দিবেন? সাথে সাথে মহিলাটি বালা দুটি খুলে নাবী এর কাছে ফেলে দিল।”৪৮৪
এই হাদীসটি এই বিষয়ের দলীল। এছাড়াও এর শাহেদ (সমর্থক হাদীস) সহীহ ও অন্যান্য হাদীস রয়েছে।
৩. এই মতটি অধিক নিরাপদ এবং দায়মুক্ত থাকার জন্য অধিক উপযোগী। নাবী বলেছেন, "সন্দেহপূর্ণ বিষয় ছেড়ে সন্দেমুক্ত বিষয়ের দিকে ধাবিত হও।”
টিকাঃ
৪৮৪. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৫৬৩; নাসাঈ, হা. ২৪৭৯; বায়হাক্বি ৪/১৪০; ইবনু কত্তান সহীহ সানাদে তার নাসবুর রায়াহ গ্রন্থে ২/৩৭০ বর্ণনা করেন; শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন, সহীহুত তিরমিযী ৫১৮।