📄 স্বর্ণ-রৌপ্যের যাকাতের হুকুম ও এর দলীল
স্বর্ণ ও রুপার যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَالَّذِينَ يَكْذِرُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ "যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।"[সুরা তাওবাহ : ৩৪]
যারা এই ওয়াজিব পরিত্যাগ করবে, তাদেরকে এই শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। নাবী বলেছেন: مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، صُفْحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ، فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنَّبُهُ وَجَبِيتُهُ وَظَهْرُهُ، كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ، فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، حَتَّى يُقْضَى اللَّهُ بَيْنَ الْعِبَادِ.
“সোনা-রূপার মালিকদের মধ্যে যারা এর হক (যাকাত) আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন তার ঐ সোনা-রূপা দিয়ে তারজন্য আগুনের অনেক পাত তৈরি করা হবে। অতঃপর তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। তারপর তা দিয়ে কপাল, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই ঠাণ্ডা হয়ে আসবে পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। এরূপ করা হবে এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। "৪৭৫
বিদ্বানদের এ মর্মে ইজমা রয়েছে, দুইশত দিরহামে পাঁচ দিরহাম যাকাত দিতে হবে। আর স্বর্ণ যদি বিশ মিসকাল পরিমাণ হয় এবং তার মূল্য যদি দুইশত দিরহাম হয় তবে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে।
টিকাঃ
৪৭৫. সহীহ মুসলিম, হা. ২১৮০, ফুআ. ৯৮৭ আবু হুরায়রা এর হাদীস।
📄 পরিমাণ
স্বর্ণ ও রৌপ্যের ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ উশরের রুবু' বা আড়াই শতাংশ ওয়াজিব। অর্থাৎ প্রত্যেক বিশ দিনার (স্বর্ণে) অর্ধ দিনার। এরপর যা বাড়বে, তাতে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী যাকাত দিতে হবে। কম হোক বা বেশি হোক। আর প্রত্যেক দুইশত দিরহামে (রৌপ্যে) পাঁচ দিরহাম। এর বেশি হলে, হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে। সদাকার অধ্যায়ে নাবী এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
وفي الرقة كل مائتي درهم رُبْعُ الْعُشْرِ "রূপার ক্ষেত্রে দুইশত দিরহামে এক দশমাংশ আদায় করতে হবে।"৪৭৬
আরেকটি হাদীস নিম্নরূপ:
وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَيْءٌ - يَعْنِي - فِي الذَّهَبِ حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ، فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارًا "আপনার উপর কিছুই নেই- অর্থাৎ স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দিনারের কম হলে কোনো যাকাত নেই। যদি আপনার নিকট বিশ দিনার থাকে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে অর্ধ রত্তি (দিনার) যাকাত দিতে হবে।"৪৭৭
নাবী থেকে এরূপ প্রমাণিত হয়েছে যে,
كَانَ يَأْخُذُ مِنْ كُلِّ عِشْرِينَ دِينَارًا نِصْفَ دِينَارٍ "তিনি প্রত্যেক বিশ রত্তিতে অর্ধ রত্তি যাকাত নিতেন। ৪৭৮
টিকাঃ
৪৭৬. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৫৪ আনাস এর হাদীস।
৪৭৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৫৭৩ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন আলী থেকে হাসান অথবা সহীহ সানাদে; ইমাম নাববী এমনটিই বলেছেন। [বইতে শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دِیرًا শব্দে রয়েছে।]
৪৭৮. ইবনু মাজাহ, হা. ১৭৯১; দারাকুলী, হা. ১৯৯ সহীহ। দেখুন, ইরওয়াউল গালীল ৩/২৮৯। [বইতে مثقالاً শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دينار শব্দে রয়েছে।
📄 যাকাতের শর্তসমূহ
স্বর্ণ ও রৌপ্যে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো প্রযোজ্য:
১. নিসাব পরিমাণ হওয়া। অর্থাৎ স্বর্ণ হলে বিশ রত্তি পরিমাণ হতে হবে। আলী হাদীস এর দলীল। তিনি বলেন,
وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَيْءٌ - يَعْنِي - فِي الذَّهَبِ حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا، وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ، فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارًا
"আপনার উপর কিছুই নেই- অর্থাৎ স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দিনারের কম হলে কোনো যাকাত নেই। যদি আপনার নিকট বিশ দিনার থাকে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে অর্ধ রত্তি (দিনার) যাকাত দিতে হবে।"৪৭৯
এটা মোটামুটি ৮৫ গ্রামের সমান। আর রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে দুইশত দিরহাম সমপরিমাণ। নাবী বলেছেন:
لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ
"পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো যাকাত নেই। ৪৮০
এক উকিয়া সমান চল্লিশ দিরহাম। তাহলে পাঁচ উকিয়া সমান দুইশত দিরহাম। নাবী বলেছেন:
وَفِي الرِّقَةِ رُبْعُ العُشْرِ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ إِلَّا تِسْعِينَ وَمِائَةٌ، فَلَيْسَ فِيهَا شَيْءٌ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبُّهَا
"রিক্কা বা রূপার ক্ষেত্রে দুইশত দিরহামে এক দশমাংশ আদায় করতে হবে। এক্ষণে যদি একশত নব্বই দিরহামও হয়, তথাপি তাতেও কোনো যাকাত নেই। তবে মালিক যদি স্বেচ্ছায় কিছু দেয় (তাহলে তা নিতে পারো)। "৪৮১
আলেমগণ সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে পাঁচ উকিয়ার সমপরিমাণ। আর স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে বিশ রত্তি বা দিনার সমপরিমাণ। ৪৮২
২. বাকি সাধারণ শর্তাবলি পূর্বে উল্লিখিত 'কাদের উপর যাকাত ওয়াজিব' এর অধ্যায়ের মতোই। তা হলো: মুসলিম হওয়া, স্বাধীন হওয়া, পূর্ণ মালিক হওয়া ও এক বছর অতিবাহিত হওয়া। এর আলোচনা পূর্বে চলে গেছে।
টিকাঃ
৪৭৯. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৫৭৩ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন আলী থেকে হাসান অথবা সহীহ সানাদে; ইমাম নাববী এমনটিই বলেছেন। [বইতে لفظ শব্দে রয়েছে; তবে হাদীসের বর্ণনায় دينارا শব্দে রয়েছে।
৪৮০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৯৭৯।
৪৮১. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৫৪।
৪৮২. শারহু সহীহ মুসলিম ৭/৪৮।
📄 স্বর্ণ-রৌপ্য একটি আরেকটির সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা
বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, স্বর্ণ-রৌপ্য নিসাব পরিমাণ হলে একটা আরেকটার সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে না। কেননা দুইটা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। তাই এরূপ ক্ষেত্রে একটা আরেকটার সাথে মিলিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে না। যেমন উট-গরু এবং যব-গম। যদিও উভয়টিতে উদ্দেশ্য একই হয়; অর্থাৎ উট ও গরুতে সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়া এবং যব ও গমে খাদ্যসামগ্রী হওয়া উদ্দেশ্য। নাবী এর বাণী- لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ “পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো যাকাত নেই।”৪৮৩ একটাকে আরেকটার সাথে মিলানোর কথা বললে, নিসাব পূর্ণ করতে গিয়ে পাঁচ উকিয়ার কম রৌপ্যতে যাকাত দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে, যখন নিসাব পূর্ণ করার মতো স্বর্ণ থাকবে। আর হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তার কাছে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ পূর্ণ পাঁচ উকিয়া হয় কিনা। এর উপর ভিত্তি করে, যদি কারো কাছে দশ দিনার এবংএকশত দিরহাম থাকে, তাহলে তার উপর কোনো যাকাত নেই। কেননা স্বর্ণ আলাদা যাকাত দিতে হবে এবং রৌপ্য আলাদা যাকাত দিতে হবে।
টিকাঃ
৪৮৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৯৭৯।