📄 যেসব সম্পদে যাকাত ওয়াজিব
পাঁচ প্রকার সম্পদে যাকাত ওয়াজিব (ফরয):
১. চতুষ্পদ জন্তু: আর তা হলো: উট, গরু ও ছাগল। নাবী বলেছেন:
مَا مِنْ صَاحِبِ إِبِلٍ، وَلَا بَقَرٍ، وَلَا غَنَمِ لَا يُؤَدِّي زَكَاتَهَا إِلَّا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْظَمَ مَا كَانَتْ، وَأَسْمَنَهُ تَنْطَحُهُ بِقُرُونِهَا وَتَطَؤُهُ بِأَخْلَافِهَا، كُلَّمَا نَفِدَتْ أُخْرَاهَا ، عَادَتْ عَلَيْهِ أُولَاهَا، حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ
"উট, গরু ও ছাগলের মালিকদের মধ্যে যে যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির নিকট এই পশুগুলো আরও বড়ো ও মোটা তাজা হয়ে আসবে। তারপর তাকে শিং দিয়ে গুঁতা দিবে এবং পা দিয়ে পিষ্ট করবে। যখনই শেষ পশুটি চলে যাবে তখনই যথাক্রমে আবার প্রথমটাকে ফিরিয়ে আনা হবে। এভাবে মানুষের মাঝে ফয়সালা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। "৪৬৭
২. দুই মুদ্রা: যথা সোনা এবং রূপা। এরূপ বর্তমানে প্রচলিত কাগজের মুদ্রা এর স্থলাভিষিক্ত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
"যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।" [সুরা তাওবাহ : ৩৪]
নাবী বলেছেন:
مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا ، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ، فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ ، كُلَّمَا بَرَدَتْ رُدَّتْ لَهُ، فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ.
"সোনা-রূপার মালিকদের মধ্যে যারা এর হক (যাকাত) আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন তার ঐ সোনা-রূপা দিয়ে তারজন্য আগুনের অনেক পাত (লোহার পাতের ন্যায়) তৈরি করা হবে। অতঃপর তা জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে কপাল, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই ঠাণ্ডা হয়ে আসবে পুনরায় তা উত্তপ্ত করা হবে। এরূপ করা হবে এমন একদিন যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ৪৮৮
৩. ব্যাবসায়িক পণ্য: এটা হলো এমন সব পণ্য যা লাভের উদ্দেশ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: ﴾يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ
"হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা তোমাদের অর্জিত পবিত্র জিনিস হতে ব্যয় করো।" [সূরা বাক্বারাহ: ২৬৭]
সকল বিদ্বানই উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো ব্যাবসায়িক পণ্যের যাকাত।
৪. শস্য ও ফল: শস্য: প্রত্যেক ঐ দানাদার খাদ্য যেগুলো গুদামজাত করে খাওয়া যায়। যেমন- গম, যব ইত্যাদি। ফল: খেজুর ও কিশমিশ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ
"আমরা তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি সেখান থেকে।" [সুরা বাক্বরাহ: ২৬৭]
অন্যত্র মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ "ফসল কর্তনের দিন তার হক বুঝিয়ে দাও।” (সূরা আনআম: ১৪১)
নাবী বলেছেন: فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا العُشْرَ، وَفِيمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفَ العُشْرِ
"বৃষ্টি, ঝর্ণা ও নালার পানিতে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ বা দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। আর সেচের মাধ্যমে পানি দেওয়া হলে অর্ধ উশর বা কুড়ি ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে।"৪৬৯
৫. খনিজ পদার্থ ও গুপ্তধন: মা'য়াদিন (খনিজ পদার্থ): ভূ-গর্ভে সৃষ্ট প্রত্যেক ঐ মূল্যবান সম্পদ যা ভূমি থেকে বের হয়। এটা কোনো উদ্ভাবকের উদ্ভাবন নয়। যেমন- সোনা, রুপা, তামা ইত্যাদি।
রিকায (গুপ্তধন): জাহেলী যুগে মাটির নিচে লুকানো বা পোঁতা প্রাপ্ত সম্পদ। খনিজ সম্পদ ও গুপ্তধনের যাকাত ওয়াজিব হওয়ার আম দলীল: أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ) “তোমরা তোমাদের অর্জিত পবিত্র জিনিস হতে ব্যয় করো এবং আমরা তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি সেখান থেকেও।” [সূরা বাক্বারাহ : ২৬৭]
ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরে বলেছেন: এর তাফসীর হলো- উদ্ভিদ, খনিজ সম্পদ ও গুপ্তধন। নাবী বলেছেন: وَفِي الزَّكَازِ الخُمُسُ "গুপ্তধনে এক পঞ্চমাংশ যাকাত দিতে হবে।”৪৭০
আর খনিজ পদার্থে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে।
টিকাঃ
৪৬৭. সহীহ মুসলিম, হা. ২১৯০, ফুআ, ৯৯০।
৪৬৮. সহীহ মুসলিম, হা. ২১৮০, ফুআ. ৯৮৭।
৪৬৯. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৮৩ ইবনু উমার এর হাদীস।
৪৭০. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৯৯; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৭১০ আবু হুরায়রা এর হাদীস।
📄 যাকাত ওয়াজিব করার হিকমাহ ও যাদের উপর ওয়াজিব (যাকাত ওয়াজিবের শর্তসমূহ)
যাকাত ওয়াজিব করার পিছনে বেশ কিছু হিকমাহ রয়েছে। সেগুলো হলো:
১. যাকাত বান্দার আখলাককে পবিত্র করে। কৃপণতা ও লোভ-লালসা থেকে মুক্ত করে। তাকে দানশীল ও বদান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে।
২. যাকাত মুসলিমদের অন্তরকে পবিত্র করে। ধনীদের প্রতি গরীবদের হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখে।
৩. যাকাত মুসলিম সমাজকে উন্নত করে। অভাবীদের অভাব দূর করে। বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে এবং ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে সহায়তা করে।
৪. যাকাত ইসলামী নিদর্শনসমূহকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। যেমন- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, দ্বীনের প্রচার-প্রসার এবং এ জাতীয় অন্যান্য ভালো কাজ।
৫. যাকাত সম্পদকে বৃদ্ধি করে এবং তাতে বরকত দান করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ﴾ “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৭৬]
যাদের উপর যাকাত ওয়াজিব: যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য চারটি শর্ত রয়েছে:
১. ইসলাম: কাফেরের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। আর যদি সে যাকাত আদায় করে, তাহলে তার থেকে তা কবুল করা হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে ইসলাম গ্রহণ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ “আর তাদের কাছ থেকে দান-খয়রাত কবুল করা হয় না এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে।”[সুরা তাওবা: ৫৪]
সুতরাং যদি তাদের দান গৃহীত না-ই হয়, তাহলে এই কর্তব্য পালনে তাদের কোনো উপকার নেই। আবু বকর এর নিম্নের বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে। তিনি বলেন,
هَذِهِ فَرِيضَةُ الصَّدَقَةِ الَّتِي فَرَضَهَا رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ “এটাই সেই ফরয যাকাত যেটা আল্লাহর রসূল মুসলিমদের উপর ফরয করেছেন। "৪৭১ কিন্তু তারপরও তার হিসাব হবে। কারণ বিশুদ্ধ মতে, সে শরীয়তের শাখাগত মাসআলায় সম্বোধিত।
২. স্বাধীন হওয়া: দাস-দাসীর উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা দাস কোনো কিছুর মালিক নয়। অন্যদিকে মুকাতাব দাসের মালিকানাও অত্যন্ত নগণ্য। আর দাসের অধীনে যা আছে তা সবই মূলত তার মনীবের। অর্থাৎ নিজের বলতে কিছুই নেই। এ কারণেই মূলত তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদের স্থির মালিক হওয়া: ৪৭২ এই নিসাব পরিমাণ সম্পদটি বিনা অভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ হিসাবে পূর্ণ মালিকানায় থাকতে হবে। যেমন খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও বাসস্থান সম্বলিত প্রয়োজন। কারণ যাকাত ওয়াজিব হয়েছে মূলত দরিদ্রদের সহযোগিতা করার জন্য। তাই নিসাব হচ্ছে যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে ধনী হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেই পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। এটাই তার উপর ওয়াজিব। নাবী বলেছেন:
لَيْسَ فِيهَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ ذَوْدٍ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسٍ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ “পাঁচ ওয়াসাকের কমে কোনো যাকাত নেই। পাঁচ উটের কমে কোনো যাকাত নেই এবং পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো যাকাত নেই। "৪৭৩
৪. সম্পদের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া: নিসাব পরিমাণ সম্পদ ব্যক্তির মালিকানায় বারো চন্দ্র মাস অতিবাহিত হতে হবে। এ ব্যাপারে নাবী বলেছেন:
لَا زَكَاةَ فِي مَالٍ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ “কোনো সম্পদ এক বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তাতে কোনো যাকাত নেই। "৪৭৪
এই শর্তটি চতুষ্পদ জন্তু, দুই মুদ্রা (সোনা ও রুপা) ও ব্যাবসায়িক পণ্যের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু শস্য, ফলমূল, মায়াদিন (খনিজ সম্পদ) ও রিকাযের (গুপ্তধন) ক্ষেত্রে এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ﴿
"তোমরা শস্য কাটার দিন শস্যের প্রাপ্য আদায় করে দাও।” [সূরা আনআম: ১৪১]
মায়াদিন ও রিকায এ দুটি ভূমি থেকে উৎপন্ন সম্পদ। সুতরাং এই সম্পদের যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য এক বছর অতিবাহিত হওয়া ধর্তব্য নয়। এগুলো শস্য ও ফলমূলের মতো।
টিকাঃ
৪৭১. সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৫৪। আর এটা সেই কিতাবে ছির আনাস বিন মালিক কে বাহরাইনে প্রেরণ করার সময় আবু বকর যা লিখে দিয়েছিলেন।
৪৭২. مستقراً বা স্থিরতার উদ্দেশ্য হচ্ছে ধ্বংসের সম্মুখীন না হওয়া। যদি ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তবে তাতে যাকাত নেই।
৪৭৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৯৭৯।
৪৭৪. ইবনু মাজাহ, হা. ১৭৯২।
📄 যাকাতের প্রকারভেদ
যাকাত দুই প্রকার: ১. সম্পদের যাকাত, যা সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত। ২. শরীরের যাকাত, শরীরের সাথে সম্পৃক্ত। এটাই যাকাতুল ফিতর।
📄 ঋণের যাকাত
ঋণটা যদি নিঃস্ব ব্যক্তির উপর থাকে আর সে যদি এক বছরের জন্য ঋণ নিয়ে থাকে, তাহলে ঐ এক বছরই ঋণদাতা এর যাকাত আদায় করবে। পক্ষান্তরে সচ্ছল ব্যক্তির উপর ঋণ থাকলে, ঋণদাতা প্রতি বছরই এর যাকাত দিবে। কারণ সম্পদটি তার নিজের কাছে থাকার যে হুকুম এটাও সেই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।