📄 যাকাতের পরিচয়
আভিধানিক অর্থ: বৃদ্ধি পাওয়া, বেড়ে যাওয়া। ফসল বাড়লে বলা হয় زكا الزرع
পরিভাষায়: যাকাত নির্দিষ্ট কিছু মানুষের এমন প্রাপ্য বা অধিকার যা সেই সম্পদে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণে আদায় করা ওয়াজিব।
এটা বান্দার পবিত্রতা এবং তার আত্মার পরিশুদ্ধতা স্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا﴾
"তাদের সম্পদ থেকে সাদকা নাও এবং তাদেরকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করো।" [সুরা তাওবাহ: ১০৩]
এটা পারস্পারিক ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার উপকরণ সমূহের মধ্যে একটি উপকরণ এবং মুসলিম সমাজের মাঝে পারস্পরিক দায়িত্ব গ্রহণ করার অন্তর্ভুক্ত।
📄 যাকাতের হুকুম ও দলীল
আর যাকাত ইসলামের অন্যতম একটি ফরয ইবাদত। পাঁচটি রুকনের মধ্যে একটি রুকন। সলাতের পর এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ “তোমরা সলাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।" [সূরা বাক্বারাহ: ৪৩]
তিনি আরও বলেন: خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا "তাদের সম্পদ থেকে সাদকা নাও এবং তাদেরকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করো।” [সূরা তাওবা: ১০৩]
নাবী বলেছেন: بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ البَيْتِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ “ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। ২. সলাত কায়েম করা। ৩. যাকাত প্রদান করা। ৪. সামর্থ্য থাকলে হাজ্ব পালন করা। ৫. রমাযানের সিয়াম পালন করা। ৪৬২
নাবী মুয়ায বিন জাবাল কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় অসীয়ত করে বলেছেন: ادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنِّي رَسُولُ الله ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ، فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ، فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةٌ فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ "তুমি তাদেরকে এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রতি দাওয়াত দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে জানাবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করেছেন। যদি তারা এটাও মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে জানাবে যে, আল্লাহ তাদের উপর তাদের সম্পদে সাদকা (যাকাত) ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে উত্তোলন করে গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে। ৪৬৩
সকল দেশের মুসলিমরা এ ব্যাপারে একমত যে, যাকাত ওয়াজিব। আর সাহাবীরাও এর বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে যুদ্ধ করতে একমত হয়েছিলেন। সুতরাং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা এটা প্রমাণিত হলো যে, যাকাত ফরয।
টিকাঃ
৪৬২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৮; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ১৬ ইবনু উমার এর হাদীস।
৪৬৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৩৯৫; সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ১৯ ইবনু আব্বাস এর হাদীস।
📄 যাকাত অস্বীকারকারীর হুকুম
যে অজ্ঞতাবশত যাকাত ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করবে, তাহলে তাকে এর ওয়াজিবের বিষয়টি জানানো হবে। তার উপর কুফরের বিধান প্রযোজ্য হবে না; কারণ সে ওযরগ্রস্ত। তার অজ্ঞতার কারণ: হয়তো সে নূতন ইসলামে প্রবেশ করেছে অথবা শহর থেকে দূরে কোনো মরুভূমিতে বেড়ে ওঠেছে। আর যদি যাকাত অস্বীকারকারী ইসলামী অঞ্চলে এবং আলেমদের মাঝে বেড়ে ওঠা মুসলিম হয়, তাহলে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। তার উপর রিদ্দাতের হুকুম লাগানো হবে। তাকে তিন দিন সময় দেওয়া হবে তাওবা করার জন্য। যদি সে তাওবা না করে, তাকে হত্যা করা হবে। কারণ কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতে যাকাত প্রদানের দলীল স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই যার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে সে যদি তা দিতে অস্বীকার করে, তবে সেটা কুরআন-সুন্নাহকে মিথ্যারোপ করা এবং কুফরির নামান্তর।
📄 কৃপণতাবশত যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি প্রদানকারীর হুকুম
যে ব্যক্তি কৃপণতাবশত যাকাত আদায়ে বিরত থাকবে অথচ তার বিশ্বাস আছে যে যাকাত ওয়াজিব, ঐ ব্যক্তি যাকাত আদায়ে বিরত থাকার কারণে পাপাচরী বলে গণ্য হবে। একারণে সে ইসলাম থেকে বের হবে না। কেননা যাকাত দ্বীনের একটি অন্যতম শাখা। সুতরাং শুধু যাকাত প্রদানে বিরত থাকার জন্য তাকে কাফের বলা যাবে না। নাবী যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীর ব্যাপারে বলেন:
ثُمَّ يَرَى سَبِيلَهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِمَّا إِلَى النَّارِ "অতঃপর সে তার পথটাকে হয় জান্নাতে, না হয় জাহান্নামে দেখবে।"৪৬৪
সে কাফের হলে তার জান্নাতের পথ থাকতো না। এজন্য তার থেকে জোরপূর্বক যাকাত আদায় করা হবে। যদি কেউ তা আদায় না করে লড়াই করে, তাহলে তার সাথে লড়াই করা হবে যতক্ষণ না সে আল্লাহর আদেশের কাছে মাথা নত করে এবং যাকাত প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ "যদি তারা তাওবা করে, সলাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও।" [সুরা তাওবাহ: ৫]
নাবী বলেছেন: أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ "আমি মানুষদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল, তারা সলাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে। যদি তারা তা করে, তবে তারা আমার থেকে তাদের জান ও মাল নিরাপদ রাখল। তবে ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর উপরই ন্যাস্ত থাকবে।”৪৬৫
আবু বকর সিদ্দীক বলেন: لَوْ مَنَعُونِي عَنَاقًا كَانُوا يُؤَدُّونَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا "যদি তারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায়, যা তারা আল্লাহর রসূল কে দিত, তাহলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব।”৪৬৬ আনাক্ব: ছাগলের মাদী বাচ্চা, যার এক বছর পূর্ণ হয়নি।
তাঁর সিদ্ধান্তে তিন খলীফাসহ সকল সাহাবী একমত ছিলেন। সুতরাং তাদের থেকে ইজমা প্রমাণিত যে, যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে তাদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। কৃপণতাবশত যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে সেও এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত হবে।
টিকাঃ
৪৬৪. সহীহ মুসলিম ৯৮৭/২৬, আবু দাউদ ১৬৫৮।
৪৬৫. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২৯৪৬; সহীহ মুসলিম, হা, ফুআ. ২১।
৪৬৬. সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ.।