📄 যেসব সলাতে কসর জায়েয
চার রাকা'আত বিশিষ্ট সলাতেই কেবল কসর বৈধ। যেমন- যোহর, আসর ও ইশার সলাত। সকলের ঐকমত্যে ফজর ও মাগরিবের সলাতে কসর করা যাবে না। নাবী ও তাঁর সাহাবীগণও তাই করেছেন। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন,
فَرَضَ اللهُ الصَّلَاةَ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْحَضَرِ أَرْبَعًا، وَفِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ، وَفِي الْخَوْفِ رَكْعَةً
“আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নাবী এর উপর মুকীম অবস্থায় চার রাকা'আত এবং সফর অবস্থায় দুই রাকা'আত ফরয করেছেন। আর ভয়ের সময় এক রাক'আত ফরয করেছেন।” ৩৪০
সুতরাং এই হাদীস প্রমাণ করে যে, চার রাকআত বিশিষ্ট সলাতই উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৩৪০. সহীহ মুসলিম, হা. ১৪৬০, ফুআ. ৬৮৭
📄 কসর সলাতের জন্য সফরের দূরত্ব ও এর প্রকারভেদ
সলাত কসর করার জন্য সফরের দূরত্ব হলো প্রায় ষোল ফারসাখ। এটা চার বুরুদের সমপরিমাণ যা প্রায় ৪৮ মাইল। (এ হিসাব মতে) ৮০ কিলো মিটারের কাছাকাছি। এটা হলো, দুইজন দূত একই সময়ে ভারী বোঝা নিয়ে পায়ে হেঁটে দুইদিন সফর করার দূরত্ব পরিমাণ। নাবী একদিন ও এক রাতের ভ্রমণকে সফর বলেছেন। ৩৪১
ইবনু আব্বাস ও ইবনু উমার চার বুরূদ পরিমাণ পথ সফর করলে সলাত কসর করতেন এবং সওম ভঙ্গ করতেন। চার বুদ হলো প্রায় ষোল ফারসাখ।
প্রকারভেদ: কয়েক প্রকারের সফর রয়েছে। ১. আস-সাফারুল মুবাহ বা বৈধ সফর: যেমন- বাণিজ্য ও আনন্দের উদ্দেশ্যে সফর; ২. আস-সাফারুল ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর: যেমন- হাজ্জ ও জিহাদের উদ্দেশ্যে সফর; ৩. আস-সাফারুল মাসনুনুল মুসতাহাব বা অন্যান্য বৈধ সফর: যেমন- পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে সফর; ৪. দ্বিতীয়বার হাজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সফর। অধিকাংশ আলেমের মতে, হারাম সফরে কসর করা জায়েয হবে না।
টিকাঃ
৩৪১. لا يَحِلُّ امْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةً يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ لَيْسَ مَعَهَا حُرْمَةٌ : (যে মহিলা আল্লাহ্ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে কোনো মাহরাম পুরুষকে সাথে না নিয়ে একদিন ও এক রাতের পথ সফর করা জায়িয নয়। সহীহুল বুখারীর শব্দে, হা. ১০৮৮; সহীহ মুসলিম, হা. ৪২১/১৩৩৯)
📄 অবস্থান করার নিয়তে সফর করলে কি কসর করা যাবে?
যে ব্যক্তি অবস্থান করার নিয়তে সফর করবে তার বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কোনো ব্যক্তি যদি অনির্দিষ্টভাবে অবস্থান করার নিয়তে সফর করে, তবে কসর করা যাবে না। কেননা এতে উপযুক্ত বৈধ কোনো কারণ নেই। অনুরূপভাবে যদি চার দিনের বেশি থাকার নিয়তে সফর করে বা কোনো প্রয়োজনে অবস্থান করে, আর এই ধারণা করে যে, চার দিনের মধ্যে তার কাজটি শেষ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে (বলা যায়) যে, নাবী মক্কায় অবস্থান কালে একুশ ওয়াক্ত সলাত কসর করেছেন। কারণ তিনি চার তারিখ সকালে এসে ইয়াওমুত তারবিয়া (যুলহিজ্জা মাসের আট তারিখ) পর্যন্ত অবস্থান করেন। অতঃপর ফজর সলাত পড়ে বিদায় নেন। সুতরাং নাবী -এর মতো যে ব্যক্তি চার দিন বা তার কম অবস্থান করবে, সে কসর করবে। এর বেশি থাকলে পূর্ণ সলাত পড়বে। ইমাম আহমাদ এটি উল্লেখ করেছেন। ৩৪২
আনাস বলেছেন, "আমরা মক্কায় দশ দিন অবস্থানকালে দশ দিনই সলাত কসর করেছি।" এর অর্থ আমরা উল্লেখ করেছি। কারণ যদি কোনো প্রয়োজনে অবস্থান করে অথচ তার নিয়ত নেই যে, সে চার দিনের বেশি অবস্থান করবে। সে এটাও জানে না যে, তার কাজ কখন শেষ হবে? অথবা বৃষ্টি বর্ষণ বা যুলুমের সম্মুখীন হয়ে আটকে গেলে সে কসর করবে যদিও কয়েক বছর অবস্থান করে। ইবনুল মুনযির বলেছেন, এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, মুসাফির ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত কসর করতে পারবে যতক্ষণ না সে মুকীম হয়ে অবস্থান করার নিয়ত করবে।
টিকাঃ
৩৪২. দেখুন, আল-মুগনী ২/১৩৪-১৩৫; মাজমুউল ফাতওয়া ইবনু বায-ফাতওয়াস সলাহ ৪৫৮ পৃষ্ঠা।
📄 মুসাফির ব্যক্তির যেসব অবস্থায় সলাত পূর্ণ করা ওয়াজিব
সফর অবস্থায় সলাত কসর করার কয়েকটি অবস্থা রয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ:-
১. মুসাফির ব্যক্তি যখন মুকীম ইমামের পেছনে সলাত পড়বে: এ সময় সলাত পূর্ণ করা আবশ্যক। নাবী বলেছেন : إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ "ইমাম নির্ধারণ করা হয় তাকে অনুসরণ করার জন্য।”৩৪৩
ইবনু আব্বাসকে মুকীমের পিছনে সলাত পূর্ণ করা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, تِلْكَ سُنَّةُ أَبِي الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“এটা আবুল কাসেম এর সুন্নাত।”৩৪৪
২. মুসাফির নাকি মুকীম; এরূপ সন্দেহপূর্ণ ব্যক্তির অনুসরণ করলে: কোনো ব্যক্তি যখন ইমামের পিছনে দাঁড়ায় অথচ সে জানেনা যে, ইমাম মুসাফির নাকি মুকীম, (যেমন বিমানবন্দর বা এরকম কোনো স্থানে) তখন এরূপ ব্যক্তি পূর্ণ সলাত আদায় করবে। কারণ কসরের জন্য দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। নয়তো সন্দেহ থাকলে পূর্ণ সলাত আদায় করবে।
৩. যখন সফরে মুকীম অবস্থার সলাতের কথা স্মরণ হবে: যেমন একজন মুসাফির ব্যক্তি, সফরে থাকাবস্থায় তার স্মরণ হলো যে, নিজ এলাকায় থাকাকালিন বিনা ওযুতে যোহরের সলাত পড়েছে। অথবা মুকীম অবস্থায় কোনো সলাত ছুটে গেছে। এক্ষণে তাকে অবশ্যই পূর্ণ সলাত আদায় করতে হবে। এ ব্যাপারে নাবী এর ঘোষণা: مَنْ نَامَ عَنِ الصَّلَاةِ، أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلُّهَا إِذَا ذَكَرَهَا
“যে ব্যক্তি সলাত না পড়ে ঘুমিয়ে যাবে অথবা ভুলে যাবে, সে যেন স্মরণ হওয়া মাত্রই সলাত পড়ে নেয়। "৩৪৫
অর্থাৎ মুকীম অবস্থার মতো সলাত পড়তে হবে। কারণ যেহেতু কাযা সলাত পূর্ণ আদায় করা ওয়াজিব সেহেতু এই সলাতও পূর্ণ আদায় করতে হবে।
৪. মুসাফির ব্যক্তির যদি এমন কোনো সলাত নষ্ট হয়ে যায়, যা পূর্ণ আদায় করা উচিত ছিল, তা পুনরায় আদায় করার সময় পূর্ণ সলাত পড়তে হবে। যেমন মুকীমের পিছনে মুসাফির সলাত পড়লে পূর্ণ সলাত আদায় করা আবশ্যক। এখন যদি তার এই সলাত নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা পরিপূর্ণরূপে আদায় করবে। কারণ সলাতের পুনরাবৃত্তি ঘটলে পূর্ণ সলাত পড়া অত্যাবশ্যক।
৫. মুসাফির ব্যক্তি যখন সাধারণ অবস্থান বা মুকীম হয়ে বসবাসের নিয়ত করবে: মুসাফির ব্যক্তি যখন নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট কোনো কাজের প্রতি মনস্থির না করে যে শহরে সফর করবে সে শহরেই সাধারণ অবস্থানের নিয়ত করবে, অনুরূপভাবে ঐ শহরকে নিজ শহর বানিয়ে নিবে তখন তার জন্য সলাত পূর্ণ করা আবশ্যক। কারণ বাস্তবিকপক্ষে সে সফরের হুকুম-বহির্ভূত। বস্তুত, সফরটাকে যখন নির্দিষ্ট একটা সময় অথবা কোনো একটা কাজের সাথে সাথে সম্পৃক্ত করা হবে, এরূপ ক্ষেত্রে কেবল মুসাফির কসর পড়তে পারবে।
টিকাঃ
৩৪৩. সহীহুল বুখারী, হা, ৩৭৮।
৩৪৪. আহমাদ ১/২১৬; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন তার ইরওয়া গ্রন্থে ৫৮১।
৩৪৫. সহীহুল বুখারী, হা. ৫৯৭; সহীহ মুসলিম, হা. ১৪৫৪, ফুআ. ৬৮৪; অর্থগত বর্ণনা।