📄 মুক্তাদী থেকে ইমামের অবস্থান
সুন্নাহ হলো ইমাম মুক্তাদীর সামনে থাকবে। আর মুক্তাদীরা দুই বা ততোধিক হবে তখন ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। কারণ নাবী যখন সলাতে দাড়াতেন তখন তিনি আগে দাঁড়াতেন আর মুক্তাদীরা পিছনে দাঁড়াতেন। সহীহ মুসলিম এবং আবু দাউদে এসেছে:
أَن جَابِراً وَجَبَّاراً وقفا، أحدهما عَنْ يَمِينِهِ وَالْآخَرَ عَنْ يَسَارِهِ فَأَخَذَ بأيديهما حتى أقامهما خَلْفَهُ.
"নিশ্চয়ই জাবির ও জাব্বার (সলাতের জন্য নাবী এর সাথে) দাঁড়ালেন। একজন তাঁর ডান পাশে, অন্যজন তাঁর বাম পাশে। অতঃপর তিনি তাদের উভয়ের হাত ধরে পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।"৩১৫
আনাস নাবী এর তাদের বাড়িতে সলাতের ঘটনায় বলেন:
ثُمَّ يَؤُمُ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَنَقُومُ خَلْفَهُ فَيُصَلِّي بِنَا.
"আল্লাহর রসূল ইমামতি করতেন আর আমরা তার পিছনে দাঁড়াতাম। অতঃপর তিনি আমাদের সলাত পড়াতেন।"৩১৬
মুক্তাদি একজন ব্যক্তি হলে ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। হাদীসে এসেছে,
لأنه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أدار ابن صخر وجابراً إلى يمينه لما وقفا عن يساره.
"ইবনু সাখর ও জাবির যখন বাম পাশে দাঁড়ালেন, তিনি ডান পাশে নিয়ে আসলেন।"৩১৭
মুক্তাদি দুইজন হলে ইমাম তাদের মাঝে দাঁড়াবে। ইবনু মাসউদ একবার আলকামা এবং আসওয়াদের মাঝে দাঁড়িয়ে ইমামতি করলেন এবং বললেন:
هكذا رأيت رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فعل
"এভাবেই আমি আল্লাহর রসূল কে করতে দেখেছি।"৩১৮
তবে এটা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উত্তম হলো- মুক্তাদী ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। মহিলারা পুরষদের পিছনের কাতারে দাড়াবে। আনাস বলেন,
وَصَفَفْتُ أَنَا وَالْيَتِيمُ وَرَاءَهُ وَالْعَجُوزُ مِنْ وَرَائِنَا.
"আমি ও ইয়াতীম বালক তাঁর পিছনে এবং আমাদের পিছনে বৃদ্ধা দাঁড়ালেন।”৩১৯
টিকাঃ
৩১৫ সহীহ মুসলিম, হা, ৭৪০৬, ফুআ. ৩০১০; দীর্ঘ হাদীসকে সংক্ষিপ্ত করে অর্থগত বর্ণনা নিয়ে আসা হয়েছে।
৩১৬ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৮৬, ফুআ, ৬৫৯।
৩১৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৭৪০৬, ফুআ, ৩০১০; মূল বইয়ে ইবনু আব্বাস রয়েছে, তবে হাদীসে ইবনু সাখর রয়েছে; অর্থগত বর্ণনা।
৩১৮ সুনান আবু দাউদ, হা. ৬১৩।
৩১৯ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৮৫, ফুআ, ৬৫৮।
📄 ইমাম মুক্তাদীর যে দায়িত্ব নিবে
জেহরী সলাতে (যে সলাতে ক্বিরাআত উচ্চ স্বরে পাঠ করা হয়) ইমাম মুক্তাদীর ক্বিরাআতের দায়িত্ব নিবে। আবু হুরায়রা এর হাদীসে এসেছে: وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا “ইমাম যখন ক্বিরাআত পাঠ করবে, তখন তোমরা চুপ থাকবে।”৩২০
অপর হাদীসে নাবী বলেন: مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةَ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ “যাদের ইমাম আছে ইমামের ক্বিরাআতই তার ক্বিরাআত।”৩২১
সিররি সলাতে (যে সলাতে ক্বিরাআত নীরবে পড়া হয়) ইমাম মুক্তাদীর ক্বিরাআতের দায়িত্ব নিবে না। অর্থাৎ মুক্তাদীকে ক্বিরাআত পাঠ করতে হবে।
টিকাঃ
৩২০ সুনান আবু দাউদ, হা. ৬০৪; ইমাম আবু দাউদ বলেন, এই অংশটুকু সুরক্ষিত (মাহয্য) নয়। এটা আবু খালিদের ধারণা মাত্র।
৩২১ ইবনু মাজাহ, হা. ৮৫০।
📄 ইমামের আগে কোনো কাজ সম্পাদন করা
ইমামের আগে কোনো কাজ করা মুক্তাদীর জন্য বৈধ নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি ইমামের পূর্বে তাকবীরে তাহরীমা দিবে তার সলাত নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ মুক্তাদীর জন্য শর্ত হলো, সে ইমামের পরে তাকবীর দিবে।
মুক্তাদীর জন্য সলাতের কাজগুলো ইমামের পরে সম্পাদন করা আবশ্যক। নাবী বলেন:
إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا، وَإِذَا قَالَ : سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَقُولُوا: رَبَّنَا وَلَكَ الحَمْدُ، وَإِذَا سَجَدَ فَاسْجُدُوا .
"ইমাম নির্ধারণ করা হয় তাঁর অনুসরণের জন্য। তাই যখন তিনি তাকবীর বলেন, তখন তোমরাও তাকবীর বলবে। যখন তিনি রুকু করেন তখন তোমরাও রুকু করবে। যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলেন, তখন তোমরা رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলবে। তিনি যখন সাজদা করেন তখন তোমরাও সাজদা করবে।"৩২২
মুক্তাদী যদি ইমামের সাথে সাথে কোনো কাজ করে ফেলে অথবা সালাম ফিরিয়ে ফেলে তাহলে তা সুন্নাতের বিপরীত হওয়ার কারণে মাকরূহ হবে। তবে সলাত বাতিল হবে না। কেননা সে ইমামের সাথে রুকন একত্রিত করে ফেলেছে। যদি সে তার আগে করে ফেলে তাহলে তা হারাম হবে। আল্লাহর রসূল বলেন:
لَا تَسْبِقُونِي بِالرُّكُوعِ وَلَا بِالسُّجُودِ، وَلَا بِالْقِيَامِ
"তোমরা আমার আগে রুকু', সাজদা কিংবা দাঁড়াবে না।"৩২৩
হাদীসে বর্ণিত نھی টা হারামের চাহিদা রাখে। সুতরাং ইমামের পূর্বে কোনো কাজ সম্পাদন করা হারাম। আবু হুরায়রা হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
أَمَا يَخْشَى الَّذِي يَرْفَعُ رَأْسَهُ قَبْلَ الْإِمَامِ، أَنْ يُحَوِّلَ اللَّهُ رَأْسَهُ رَأْسَ حِمَارٍ؟
"সাবধান! তোমাদের কেউ যখন ইমামের পূর্বে মাথা ওঠিয়ে ফেলে, তখন সে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার মাথা গাধার মাথায় পরিণত করে দিবেন?”৩২৪
টিকাঃ
৩২২ সহীহুল বুখারী, হা. ৩৮৯, সহীহ মুসলিম, হা. ৪১১।
৩২৩ সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৬।
৩২৪ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯১।
📄 ইমামতি ও জামাআত বিষয়ে বিভিন্ন বিধান
ইমামতি ও জামাআত সংশ্লিষ্ট পূর্বের আলোচনার ব্যতিক্রম কতিপয় বিধিবিধানা:
১. জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানো মুস্তাহাব। জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা ইমামের ঠিক পিছনে একদম কাছাকাছি দাঁড়াবে। নাবী বলেন:
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
"তোমাদের মধ্য হতে যারা জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান তারা আমার পিছনে দাঁড়াবে। তারপর দাঁড়াবে তাদের নিকটবর্তী স্তরের লোক। তারপর দাঁড়াবে তাদের নিকটবর্তী স্তরের লোক।"৩২৫
এর হিকমাহ হলো: ইমামের নিকট থেকে তার শিখবে, প্রয়োজন হলে ক্বিরাআতে ইমামকে সাহায্য করা (লোকমা দেওয়া) ও সলাতে কিছু হয়ে গেলে স্বেচ্ছায় তাদের মধ্য হতে একজন তার (ইমামের) প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
২. প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর প্রতি আগ্রহী হওয়া: প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর প্রতি আগ্রহী হওয়া ও সেই সাথে পিছনের কাতারে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকা মুক্তাদির জন্য মুস্তাহাব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রসূল বলেছেন:
تَقَدَّمُوا فَأْتَمُّوا بِي ، وَلْيَأْتَمَّ بِكُمْ مَنْ بَعْدَكُمْ، لَا يَزَالُ قَوْمٌ يَتَأَخَّرُونَ حَتَّى يُؤَخِّرَهُمُ اللَّهُ
"তোমরা সামনের কাতারে এসো এবং আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে তোমাদের পরবর্তী লোকেরা তোমাদের অনুসরণ করবে। কোনো সম্প্রদায় প্রথম কাতার থেকে পিছনে সরে আসতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে পশ্চাদ্বর্তী করে দেবেন।"৩২৬
তিনি আরও বলেছেন: لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي النَّدَاءِ وَالصَّفِّ الأَوَّلِ، ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَأَسْتَهَمُوا "আযান দেওয়া এবং প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর মাঝে কি পরিমাণ নেকি আছে এটা যদি মানুষ জানতে পারতো, তাহলে তা অর্জনের জন্য লটারি করে হলেও তা করত।"৩২৭
অপরদিকে মহিলারা সব সময় পিছনের কাতারে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এ প্রসঙ্গে নাবী বলেছেন: خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا ، وَشَرُّهَا آخِرُهَا ، وَخَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا، وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا.
"পুরুষদের সর্বোত্তম কাতার হলো প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হলো শেষ কাতার। আর মহিলাদের সর্বোত্তম কাতার হলো শেষ কাতার এবং নিকৃষ্ট কাতার হলো প্রথম কাতার।"৩২৮
৩. পরস্পর মিলে কাতার সোজা করা, ফাঁক বন্ধ করা এবং ধারাবাহিকভাবে প্রথম কাতার থেকে পূর্ণ করা: সলাত শুরু করার আগে ফাঁক বন্ধ করা ও কাতার সোজা করার নির্দেশ দেওয়া ইমামের জন্য মুস্তাহাব। এটা নাবী করেছেন। তিনি বলতেন: سَرُّوا صُفُوفَكُمْ، فَإِنَّ تَسْوِيَةَ الصَّفٌ، مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ . "তোমরা কাতার সোজা করো। নিশ্চয়ই কাতার সোজা করা সলাতের পরিপূর্ণতা।"৩২৯
আনাস বলেন, সলাতের ইকামত দেওয়া হলে আল্লাহর রসূল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ، وَتَرَاصُّوا، فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي.
"তোমাদের কাতার সোজা করো এবং পরস্পর মিলে দাঁড়াও। কারণ আমি আমার পিছনে থেকে তোমাদের দেখতে পাই।"৩৩০
আনাস রা. আরও বলেন,
كَانَ أَحَدُنَا يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ، وَقَدَمَهُ بِقَدَمِهِ.
"আমাদের প্রত্যেকেই পরস্পরে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলিয়ে দাঁড়াতেন।"৩৩১
প্রথম কাতার পূর্ণ করে তার পরের কাতারগুলো পূর্ণ করা মুস্তাহাব। যদি অপূর্ণ থাকে তাহলে যেন কাতারের শেষে থাকে। এ বিষয়ে নাবী ﷺ বলেছেন:
أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا ؟ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ الله، وَكَيْفَ تَصُفُّفُ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأَوَلَ وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّفُ
"তোমরা কি সেভাবেই কাতার বন্দি হবে না, যেভাবে ফিরিশতামণ্ডলী তাদের রবের নিকট কাতার বন্দি হন? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল ﷺ! ফিরিশতারা কীভাবে তাঁদের রবের নিকট কাতার বন্দি হন? উত্তরে বললেন: তাঁরা প্রথম থেকে কাতার সোজা করেন এবং পরস্পরে মিলে মিলে দাঁড়ান।"৩৩২
৪. কাতারের পিছনে নিঃসঙ্গ ব্যক্তির সলাত: কাতারের পিছনে কোনো ব্যক্তি নিঃসঙ্গ সলাت আদায় করলে তা বিশুদ্ধ হবে না। এ ব্যাপারে নাবী ﷺ বলেছেন:
لَا صَلَاةَ لمنفرد خَلْفَ الصَّفَّ
"পিছনের কাতারে নিঃসঙ্গ ব্যক্তির সলাত হয় না।"৩৩৩
رَأَى رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يُصَلِّي وَحْدَهُ خَلْفَ الصَّفُ فَأَمَرَهُ أَنْ يُعِيدَ الصَّلَاةَ.
"আল্লাহর রসূল ﷺ এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে কাতারের পিছনে একাকী সলাত আদায় করছে। তখন তিনি তাকে পুনরায় সলাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন।”৩৩৪
টিকাঃ
৩২৫ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩২।
৩২৬ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৮, ফুআ. ৪৩৮।
৩২৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৭, ফুআ. ৪৩৭।
৩২৮ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৪০, ফুআ, ৪৪০।
৩২৯ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৩, ফুআ. ৪৩৩।
৩৩০ সহীহুল বুখারী, হা. ৭১৯।
৩৩১ সহীহুল বুখারী, হা. ৭২৫।
৩৩২ সহীহ মুসলিম, হা. ৪৩৪, ফুআ. ৪৩০।
৩৩৩ আহমাদ ৪/২৩; ইবনু মাজাহ, হা. ১০০৩; ইমাম আহমাদ হাসান বলেছেন। ইমাম বুসীরী সহীহ বলেছেন যাওয়ায়েদ ইবনু মাজাহতে এবং ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবনু মাজাহ, হা. ৮২২।
৩৩৪ আহমাদ ৪/২২৮; সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৮২; তিরমিযী, হা. ২৩০; ইবনু মাজাহ, হা. ১০০৪; ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন। আহমাদ শাকের সহীহ বলেছেন, হাওয়াশিউত তিরমিযী ১/৪৪৮-৪৫০; ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন, সহীহত তিরমিযী ১৯১।